kalerkantho

রবিবার। ২২ জানুয়ারি ২০১৭ । ৯ মাঘ ১৪২৩। ২৩ রবিউস সানি ১৪৩৮।


সাদাকালো

সমাজের অধঃপতন ঠেকানোর আশু ব্যবস্থা নিতে হবে

আহমদ রফিক

২৪ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



সমাজের অধঃপতন ঠেকানোর আশু ব্যবস্থা নিতে হবে

সম্প্রতি মায়ের হাতে তার দুই সন্তানের খুন হওয়ার ঘটনা রাজধানী ঢাকার শিক্ষিত সমাজে যথেষ্ট আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। সবার একই প্রশ্ন, মা কেমন করে তার দুই সন্তানকে হত্যা করতে পারে? শুধু লোককথায় নয়, গল্প-কাহিনীতে নয়, বাস্তব ঘটনা সূত্রেও দেখা যায়, মা প্রাণ দিয়ে তাঁর সন্তানকে বাঁচানোর চেষ্টা করছেন বা করেছেন। মানবেতর প্রাণী জগতেও দেখা যায় একই ঘটনা। মাতৃত্ব এমনই এক তুলনাহীন অনুভূতি, যার কাছে পৃথিবীর আর সব কিছু হার মানে। আর সেই মা কি না...!

সন্তান হন্তারক মা মাহফুজা বেগমের আচরণ নিয়ে চলছে হাজার রকম জল্পনাকল্পনা, মনোবিশ্লেষণও বাদ যাচ্ছে না। এ সবকিছু শোনা যাচ্ছে ঘরোয়া আলোচনায়, লেখা হচ্ছে কাগজের পাতায়। কারণ ঘটনাটি সত্যই রহস্যজনক এক ধাঁধা। পুলিশ ওই মাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেও কোনো তথ্যসূত্র উদ্ধার করতে পারেনি, খুঁজে পায়নি হত্যার বিশ্বাসযোগ্য, গ্রহণযোগ্য কারণ তথা ‘মোটিভ’।

হন্তারক মহিলার (তাকে ‘মা’ নামে অভিহিত না করাই সংগত) একই কথা—‘ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় তাদের পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিয়েছি। ’ আজব কথা! তার ছেলেমেয়ে দুজনই ছিল মেধাবী। তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুর্ভাবনার কোনো যুক্তিসংগত কারণ নেই।

ঘটনা বিচারে এসেছে স্বামীর পরকীয়ার কথা—সেটাও বিচার-ব্যাখ্যায় হালে পানি পায়নি।

এ পরিপ্রেক্ষিতে আবারও প্রশ্ন, তাহলে কেন এ হত্যা? প্রশ্ন উঠেছে, মহিলা মনোবিকারগ্রস্ত কি না, মনোবিশ্লেষকের তাতে সায় নেই। স্বভাবত প্রশ্ন, একজন উচ্চশিক্ষিত, একদা শিক্ষিকা কেন তাহলে নিজ সন্তানদের হত্যা করবে? তীব্র মানসিক আবেগের তাড়না ছাড়া এমন ভয়াবহ কর্ম সম্ভব নয়। কিন্তু হত্যার অব্যবহিত পরও তার ধীরস্থির আচরণ মানুষকে বিস্মিত করেছে। উদ্দেশ্য নিয়ে বিভ্রান্ত সবাই।

হঠাৎ ক্রোধের বশে কোনো মানুষ এ জাতীয় ঘটনা ঘটালেও ক্রোধ প্রশমিত হওয়ার পর তার মধ্যে আত্মগ্লানির প্রবল প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। একমাত্র পেশাদার, ভাড়াটে খুনিরা এদিক থেকে ব্যতিক্রম। যেমন সিরিয়াল কিলারদের কাহিনী—বাংলাদেশেও বছর কয় আগে তেমন ঘটনার কথা সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে ক্রোধেরও কোনো কারণ ঘটেনি। তবু হত্যাকাণ্ড ঠিকই ঘটেছে। ঘাতকদের পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের মতো।

এ ক্ষেত্রে এমন সূত্রও সংবাদমাধ্যমে উল্লিখিত হয়েছে যে কন্যাসন্তানটিকে এর আগেও একবার হত্যার চেষ্টা করা হয়। তাহলে বিষয়টা কেমন দাঁড়ায়? হত্যার কীট যেকোনো কারণে হোক ওই জন্মদাত্রীর মাথায় বাসা বেঁধেছিল। সেই কারণটিই জানা যাচ্ছে না। বোঝা যাচ্ছে না এ হত্যাকাণ্ডের চরিত্র ব্যক্তিক, না পারিবারিক, না সামাজিক। কারণ জানা না গেলে প্রতিরোধের ব্যবস্থাও নেওয়া সম্ভব হয় না। আলোচ্য ঘটনাটি নানাদিক বিচার সত্ত্বেও চারদিক বন্ধ একটি খুপরির মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিঃসন্দেহে ঘটনা রহস্যজনক, দুর্বোধ্য।

দুই.

