kalerkantho


ভোটের আমেজ পাইনসা হইয়া গেছে

এ এম এম শওকত আলী

২৭ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ভোটের আমেজ পাইনসা হইয়া গেছে

প্রথম ধাপে ৭১৯টি ইউনিয়নে নির্বাচন হয়েছে গত ২২ মার্চ। এ ধাপের নির্বাচনের আগে থেকেই গণমাধ্যমে নির্বাচন যে অবাধ ও সুষ্ঠু হবে না, তা নিয়ে খবর প্রকাশ করা হয়েছিল। একটি রাজনৈতিক দল বলেছিল যে একতরফা নির্বাচন হবে। এ উক্তির সমর্থনে বিভিন্ন স্থানে প্রার্থীদের বাধা ও সমর্থকদের পাল্টাপাল্টি হামলা, সংঘর্ষের অভিযোগ করা হয়। সাংবাদিকদের নিরপেক্ষ মূল্যায়নেও নির্বাচন কমিশনের নিষ্ক্রিয়তার কথা বলা হয়। প্রকাশিত পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে ৫৪টি ইউনিয়নে ক্ষমতাসীন দলের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়েছেন। এ সম্পর্কে প্রকাশিত সংবাদে মন্তব্য ছিল বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত পদ মোট পদের ৯ শতাংশ। অতীতের নির্বাচনেও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার নজির যে একেবারেই নেই তা বলা যাবে না। তবে বর্তমান সংখ্যা অনেক বেশি বলে পর্যবেক্ষকরা ধারণা করছেন। এ লেখার শিরোনাম বাগেরহাট জেলার এক ভোটারের উক্তি। এ ধরনের মূল্যায়ন অন্য দিনের সংবাদেও দেখা যায়। এতে বলা হয় যে উৎসবের বদলে রয়েছে উত্কণ্ঠা ও শঙ্কা, যা অতীতে দৃশ্যমান ছিল না। সাত শতাধিক ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী প্রায় তিন হাজার। কাউন্সিলর পদের জন্য প্রায় ৩৩ হাজার ৪০০ প্রার্থী রয়েছেন। সর্বমোট ১৪টি রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থীরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছেন। তবে এর মধ্যে স্বল্পসংখ্যক জায়গায় কোনো কোনো দলের প্রার্থীরা সহিংসতার যুক্তি দেখিয়ে নির্বাচন বর্জন করার ঘোষণা দিয়েছেন।

