kalerkantho


রক্তাক্ত রাতের ইতিহাস ও গণহত্যা

মিল্টন বিশ্বাস

২৫ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



রক্তাক্ত রাতের ইতিহাস ও গণহত্যা

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ‘ভয়াল রাত’ হিসেবে গণ্য; গণ্য পাকিস্তানিদের গণ্যহত্যার সূচনা হিসেবে; যদিও তাদের হত্যাযজ্ঞের ইতিহাস দীর্ঘ। ভাষা আন্দোলন থেকে তারা বাঙালিদের নিধনযজ্ঞ শুরু করে। এরপর বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জ-শহরে ঘটেছে অনেক ঘটনা; আর সেসব ঘটনায় নির্মম মৃত্যুর শিকার হয়েছে অজস্র বাঙালি। এই যে বাঙালিদের ওপর তাদের আক্রোশ ২৩ বছর ধরে পুঞ্জীভূত হয়েছে, তারই ভয়ংকর রূপটি দেখা গেছে ২৫ মার্চের মধ্যরাত থেকে। কারণ পাকিস্তানিদের বাঙালি সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা তৈরি করা হয়েছিল। পাকিস্তানিরা তাদের মতো সমমর্যাদার মানুষ মনে করেনি বাঙালিদের, তার প্রমাণ পাওয়া যায় বিভিন্নজনের মন্তব্যে। বুদ্ধিজীবী হত্যার মূল হোতা মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী তাঁর স্মৃতিকথায় বাঙালির ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, “বাঙালি তিন রকমের। ‘বাবু বাঙালি’রা লেখাপড়া শিখে কেরানি হতে আগ্রহী, ‘জাদু বাঙালি’রা ডাকিনী আর ‘ভুখা বাঙালি’ তো চির ক্ষুধার্ত। ” লেফটেন্যান্ট জেনারেল নিয়াজির বাঙালি সম্পর্কে ধারণা ছিল একই রকমের, ‘বাঙালিরা হলো নিচু এলাকার মানুষ, শয্যার নিচে শায়িত হওয়াটা তাদের অভ্যাস। ’ ভারতবর্ষের হাজার বছরের ঐতিহ্য লালনকারী একটি জাতি সম্পর্কে পাকিস্তানি সেনাদের এ ধরনের মনোবৃত্তি একাত্তরে সমগ্র বাংলাদেশে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। লেলিয়ে দেওয়া হয় সেনাবাহিনীকে বাঙালি জাতিকে নিঃশেষ করার জন্য। চালানো হয় নির্বিচার হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন ও অগ্নিসংযোগ। আজও আবিষ্কৃত হচ্ছে অনেক বধ্যভূমি, যা পাকিস্তানিদের গণহত্যা বা জেনোসাইডের সাক্ষ্য বহন করছে।

একাত্তরে ৩০ লাখ ১০ হাজার বাঙালি নিহত হওয়ার ঘটনা ছিল গণহত্যা। গণহত্যা হলো বিকৃত মানসিকতার পরিচয়, যার সঙ্গে নৃশংসতা শব্দটি জড়িত। একটি গোষ্ঠীকে লেলিয়ে দেওয়া অন্য একটি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে; আক্রান্ত গোষ্ঠী নিরীহ ও নির্বিবাদী। পাকিস্তান আমলে বাঙালি জাতিগোষ্ঠী পশ্চিম পাকিস্তানের ওপর কোনো রকম পীড়ন কিংবা হামলা চালায়নি। তবু এ হত্যালীলায় উল্লাসে মেতে উঠেছিল পাকিস্তানিরা। ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না। ’ ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী বেশে বাঙালির সেই পরিচয় বিশ্ববাসী দেখেছে। ২৫ মার্চের গণহত্যার সূচনা যে পাকিস্তানিদের পূর্বপরিকল্পনার অংশ ছিল, তা ইতিহাসের পাতায় লিপিবদ্ধ আছে। এ ভয়াল রাতের আগে বাংলাদেশে পাকিস্তানি চক্রান্তের রাজনৈতিক ঘটনার কিছু উল্লেখ করা যেতে পারে। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পর আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা শুরু হয় একাত্তরের মার্চে। একটি নতুন সংবিধান তৈরি করে সরকার পরিচালনার বিভিন্ন চিন্তাভাবনার বিপরীত ছিল পাকিস্তানি শাসকদের ভাবনা। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আলোচনার মূল ভিত্তি ছিল ছয় দফার দাবিগুলো। প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র ও দেশের দুই অংশের মধ্যে যোগাযোগের বিষয় কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে থাকবে। এ ছাড়া বাংলাদেশের আর কোনো কিছুই কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। উদ্বেগ, উত্কণ্ঠার মধ্যে চলতে থাকা এ আলোচনার শেষ পরিণতি হয়েছিল অস্ত্র দিয়ে বাঙালি দমনের চেষ্টার মধ্যে।  

