kalerkantho


বিচার চেয়ে রাস্তায় দাঁড়াতে হবে কেন?

ফরিদুর রহমান

২৭ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



বিচার চেয়ে রাস্তায় দাঁড়াতে হবে কেন?

গত ২১ মার্চ রাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনুর একটি ছবি প্রথম চোখে পড়ে। চা বাগানের পটভূমিতে তোলা ছবিটিতে তনুর কোনো সহপাঠীর মন্তব্য থেকে জানা যায়, এটিই তাঁর জীবনের শেষ ছবি, কারণ গত রাতে কুমিল্লা সেনানিবাসের সীমানাসংলগ্ন এলাকা থেকে ধর্ষণের শিকার তনুর মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। পরদিন সকালে মূলধারার সংবাদপত্র ও কোনো টেলিভিশন চ্যানেলে ঘটনাটি সম্পর্কে কোনো প্রতিবেদন না দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলাম এবং ধরে নিয়েছিলাম খবরটি ভুয়া। আজকাল ব্লগ ও ফেসবুক-টুইটারের মতো মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে হেয় করার জন্য বা অনেক সময় শুধু মজা করার জন্য ভিত্তিহীন অনেক তথ্য প্রকাশিত হতে দেখা যায়। তনু হত্যার ব্যাপারটি প্রথমে তেমনি একটি ভিত্তিহীন গুজব মনে হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কুমিল্লায় হাজারও মানুষের রাজপথে নেমে আসা ও সারা দেশে অসংখ্য প্রতিবাদ-সমাবেশে ক্ষুব্ধ মানুষের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র—আমাদের প্রশাসন সংরক্ষিত এলাকায়ও একটি মেয়ের নিরাপত্তা দিতে কতটা ব্যর্থ।

আমাদের দেশে আইনের লোকেরা, অর্থাৎ আইন প্রণেতা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা প্রায়ই বলে থাকেন, আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। কোথাও কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত পুলিশ দ্রুত মামলা নথিভুক্ত করে ঘটনাস্থল থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত বা আলামত সংগ্রহ করে, অপরাধীকে গ্রেপ্তার করে অথবা গ্রেপ্তারের উদ্যোগ নিয়ে সংক্ষুব্ধ পক্ষের জন্য অন্তত একটি সান্ত্বনার পরিবেশ সৃষ্টি করবে—এটুকু আইনের লোকদের কাছে সাধারণ মানুষের খুব বড় কোনো প্রত্যাশা নয়। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হত্যা, ধর্ষণ ও নারী-শিশু নির্যাতনের মতো ঘটনা ঘটলে পুলিশ মামলা নিতে গড়িমসি করে, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কালক্ষেপণ করে অপরাধের গুরুত্ব হ্রাসের চেষ্টা করে এবং অনেক সময়ই প্রকৃত অপরাধীকে আড়াল করে আইনের গতিপথ ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করে। ফলে প্রতিটি হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনের পরে নিহত শিশু বা ধর্ষণের শিকার মেয়েটির সহপাঠী, স্বজন ও সমাজের সচেতন মানুষকে পথে নেমে মানববন্ধন, মিছিল ও রাজপথ অবরোধ করে ‘বিচার চাই’ বলে আওয়াজ তুলতে হয়। প্রকৃতপক্ষে আইনের ঠেলাগাড়িটিকে জোরে ধাক্কা না দিলে তা নড়তেই চায় না।   

