kalerkantho

25th march banner

বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া এবং তাঁর কাউন্সিলরদের প্রতি খোলা চিঠি

জাফরুল্লাহ চৌধুরী

১৯ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া এবং তাঁর কাউন্সিলরদের প্রতি খোলা চিঠি

১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপির জন্ম হয়েছিল। সদ্য বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ভবিষ্যৎ বিএনপির ভবিষ্যতের সঙ্গে গ্র্রথিত। আওয়ামী লীগকে নকল করে বিএনপির কোনো লাভ হবে না। বিএনপিকে নিজস্ব ধারায় সাহসের সঙ্গে অক্ষুণ্ন রাখতে হবে। ছোট-বড় সব দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দলকে সঙ্গে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের তিন মূল আদর্শ সামনে রেখে অগ্রসর হতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের তিন মূল আদর্শ হচ্ছে—গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও সাম্য। রাষ্ট্রে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে আগে দলে এবং দলের সব শাখায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। পরিবারতন্ত্র পরিহার করতে হবে। তবে নিজ গুণে পরিবারের সব সদস্যের একই ধারার রাজনীতি করার অধিকার কোনো অন্যায্য বিষয় নয়। এটা সর্বজনবিদিত যে বিএনপির সবচেয়ে নন্দিত নেতা হচ্ছেন খালেদা জিয়া এবং তারেক জিয়া। তাঁরাই এখন বিএনপির সবচেয়ে প্রিয় নেতা। তাঁরাই শত-সহস্র ভোট বেশি পেয়ে দলের যেকোনো পদে নির্বাচিত হবেন এবং সুষ্ঠু নির্বাচন হলে তাঁদের নেতৃত্বে দলকে জয়যুক্ত করার সম্ভাবনা সমধিক, যদি তাঁরা জনগণের চাওয়া-পাওয়াকে গ্রাহ্য করেন।

বিএনপির নির্বাচিত কমিশন ছিল বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনের মতো একটি অথর্ব, ‘জো হুজুর’ বয়োবৃদ্ধ নিজস্ব চিন্তাবিহীন, দন্তবিহীন কমিটি। দু-তিন সপ্তাহের মধ্যে যেখানে কাউন্সিলের মিটিং হচ্ছে, যেখানে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের ভাগ্য নির্ধারিত হবে, সেখানে কেন একই সঙ্গে বিএনপি চেয়ারপারসন ও ভাইস চেয়ারপারসন পদের নির্বাচন করা হলো না। এই প্রশ্নের  উত্তর ‘বীরের মতো’ ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন মহোদয়কে দিতে হবে।

আওয়ামী লীগে যেমন সব ক্ষমতা শেখ হাসিনা ওয়াজেদের ওপর সমর্পণ করা হয়েছে, ঠিক তেমনি বিএনপিতেও সব ক্ষমতা খালেদা জিয়ার ওপর অর্পণ করা হয়েছে। সঙ্গে বিনা আলোচনায় তড়িঘড়ি করে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানের ক্ষমতা বৃদ্ধির মহা উৎসব চলছে। কাউন্সিল অধিবেশনের আগে চেয়ারপারসন ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচনের যুক্তি দাঁড় করানোর গুজব ছড়ানো হয়েছে যে সরকার শেষ মুহূর্তে বিএনপির কাউন্সিল বানচাল করে দিতে পারে। এমনকি আজগুবি পদ্ধতিতে খালেদা জিয়াকে জেলে পাঠাতে পারে। দল ও সংবিধান রক্ষার নিমিত্তে এই তড়িঘড়ি নির্বাচন। জমির উদ্দিন সাহেব, শুরুতেই কেন আপনি খালেদা জিয়াকে ভুল পথে চালিত করলেন? এটা করেছেন কী স্থায়ী কমিটিতে আপনার পদপ্রাপ্তি নিশ্চিত করার জন্য!

