kalerkantho


কালান্তরের কড়চা

‘এ কী কথা শুনি আজ মন্থরার মুখে!’

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

২২ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



‘এ কী কথা শুনি আজ  মন্থরার মুখে!’

গত সপ্তাহেই ‘কালের কণ্ঠে’ আমার কলামে লিখেছি, বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপি ঘুরে দাঁড়াতে চাইছে। কিন্তু ঘুরে দাঁড়াতে হলে দলটিকে পরগাছা রাজনীতি ত্যাগ করতে হবে।

জন্মাবধি সেনা ছাউনিনির্ভর, পাকিস্তানের ফৌজি শাসকদের সমর্থননির্ভর, সৌদি ও জামায়াতনির্ভর এবং আন্দোলনের নামে সন্ত্রাসনির্ভর রাজনীতি করার পর হঠাৎ ধোয়া তুলসীপাতা সেজে গণতন্ত্রের কথা, দেশকে সুনীতি, সুশাসন ও সুসরকার দেওয়ার কথা বললে তো হবে না। দলের অতীতের রেকর্ড থেকে উদাহরণ তুলে ধরে জনগণকে দেখাতে হবে, তাঁরা মুখে যা বলছেন, তা তাঁরা কাজে পরিণত করার আন্তরিক ইচ্ছা ও ক্ষমতা রাখেন। আর দেশের মানুষকে প্রতারণা করা হবে না।

উপকথার এক সিংহ বৃদ্ধ বয়সে দুর্বল শরীরে আর শিকার ধরতে না পারায় জঙ্গলে ঘোষণা করে দিয়েছিল, সে অহিংস ধর্মে দীক্ষা নিয়েছে। সে আর বনের জন্তু হত্যা করে খাবে না। বনের পশু-পাখি তার কাছে এসে অহিংস ধর্মে দীক্ষা নিতে পারে। বনের অনেক পশু-পাখি তার গুহায় সরল বিশ্বাসে গেছে, আর ফিরে আসেনি। একদিন এক খেঁকশিয়াল তার গুহামুখে গিয়ে ভেতরে ঢুকল না। বাইরে দাঁড়িয়ে বলল, মামা, গুহার ভেতরে ঢুকে তোমার কাছে আসতে ভয় হচ্ছে।

দেখতে পাচ্ছি, অনেক পশু-পাখির পায়ের ছাপ ভেতরের দিকে গেছে। কিন্তু তাদের বাইরে বেরিয়ে আসার পায়ের ছাপ নেই। মামা, আমি তাই আর ভেতরে ঢুকলাম না।

বিএনপির ষষ্ঠ কাউন্সিলের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দলনেত্রী খালেদা জিয়া যেসব কথা বলেছেন তা সংবাদপত্রে পাঠ করে উপকথার বৃদ্ধ ও শিকারে অক্ষম সিংহের গল্পটি মনে পড়ল। ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেননের এ সম্পর্কিত মন্তব্যটি প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য আনয়ন, সুশাসন, দলীয়করণমুক্ত প্রশাসন প্রতিষ্ঠা, কালাকানুন বাতিল, জনগণের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠাসহ যেসব বিষয়ে খালেদা জিয়া বক্তব্য দিয়েছেন, সেগুলোর প্রায় সবই নব্বইয়ের তিন জোটের রূপরেখায় ছিল। একানব্বইয়ে ক্ষমতায় গিয়ে তিনিই প্রথম সেগুলো উল্টে দেন। তিনি সর্বক্ষেত্রে শুধু দলীয়করণ করেননি, মিরপুর ও মাগুরায় উপনির্বাচনে কারসাজি করে নির্বাচনী ব্যবস্থাটাই ধ্বংস করে দেন। আর ২০০১ সালে ক্ষমতায় গিয়ে সুনীতি ও সুশাসন বিদায় করে দিয়ে হাওয়া ভবনে দুর্নীতির ঘাঁটি গড়ে তোলেন। জঙ্গিবাদ ও মৌলবাদের বিরুদ্ধেও তাঁর মুখে কোনো শক্ত কথা নেই।

