kalerkantho

বুধবার । ১৮ জানুয়ারি ২০১৭ । ৫ মাঘ ১৪২৩। ১৯ রবিউস সানি ১৪৩৮।


কালান্তরের কড়চা

বাংলাদেশে বিএনপির ‘পরগাছা’ রাজনীতি

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

১৫ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



বাংলাদেশে বিএনপির ‘পরগাছা’ রাজনীতি

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপি আবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা শুরু করেছে। ১৯ মার্চ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দলের কাউন্সিল অধিবেশন। তবে এর আগেই চেয়ারপারসন ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান এই দুই শীর্ষ পদে খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমান বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। বাকি পদগুলো কাউন্সিল অধিবেশনে শীর্ষ দুই নেতার ইশারা-ইঙ্গিতেই যে পূরণ করা হবে তাতে সন্দেহ নেই। এভাবেই শীর্ষ নেতৃত্বের অঙ্গুলি হেলনে বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো চলছে এবং ভবিষ্যতেও চলবে। এভাবেই চলবে বাংলাদেশে ‘গণতান্ত্রিক রাজনীতির’ অভিযাত্রা।

কিছুদিন আগে ‘সংসদীয় বিরোধী দল’ জাতীয় পার্টিতেও এই খেলা চলেছে। দলের প্রধান নেতা জেনারেল এরশাদ নিজের একক ইচ্ছায় সহসা ছোট ভাই জি এম কাদেরকে দলের নেতৃত্বে টেনে এনে তাঁর উত্তরাধিকারী করেছেন। অর্থাৎ বাংলাদেশের রাজনীতিতেও চলছে বংশানুক্রমিক আধিপত্যের পালা। এরশাদ সাহেবের কোনো অবিতর্কিত পুত্রসন্তান নেই। থাকলে হয়তো তাঁকেই ছোট ভাইয়ের বদলে দলের নেতৃত্বের উত্তরাধিকারী করতেন।

বিএনপির অন্যতম শীর্ষ পদে তারেক রহমানের আরোহণকে অনেকটা উল্লম্ফনের সঙ্গে তুলনা করা চলে। ভারতে কংগ্রেসের নেতৃত্বে রাহুল গান্ধীর আরোহণ পর্যায়ক্রমিক। প্রথমে যুব কংগ্রেসে যোগ দিয়ে রাজনীতিতে তাঁর যাত্রা শুরু। এরপর ধীরে ধীরে কংগ্রেসের অন্যতম শীর্ষ নেতৃত্বের পদের দিকে এগিয়েছেন। বাংলাদেশে তারেক রহমানের রাজনীতিতে আবির্ভাব সম্পূর্ণ উল্লম্ফন প্রক্রিয়ায়।

বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে এক যুগ আগে রাজনীতিতে যুক্ত হয়েই মায়ের কৃপায় তিনি দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হন। আসলে হন অঘোষিত মহাসচিব। তখনকার মহাসচিব মান্নান ভূঁইয়াসহ সিনিয়র মন্ত্রীরা পর্যন্ত তারেক রহমানকে দেখলে নতজানু হয়ে সালাম দিতেন। তাঁকে সামনের আসন ছেড়ে দিতেন। এরপর রাতারাতি ২০০৯ সালে তাঁকে দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান করা হয়। সবই মায়ের ইচ্ছায়। এখন সবাই জানে, পুত্রের ইচ্ছাতেই মা দলের রাজনীতি পরিচালনা করেন। পুত্র বিদেশে বসে দলের কলকাঠি নাড়েন। তাঁর ইচ্ছাতেই জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির কণ্ঠিবদলের রাজনীতি এবং আন্দোলনের নামে ব্যর্থ সন্ত্রাসের রাজনীতি। দলে মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক নেতৃত্বের যে অংশবিশেষ ছিল বা আছে, তারেক রহমান তাদেরও দল থেকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করেন অথবা নিষ্ক্রিয় করে ফেলেন।

খালেদা জিয়া এখন খুব একটা সুস্থ নন। ফলে দলের সিংহাসনে পুত্রের অভিষেকের সব আয়োজন তিনি শুরু করেছেন। ঢাকার কাগজেই খবর বেরিয়েছে, সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমানের ক্ষমতা বাড়ানো এবং কর্তৃত্ব নির্দিষ্ট করার জন্য বিএনপির দলীয় গঠনতন্ত্র সংশোধন করা হচ্ছে। অর্থাৎ প্রাচীন ভারতে রাজা ভরত যেমন রামচন্দ্রের পাদুকা সিংহাসনে রেখে রাজত্ব চালাতেন, তারেক রহমান বিদেশে বসে তেমনি মায়ের নাম ভাঙিয়ে নিজে দল চালাবেন। তাতে দলটির ভবিষ্যৎ কী দাঁড়াবে তা ভেবে দলের অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী উদ্বিগ্ন।

