kalerkantho


কাউন্সিল ২০১৬ থেকে ঘুরে দাঁড়াক বিএনপি

মোফাজ্জল করিম

১৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



কাউন্সিল ২০১৬ থেকে ঘুরে দাঁড়াক বিএনপি

ঐক্যের পথ ছেড়ে বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে অভ্যন্তরীণভাবে অনৈক্যের পথে চলছে। এতে অহেতুক দুর্বল হয়ে পড়ছে দলটি। দলের সব নেতাকর্মীকে এক সুতায় ঐক্যবদ্ধ করতে না পারলে ঘুরে দাঁড়ানোর নামে আগামী দিনের যে সংগ্রামের স্বপ্ন দেখছে বিএনপি, তা দুঃস্বপ্নে পরিণত হতে পারে। সর্বোপরি বিএনপিকে স্থায়ীভাবে বোতলবন্দি করে ফেলার যে জাল বিস্তার করেছে শাসকদল, তা ছিন্ন করে বেরিয়ে আসতে চাই অকুণ্ঠ জনসমর্থন

 

বহুকাল আগে, সেই উনিশ শ ষাটের দশকের শুরুতে কবি ও ঔপন্যাসিক ডি এইচ লরেন্স (১৮৮৫-১৯৩০)-এর ‘ইন টাইমস্ অব ব্রেকিং অব দ্য নেশনস্’ শীর্ষক একটি কবিতা পড়েছিলাম। নাতিদীর্ঘ কবিতাটিতে কবি যুদ্ধকালীন সময়ে সাধারণ মানুষের নিস্পৃহ অবস্থানের কথা বলেছেন। যুদ্ধের উন্মাদনা, ধ্বংসলীলা, জয়-পরাজয় একজন সাধারণ খেটে খাওয়া কৃষকের জীবনকে সামান্যই আন্দোলিত করে, সে তার শস্যকর্তন, কর্তিত শস্যের আঁটিবন্ধন ইত্যাদি নিত্যকর্মে যখন সম্পূর্ণ নিমগ্ন থাকে, তখন হয়তো তার দেশ আরেক দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধের মরণখেলায় মেতে উঠেছে, যে কর্মকাণ্ডে কৃষকের উৎসাহ অল্পই। ওই যুদ্ধের ফলে হয়তো তার দেশকে জয় করে নেবে আরেক দেশ, বদল হবে রাজার অথবা তার দেশের রাজা মালিক হবে আরেক দেশের, গগনবিদারী ডঙ্কা বাজিয়ে, বিজয়কেতন উড়িয়ে, দশ-দিগন্তে ছড়িয়ে দেবে সেই বার্তা; কিন্তু সে খবরে কিছুই যাবে আসবে না অষ্টপ্রহর জীবনযুদ্ধে লিপ্ত দরিদ্র চাষীটির। আজ থেকে অর্ধ শতাব্দীরও বেশি আগে পঠিত কবিতাটি আজও আমার প্রিয় কবিতাগুলির একটি। তাই তো জীবনসংগ্রামে জবুথবু মানুষের কাছে বহির্জগতের কাড়া-নাকাড়ার আওয়াজের কী দাম আছে।

সমাজ ও রাষ্ট্রের উপরি কাঠামোতে নানা ধরনের হুলস্থুল ধূমধড়াক্কা হরহামেশা লেগেই থাকে, জীবনযন্ত্রণায় পর্যুদস্ত নিচুতলার মানুষের যাতে আগ্রহ নেই বললেই চলে। তাদের দিন যায় রাত আসে শুধু বেঁচে থাকার ধান্ধায়। দেশে ‘রাজা যায়, রাজা আসে’, যায় না শুধু তাদের জীবনের দুঃখ-কষ্ট-যন্ত্রণা। রাষ্ট্রক্ষমতায় কে এল, কে গেল তাতে তাদের কিছু যায় আসে না। হয়তো হঠাৎ একদিন ভোট আসে গই-গেরামে, ছেঁড়া পলিথিনে ছাওয়া বস্তির ঘরে। তারা সেদিন টেরি কেটে, খিলিপান মুখে দিয়ে মুরব্বিদের, উঠতি নেতাদের বলে দেওয়া মার্কায় ভোট দিয়ে ভোটের বিনিময়ে সুখ কিনতে যায়। তারপর আবার সেই থোর-বড়ি-খাড়া, খাড়া-বড়ি-থোর। ভোটের বাক্সের ওপর বসে থাকা সুখ পাখিটা সেই যে উড়াল দিয়ে ডানা মেলে অসীম আকাশে, তার আর দেখা মেলে না বাকি জীবন। এই মানুষগুলোর জীবনে রাজনীতিও দোলা দিয়ে যায় শুধু ওই ভোটের ক’টা দিন।