মেননের এই বক্তব্যকে হাওয়ায় উড়িয়ে না দিয়ে খালেদা জিয়া তাঁর নিজের এবং দলের অতীতের রেকর্ডের দিকে যদি দৃকপাত করেন তাহলে দেখবেন, বিএনপির ষষ্ঠ কাউন্সিল অধিবেশনে দাঁড়িয়ে তিনি যা বলেছেন, তিনি ও তাঁর দল এত দীর্ঘকালের রাজনীতিতে এর সম্পূর্ণ বিপরীত কাজ করে এসেছেন। স্বাধীনতার শত্রুদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তিনি দেশে যে শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তা সুশাসন নয়, তা ছিল ভয়াবহ অপশাসন। নির্বাচনে হেরে ক্ষমতায় যেতে না পেরে তিনি নিয়মতান্ত্রিক বিরোধী দলের ভূমিকা গ্রহণ করেননি। সংসদে যাননি। গুপ্তহত্যা ও মানুষ পুড়িয়ে মারার সন্ত্রাসকে মদদ দিয়েছেন, এগুলো আন্দোলন বলে চালিয়েছেন। দেশের সেরা রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবী হত্যা, গ্রেনেড হামলায় শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের সব নেতার হত্যাচেষ্টা, ১০ ট্রাক অবৈধ অস্ত্র আমদানির কেলেঙ্কারি, ঘাতক জেএমবি ও বাংলা ভাইদের উত্থান, দুর্নীতির ঘাঁটি হাওয়া ভবনের প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি সবই তাঁর সরকারের আমলের ঘটনা। এই অপশাসন ও অপকর্মের দীর্ঘ রেকর্ড যে দলের, সে দলের নেত্রী এই অতীতের জন্য জনগণের কাছে ক্ষমা না চেয়ে, অনুশোচনা প্রকাশ না করে তাদের কাছে কিভাবে সুনীতি, সুশাসন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় মধুর প্রতিশ্রুতি নিয়ে হাজির হন? বাংলাদেশের মানুষকে কি তাহলে তিনি চিরকালের অজ্ঞ ও মূর্খ বলে মনে করেন?

বিএনপির কাউন্সিল অধিবেশনে দেওয়া খালেদা জিয়ার বক্তব্যকে আমি অভিনন্দন জানাতে পারতাম, যদি এই বক্তব্যের মধ্যে অতীতের ভুলত্রুটিগুলো শুধরে দলটিকে সুষ্ঠুভাবে পুনর্গঠনের আন্তরিক সদিচ্ছার আভাস পেতাম। দেশে সত্যই এখন আওয়ামী লীগের পাশাপাশি আরো একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক দল দরকার। নইলে দ্বিদলীয় সুষ্ঠু ও নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির ধারা দেশে প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। সন্ত্রাস ও ষড়যন্ত্র থেকে দেশের রাজনীতিকে মুক্ত করা যাবে না।

কিন্তু দলের পুনর্গঠন ও অতীতের ভুল সংশোধনের কোনো সদিচ্ছাই খালেদা জিয়ার ভাষণে ব্যক্ত হয়নি। তিনি তাঁর ভাষণে কিছু রঙিন ফানুস তৈরি করেছেন। যেমন প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য আনার জন্য দুই কক্ষবিশিষ্ট সংসদ করা হবে। হাস্যকর প্রতিশ্রুতি। যাঁরা তাঁর ভাষণটি লিখে দিয়েছেন (আমার বন্ধু শফিক রেহমান এখনো ঘোস্ট রাইটারের চাকরিতে আছেন কি?) তাঁদের পাণ্ডিত্যকে বাহাদুরি দিতেই হয়। ব্রিটেনে দুই কক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্ট আছে। যেমন হাউস অব লর্ডস এবং হাউস অব কমন্স। তাতে টোরি প্রধানমন্ত্রী  মার্গারেট থ্যাচার বা লেবার প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের ‘ইলেকটিভ ডিক্টেটর’ হিসেবে অভ্যুদয় ঠেকানো গিয়েছিল কি?

