kalerkantho

সোমবার। ২৩ জানুয়ারি ২০১৭ । ১০ মাঘ ১৪২৩। ২৪ রবিউস সানি ১৪৩৮।


কুড়িয়ে পাওয়া সংলাপ

একজন আইন প্রণেতার সংসদ বক্তৃতা ও হৃৎনলয়ের রোদনবোধন

রণজিৎ বিশ্বাস

২৭ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



একজন আইন প্রণেতার সংসদ বক্তৃতা ও হৃৎনলয়ের রোদনবোধন

কথার ঝুলির আকৃতি আজ একটু বড়, একটু বেশিই পেটমোটা। ১৫ দিনে অনেক খবর জমেছে, সেগুলো ঠেসেঠুসে ভরতে ভরতে নিজের পেটটিও তরমুজের আকৃতি নিয়েছে।

আর কিছু সেখানে ভরলেই ঠাস করে সেটি ফেটে যাবে। সে বিলাসে মন নেই, কারণ পেটফাটা মানুষ বেশি দিন বাঁচে না।

এক-এক করে তাই অনেক কথার মুক্তি দিতে চাই। সবার আগে চলমান সংসদ অধিবেশনে একজন বিশিষ্ট সদস্যের বক্তৃতা। তিনি আমাদের মুক্তিযুদ্ধে দুই নম্বর সেক্টরের কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফ বীর-উত্তমের কন্যা মেহজাবিন খালেদ এমপি।

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদে অনেক তথ্য জড়ো করে একটি সিদ্ধান্তমূলক বক্তৃতা দিয়েছেন। পত্রিকা থেকে মাথা না তুলে পড়ার মতো। এই বক্তৃতায় আমরা কিছু কথা নতুন জানলাম, কিছু জানা কথা নবায়ন করলাম। অবিকল উদ্ধরণে সেগুলো বন্ধন করতে চাই। সব নয়, বাছাবাছা কয়েকটি, ব্লাডকে ‘বয়েল’ করানো কয়েকটি।

যেমন—‘বঙ্গবন্ধু-হত্যাকাণ্ডের পর ক্ষমতায় আরোহণকারী জেনারেল জিয়াউর রহমান পাকিস্তানের সঙ্গে আবার একীভূত হয়ে কনফেডারেশন করার ষড়যন্ত্র করেছিলেন। ’

মেহজাবিন খালেদ জিয়াউর রহমানের মুক্তিযুদ্ধকালীন ও পরবর্তী কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেছেন, পাকিস্তানের গোয়েন্দা বাহিনী আইএসআইয়ের ‘চর’ হিসেবে তিনি স্বাধীনতাসংগ্রামে অনুপ্রবেশ করেছিলেন। একাত্তরে রণাঙ্গনে পরাজয়ের পর ‘পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধারের জন্য’ পাকিস্তানিরা বাংলাদেশে চর নিয়োগ করে। সেনাবাহিনীর মধ্যে মেজর জিয়া ছিলেন পাকিস্তানিদের একনিষ্ঠ বিশ্বস্ত অনুচর। পাকিস্তানের তত্কালীন প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টোর কথা উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, ‘ভুট্টো বলেছিলেন, তিনি (জিয়াউর রহমান) সেনাবাহিনীতে গোপনে গোপনে পাকিস্তানফেরত সৈনিকদের নিয়ে বৈঠক করে সরকারবিরোধী তত্পরতা চালান। ’