বিএনপির ভবিষ্যৎ চিন্তা করতে হলে দেশের সার্বিক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক অবস্থা ও দুর্নীতির বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলন ও কাউন্সিললগ্নে সুন্দর স্লোগান দিয়েছেন, ‘দুর্নীতি দুঃশাসন হবেই শেষ, গণতন্ত্রের বাংলাদেশ। ’

কিভাবে এই স্লোগান কার্যকর করবেন দেশবাসী তা শুনতে চায়, জানতে চায়— 

বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা : বঙ্গবন্ধু শেখ মুুজিবুর রহমান সহস্র বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, ১৭ মার্চ তাঁর জন্মদিবস।

বঙ্গবন্ধু সরাসরি বা লোকজন তাতিয়ে দিয়ে তাঁদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের কোনো মামলা আনেননি। হয়রানি করাননি। মানহানির মামলার জন্য মদদ দেননি।

শেখ মুুজিব ছিলেন সত্যিকার অর্থে হৃদয়বান পুরুষ। ভুলভ্রান্তিতে স্নাত সত্যিকার দেশপ্রেমিক নেতা। প্রয়াত শেখ মুজিবুর রহমান এবং জিয়াউর রহমানের স্থান যেন বেহেশতে হয়, সে জন্য বিএনপি কাউন্সিলের প্রারম্ভে তাঁদের জন্য দোয়া কামনা করলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিএনপির ভিন্নতর রূপ জনগণ দেখতে পাবে। এতে প্রমাণিত হবে বিএনপি জিঘাংসা বা প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না।

দেশের অবস্থা কী তা দেশবাসী আন্দাজ করতে পারে, বুঝতে পারে কিন্তু উচ্চারণ করতে রাজি নয়। বিএনপি কী তাদের ষষ্ঠ কাউন্সিল অধিবেশনে জনগণের সুষ্ঠু জীবনযাত্রার নিশ্চয়তা দেবে? দেশে অশনিসংকেত দেখা দিচ্ছে, দ্রুত ঘটনা ঘটছে। মালয়েশিয়া চুক্তি করেও শ্রমিক নেওয়ার চুক্তি এক সপ্তাহের মধ্যে বাতিল করেছে। সৌদি জোটে যোগ দিয়েও জাতিসংঘের অজুহাতে খোলামনে সৌদি আরবকে সহায়তা না করায় সৌদি আরব আমাদের কয়েক মিলিয়ন প্রবাসী শ্রমিককে দেশে ফেরত পাঠানোর প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে। যুক্তরাজ্য ঢাকা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে লন্ডনের হিথরোতে কার্গো বিমান চলাচল নিষিদ্ধ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র এখনো জিএসপি বহাল করেনি। তার সঙ্গে যুক্ত হলো বাংলাদেশ ব্যাংক কেলেঙ্কারি।

প্রতিদিন মানুষ খুন হচ্ছে, মাতা সন্তানকে মারছে, সাংবাদিক সাগর-রুনির হত্যার বিচার সম্পর্কে সরকার নিশ্চুপ। দৈনিক আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের সুপ্রিম কোর্ট থেকে মুক্তির আদেশ পাওয়ার পর নতুন মামলা দিয়ে তাঁকে আটকে রেখেছে, এক বছর পার হওয়ার পরও মাহমুদুর রহমান মান্নার বিরুদ্ধে মামলা শুরু না করে বিনা বিচারে সরকার তাঁকে আটক রেখেছে। আটক আছে বিএনপির ১৫ হাজারের মতো কর্মী এবং অজ্ঞাতনামা আসামির তালিকায় ঢুকিয়ে দেবে ভয় দেখিয়ে পুলিশ হাজার হাজার বিএনপিকর্মীর কাছ থেকে প্রতি মাসে জনপ্রতি ২৫ হাজার থেকে এক লাখ টাকা আদায় করার কাজে ব্যস্ত থাকায় দেশে খুন, ডাকাতি, চুরি ও দুর্নীতি ব্যাপক হারে বেড়েছে।

কী করণীয়? কী ঘোষণা দিয়ে প্রস্তুতি নিলে জনগণ বিএনপির সঙ্গে রাস্তায় নামবে?