কেউ কেউ বলছেন, ভারতে ইন্দিরা গান্ধী প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে পুত্র সঞ্জয় গান্ধীকে দিল্লির সিংহাসনে তাঁর উত্তরাধিকারী করার চেষ্টা করতে গিয়ে যেমন নিজের জন্য এবং দলের জন্য বিপর্যয় ডেকে এনেছিলেন, বাংলাদেশে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া তাঁর পুত্র তারেক রহমানকে বাংলার মসনদে বসানোর চেষ্টা দ্বারা তেমনি তাঁর নিজের নেতৃত্ব এবং দলের ভবিষ্যতের জন্যও এক মহাবিপর্যয়ের পথ খুলে দিয়েছেন।

ভারতের সঞ্জয় গান্ধীর তবু নেহরু পরিবারের দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞানের উত্তরাধিকার ছিল। কিন্তু বাংলাদেশে সেনাপতিপুত্র হিসেবে সেনানিবাসে যাঁর জন্ম ও যৌবনকাল পর্যন্ত বসবাস, তাঁর রাজনৈতিক অভিজ্ঞান দূরে থাক, ব্যক্তিগত শিক্ষা ও জ্ঞানের সীমানা কতটুকু? বিলেতে বসে তাঁর প্রগলভ ইতিহাসচর্চা থেকেই কি তা বোঝা যায়নি? এ জন্যই বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপির ঘুরে দাঁড়ানোর ইচ্ছা কতটা সফল হবে এ ব্যাপারে অনেকে সন্দেহ পোষণ করেন।

গণভিত্তি না থাকলে অথবা তা হারালে কোনো রাজনৈতিক দল বেশি দিন টিকে থাকে না। আওয়ামী লীগের বর্তমানে যত দুর্বলতা থাক, এই দলের একটা গণভিত্তি আছে। এই গণভিত্তির জন্যই শত দুর্বিপাকের মধ্যেও দলটি টিকে আছে এবং বারবার ক্ষমতায় আসছে। বিএনপির জন্ম সেনা ছাউনিতে। এই দলের কোনো গণভিত্তি ছিল না। বিভিন্ন দলের ও মতের ‘পরগাছা’ নিয়ে দলটির জন্ম।

খালেদা জিয়া নেতৃত্বে এলে দলটির একটা গণভিত্তি গড়ে ওঠে। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে যোগ দিয়ে এবং নির্বাচনে জয়ী হয়ে দেশ পরিচালনায় সংসদীয় পদ্ধতিতে ফিরে এসে বিএনপির এই গণভিত্তি আরো শক্ত হয় এবং দেশের দ্বিতীয় প্রধান দল হিসেবে গড়ে ওঠে।

এরপরই শুরু হলো দলটির নীতি ও নেতৃত্বের ভুল। খালেদা জিয়া একনায়ক এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামলেন। কিন্তু ক্যান্টনমেন্ট ছাড়লেন না। দলের গণভিত্তিকে উপেক্ষা করে তিনি ক্যান্টনমেন্টের শক্তিকেই তাঁর ক্ষমতার ভিত্তি হিসেবে ধরে নিলেন। রাজনীতিতে অন্যের ওপর নির্ভরশীলতা পরগাছার রাজনীতি। পরগাছা যেমন নিজের পায়ে দাঁড়ানোর শক্তি অর্জন করে না, তেমনি অন্যের সমর্থননির্ভর রাজনীতিও কখনো পায়ের তলায় মাটির সন্ধান পায় না।

পরগাছার রাজনীতির অর্থ যাঁরা বুঝতে চান না, তাঁদের কবি মধুসূদন দত্তের ‘রসাল কহিল উচ্চে স্বর্ণ লতিকারে’ কবিতাটি পড়ে দেখতে অনুরোধ জানাই। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি চিরকাল পরগাছার রাজনীতি করেছে এবং এখনো তা করছে। এখানেই বিএনপির রাজনীতির চরম ব্যর্থতা। এই ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ না করলে বিএনপি ১৯ মার্চের কাউন্সিল অধিবেশনের পরও ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না।

রাজনীতিতে পরগাছানীতি অনুসরণ করতে গিয়েই বিএনপি ক্যান্টনমেন্টের ওপর নির্ভরতার পাশাপাশি দেশের স্বাধীনতার শত্রু জামায়াতের সমর্থন ও সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। অথচ বিএনপির নিজস্ব গণভিত্তি গড়ে উঠেছিল, বিশাল জনসমর্থনও ছিল। তাকে উপেক্ষা করে তারেক রহমানের পরামর্শে খালেদা জিয়া জামায়াতের সঙ্গে শুধু আঁতাত করা নয়, ক্ষমতায় তাদের অংশীদার করেন এবং তাদের সমর্থন ও সহযোগিতার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। ২০১৪ সালের সাধারণ নির্বাচন বর্জন করে জামায়াতের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে পেট্রলবোমায় মানুষ পুড়িয়ে মারার সন্ত্রাসে যোগ দিয়ে বিএনপি তার আত্মহননের পথটি বেছে নেয়।