আসলে রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত বাংলাদেশের কতজন মানুষ? বোধ হয়, শতকরা আধাজনও নয়। তার মানে ১৬ কোটি মানুষের দেশের টেনেটুনে ৭/৮ লাখ রাজনীতি চর্চা করেন অথবা কালেভদ্রে চোঙ্গা-টোঙ্গা ফুঁকেন, ট্রাকে চড়ে নেতা-নেত্রীর জনসভায় যান, মিছিলে যোগ দেন। আর রাজনীতি যাদের ব্রেড অ্যান্ড বাটার (বাংলা করে বোধ হয় বলা যায়, হালুয়া-রুটি), তাদের সংখ্যা কত হবে? সারা দেশে মনে হয় লাখখানেকও হবে না। এরা শয়নে-স্বপনে, নিদ্রায়-জাগরণে রাজনীতি ছাড়া কিছু বোঝেন না। এদের অন্ন জোগায় রাজনীতি, এদের ইজ্জত-হুরমতের মালিকও রাজনীতি। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে সারা দেশের আনাচে-কানাচে এরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন, যদিও এদের বিচরণক্ষেত্র মূলত রাজধানী ঢাকা ও দেশের সকল জেলা-উপজেলা শহর। অর্থাৎ তাদের কর্মকাণ্ড সবই শহরকেন্দ্রিক। যত বড় শহর তত বেশি হল্লা-গল্লা, দাপাদাপি। এদের নেতারা একেকজন একেকটি গ্রহের মত। সেই গ্রহের চারদিকে সারাক্ষণ এরা ঘোরেন উপগ্রহের মত। এদের একমাত্র প্রত্যাশা, নেতা তাদের নানা বিষয়ে সুযোগ করে দেবেন—টেন্ডারবাজি, চান্দাবাজি, জমি দখল, সরকারি খাসজমি-দোকানপাট বরাদ্দ, রিলিফের মাল গাপ্পু করা ইত্যাদি। আর তাদের একমাত্র ডিউটি এসব আতিনেতা পাতিনেতার চামচাগিরি করা। এরা মনেপ্রাণে চান, নেতার আরও তরক্কি হোক, নেতা উপজেলা থেকে জেলা, জেলা থেকে প্রমোশন পেয়ে কেন্দ্রে যাক। আর যদি এমপি বা মন্ত্রী-মিনিস্টার হয় তাহলে চামচাকে আর পায় কে?

মফস্বলে এসব নেতা সাহেব ও তাদের টেন্ডলরা ছাড়া বাদ বাকি সবাই পাবলিক। তারা দেশের অগণিত খেটে খাওয়া মানুষ : কৃষক-মজুর, কামার-কুমার, হাইল্যা-জাইল্যা। এদের দলে আছেন কোনো সাতে-পাঁচে নেই এমন শিক্ষিত একটি শ্রেণী। এরা বিভিন্ন অফিস-আদালতে চাকরি-বাকরি করেন, স্কুল-কলেজে শিক্ষকতা করেন। আবার লেখাপড়ার সামান্য পুঁজি নিয়ে কেউ কেউ হয়তো ছোট-বড়-মাঝারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক। এই শ্রেণীটি, অর্থাৎ মফস্বলের এই শিক্ষিত সমাজটি, সবই দেখেন, বোঝেন, কোথায় কী হচ্ছে মোটামুটি তার খবরাখবর রাখেন, তবে পারতপক্ষে কোনো ঝামেলায় জড়াতে চান না। তারা অলস্ দুপুরে বিছানায় শুয়ে শুয়ে ছাদের দিকে চেয়ে চেয়ে ভাবেন, দেশটা একদিন এগিয়ে যাবে উন্নতির দিকে; দুর্নীতি, সন্ত্রাস, স্বজনপ্রীতি ইত্যাদি দূর হয়ে যাবে দেশ থেকে। কিন্তু সেই লক্ষ্যে তাদের কাজ করতে বললে বলবেন, না ভাই, মাপ করবেন। ওটা পলিটিশিয়ানদের কাজ, আমি ওতে নাই। এরা এবং সারা দেশের কোটি কোটি খেটে খাওয়া মানুষ, ‘মূঢ় ম্লান মূক মুখের’ মানুষরাই হচ্ছে রাজনীতির ভাষায় ‘সাইলেন্ট মেজরিটি’। রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় এই মানুষগুলোর অনেকেই নিষ্ক্রিয় হলেও অচেতন নন, সচেতন। এরা আবার গ্রামে-গঞ্জে নীরবে জনমতকে প্রভাবিত করে থাকেন। তাঁদের আশপাশের অরাজনৈতিক অনালোকিত জনগণ বিভিন্ন বিষয়ে তাঁদের কাছে সলাপরামর্শের জন্য ছুটে আসেন। স্ব-স্ব এলাকায় এদের অবস্থান উজ্জ্বল দীপবর্তিকার মত।