১. প্রথমে ঠিক করুন আপনাদের দলের গঠনতন্ত্র। কী আশ্চর্য, যে নেতা শারীরিক কারণে বছরে সাড়ে ১১ মাস হাসপাতালে থাকেন, তাঁকে দায়িত্ব দিয়েছেন বয়োবৃদ্ধ চলত্শক্তিবিহীন অপর ৩২ জনকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপির গঠনতন্ত্র পরিবর্তনের সুপারিশ প্রণয়নের জন্য।

বিএনপি সংবিধানের পৃষ্ঠা সংখ্যা কত?

উচিত ছিল রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এমাজউদ্দীন, রশিদুজ্জামান, রওনক জাহান, দিলারা চৌধুরী, আইনের অধ্যাপক আসিফ নজরুল, বোরহান আহমদ, অধ্যাপক মাহবুবুল্লাহ প্রমুখকে প্রাথমিক সুপারিশমালা তৈরির দায়িত্ব প্রদান। তাঁরা সাত দিনের মধ্যে পরীক্ষা করে সুপারিশ করতেন, কাউন্সিল সদস্যরা তা পরীক্ষা করে চূড়ান্ত করতেন। আধুনিক চিন্তাধারাকে আপনাদের গণতন্ত্রে অন্তর্ভুক্ত করতে শিখুন। কোনো কমিটিতে এক-তৃতীয়াংশের অধিক বয়োজ্যেষ্ঠ রাখা অনুচিত। দেশে বর্তমানে ৬০ বছরের অধিক বয়সীদের সংখ্যা ১৫ শতাংশের অনধিক। কমিটির এক-তৃতীয়াংশ হবেন তরুণরা এবং অপর তৃতীয়াংশ হবেন মহিলারা।

সর্বক্ষেত্রে গোপন ব্যালটে নির্বাচনপ্রক্রিয়া বহাল থাকা বাঞ্ছনীয়। মিলেমিশে কমিটি গঠন খাটের নিচে ময়লা লুকিয়ে রাখার মতো। ছাত্রদলে ২৭ বছরের ঊর্ধ্বের কোনো ছাত্রকে নেতৃত্বে আনা ভুল সিদ্ধান্ত। অধিক বয়সী ছাত্ররা টেন্ডার ও দুর্নীতিতে সহজে জড়িয়ে পড়ে। নিদেনপক্ষে প্রতিবছর ১০০ টাকা চাঁদা দিয়ে যাঁরা বিএনপির সদস্য হবেন, তাঁরা নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন। উড়ে এসে জুড়ে বসার নিয়ম বাদ দিতে হবে।

১. দলের চেয়ারপারসনের মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষমতা ১০ শতাংশের মধ্যে সীমিত হওয়া শোভনীয়। এতে দলপ্রধানের বা তাঁর সন্তানের ক্ষমতা কমবে না। দলের ভবিষ্যতের ওপর তারেক জিয়ার ভবিষ্যৎ নির্ভরশীল।

২. প্রতিবছর ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা ও নগর কমিটির বার্ষিক অধিবেশন হলে দলে গণতন্ত্রের ভিত্তি সুদৃঢ় হবে। কেন্দ্রীয় কাউন্সিল মিটিংয়ের সময় কেন্দ্রের নির্বাচন প্রতি চার বছর পর পর হওয়া বাঞ্ছনীয়। তবে বার্ষিক মিটিং করা অবশ্যকর্তব্য।

৩. কাউন্সিল অধিবেশনের শুরুতে শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, কামরুজ্জামান, মনসুর আলী, মওলানা ভাসানী, জিয়াউর রহমান, আতাউল গণি ওসমানী, কাজী নুরুজ্জামান ও সব সেক্টর কমান্ডার এবং প্রয়াত সব মুক্তিযোদ্ধার আত্মার মাগফিরাত কামনা করতে আশা করি ভুলবেন না।

৪. ঘোষণা দিন, আপনাদের দলের ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের আটককৃত নেতাদের মুক্তির জন্য আপনারা দৃষ্টমানভাবে সচেষ্ট হবেন এবং বিচারে সার্বিক সহযোগিতা দেবেন। আপনাদের দলের আইনজ্ঞরা আটক ব্যক্তিদের কাছ থেকে কোনো ফি নেবেন না, বরঞ্চ কোর্টের বিবিধ খরচও তাঁরা বহন করবেন। কারণ অ্যাডভোকেট সাহেবদের এই সাহস আছে।