নেতৃত্বের এই পরগাছা ভূমিকার সঙ্গে যুক্ত হয় বিএনপির নীতিগত ভ্রষ্টতা। আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করতে গিয়ে জামায়াতের পরামর্শে মুক্তিযুদ্ধের মূল আদর্শের বিরোধিতা এবং বঙ্গবন্ধুসহ মুক্তিযুদ্ধের নেতাদের নাম ইতিহাস থেকে মুছে ফেলতে গিয়ে বিএনপি চরম ভুল করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা-উত্তর যে রাজনীতির ওপর দলটির প্রতিষ্ঠা, সেই রাজনীতিকে অস্বীকার করে এবং তার ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টা চালিয়ে কোনো দল নিজের অস্তিত্ব দীর্ঘকাল টিকিয়ে রাখতে পারে কি? বিএনপি নেতারা গত চার দশকেও কেন এই সত্যটা অনুধাবন করতে পারলেন না যে আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করা আর দেশের স্বাধীনতার মূল আদর্শের বিরোধিতা করা এক কথা নয়?

সম্ভবত খালেদা জিয়া তাঁর স্বামীর সহকর্মী এবং মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক যেসব নেতাকে সঙ্গে নিয়ে রাজনীতিতে নেমেছিলেন, তাঁদের পরামর্শ শুনলে এবং গণরাজনীতি বর্জন করে পরগাছার নীতি অনুসরণ না করলে বিএনপির এই বিপর্যস্ত অবস্থা আজ দেখা দিত না। তাঁর দলেরই অনেকের ধারণা, পুত্র তারেক রহমানের ভ্রান্ত পরামর্শে চালিত হয়েই তিনি আজ এই অবস্থায় এসে পৌঁছেছেন। রাজনীতিতে ঘুরে দাঁড়াতে পারছেন না। তারেক রহমানের রাজনীতি ষড়যন্ত্র, সন্ত্রাস ও মিথ্যাচারভিত্তিক বলে বাজারে অভিযোগ রয়েছে। এই অভিযোগে তিনি মামলা-মোকদ্দমাতেও ঝুলছেন। তাঁকে কাণ্ডারি করে বিএনপি কতটা এগোতে পারবে?

জামায়াতের প্রতি একটা অদৃশ্য নাড়ির টান এখনো বিএনপির রয়ে গেছে। ফলে জনসমর্থনের ভিত্তিতে ফিরে না এসে এখনো চলছে তার পরগাছা রাজনীতির পুনরাবৃত্তি। বিএনপির সাম্প্রতিক রাজনীতি হচ্ছে বিদেশি শক্তির সাহায্যের ওপর নির্ভরতা। ভারতে বিজেপি যখন ক্ষমতায় আসে, তখন বিএনপি অতি আশায় বুক বেঁধেছিল, বিজেপিই বুঝি ঢাকার মসনদ তাদের পুনরুদ্ধার করে দেবে। এ জন্য বিজেপির নির্বাচন জয়ে তারা ঢাকায় মিষ্টি বিতরণ করেছে, বক্তৃতা-বিবৃতিতে মোদি-ভজনা শুরু করেছিল, বিজেপি সরকার তাদের অতি আশায় ছাই দিয়েছে। তারা আওয়ামী লীগ সরকারকে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছে।

পরনির্ভরতার এই রাজনীতি থেকে বিএনপি কোনো শিক্ষা নেয়নি। এখন তাদের আশা, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে যদি হিলারি ক্লিনটন জিতে যান, তাহলে বাংলাদেশে হাসিনা সরকার বিপাকে পড়বে। বিএনপির বড় সহায় নোবেলজয়ী ড. ইউনূস। তিনি আবার হাসিনাবিরোধী। তাঁর পরামর্শে ও প্রভাবে হিলারি প্রশাসন নিশ্চয়ই হাসিনা সরকারের মিত্র হবে না। তাহলে বিএনপির পোয়াবারো।

এই আশার গুড়েবালি পড়তেও বেশি দেরি হবে না। হিলারি ক্লিনটন যদি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হনও, তাহলে ভারতের নরেন্দ্র মোদির মতো তাঁর দেশের বৃহত্তর স্বার্থে ঘুরে দাঁড়াবেন না এবং হাসিনা সরকারের পক্ষ নেবেন না তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। বরং সম্ভাবনাই বেশি। বিএনপিকে সম্ভবত আরো একবার আশাভঙ্গের বেদনায় ভুগতে হবে। বিএনপি যদি বাংলাদেশের রাজনীতিতে ঘুরে দাঁড়াতে চায়, তাহলে তাকে পরগাছা নীতি ত্যাগ করতে হবে। দলের শক্তি হিসেবে গণভিত্তিকে গুরুত্ব ও প্রাধান্য দিতে হবে। দলের নীতি ও নেতৃত্ব সংশোধন করতে হবে। তারেক রহমানের লাগামহীন দৌরাত্ম্যে লাগাম টানতে হবে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বিকল্প সুষ্ঠু, সবল ও গণতান্ত্রিক দল অবশ্যই দরকার। কিন্তু সেই দল হওয়ার আবশ্যিক সব শর্ত বিএনপিকে আগে পূরণ করতে হবে।

লন্ডন, সোমবার, ১৪ মার্চ ২০১৬


মন্তব্য