মাঝারি সাইজের এই ‘বড়’ খবরটিতে আরো আছে “বাংলাদেশে ক্ষমতা দখলের পর জিয়াউর রহমান দেশকে ‘পাকিস্তানে ফেরাতে চেয়েছিলেন। ’...১৯৭৭ সালে পাকিস্তান সফরে গিয়ে জিয়াউর রহমান পাকিস্তানের সঙ্গে কনফেডারেশন করার ষড়যন্ত্র করেছিলেন। ...তিনি দেশবিরোধী ও ষড়যন্ত্রের হোতা। ...যদিও তিনি (জিয়াউর রহমান) মুক্তিযোদ্ধা নামে পরিচিত ছিলেন, কিন্তু তাঁর মনেপ্রাণে মুক্তিযুদ্ধের সামান্য চিন্তাচেতনা, ধ্যানধারণা ও আদর্শের চিহ্ন ছিল না। ...১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ চট্টগ্রাম সেনানিবাসে সহস্রাধিক বাঙালি সৈনিক হত্যার জন্য জিয়াকে দায়ী করে তিনি বলেন, জিয়ার নির্দেশে বেঙ্গল রেজিমেন্টের ১৮০০ সৈনিক অস্ত্র জমা দেন। এর কিছুক্ষণ পরই পাকবাহিনী বেঙ্গল রেজিমেন্টের নিরস্ত্র সৈনিকদের ওপর আক্রমণ চালায়। এতে প্রায় ১২০০ বাঙালি সৈন্য নিহত হন। এই হত্যাকাণ্ডের দায় থেকে জিয়া রেহাই পেতে পারেন না। ওই সময়...চট্টগ্রামে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড ছিলেন মেজর জিয়াউর রহমান। ”

এর আগে পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা বিভাগে জিয়াউর রহমানের কাজ করার কথা তুলে ধরে মেহজাবিন খালেদ বলেন, ‘১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারির পর বাঙালি রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও ছাত্রদের গোপন রিপোর্ট প্রদানের দায়িত্বে জিয়াকে বেছে নিতে আইয়ুব খান ভুল করেননি। ’

আমি একজন ফ্যাসিলিটেটর। সচেতন মানুষের ভাবনার রেলগাড়িতে উঠে কম্পার্টমেন্টে কম্পার্টমেন্টে কিছু ‘ফুড ফর থট’ ও ভাবনার কিছু রেণুকণা কলামিস্ট হিসেবে আমি দিনকয়েকের ব্যবধানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আসি। আমি যা শুনি, তা শোনাই, চাঞ্চল্যকর যা কিছু পাঠ করি, তা পড়াই, চেতনার জতুগৃহে যা কিছু আগুনের হলকা ছোঁয়ানো, যা কিছু নতুন নতুন জানতে পারি, জানিয়ে যাই।

কেন জানাই? জানাই, আড়ালের কিছু খবর পাঠক সাধারণ ও তথ্যসন্ধানীদের দৃষ্টিতে আনার জন্য, কিছু ঘটনার ওপর থেকে ধুলোবালির আস্তরণ সরানোর জন্য ও কিছু বিভ্রান্তিকর মুখমণ্ডলকে আবরণমুক্ত করার জন্য।

মেহজাবিন খালেদ এমপির পার্লামেন্ট-স্পিচের ওপর সংবাদপত্র প্রতিবেদনের যেটুকু অংশ উদ্ধরণচিহ্নে বাঁধা হলো, তা আসলে কোন ক্যাটাগরির খবর? এ প্রশ্ন আসতেই পারে। প্রথমত, এটি বড় চাঞ্চল্যকর খবর। মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো খবর। যদি মনে করা হয় এই বক্তৃতায় ও খবরে অসত্য ও কষ্টকল্পনার কিছু তথ্য আছে, যুক্তির জোরে তা খণ্ডনের চেষ্টা চলতে পারে, তবে জোরের যুক্তিতে বা ব্যবহারজীর্ণ কোনো শব্দগুচ্ছে নয়।

ব্যবহারজীর্ণ শব্দগুচ্ছ বা শব্দবন্ধ কোনগুলো? এগুলো ‘ফর্মুলেইক ফ্রেজ’—যা আমরা যখন-তখন ব্যবহার করি, সুযোগ পেলেই ব্যবহার করি, বেকায়দায় পড়লেই ব্যবহার করি, মোটামুটি বিনা অর্থেই ব্যবহার করি। যেমন—‘কথাগুলো বিদ্বেষপ্রসূত’, ‘কথাগুলো অযৌক্তিক, অসত্য ও হাস্যকর’, ‘এটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিতে মানুষের দৃষ্টিকে অন্যদিকে সরাবার প্রচেষ্টামাত্র’।