ইতিহাস সাক্ষী দেয়, পাকিস্তানিরা মার্চের আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছিল। প্রতিদিনই সেনা আনা হচ্ছিল পশ্চিম পাকিস্তান থেকে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে হেরে ইয়াহিয়া খান নির্বিঘ্নে ক্ষমতা ছেড়ে দেবেন না—এ সন্দেহ ছিল নেতাদের মনে। সে কারণে আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাধানের রাস্তা তৈরির প্রচেষ্টা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে চললেও ইয়াহিয়ারা মরণকামড় দেওয়ার জন্য কালক্ষেপণ করছিলেন। এমনকি বাঙালিদের প্রতি সহানুভূতিশীল পাকিস্তানি সরকারি কর্মকর্তাদের বদলিও করা হয়েছিল। ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করার ষড়যন্ত্র আগে থেকেই নেওয়া হয়েছিল। এ জন্য আলোচনা চললেও বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পর পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যায়। একদিকে ভুট্টোর মত ছিল গ্রামাঞ্চলের অধিকাংশ সাচ্চা মুসলমান পাকিস্তানের সংহতির পক্ষে; অন্যদিকে বঙ্গবন্ধু সোচ্চার ছিলেন সংগঠিত জনগণের মতামত মেনে নিয়ে অবশ্যই ছয় দফার ভিত্তিতে ক্ষমতা হস্তান্তর করার দাবির পক্ষে। এর বাইরে জনগণ কোনো কিছু মেনে নেবে না।

১৫ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ঢাকায় আসেন এবং সেদিনই তিনি সামরিক সম্মেলন করেন। লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খান, মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা, মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী ও পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল মেজর জেনারেল মিঠঠা ও এমজিও মেজর জেনারেল ইফতেখার জানজুয়া উপস্থিত ছিলেন। মিঠঠা ইয়াহিয়াকে রাজনৈতিকভাবে দেশের নাজুক পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য অনুরোধ করলে সে প্রস্তাব নাকচ করে দেন তিনি এবং কয়েক দিন পর মিঠঠাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। ১৬ মার্চ প্রেসিডেন্ট হাউসে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা হলে ইয়াহিয়া তাঁর দাবিগুলো শুনে নিরুৎসাহ হয়ে পড়েন। কারণ জনগণের দেওয়া শক্তিশালী ম্যান্ডেট নিয়ে বঙ্গবন্ধু তখন ক্ষমতা ভাগাভাগি করতে ইচ্ছুক নন। দুজনের ভিন্নমুখী অবস্থান থেকে কথা হয়। ১৭ মার্চ আবার বৈঠক হলে ইয়াহিয়া বঙ্গবন্ধুর প্রস্তাব মানতে রাজি হননি। বরং তিনি আলোচনার বিবরণ দিতে গিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের তত্কালীন গভর্নর জেনারেল টিক্কা খানকে বলেছিলেন, ‘হারামজাদাটা ভালো ব্যবহার করল না। তুমি তৈরি হয়ে যাও। ’ রাত ১০টায় টিক্কা খান জিওসিকে টেলিফোন করে বললেন, ‘খাদিম তুমি এগিয়ে যেতে পারো। ’ অর্থাৎ সামরিক কার্যক্রম শুরু করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পনা প্রণয়ন ও কাগজপত্র তৈরি করার প্রক্রিয়া চলতে থাকে। ১৮ মার্চ খাদিম ও ফরমান বৈঠকে বসে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ পরিকল্পনা তৈরি করেন। বঙ্গবন্ধুর শাসন উচ্ছেদ ও সরকারের কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য ১৬টি প্যারাসংবলিত পাঁচ পৃষ্ঠাব্যাপী এ পরিকল্পনা ২০ মার্চ ইয়াহিয়া অনুমোদন করেন। ২১ মার্চ ভুট্টো ও তাঁর প্রধান সহচররা ঢাকায় আসেন এবং ইয়াহিয়া তাঁকে বঙ্গবন্ধুর দাবিগুলো জানালে তিনি তা মেনে নিতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন। ২৩ মার্চ আওয়ামী লীগের ‘প্রতিরোধ দিবসে’ পাকিস্তানের পতাকা পোড়ানো হয় এবং জিন্নাহর ছবি টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে তাঁর কুশপুত্তলিকা দাহ করা হয়। সারা দেশে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলিত হয় এবং ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে গ্রামগঞ্জ, শহর-নগর প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। এ পরিস্থিতির মধ্যেও বঙ্গবন্ধু বিনা রক্তপাতে সব কাজ সম্পন্ন করার চেষ্টা করেছেন। অন্যদিকে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে প্রচার করে ২৪ মার্চ থেকে ভুট্টোর সঙ্গীদের অনেকেই পশ্চিম পাকিস্তানে ফেরা শুরু করেন। এদিন সামরিক আয়োজনের অংশ হিসেবে সিনিয়র অফিসাররা বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্টে যোগাযোগ করে জেনোসাইডের প্রাক-প্রস্তুতি শেষ করেন। ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ঢাকা ত্যাগ করেন। সমঝোতার খসড়া প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলার সময় ইয়াহিয়ার দল ২৫ মার্চে ইতিহাসের বর্বরোচিত গণহত্যা চালানোর প্রস্তুতি নেয়। অথচ বঙ্গবন্ধুর প্রচেষ্টা ছিল গণহত্যা এড়ানোর জন্য আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে।