বর্তমানে ব্রিটেনেই উচ্চকক্ষ বা লর্ডসভার বিলোপের প্রস্তাব উঠেছে। আর সে ক্ষেত্রে আমরা বাংলাদেশে হাজার বছর আগের সামন্তযুগীয় প্রভুত্ব রক্ষার ব্যবস্থায় কি ফিরে যাব? আর খালেদা জিয়ার গত শাসনামলে অঘোষিতভাবে দুই কক্ষবিশিষ্ট ক্ষমতার পার্লার তো ছিলই। যেমন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়ার বাসভবন এবং অন্যটি তারেক রহমানের হাওয়া ভবন। এ ক্ষেত্রে ক্ষমতায় আসল ঘাঁটি ছিল নিম্ন কক্ষ (Lower House) , অর্থাৎ হাওয়া ভবন। এই দ্বিকক্ষ সংসদের ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শান্তনু মজুমদার আমার মনের কথাটিই ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমার মনে হয় না দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন কিছু সংযোজিত হবে। এই দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের মাধ্যমে সমাজের অভিজাত শ্রেণিকে হয়তো আইনসভায় নিয়ে আসা যাবে। ’

আমি শান্তনু মজুমদারের বক্তব্যের সঙ্গে আরেকটি কথা যোগ করতে চাই। জেনারেল জিয়াউর রহমান বন্দুকের জোরে ক্ষমতা দখলের সঙ্গে সঙ্গেই ঘোষণা করেছিলেন, 'I will make politics difficult for politicians'. (আমি রাজনীতিকদের জন্য রাজনীতি করা দুঃসাধ্য করে তুলব)। তিনি তাঁর প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে গেছেন। 'Money is no problem'—টাকা কোনো সমস্যা নয়, এই ধুয়া তুলে তাঁর আমলেই ঋণখেলাপি একটি লুটেরা ধনিক শ্রেণি গড়ে তোলা হয়। বর্তমানে তাদের আধিপত্য সর্বত্র বিস্তৃত। সংসদের সদস্যপদেও প্রকৃত রাজনীতিকদের বদলে এই নব্য ধনী ব্যবসায়ীদের বিরাট সংখ্যাগরিষ্ঠতা। এখন সংসদের উচ্চকক্ষ প্রবর্তন করা হলে এই নব্য অভিজাততন্ত্রের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা পাবে সেই কক্ষেও।

চাই কী তখন ব্রিটেনের হাউস অব লর্ডসের মতো ক্ষমতাসীন দলের (যদি তখন বিএনপি ক্ষমতায় থাকে) মনোনয়নে ড. কামাল হোসেনের মতো নেতারাও উচ্চকক্ষের সদস্য হয়ে আসবেন, মনোনয়ন ছাড়া নির্বাচনে জিতে সংসদ সদস্য হওয়ার কোনো সম্ভাবনা যাঁদের নেই। সত্য কথা বলতে কী দ্বিকক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্ট বা সংসদ অনেক দেশেই আছে। যার উপযোগিতা এখন পর্যন্ত সর্বতোভাবে প্রমাণিত নয়। বাংলাদেশে যখন সত্যিকারভাবে প্রয়োজন একটি প্রকৃত জনপ্রতিনিধিত্বশীল দ্বিদলীয় (দ্বিকক্ষ নয়) পার্লামেন্ট, তখন সেই পার্লামেন্ট ও পার্লামেন্টের নির্বাচন বর্জন করে হঠাৎ প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা হ্রাসের নামে বিএনপির দ্বিকক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্ট প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব কি গণতন্ত্রের আসল ইস্যু থেকে জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যমূলক চেষ্টা নয়?