২.

এই মুহূর্তে বাংলাদেশের ছোট-বড় সব রাজনীতিবিদ ও সচেতন-অচেতন সব সাধারণ মানুষের দরজায় মুহুর্মুহু কড়া নাড়ছে দেশের দুই বড় দলের কাউন্সিল অধিবেশন। দুটি অধিবেশনই এ মাসের মধ্যে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। দীর্ঘ প্রায় সাত বছর পর বিএনপির অধিবেশন হবে ১৯ মার্চ শনিবার। আর তার ক’দিন পর এ মাসেই হবে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল। এখন পর্যন্ত তাদের ঘোষিত তারিখ ২৯ মার্চ। এই দুই বড় ঘটনা নিয়ে মিডিয়াসহ সবখানে চলছে আলাপ-আলোচনা-সমালোচনার ঘনঘটা। শাসকদল আওয়ামী লীগের সভা-সমিতি করতে কোনো বাধা-বিপত্তি থাকার কথা নয়, নেইও। ক্ষমতায় থাকার সুযোগ-সুবিধা নিয়ে দলটির আয়োজন হবে রাজসিক এটা বোঝাই যায়। এবং সম্ভবত তা সোহরাওয়ার্দী উদ্যান বা এরকম কোনো বড় ময়দানেই হবে। আর বৃষ্টি-বাদল বা নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রেও হতে পারে। ভেন্যুর ব্যাপারে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে কোনো ঘোষণা আসেনি এখনও।

তবে বিএনপির কাউন্সিল অধিবেশনের ভেন্যুর ব্যাপারে সরকার আরও উদারতার পরিচয় দিতে পারত। বিএনপি তাদের কাউন্সিলের ঘোষণা দিয়েছে অনেক আগেই। কিন্তু সরকার অনুমতি দেওয়ার ব্যাপারে অযথা কালক্ষেপণ করতে করতে শেষ পর্যন্ত অনুমতি দেয়। কোথায়? না, সেই আদ্যিকালের বদ্যিবুড়ো ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউটে। (একটু আগে শুনলাম আরও একটি মিলনায়তনও বরাদ্দ পেয়েছে বিএনপি। সেটি গুলিস্তান এলাকায় নাট্যমঞ্চ মিলনায়তন। কিন্তু সোহরাওয়ার্দী উদ্যান বা বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক কেন্দ্র যেন বিএনপির জন্য আউট অব বাউন্স, নিষিদ্ধ এলাকা)। স্বভাবতই বিএনপি বলছে, তাদের ডেলিগেটদের কাছে চিঠি পাঠাতে যাতে বিলম্ব হয় এবং অপেক্ষাকৃত স্বল্প পরিসর ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউটে যাতে সম্মেলন করতে, খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করতে ত্রুটি হয় সে জন্যই কর্তৃপক্ষ এই অনুদারতার আশ্রয় নিয়েছে। জানি না, আসল বিষয়টি কী, তবে সরকারের পক্ষ থেকে এতে যে স্বচ্ছতার অভাব ছিল তাতে সন্দেহ নেই। এসব ছোটখাটো ব্যাপারেও যদি এখনও আমরা মনটাকে বড় করতে না পারি, তাহলে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে কীভাবে?