হত্যা বা ধর্ষণের মতো বড় রকমের কোনো অপরাধের সঙ্গে ক্ষমতাধর বা যথেষ্ট অর্থবিত্তের জোগানদাতা কেউ জড়িত থাকলে প্রশাসন প্রথমত হুমকিধমকি দিয়ে আপসরফা করার এবং তা না হলে শেষ পর্যন্ত টাকা-পয়সার বিনিময়ে বিষয়টিকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে। ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার প্রচলিত কায়দায় কুমিল্লার জেলা প্রশাসক মহোদয় হাজার বিশেক টাকা এবং এক খণ্ড জমির প্রস্তাব নিয়ে নিহত মেয়েটির পরিবারের কাছে হাজির হয়েছিলেন। অন্যদিকে জেলা প্রশাসক ও কুমিল্লার পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, তাঁদের কাছে এই হত্যাকাণ্ড বা উত্ত্যক্তকারীর মোবাইল ফোন সম্পর্কে কোনো তথ্য নেই। কথা শুনে মনে হয়, তথ্য জোগাড়ের দায়িত্বও তনুর স্বজন বা সহপাঠীদের। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিতদের হাতে সব কিছু তুলে দিলেই কেবল তাঁরা মামলাটি নিয়ে কিঞ্চিৎ অগ্রসর হতে পারেন। তবে তথ্যের অভাবের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা পুলিশ সুপার ৭১ টিভির ‘সরাসরি’ অনুষ্ঠানে বলে ফেলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘এই মামলায় হাইলি টেকনিক্যাল কিছু ব্যাপার আছে। এটা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আমরা কিছু বলতে পারছি না। ’ বক্তব্য থেকে পুলিশের অসহায়ত্বই প্রকাশিত হয়েছে, সদিচ্ছা নয়। তবে কি আমাদের প্রশাসন ‘প্রতিকারহীন শক্তের অপরাধে’ কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে না পেরে বিচারপ্রার্থীর জন্য নীরবে-নিভৃতে অশ্রুপাতই ভবিতব্য বলে নিশ্চিত করতে চায়?     

কিন্তু কোনো ঘটনাই যে শেষ পর্যন্ত ধামাচাপা দেওয়া সম্ভব হয় না তার প্রমাণ অতীতে আমরা বহুবারই পেয়েছি। ১৯৯৫ সালের ২৪ আগস্ট দিনাজপুরে কিশোরী ইয়াসমিনকে ধর্ষণ ও হত্যার পরে অপরাধী পুলিশ কর্মকর্তা ও পুলিশের গাড়িচালককে আড়াল করার অপচেষ্টার বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছিল সারা দেশ। বিক্ষুব্ধ জনতা দিনাজপুরে পুলিশ ফাঁড়ি ঘেরাও করলে পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছিল সাতজন প্রতিবাদী মানুষ। একজন ইয়াসমিন হত্যার ঘটনায় সাতজন নিরপরাধ মানুষ জীবন দিয়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেছে। ঘটনার ৯ বছর পর ২০০৪ সালে বিচারে সাজাপ্রাপ্ত অপরাধীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

একটি হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটে যাওয়ার সাত দিন পরও যখন কেউ গ্রেপ্তার হয় না, এ ব্যাপারে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না এবং পুলিশ ও প্রশাসন কোনো জিজ্ঞাসারই সন্তোষজনক জবাব দিতে ব্যর্থ হয় তখন স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, তারা কাকে বাঁচাতে চেষ্টা করছে? অপরাধী যত বড় শক্তিধরই হোক না কেন—তার মুখোশ উন্মোচন করে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানো হলে তা কি পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা বাড়াতে সহায়তা করে না? পুলিশের যেকোনো ইতিবাচক তত্পরতা কি জনগণের মধ্যে নিরাপত্তা বোধ ও একই সঙ্গে সরকারের ভাবমূর্তি বাড়াতে সাহায্য করে না? তাহলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে কেন এই লুকোচুরি খেলা?       

সোহাগী জাহান তনু হত্যার পরপরই এক সপ্তাহের মধ্যে আরো চারটি ধর্ষণ ও হত্যার তথ্য ও ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পাতায় প্রকাশিত হয়েছে। পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় একজন এসএসসি পরীক্ষার্থীকে ধর্ষণের পর হত্যা করে ধানক্ষেতে ফেলে রাখা হয়েছে, পাবনার চাটমোহরে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এক গৃহবধূ, টাঙ্গাইলের তাড়াইলে ১৩ বছরের একটি শিশু ও রাজশাহী শহরে হোটেলে ধর্ষণের শিকার হয়েছে এক কিশোরী। এই ঘটনাগুলোর কোনো খবরই মূলধারার সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়নি। আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতে চাই, এই ঘটনাগুলো আদৌ ঘটেনি, আমার দেশ এখনো ধর্ষকের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়নি। তনু হত্যার প্রতিবাদে সারা দেশের মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়েও যেখানে ন্যায়বিচারের সম্ভাবনা এখন পর্যন্ত নিশ্চিত নয়, সেখানে পরপর এত ধর্ষণ ও হত্যার বিচারের দাবি নিয়ে আমরা কোথায় দাঁড়াব?

লেখক : সাবেক উপমহাপরিচালক (অনুষ্ঠান), বাংলাদেশ টেলিভিশন


মন্তব্য