দলের কাউন্সিল অধিবেশনে প্রায় এক ঘণ্টার বক্তব্যে খালেদা জিয়া ‘ভিশন ২০৩০’ নামের একটি কর্মসূচির সারসংক্ষেপ তুলে ধরেন। বলেছেন, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে সৃজনশীল উদ্যোগের মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশকে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করা হবে। আওয়ামী লীগের নেতারা দাবি করেছেন, বিএনপির ভিশন ২০৩০ আসলে তাদের ‘রূপকল্প ২০২১’-এর নকল। রূপকল্প ২০২১-এ ওই সালের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে এবং এর ধারাবাহিকতায় ২০৩০ সালের মধ্যে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে বলা হয়েছে। তাহলে বিএনপির পরিকল্পনায় নতুন কী কথা বলা হলো? এটা তো তাহলে দুই দলের ভিশনের যুদ্ধ, জনগণকে স্বপ্ন দেখানোর যুদ্ধ। এই স্বপ্নের পোলাও জনগণ কোনো দিন জেগে উঠে খেতে পারবে কি না তার কোনো নিশ্চয়তা তো এই ‘স্বপ্ন মঙ্গলে’ নেই।

খালেদা জিয়া বলেছেন, তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে মানুষের মাথাপিছু আয় দাঁড়াবে পাঁচ হাজার মার্কিন ডলার। খালেদা জিয়াকে সবিনয়ে জানানো দরকার, স্বপ্নের পোলাও স্বপ্নেই খেতে ভালো। তা বাস্তবে পেট ভরায় না। ভিশন ২০৩০ সফল করে কিভাবে তিনি বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ২০৩০ সালে পাঁচ হাজার ডলার করবেন, এর কোনো আর্থসামাজিক কর্মসূচির কথা তাঁর ভাষণে নেই। লন্ডনে আশ্রয় গ্রহণকারী তাঁর পুত্র তারেক রহমানের যে রেকর্ডকৃত বক্তৃতা ৪২ ইঞ্চি টেলিভিশনের মাধ্যমে ঢাকার সভায় প্রচার করা হয়েছে, তাতেও এই উন্নয়নের লক্ষ্যে কিভাবে পৌঁছানো যাবে তার কর্মসূচি অনুপস্থিত। এটাও কি তাহলে মিথ্যা ইতিহাসচর্চার মতো মিথ্যা স্বপ্নচর্চা?

মিথ্যা প্রতিশ্রুতির রঙিন ফানুস উড়িয়ে কখনো প্রকৃত রাজনীতি করা  যায় না, জনগণকেও বিভ্রান্ত করে রাখা যায় না। দেশের রাজনীতিতে সুষ্ঠুভাবে ফিরে আসতে হলে বিএনপিকে বাস্তবতায় ফিরে আসতে হবে। অসার প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি ছড়িয়ে লাভ হবে না। দেশের মানুষ এখন অনেক বেশি সচেতন। তাদের বোঝাতে হবে, কথা নয়, কাজ দিয়ে, বিএনপি অতীতের ভুল এবং অপরাধগুলো আর করবে না, স্বাধীনতাবিরোধী সন্ত্রাসী চক্রের সঙ্গে আর হাত মেলাবে না। বাইরের শক্তির ওপর নির্ভরতা ত্যাগ এবং দেশের মানুষের সমর্থন নির্ভর করে স্বাধীনতার মূল্যবোধভিত্তিক রাজনীতিতে ফিরে আসবে এবং গণতান্ত্রিক পন্থায় ক্ষমতায় যাওয়ার চেষ্টা করবে। তাহলে দেশের মানুষকে স্বপ্নের পোলাও খাওয়ানোর চেষ্টা না করে বাস্তব ও প্রকৃত কর্মসূচির ভিত্তিতেই দেশের রাজনীতিতে তারা আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।

লন্ডন, সোমবার, ২০ মার্চ ২০১৬


মন্তব্য