২৫ মার্চ রাতের ঘটনা এখনো বিশ্বের ইতিহাসে হৃদয়বিদারক হিসেবে চিহ্নিত। সেদিন রাজারবাগের পুলিশ বাহিনী ও পিলখানার পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলসকে নিরস্ত্র করা হয়েছিল হত্যাযজ্ঞের মধ্য দিয়ে। ত্রাস সৃষ্টির জন্য অনেক এলাকায় গোপন স্থান থেকে গুলি ছোড়া হয় এবং বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেপ্তারের জন্য বাসায় বাসায় হামলা চালানো হয়। প্রথমেই বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি গ্রেপ্তারের আগে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে যান। বলেন, ‘আজ থেকে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ। আমি আপনাদের আহ্বান জানাচ্ছি, যে যেখানেই থাকুন, যে অবস্থাতেই থাকুন এবং হাতে যার যা আছে তাই নিয়ে দখলদার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলুন। তত দিন পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যান যত দিন না দখলদার পাকিস্তান বাহিনীর শেষ সৈনিকটি বাংলাদেশের মাটি থেকে বহিষ্কৃত হচ্ছে এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হচ্ছে। ’ বঙ্গবন্ধুর এ ঘোষণার আগেই বাঙালিদের প্রতিরোধ শুরু হয়ে যায়।  

বিভীষিকাময় রাতের ঘটনায় যদিও আধুনিক সমরাস্ত্র নিয়ে হানাদাররা ঘুমন্ত নগরবাসীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে; কিন্তু একেবারে সহজ ছিল না সেই অপারেশন সার্চলাইট পরিকল্পনা বাস্তবায়ন। কারণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় হানাদাররা প্রবল প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়। তত্কালীন ইকবাল হল ও জগন্নাথ হলের অনেক ছাত্র সেই প্রচণ্ড হামলার মধ্যেও প্রতিরোধ গড়ে দেশমাতৃকার জন্য শহীদ হন। রাতের আঁধারের সেই হৃদয়বিদারক ঘটনাগুলোর প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন অনেকেই। চারদিকে অগ্নিশিখা ধূম্র্রকুণ্ডলী সৃজন করে ব্যাপ্ত ছিল সেই রাত। আর মানুষের আর্তনাদ ছিল আকাশস্পর্শী মর্মদায়ক। বিশ্ববিদ্যালয়ের গণকবরগুলো আজও সে রাতের ঘটনার সাক্ষী হয়ে রয়েছে। হামলার ফলে অনেক ভবনই মাটির সঙ্গে মিশে গিয়েছিল। ঢাকা নগরের রাজপথে ছিল মৃতদেহের স্তূপ।

 

লেখক : অধ্যাপক ও পরিচালক, জনসংযোগ,

তথ্য ও প্রকাশনা দপ্তর, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য