kalerkantho

শুক্রবার । ২০ জানুয়ারি ২০১৭ । ৭ মাঘ ১৪২৩। ২১ রবিউস সানি ১৪৩৮।


টেকসই উন্নয়নে নৈতিকতার গুরুত্ব

ড. মো. নাছিম আখতার

১৬ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি,

সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি। ’

 

ছেলেবেলায় যখন কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের দেশাত্মবোধক কবিতার চরণগুলো পড়তাম তখন মনে হতো তিনি হয়তো একটু বাড়িয়েই লিখেছেন। কিন্তু জীবনের পথপরিক্রমায় দেশ-বিদেশের অভিজ্ঞতা থেকে এখন উপলব্ধি করি যে তিনি প্রকৃতপক্ষে অতিরঞ্জিত কোনো কথা বলেননি। আবহমানকালের ইতিহাস বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করলে জানা যায় যে ১০০০ খ্রিস্টাব্দের সমসাময়িককালে আমাদের দেশ তথা পুরো ভারতীয় উপমহাদেশ ছিল অর্থনৈতিক শক্তির শীর্ষে। আর মোগল আমলে সেই অবস্থান নেমে এসেছিল চতুর্থে। এর ফলে প্রাচীন আমলের সেই স্বর্ণযুগে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর মানুষ এখানে এসেছে বাণিজ্যের অন্বেষণে। আবার কখনো কখনো তারা কূটকৌশল অবলম্বন করে এ দেশের শান্তিপ্রিয়, উদার, সরল-সাধারণ মানুষকে প্রবঞ্চিত করে শাসকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। এ দেশের জলবায়ু, আবহাওয়া, প্রকৃতি—সবই ছিল মানব বসবাসের ক্ষেত্রে অনুকূল; আর তাই তো এ দেশের মানুষ বেড়েছে জ্যামিতিক হারে। এ দেশ আমাদের, দেশমাতৃকার পলিবাহিত মাটিতে জন্মগ্রহণ করে আমরা গৌরব বোধ করি।

গর্বের প্রথম কারণ, আমাদের সভ্যতার ইতিহাস অতি প্রাচীন। সনাতন ধর্মের উত্পত্তি ঘটেছিল এই ভূখণ্ডে প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে। তাই পশ্চিমা বিশ্বের মানুষকে যদি আমরা সভ্য বলি, তাহলে আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সমৃদ্ধিশীল জীবনের যে চিরায়ত বাস্তবতা সে ক্ষেত্রে আমরা নিজেদের সুসভ্য জাতি বলে গৌরব বোধ করতেই পারি।

দ্বিতীয় কারণ, প্রাকৃতিক ধন-সম্পদের ভাণ্ডার আমাদের এই ভূখণ্ড। প্রকৃতি আমাদের উজাড় করে দিয়েছে তার অবারিত ধনভাণ্ডার। আমাদের প্রকৃতি যেমন সমৃদ্ধ, ঠিক তেমনি আমাদের বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর মধ্যে সহিষ্ণুতা ও সম্প্রীতির বন্ধন অত্যন্ত দৃঢ়। এই ছোট জায়গায়ই বিপুল জনগোষ্ঠীর জীবন ধারণের প্রয়োজনীয় উপাদান, তথা খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ইত্যাদি ব্যবস্থা হচ্ছে। আজ আমরা আমদানিনির্ভর জাতির কলঙ্ক মুছে রপ্তানিমুখী জাতির গৌরবে অভিষিক্ত হচ্ছি।

তৃতীয় কারণ, প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের বিপুল সম্ভাবনায় আমরা পেয়েছি ষড়ঋতুর সমাহার। এই ষড়ঋতুর কারণে আমাদের দেশে পর্যায়ক্রমে আসে গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত। ছয় ঋতুতে আমাদের প্রকৃতি ছয়টি নতুন সাজে সজ্জিত হয়। এই অপরূপ প্রকৃতি আমাদের দিয়েছে অপার সৌন্দর্যমণ্ডিত মন ও হূদয়। ঋতুবৈচিত্র্য আমাদের জীবনকে যেমন সহজ করেছে ঠিক তেমনি সমৃদ্ধও করেছে।