জানা যায় যে গত সোমবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার নির্বাচনপূর্ব সহিংস ঘটনার জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের দায়ী করেছেন। তাঁর ভাষায় কমিশন আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য অন্যান্য সরকারি বিভাগের কর্মকর্তাদের ওপর নির্ভরশীল। এ তথ্য নতুন কোনো বিষয় নয়। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশেই একই পদ্ধতি এ ক্ষেত্রে অনুসরণ করা হয়। নির্বাচনসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। কিন্তু তাঁদের ওপর কমিশনের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। স্মরণ করা যেতে পারে যে যেকোনো নির্বাচনের কিছু দিন আগেই নির্বাচনসংশ্লিষ্ট সব সরকারি কর্মকর্তাকে কমিশনের অধীন করার নিয়ম সংবিধান স্বীকৃত এবং তা করাও হয়। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের মূল্যায়নে সহিংস ঘটনার প্রতিকার করা সম্ভব নয়, কারণ সংশ্লিষ্ট অন্য বিভাগীয় কর্মকর্তারা এ ক্ষেত্রে কমিশনকে কোনো সহযোগিতা করেন না। এ প্রসঙ্গে তিনি অবশ্য কিছু আশার বাণীও শুনিয়েছেন। তিনি বলেছেন, পুলিশের ব্যর্থতার জন্য তাদের দায়ী করা হবে। উল্লেখ্য, নির্বাচনের সময় একমাত্র পুলিশই আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকে না। এর সঙ্গে আনসার, বিজিবি ও র‍্যাবও থাকে। অতীতের ঘটনার ভিত্তিতে বলা যায়, ব্যর্থতার জন্য কারো বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করার নজির নেই, যা আছে তা হলো বদলির নজির। বর্তমানের নির্বাচনপূর্ব সময়েও এ নজির আমরা জানতে পেরেছি। বলা যায় যে যিনি বদলি হন, তিনি হয়তো এর জন্য স্বস্তিবোধ করেন। কারণ তিনি ঝামেলামুক্ত থাকেন। এরপর কী হয় তা কেউ জানে না। এ প্রসঙ্গে নির্বাচনসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের বিষয়ে কিছু ব্যাখ্যারও প্রয়োজন রয়েছে। নির্বাচনসংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা ওই সময় বিভিন্ন পদে কাজ করেন। যেমন রিটার্নিং অফিসার, সহকারী রিটার্নিং অফিসার, প্রিসাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসার। প্রিসাইডিং অফিসার থেকে পোলিং অফিসার পর্যন্ত পদধারী ব্যক্তিরা ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করেন। কেন্দ্রে কোনো ধরনের অনিয়ম হলে নির্বাচনী আইনে যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে তা তিনি প্রয়োগ করতে পারেন। অর্থাৎ ভোটপ্রক্রিয়া বন্ধ করতে পারেন। ভোটকেন্দ্রে কর্তব্যরত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা কামনা করতে পারেন। প্রশিক্ষণের বিষয় মূলত নির্বাচনী আইনসংক্রান্ত। নির্বাচনপূর্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব প্রধানত পুলিশের। সহিংস ঘটনার বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার আরো ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন যে বাংলাদেশসহ পার্শ্ববর্তী দেশে উন্নত দেশের তুলনায় নির্বাচনকে ঘিরে সহিংসতার মাত্রা অনেক বেশি। অতীতেও বাংলাদেশে সহিংস ঘটনা ঘটেছে। নির্বাচন এখন অর্থকেন্দ্রিক। শক্তিধর প্রার্থীরাই মনে করেন যে তিনি যোগ্যতম প্রার্থী। সহিংস ঘটনার পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পর থেকে ২১ মার্চ পর্যন্ত সর্বমোট আট ব্যক্তি নিহত ও ৫০০ ব্যক্তি আহত হয়েছেন। অতীতের নির্বাচনপূর্ব সহিংসতার বিষয়ে কোনো পরিসংখ্যান কমিশনের পক্ষ থেকে প্রকাশ করা হয়নি। এ কারণে ধারণা করা যায় যে অতীতের নজির এ ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক নয়। তা ছাড়া গত কয়েক দিনের প্রকাশিত সংবাদে এ কথাই বলা হয়েছে। ২২ মার্চ প্রকাশিত এক সংবাদে দেখা যায় যে কমিশন নির্বাচনপূর্ব অনিয়ম ও সহিংস ঘটনা রোধের জন্য একাধিকবার কঠোর সাবধান বাণী উচ্চারণ করেছে। কিন্তু অত্যন্ত স্বল্পসংখ্যক ক্ষেত্রে কিছু আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এ নিয়ে বিশেষজ্ঞদের অভিমত হলো, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঢিলেমিই সহিংস ঘটনার মূল কারণ। এ প্রসঙ্গে প্রকাশিত উদ্ধৃতি হলো পুলিশ ও রাজনৈতিক দলগুলোই অনিয়ম ও সহিংস ঘটনার কারণ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক নির্বাচন কমিশনারের মন্তব্য হলো পুলিশই প্রধানত দায়ী। সহিংস ঘটনায় মৃত প্রার্থীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি বান্দরবানের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী শান্তি ত্রিপুরা। তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন।

এবারের ইউনিয়ন নির্বাচন ছয় ধাপে হবে। এর মূল কারণ এক ধাপে সব ইউনিয়নে নির্বাচন পরিচালনা করা দুরূহ বিষয়। এ ছাড়া ধাপে ধাপে নির্বাচন করলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা সহজে সফল করা যায়। নির্বাচনপূর্ব সহিংসতার আধিক্য দেখে মনে হয়, লক্ষ্য অর্জন শতভাগ হয়নি। এর পরের বিষয় হচ্ছে ভোট গ্রহণের দিন নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করা। সব ধরনের নির্বাচনের দিন যেসব বিষয় দৃশ্যমান হয় তা কারো অজানা নয়। ভোটকেন্দ্র দখল, জাল ভোট প্রদান, ব্যালট বাক্স ছিনতাই, ভোটারদের ভয়ভীতি দেখিয়ে নিজস্ব সমর্থকদের দিয়ে ভোট দেওয়ার চেষ্টা, অন্য দলের পোলিং এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া ইত্যাদি। এ পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ নির্বাচনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দায়িত্ব পালনে কঠিন পরীক্ষা বা পরিস্থিতির সম্মুখীন হন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, এ ধরনের অপচেষ্টা রোধ করা শতভাগ নিশ্চিত করা যায় না। এহেন পরিস্থিতিতে নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণে প্রদত্ত ভোটের পরিসংখ্যানের ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি পায়। পরিসংখ্যানভিত্তিক বিশ্লেষণে যদি দেখা যায় যে স্বল্পসংখ্যক ভোটকেন্দ্রে হানাহানির জন্য সার্বিক ফলাফল অপরিবর্তিত থাকবে, তাহলে বিষয়টি ফলাফল ঘোষণার