আলোচ্য ঘটনাটিকে পারিবারিক-সামাজিক চৌহদ্দিতে বিচার করাই বোধ হয় সংগত। যদি অবশ্য এর একান্ত ব্যক্তিক কারণ বিবেচনার বাইরে রাখা যায়। ভুলে যাওয়া উচিত নয় কিছুকাল আগে তরুণী মেয়ের হাতে তারই মা-বাবার খুন হওয়ার ঘটনা। সেখানে অবশ্য গ্রহণযোগ্য কিছু কারণ ছিল। যেমন সন্তানকে মা-বাবার সময় না দিয়ে বখাটে হতে সাহায্য করা। তা ছাড়া অনুকূল পরিপ্রেক্ষিতে ছিল ব্যাপক মাদকাসক্তিসহ সামাজিক অবক্ষয়ের মতো বিষয়াদি।

আমার মনে হয়, এ ক্ষেত্রে দূষিত সামাজিক পরিবেশের বিষয়টিও বিবেচনায় আনা উচিত। কারণ অর্থনৈতিক প্রগতির চেষ্টায় উন্মুখ বাংলাদেশ তার সামাজিক সুস্থতার দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না। খুন, নারী নির্যাতন, ছিনতাই পণ-অপহরণ, ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার টানে খুনের মতো বিষয় এত ব্যাপক, এত সচরাচর হয়ে দাঁড়িয়েছে যে বিশ্বাস করা কঠিন।

এসব নিয়ে কাগজে লেখালেখি কম হচ্ছে না। সভা-সমাবেশে, সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে আলোচনা কম হচ্ছে না। কিন্তু কোনো কিছুতেই ব্যাধির নিরাময় ঘটছে না। প্রতিদিন কাগজের পাতায় চোখ রাখলে মনে হয়, অবস্থা বুঝি চরমে পৌঁছেছে। মাস কয় আগে একটি দৈনিকের প্রথম পাতায় মোটা হরফের শিরোনাম ছিল : ‘মানুষ যেন মানুষ নেই’।

প্রমাণ ওই কাগজের একই পাতার কয়েকটি ঘটনা। যেমন শিরোনাম ‘মা-বাবার হাতে সন্তান খুন/ভাইয়ের হাতে বোন খুন’। বিবরণে প্রকাশ : ‘অলৌকিক ক্ষমতা দেখাতে গিয়ে সাড়ে তিন বছরের মেয়েকে পিটিয়ে হত্যা করেছে মা-বাবা। ’ দ্বিতীয় ঘটনা ‘ধারের টাকা ফেরত চাওয়ায় বংশালে আপন ছোট ভাইয়ের হাতে খুন হয়েছেন বোন। ’

‘মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় মেয়ে হত্যার অভিযোগে গ্রেপ্তার এক ব্যক্তি। যৌতুক দিতে না পারায় যশোরে স্বামীর হাতে খুন হয়েছেন স্ত্রী। ’ এ জাতীয় খবরের পাশেই শিরোনাম : ‘ধর্ষণের শিকার আদিবাসী ছাত্রী’। ‘রাজধানীতে মাইক্রোবাসে গারো তরুণীকে গণধর্ষণের পর এবার একই এলাকায় এক আদিবাসী স্কুলছাত্রী (চতুর্থ শ্রেণির) ধর্ষণের শিকার। ’ বাঁ-পাশে এক কলামের খবর-শিরোনাম : ‘বরগুনায় শাবল দিয়ে পিটিয়ে শিশু হত্যা’।

ওই কাগজের বাকি ১৯ পৃষ্ঠার খবরে না গিয়েও বলতে পারা যায় বাংলাদেশে সামাজিক অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে এখানে মানুষ আর মানুষের পর্যায়ে নেই। কেউ বলতে পারেন, ওগুলো হয়তো বিশেষ সময়ের ঘটনা। না, বাস্তব পরিস্থিতি তা নয়। এর পরও প্রতিদিন পড়তে হয়েছে অনুরূপ কোনো কোনো ঘটনা। আজ (২০.৩.২০১৬) থেকে মাত্র চার দিন আগের ঘটনাটিও কম ভয়াবহ নয়। যেমন : ‘বরিশালে চলন্ত বাসে এসএসসি পরীক্ষার্থী দুই বোনকে গণধর্ষণ’। ভাবা যায়, চলন্ত বাসে গণধর্ষণ! এখানেই শেষ নয়। ঘটনার দৃশ্য মোবাইলে ধারণ করে ধর্ষক মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করেছে। সামাজিক দূষণ, সামাজিক অবক্ষয় ও মূল্যবোধের অভাব এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে কেউ কেউ একে ‘জঙ্গল অবস্থা’ বলে চিহ্নিত করছেন।