হয়েছে। তেমন চেষ্টাও হয়েছে। পরদিনের কাগজেই হয়েছে। বলা হয়েছে, যাদের বলার তারাই বলেছে—চলমান পরিস্থিতিতে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অপচেষ্টা হচ্ছে। একই প্রতিবাদে পুরনো সেই ‘ক্লীশে’কে আবার টানা হয়েছে—উনি স্বাধীনতার ঘোষক।

এমনটিও স্বাভাবিক। পুরনো, ভোঁতা ও মরচে পড়া অস্ত্রকে একসময় হাত থেকে ফেলে দিতে হয়, কিন্তু আমরা দিই না, দিতে পারি না। কারণ, আমাদের তূণে তীরের বড় টান। সব সময় সব কিছু যে প্রাসঙ্গিক হয় না—তা আমরা হয় বুঝতে পারি না, নয় বুঝতে চাই না। তা ছাড়া যা সত্যচ্যুত ও সম্পর্করহিত, মানুষ তা খায়ও না, নেয়ও না, পাতেও তোলে না। আমাদের সমস্যা হচ্ছে, আমরা তা বারবার ব্যবহার করে নিজেদের হাস্যকর প্রাণীতে পরিণত করি, চারপাশের মানুষগুলোকে আমরা চালাক ও চতুরজনরা বড় বুদ্ধিহীন ও ‘সরল’ মনে করি।

দ্বিতীয় কথাটি খুব দুঃখজনক। সেটি যে আমাকে কী কষ্ট দয়, কেমন ছোট করে রাখে, যদি বোঝানো যেত, হালকা বোধ করতাম। মহান স্বাধীনতার ঘোষণা সম্পর্কিত ওই মতলবি বাক্যটি যতবার শুনি, যতবার পড়ি, ততবার কষ্ট পাই, ততবার লজ্জা পাই, ততবার ক্ষুদ্র হয়ে যাই।

পাষাণপৈঠায় নিজের মাথা কুটতে কুটতে রক্তাক্ত অবস্থায় তখন শুধু চিত্কার করতে ইচ্ছা করে—বোধে-বুদ্ধিতে আর ভাষাজ্ঞানে আমরা কি এতই দুর্বল কোনো জনগোষ্ঠী যারা ‘ঘোষণা’ ও ‘পাঠ’ শব্দ দুটির অর্থ ও অর্থপার্থক্য বুঝতে পারব না! মেধায় ও স্মৃতিতে আমরা কি এতই ঊনখাটো!

সেই পাঠ আবার প্রথম পাঠ নয়, অসামরিক কয়েকজনের পাঠ করার পরের পাঠ। সেই পাঠ আবার জাতির জনক ও স্বাধীনতার স্থপতিজনার পক্ষে ‘আমাদের মহান নেতা’ হিসেবে তাঁর নাম শ্রদ্ধায় উল্লেখ করে পাঠ। যাঁর নামে কথা, যাঁর নামে সন্ধিমূলক বারতা ও যাঁর নামে প্রচার, যদ্দিন তিনি বেঁচে ছিলেন তিনি নিজের মতো করে সারা দেশ দাপিয়ে বেড়ানোর সময় ও নিজের স্থানিক অবস্থান থেকে উন্নয়নের কিছু দর্শন শোনানোর সময় এবং দেশের সবচেয়ে বড় আইনের বই পবিত্র সংবিধানের একটি স্তম্ভ ধসিয়ে দিয়ে পরোক্ষভাবে তাতে ভেদবিচার ও বিভেদবুদ্ধির বিষ ঢোকানোর সময় একবারের জন্যও এই ঘোষণার দাবিটি উচ্চারণ করেননি, অথবা সমীচীন মনে করেননি, দাবিটির হাজার মাইল দূরের কোনো সংকীর্ণ পথ ধরে হাঁটার চেষ্টাও করেননি।

এই দূরত্বটি হাজার মাইলের বেশিও হতে পারত। কিন্তু আমি হাজার মাইল উল্লেখ করছি বড় জবরদস্ত এক কারণে। পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের মানসিক, আদর্শিক ও সত্যসততা-সাধুতাকেন্দ্রিক দূরত্ব যত কোটি মাইল হোক না কেন, ভৌগোলিক দূরত্ব তো এক হাজার মাইলই।

লেখক : কথাসাহিত্যিক, সাবেক সিনিয়র সচিব


মন্তব্য