৫. আজকের ক্ষমতাসীনদের নিশ্চিত করুন যে বিএনপি ও তাদের সহযোগীরা ক্ষমতায় এলে তারা আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলের রাজনৈতিক কর্মীর বিরুদ্ধে কোনোরূপ হয়রানিমূলক মামলা দায়ের করবে না। পুলিশদের নির্দেশ দেন তারা যেন এখন থেকে ভালো হয়ে যায়। রাজনৈতিক কর্মীদের ভয় দেখিয়ে ঘুষ বাণিজ্য অবিলম্বে বন্ধ রাখে, সঙ্গে সঙ্গে ফুটপাতের ছোট ছোট দোকানির কাছ থেকে দৈনিক ও সাপ্তাহিক চাঁদা ওঠানো বন্ধ করে, নতুবা তাদের বিরুদ্ধে সব ধরনের শাস্তিমূলক আইনসংগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং অন্যায়ভাবে অর্জিত সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের জন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করা হবে।

৬. অজ্ঞাতনামা আসামির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার ভয়কে কর্মীদের অগ্রাহ্য করতে বলুন। পুলিশকে ঘুষ না দিয়ে বরঞ্চ জেলে যাক, আপনারা তাঁদের মুক্ত করে আনবেন।

৭. কোনো রাজনৈতিক কর্মীকে রাজনৈতিক কার্যকলাপের জন্য দুই মাসের বেশি সময় আটকে রাখা যাবে না, হয় জামিন দিয়ে তাঁর বিচার শুরু করতে হবে, নতুবা খালাস দিতে হবে।

৮. এক মাসের মধ্যে অজ্ঞাতনামা অভিযুক্ত ব্যক্তিদের তালিকা সম্পন্ন করে পুলিশকে কোর্টে জমা দিতে হবে। পরে অন্য কোনো নাম যুক্ত করা আইনসিদ্ধ হবে না।

৯. এসব লক্ষ্য অর্জন করার জন্য নিরপেক্ষ স্বাধীন বিচারব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। দলীয় বিবেচনায় বিচারক নিয়োগ দেওয়া হবে না। নিয়োগ প্রাক্কালে বিচারপতির সব সম্পদের বিবরণ প্রকাশ করতে হবে, যাতে জনসাধারণ বিচারপতির জীবনধারণ লক্ষ রাখতে পারেন।

১০. সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে সুধীসমাজের দুজন প্রতিনিধিকে অন্তর্ভুক্ত করলে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের গুরুত্ব বাড়বে।

১১. দেশের গণতন্ত্রের সুষ্ঠু বিকাশের লক্ষ্যে দুর্নীতি কমানো প্রয়োজন। দেশের সব আমলা, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, বিচারপতি-বিচারক, পেশাজীবী ও ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার এবং শিক্ষকদের আয়কর রিটার্ন প্রকাশ করতে হবে, যাতে জনসাধারণ তা পরীক্ষা করে দেখতে পারে। নিম্ন থেকে উচ্চপর্যায়ের সব সরকারি পদে নিযুক্ত ব্যক্তিদের নিযুক্তি সময়কালীন নিজস্ব, পৈতৃক ও শ্বশুরবাড়ির সম্পদের হিসাব জনপ্রশাসন বিভাগে জমা দেবেন, যা প্রকাশ করা হবে স্থানীয় জনগণের নিরীক্ষণের জন্য।

জনগণের জীবনযাত্রার উন্নয়নের জন্য বিএনপি কী কী নিশ্চয়তা দেবে?