চতুর্থ কারণ, পারিবারিক বন্ধন আমাদের আবহমানকালের চিরন্তন ঐতিহ্য। মা-বাবা, ভাইবোন, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবের মধ্যে এমন মায়া-মমতা, ভালোবাসা বিশ্বের অনেক দেশেই বিরল। এই নিবিড় বন্ধন শুধু মানুষের মধ্যে আত্মিক প্রশান্তিই আনে না, এর সঙ্গে জীবনের স্বাদ ও কর্মস্পৃহাকে অর্থবহ করে তোলে। ফলে প্রাকৃতিক বিপর্যয়, বিশেষ করে বন্যা মোকাবিলায় সাফল্য অর্জনের ক্ষেত্রে আমাদের যে আত্মিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতা কাজ করে তা বিদেশের কৃত্রিম সমাজের মধ্যে দেখা মেলা ভার।

বর্তমান সরকারের গতিশীল ও পরিকল্পিত চিন্তাধারার মাধ্যমে দেশ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। নিজের দেশের পণ্যের বিজ্ঞাপন যখন ভিনদেশি টেলিভিশনের পর্দায় দেখা যায়, তখন মানুষ হিসেবে মনটা খুশিতে ভরে ওঠে। যখন শুনি আমাদের তৈরি ওষুধ পৃথিবীর ৮৮টিরও বেশি দেশে রপ্তানি হচ্ছে, তখন গর্ববোধ করি। যখন জানি পদ্মা নদীর ওপর নিজস্ব অর্থায়নে সেতু হচ্ছে, তখন ভালো লাগার মাত্রায় যোগ হয় এক অনির্বচনীয় গর্ব ও প্রত্যাশা। আগামীর সম্ভাবনাময় চোখে যখন দেখি আমাদের আইটি সেক্টর গার্মেন্ট সেক্টরকেও পেছনে ফেলবে তখন বিস্ময়ে অভিভূত হই। কৃষিতে শাকসবজি, ফলমূল উত্পাদনে আমাদের সমকক্ষ দেশ পৃথিবীতে খুবই কম। আমরাই পারি আমাদের কৃষিদ্রব্যের বিপুল সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে কীটনাশকমুক্ত কৃষিপণ্যের বিশাল বিদেশি বাজার সৃষ্টি করতে। যার সাম্প্রতিক দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করা যায় যে বাংলাদেশের কৃষিবিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত বছরে ছয় ফসলি চাষ পদ্ধতি।

কখনো কখনো খাদ্যে ভেজাল, নারী ও শিশু নির্যাতন, কর্মক্ষেত্রে দুর্নীতি, চাকরিতে নিয়োগে অস্বচ্ছতাসহ বহু নেতিবাচক কার্যকলাপ আমাদের সোনার বাংলার এই ইতিবাচক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে। আমরা উন্নয়নের অভীষ্ট লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়া শুরু করলেও কোনো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমাদের অগোচরেই থেকে যাচ্ছে। আর তা হচ্ছে জীবন ও কর্মক্ষেত্রে আমাদের নৈতিকতার অভাব। কাজেই এই রাহুগ্রাস থেকে বেরিয়ে আসতে হলে আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নৈতিকতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। আমাদের বুঝতে হবে, বিশ্বাস ও সততাই ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের মধ্যে সেতুবন্ধ তৈরি করে। এই সেতুবন্ধ যত মজবুত হবে উন্নতিও ততটাই টেকসই হবে। পরিবার, সমাজ, জাতি যখন সৎ ও নৈতিকতার চর্চা করবে ও তার প্রতি বিশ্বাস রাখবে, তখন দেশের প্রতিটি কর্মকাণ্ডে থাকবে প্রাণ ও প্রাচুর্যের ছোঁয়া।