সহায়ক হয়। এবারের ইউনিয়ন নির্বাচনে সহিংস ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ২৪ মার্চ পর্যন্ত মোট ১৪ জন। আগের কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। এ-সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া গেলে মাত্রার আধিক্য সম্পর্কে নিশ্চিত কিছু বলা সম্ভব ছিল। এ সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের ধারণা, নিহতের সংখ্যা আগের তুলনায় অনেক বেশি। আশঙ্কার বিষয় হলো, প্রথম ধাপের নির্বাচন শেষ না হতেই পরবর্তী ধাপের নির্বাচন ঘিরে হানাহানি শুরু হয়েছে। ২৪ মার্চ প্রকাশিত এক খবরে এ কথাই বলা হয়েছে।

এক বিশেষজ্ঞের মতে, বিরাজমান অবস্থা নির্বাচন ব্যবস্থাপনার চরম অবনতির বহিঃপ্রকাশ। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবার সচেতন হওয়া অত্যন্ত জরুরি। পত্রিকা সূত্রে আরো জানা যায় যে নির্বাচনপূর্ব ও ভোটের দিনের সহিংসতায় মোট ১৪ জন নিহত হয়েছে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পূর্ব-ইতিহাস পর্যালোচনা করে অতীতে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন যে এ পর্যায়েই ভোটারদের আগ্রহ ও অংশগ্রহণ সর্বাধিক হয়। ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় নির্বাচনের পরেই ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এর পরও নিয়মমাফিক ইউনিয়নে নির্বাচন হয়েছে। তবে নিহতের সংখ্যা এত বেশি ছিল না। অনেকের মতে, দলীয় ভিত্তিতে এ পর্যায়ে নির্বাচন হওয়ার কারণেই সহিংসতার মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রাসঙ্গিক অন্য কারণ হলো, কমবেশি প্রায় সব দলেরই বিদ্রোহী প্রার্থী। বিদ্রোহী প্রার্থীর অংশগ্রহণের ফলেও কিছু সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এ দৃশ্যপট দলীয় শৃঙ্খলার ঘাটতিরই বহিঃপ্রকাশ। অন্য অর্থে বলা যায়, তৃণমূল পর্যায়ে মতামতের ভিত্তিতে প্রার্থীর মনোনয়ন অনেক ক্ষেত্রেই সঠিক ছিল না। ওই পর্যায়ের নেতারা এ বিষয়ে একমত হতে পারেননি। এ কারণেই বিদ্রোহী প্রার্থীর বিষয়টি দৃশ্যমান ছিল। এ নিয়ে ভবিষ্যতে দলীয় কর্মপন্থা কী হবে তা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

এ প্রসঙ্গে এ কথাও বলা যায় যে স্থানীয় গণতন্ত্রের এমন ধারা চলতে থাকলে এর ভবিষ্যৎ কোনো ক্রমেই উজ্জ্বল হবে না। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনকেও ভবিষ্যতের জন্য অধিকতর সক্রিয় হতে হবে। এর সঙ্গে অংশগ্রহণকারী সব রাজনৈতিক দলেরই সদিচ্ছার প্রয়োজন রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকার বিষয়টিও এ নির্বাচনে প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। অন্যান্যের মধ্যে নির্বাচন পরিচালনাকারী কমিশনও প্রশ্ন তুলেছে। কমিশন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সদস্যদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলেছে। এ ব্যবস্থা সফলভাবে বাস্তবায়ন করা হলে ভবিষ্যতে হয়তো সহিংসতার ঘটনার সংখ্যা হ্রাস পাবে। অন্যথায় স্থানীয় গণতন্ত্রের দুর্বৃত্তায়ন রোধ করা সম্ভব হবে না।

লেখক : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা


মন্তব্য