যা হোক, বিএনপির কেন্দ্রীয় অফিস থেকে জেলায় জেলায় চিঠিপত্র চলে গেছে, আর সাংগঠনিক শৃঙ্খলার অভাবজনিত কারণে প্রতিনিধি নির্বাচন নিয়ে প্রায় সবখানেই শোনা যায় রীতিমত ধুন্ধুমার শুরু হয়েছে। এটা হতো না যদি মাস দু-তিনেক আগে থেকে ঢাকায় অবস্থানকারী নেতৃবৃন্দ সাংগঠনিক সফরে বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় যেতেন এবং বিএনপির ঘুরে দাঁড়ানোর দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বিবদমান পক্ষগুলোকে অন্তত সাময়িকভাবে হলেও ঐক্যবদ্ধ করার উদ্যোগ নিতেন। মাঠপর্যায়ে অনেক জেলা-উপজেলাতে নিয়মিত কমিটি নেই। ফলে দল এখন একাধিক উপদলে বিভক্ত হয়ে কোন্দলে ব্যস্ত। সাংবিধানিকভাবে কমিটি গঠন করার কাজটি বিভিন্ন জেলায় অবহেলিত হয়ে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। নিবেদিতপ্রাণ, দক্ষ কর্মীদের মধ্যে এ নিয়ে বিরাজ করছে চরম হতাশা। এর মধ্যে আগামীকালের কাউন্সিল অধিবেশন নিয়ে নানাজনের নেতিবাচক কথাবার্তা ও স্বার্থান্বেষীগোষ্ঠীর অপপ্রচার এই হতাশাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। আর সব কিছু ছাড়িয়ে চলছে পদ দখলের উলঙ্গ প্রতিযোগিতা।

অথচ দেশে একটি সুসংহত, সুসংগঠিত বিরোধী দল এখন সময়ের দাবি। সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের কথা বলার, কোনো বিপদ-আপদে পাশে দাঁড়ানোর, ‘বন্দুকযুদ্ধ’ আর খুন-গুমের প্রতিবাদ জানানোর কেউ না আছে সংসদে, না আছে রাজপথে। ২০১৪ সালের তাণ্ডবলীলার কোনো সুষ্ঠু তদন্ত না করে, প্রকৃত দোষী কে বা কারা তা নির্ণয় না করে, সরকার সুপরিকল্পিতভাবে বিএনপির নেতাকর্মীদের কারাভ্যন্তরে রেখে, আর না হয় ঘরছাড়া যাযাবর বানিয়ে ছেড়েছে। বিএনপি ফাটা বাঁশের চিপায় পড়ে, এত দিন শুধু ‘মরে গেলাম মরে গেলাম’ বলে চিক্কর পেড়েছে। এখন তারা ঘোষণা দিয়েছে ঘুরে দাঁড়ানোর। সাধারণ মানুষও চায় একটি শক্তিশালী বিরোধী দল দেশে থাকুক। সব ব্যাপারে ‘ওয়াকওভার’ দেওয়া, জ্বী হুজুর মার্কা গৃহপালিত তথাকথিত বিরোধী দল দেখতে দেখতে লোকের বিবমিষা দেখা দিচ্ছে। এদিকে যে হারে শিশুহত্যা শুরু হয়েছে তাতে অচিরেই প্রাইমারি স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীর আকাল না পড়ে যায়। আর ব্যাংক লুটের মচ্ছব দেখে তো মনে হয় বাচ্চাদের মাটির ব্যাংকের সিকি-আধুলিগুলোও আর নিরাপদ নয়।

৩.