কিন্তু জঙ্গলেও তো অলিখিত আইন আছে। অনিচ্ছুক প্রাণী যৌন তাড়নার শিকার হয় না। নিম্নবর্গের প্রাণীর মধ্যে যে নীতিবোধ দেখা যায় তা বুদ্ধিমান প্রজাতির মানবের মধ্যে দেখা যাচ্ছে না—শিক্ষা, মূল্যবোধ, নৈতিকতা—সব উধাও হয়ে গেছে। সভ্যতা-সংস্কৃতি শব্দগুলো উপহাসের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি তা চরমে উঠেছে। স্নেহ, মমতা, শ্রদ্ধা, মানবিক বোধ বাংলাদেশি সমাজ থেকে বিদায় নিয়েছে বলে মনে হয়।

সমাজের এমন চরম দশা ও পতন এবং প্রতিবাদহীন, প্রতিকারহীন পরিস্থিতির কথা ভাবতে পারা যায় না। বর্তমান সামাজিক দুরবস্থার কারণ নির্দেশে নানা অভিমত দেখতে পাওয়া যায়। এর মধ্যে রয়েছে প্রতিটি ঘটনা তথা অপরাধের যথাযথ শাস্তি বিধানে শিথিলতা। কারো মতে, বড় কারণ সুশাসনের অভাব, আইনি ফাঁকফোকর, কঠোর শাস্তির বিধান না থাকার মতো পরিস্থিতি।

একটি বিষয় কিন্তু বিবেচনায় আনতেই হবে যে নারী নির্যাতন, নারী ধর্ষণ, এমনকি হত্যাকাণ্ড সমাজে মহামারি ব্যাধির আকার ধারণ করেছে। লেখালেখি, উপদেশ-পরামর্শে এ ব্যাধি দূর হওয়ার মতো নয়। শিশুহত্যার বিষয়টিও সম্প্রতি ব্যাপকতা অর্জন করেছে, যা পূর্বোক্ত দুষ্ট ব্যাধির মতো চরিত্রের। নানা কারণে, গুরুত্বহীন কারণে হত্যাকাণ্ড সচরাচর বিষয় হয়ে উঠেছে।

খুনের কারণগুলো খতিয়ে দেখলে অবাক হতে হয়। ধারের টাকা চাইতে গিয়ে খুন, ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা নিয়ে খুন, রাজনৈতিক কারণে খুন, হিংসা-ঈর্ষার পরিণামে খুন, প্রতিশোধ নিতে খুন, ক্ষমতার দ্বন্দ্বে খুন ইত্যাদি লঘু-গুরু বিচিত্র কারণে খুন যেন বাংলাদেশে সামাজিক অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এ অবস্থা সত্যই অভাবিত।

অবাক হই যে প্রতিদিন এত ভয়াবহ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেও সমাজে অভিভাবক হিসেবে পরিচিতদের কোনো মাথাব্যথা লক্ষ করা যাচ্ছে না। অথচ এখানে সুধী নাগরিক সমাজ, মানবাধিকার কমিশন থেকে শুরু করে কত সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন রয়েছে, তাদের কারোর আলোচ্য পরিস্থিতির নিরসনে কোনো উদ্যোগ বা প্রচেষ্টা দেখা যায় না। সর্বোপরি রাষ্ট্রযন্ত্রেরও একই অবস্থা। পরিস্থিতি চরমে না পৌঁছলে কি নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের অভাবিত ঘটনা সম্ভব এবং সেখানে রক্ষক বাহিনীর সংশ্লিষ্টতা!

তাই ন্যায়বিচারের দ্রুততা, পক্ষপাতহীন শাসনব্যবস্থা, সুস্থ সামাজিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার মতো বিষয়গুলো আমলে আনা জরুরি হয়ে উঠেছে। সমাজকে সুস্থ অবস্থায় গতিশীল করার দীর্ঘস্থায়ী কাজ সবার দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে। না হলে সুস্থ সামাজিক পরিবেশে জীবনযাত্রা অসম্ভব হয়ে থাকবে। এ দায় আমার, আপনার, সবার। একক চেষ্টায় অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে না। বন্ধ হবে না শিশুহত্যা, নারী নির্যাতন, মায়ের হাতে সন্তান হত্যার মতো ঘটনা বা কন্যার হাতে মা-বাবা খুন।

লেখক : কবি, গবেষক ও ভাষাসংগ্রামী


মন্তব্য