১. বাংলাদেশ ২৭ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভের বুনিয়াদ সৃষ্টিতে বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর আতিউর রহমানের কোনো অবদান নেই। ভিত্তি সৃষ্টি করেছে গার্মেন্ট শিল্পে কর্মরত ৪০ লাখ (মূলত মহিলা) শ্রমিক। মরুভূমির দেশে পরিবার-পরিজনবিহীন একাকী কর্মরত প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকরা তাঁদের অর্জিত পুরো অর্থ দেশে পাঠিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ স্ফীত করেছেন। খাদ্যে নিরাপত্তা এনেছেন বাংলাদেশের কৃষক-কিষানিরা। আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন অন্যরা।

২. ঘোষণা দিন, আপনারা শ্রমিকের মাসিক ১০ হাজার টাকা বেতন নিশ্চিত করবেন। তৎসঙ্গে সামরিক ও পুলিশ বাহিনীর দরে শ্রমিকরা পাবেন প্রতি মাসে চাল, ডাল, তেল ও চিনির রেশন।

বার্ষিক দুই হাজার টাকায় স্বাস্থ্যবীমার বদৌলতে সব কৃষক, শ্রমিক পাবেন পরিপূর্ণ সুবিধা, সব রোগ নির্ণয়, হাসপাতালে ভর্তি এবং অপারেশনগুলো ফ্রি। রোগী কেবল নিজের খাওয়া খরচ ও ওষুধের ২৫ শতাংশ মূল্য পরিশোধ করবেন।

৩. সব গৃহকর্মীকে নিবন্ধনের আওতায় এনে তাঁদের খাওয়াদাওয়ার সঙ্গে ন্যূনতম মাসিক চার হাজার টাকা বেতন নিশ্চিত করবেন।

৪. জনসাধারণের স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রথমে বড় বড় শহরে এবং সব জেলা-উপজেলায় এমবিবিএস ও বিডিএস ডেন্টাল সার্জন দ্বারা জেনারেল প্র্যাকটিশনার্স (জিপি) পদ্ধতি চালু করা হবে। তাঁরা সব প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা নিশ্চিত করবেন, প্রয়োজনে জেলা ও উচ্চতর স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে রেফার করে নিখরচায় ভর্তি, চিকিৎসা ও অপারেশনের ব্যবস্থা করে দেবেন।

৫. ৬০ বছরের বেশি বয়সীদের ব্যথা-বেদনা, আর্থ্রাইটিস ও একাকিত্ব ও বিষণ্নতা নিরসনের জন্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করবেন।

৬. ১৯৯৪ সালে খালেদা জিয়া আজকালকার দরবেশ সালমান এফ রহমানের প্ররোচনায় বিদেশে ওষুধ রপ্তানির লক্ষ্যে ১৯৮২ সালের জাতীয় ওষুধনীতি অনুযায়ী সরকার কর্তৃক সব ওষুধের মূল্য নির্ধারণ স্থগিত করায় ওষুধের দর হয়েছে আকাশচুম্বী; এতে অবশ্য বর্তমান সরকারের প্রত্যক্ষ মদদ রয়েছে।

৭. সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতায় এলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নির্বাচিত ৪০৬টি ওষুধের মূল্য সরকার কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হবে। তাতে ওষুধের মূল্য অর্ধেকের চেয়ে কম হবে।

৮. ওষুধ প্রশাসনের কোনো কমিটিতে কোনো ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাকে সদস্য করা হবে না। এটা বাংলাদেশের মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনেরও দাবি। কেবল গবেষক, শিক্ষক, বৈজ্ঞানিক ও ক্রেতাস্বার্থ সংরক্ষণ সংস্থার মনোনীত ব্যক্তিরা ওষুধ নির্বাচন ও মূূল্য নির্ধারণ কমিটির সদস্য হবেন।

৯. প্রত্যন্ত অঞ্চল এবং গ্রামের মানুষের চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব নবীন চিকিৎসক ইউনিয়ন হেলথ ও ফ্যামিলি ওয়েলফেয়ার সেন্টারে সার্বক্ষণিকভাবে তিন বছর অবস্থান করে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হবে। না দিলে কোনো ডাক্তার পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কোর্সে ভর্তি হতে পারবেন না। যেসব নবীন ডাক্তার গ্রামে থেকে জনসাধারণের সেবা দিচ্ছেন তাঁদের ডিঙিয়ে কেউ যেন পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কোর্সে ভর্তি হতে না পারেন, সে জন্য দ্রুত আইন প্রণয়ন করা হবে।