এখন একটা মস্ত বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, কাউন্সিল অধিবেশনের পর বিএনপি কি সত্যি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে? সংগঠিত করতে পারবে কি দেশের অগণিত নিবেদিতপ্রাণ নেতাকর্মীকে? দলটি সম্বন্ধে মানুষের মনে, বিশেষ করে শিক্ষিত সচেতন মহলে, যে দ্বিধা-সংশয় দেখা দিয়েছে জামায়াত-যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, শীর্ষ নেতাদের জনবিচ্ছিন্নতা ও চেয়ারপারসনকে ভুল পরামর্শ প্রদান, দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানের দেশে প্রত্যাগমনে অপারগতা ইত্যাদি প্রশ্নে; সেগুলোর সদুত্তর এই কাউন্সিল অধিবেশনেই দিতে হবে দলটির কর্ণধারদের। ঐক্যের পথ ছেড়ে বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে অভ্যন্তরীণভাবে অনৈক্যের পথে চলছে। এতে অহেতুক দুর্বল হয়ে পড়ছে দলটি। দলের সব নেতাকর্মীকে এক সুতায় ঐক্যবদ্ধ করতে না পারলে ঘুরে দাঁড়ানোর নামে আগামী দিনের যে সংগ্রামের স্বপ্ন দেখছে বিএনপি, তা দুঃস্বপ্নে পরিণত হতে পারে। সর্বোপরি বিএনপিকে স্থায়ীভাবে বোতলবন্দি করে ফেলার যে জাল বিস্তার করেছে শাসকদল তা ছিন্ন করে বেরিয়ে আসতে চাই অকুণ্ঠ জনসমর্থন। আর ‘সাইলেন্ট মেজরিটি’ তখনই সেই সমর্থন দেবে, যখন তারা দেখবে দলটি দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও তোষামোদের পঙ্কিল রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শে উজ্জীবিত একটি সুসংহত, সুসংগঠিত দলে পরিণত হয়েছে। ১৯ মার্চের কাউন্সিলে বিএনপির কাছে সাধারণ মানুষের এটাই হচ্ছে বড় প্রত্যাশা।

শুধু তোষামোদ, হাত কচলানো ও দুর্নীতিকে পুঁজি করে দলটিতে যারা শেকড় গেড়ে বসে ২০০৮-এর জাতীয় নির্বাচনে বিএনপিকে কুল্লে ৩০/৩২টি আসন পাইয়ে দিয়েছিল, সেই সব অথর্ব মোসাহেবকে সময় থাকতে, নোয়াখালী অঞ্চলের ভাষায়—‘গেঁডি ধরি’ (অর্থ : ঘাড় ধরে) বের করে না দিলে কপালে দুঃখ আছে। মনে রাখা দরকার, শেষ বিচারের জন্য একদিন দিনশেষে দাঁড়াতে হবে জনতার আদালতেই, যে আদালত, প্রথমেই গুনতে শুরু করবে ‘ক্লিন ইমেজের’ লোকদের বাদ দিয়ে কতজন ধান্দাবাজ, ধড়িবাজ, আখের গোছাতে পটু লোককে আবার কুরসির রওনক বাড়ানোর জন্য বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর এও মনে রাখা দরকার, জনতা এই বাসি, পচা, পূতিগন্ধময় রাজনীতিতে সত্যিকার অর্থেই গুণগত পরিবর্তন দেখতে চায়। তারা তাদের পায়ের ঘাম মাথায় ফেলে, থুকিক, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে প্রবৃদ্ধির হার ঠেলতে ঠেলতে দুই ডিজিটের দিকে নিয়ে যাবে, মাথাপিছু আয় বাড়িয়ে ১৩/১৪ শ ডলার করবে, ব্যাংক রিজার্ভ এত লুটপাটের পরও হবে ২৮ বিলিয়ন, আর মুষ্টিমেয় কিছু দুর্বৃত্ত সিন্দবাদের দৈত্যের মত তাদের ঘাড়ে চেপে বসে চিরকাল কাঁঠাল ভাঙবে, মালাই-মাখন খাবে, সেই দিন শেষ। জনতার রুদ্ররোষ থেকে বাঁচতে হলে বাংলাদেশে এখন ধোঁকাবাজির রাজনীতিকে বঙ্গোপসাগরে বিসর্জন দিয়ে সত্যিকার অর্থে জনকল্যাণকর কলুষমুক্ত রাজনীতির প্রবর্তন করতে হবে।

বিএনপির ষষ্ঠ কাউন্সিল অধিবেশন ২০১৬-এর সর্বাঙ্গীন সাফল্য কামনা করি এবং সেই সঙ্গে আশা করি, আমজনতার কাতারে দাঁড়িয়ে ১৯ মার্চ বিএনপিকে এক নতুন রূপে দেখতে পাব।

লেখক : সাবেক সচিব, কবি

mkarim06@yahoo.com


মন্তব্য