সুস্বাস্থ্যের জন্য যেমন সুষম খাদ্যের প্রয়োজন, তেমনি সুন্দর ও সুখী জীবনের জন্য প্রয়োজন আত্মা ও মন পরিতুষ্ট করা। আত্মা ও মন উভয়েরই খাদ্যের প্রয়োজন। আত্মা ও মন উভয় ভিন্ন ভিন্ন সত্তা এবং উভয়ের মধ্যে রয়েছে সূক্ষ্ম পার্থক্য। মন নৈতিক-অনৈতিক উভয় কাজেই আনন্দ পেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ হিংসাবশত অন্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে মন তাত্ক্ষণিকভাবে আনন্দিত হয়। কিন্তু আত্মার তুষ্টির উপাদান শুধুই ভালো চিন্তা ও সৎ কর্ম। ভোগবাদী সমাজব্যবস্থায় ধারণা করা হয়, মন ও দেহকে তুষ্ট করতে পারলেই মানুষ সুখী। কিন্তু এই ধারণা যে কতটা ভুল, তা সুখের মাপকাঠিতে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ পরাশক্তির আনুক্রমিক অবস্থানের দিকে তাকালেই বুঝতে পারা যায়। বিশ্বের এক নম্বর ধনী বিল গেটস মানবদরদি হিসেবে পরিচিত। তিনি তাঁর অর্জিত সম্পদের বেশির ভাগ অংশই দান করেছেন মানবকল্যাণে; দানের মধ্যে তিনি খুঁজে পেয়েছেন আত্মার তুষ্টি। আর আমরা সাধারণ মানুষ আত্মার তুষ্টি খুঁজতে পারি নিজের গণ্ডির মধ্যে থেকে ভালো কাজের মাধ্যমে, আমাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে, মা-বাবা, শিক্ষক ও গুরুজনদের শ্রদ্ধা করে, প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনকে সাহায্য করে, নিজের ভাষা ও সংস্কৃতিকে বুকে লালন করে, দেশকে ভালোবেসে এবং দেশের উন্নতিতে অবদান রেখে। তেমনি নৈতিকতাবিবর্জিত শুষ্ক জীবনের স্বাদ কতটুকু, তা ভাবার বিষয়।

ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ ও রাজনীতিবিদ Lord Macaulay ব্রিটিশ ভারতের কলকাতা গভর্নর কাউন্সিলের একজন আইন সদস্য ছিলেন। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষ সম্পর্কে দেওয়া তাঁর বক্তব্যে তিনি আমাদের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও নৈতিক গুণাবলির শ্রেষ্ঠত্ব অকপটে স্বীকার করেছিলেন। শাসকের ভূমিকায় টিকে থাকার জন্য ব্রিটিশ নীতিনির্ধারকদের প্রতি তাঁর যে উপদেশ ছিল, তা সচেতন ও দেশপ্রেমিক বাংলাদেশিদের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করবে বলে আমার বিশ্বাস। শিক্ষার মূল ভিত্তি নৈতিকতাকে অক্ষুণ্ন রেখে জীবন ধারণ ও কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে যেকোনো শিক্ষাই মর্যাদাপূর্ণ ও আত্মিক প্রশান্তির প্রতীক। তাই আমাদের উচিত শৈশবকালীন শিক্ষা থেকে উচ্চতর শিক্ষা পর্যন্ত জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই নৈতিক শিক্ষার বিষয়টিকে শিক্ষা কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্তিকরণের মাধ্যমে ইতিবাচক বাংলাদেশের রূপরেখা বাস্তবায়ন করা, যাতে দেশ থেকে নেতিবাচক দিকগুলো দূর হয়ে যায় এবং আমরা পরিণত হই সুখী ও সুষমভাবে সমৃদ্ধ জাতিতে। বাংলাদেশের প্রখ্যাত ভাষাবিদ অসাধারণ ধীশক্তিসম্পন্ন পণ্ডিত ড. মো. শহীদুল্লাহর মতো আমরাও বিশ্বাস করতে চাই, ‘মাতা, মাতৃভূমি ও মাতৃভাষা এই তিনটি জিনিস প্রত্যেক মানুষের কাছেই গৌরবের বস্তু। ’

লেখক : অধ্যাপক ও ডিন, ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদ, বিভাগীয় প্রধান, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ. ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর।

drnasim@duet.ac.bd


মন্তব্য