১০. ধূমপান ও পানসেবন স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বিধায় জনসাধারণকে আসক্তি থেকে নিবারণের জন্য এসব ক্ষতিকর দ্রব্যে শুল্ক অনেক গুণ বাড়ানো হবে, যাতে জনসাধারণ বুঝতে পারে, এক কাঠি সিগারেটের মূল্যে এক কাপ চা ও একটি বনরুটি খাওয়া শ্রেয় ও বুদ্ধিমানের কাজ।

১১. শিক্ষা ছাড়া দারিদ্র্য থেকে মুক্তি সহজ নয়। সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য প্রাথমিক অবস্থায় প্রতি উপজেলায় ক্যাডেট কলেজতুল্য ভালো মানের একটি করে সরকারি হাই স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হবে। শিক্ষকদের মানমর্যাদা বাড়ানোর লক্ষ্যে কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য নয়, সব প্রাইমারি, মাধ্যমিক, কলেজ ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করে প্রাইভেট পড়ানো বন্ধ করার সঙ্গে সঙ্গে কোচিং সেন্টারগুলো বন্ধ করার জন্য স্বতন্ত্র উচ্চপর্যায়ের শিক্ষা কমিশন স্থাপন করা হবে।

১২. মানবতাবিরোধী অপরাধীদের সুষ্ঠু বিচার অব্যাহত রাখা হবে। অপরাধীরা চাইলে বিদেশের আইন বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নিতে পারবেন। তুরিন আফরোজ, পান্না দাশগুপ্ত ও অন্যান্য প্রসিকিউটরের দক্ষতা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, সে সম্পর্কে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন স্থাপন করা হবে।

১৩. বেশি দুর্নীতি হচ্ছে বিদ্যুৎ উত্পাদন ও মেগা প্রজেক্টে।

অতীতে প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ উত্পাদনে খরচ হতো ছয় টাকা ২৭ পয়সা। বিবিয়ানা-২ চালু হওয়ার পর প্রতি কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উত্পাদন খরচ আরো কমে পাঁচ টাকা ৮০ পয়সা হয়েছে। তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকন্দ্রে ব্যবহৃত জ্বালানি অর্থাৎ ফার্নেস ও ডিজেল খরচ সমন্বয় করা হলে বিদ্যুৎ উত্পাদন খরচ আরো কম হবে।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, হাসিনা সরকারের স্নেহধারায় সিক্ত পাঁচটি রেন্টাল কম্পানি ২৫ টাকার বেশি দরে প্রতি কিলোওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে সরকারকে। এসব অনৈতিক লেনদেন পরীক্ষার জন্য বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করে এক বছরের মধ্যে সব অপরাধীকে আইনের আওতায় নেওয়া হবে। স্মরণ রাখতে হবে যে গত ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে পাঁচ হাজার ৫৮৭ কোটি ৭০ লাখ ডলার বা চার লাখ ৪১ হাজার ৪২৪ কোটি টাকা পাচার হয়েছে গভর্নর আতিউর রহমানের সন্তানসম বাংলাদেশ ব্যাংকের নাকের তলা দিয়ে। হিসাবটি প্রকাশ করেছে ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যানশিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই)।

১৪. জনগণের স্বার্থে বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রণীত সব অসম চুক্তির পুনর্মূূল্যায়ন করা হবে।

১৫. বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে বাহিত ট্রানজিট চার্জ প্রতি কিলোগ্রামে ১৩ পয়সার পরিবর্তে ন্যাশনাল বোর্ড অব রেভিনিউ ধার্য দর প্রয়োগ নিশ্চিত করা হবে ।

১৬. রামপালে বিদ্যুৎকন্দ্র স্থাপন বন্ধ করে দিয়ে সুন্দরবন রক্ষার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করুন।

১৭. গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে স্থানীয় শাসনের বিস্তার ঘটালে জনগণের সহজ সুন্দর জীবনযাত্রা নিশ্চিত হবে। স্থানীয় শাসনের বিস্তারের জন্য বাংলাদেশে চার বা আটটি প্রদেশে স্থাপনের বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচনা করে দেখবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিন।

আপনাদের উদ্দেশ্য মহৎ হলে জনগণ আপনাদের সঙ্গে থাকবে।

জয় হোক মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন গণতন্ত্রের।

লেখক : ট্রাস্টি, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র


মন্তব্য