সুশাসন ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা-334599 | উপ-সম্পাদকীয় | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১৪ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৬ জিলহজ ১৪৩৭


সুশাসন ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা

মিল্টন বিশ্বাস

১১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



সুশাসন ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা

সুশাসন প্রতিষ্ঠায় গণমাধ্যমের ভূমিকা অনস্বীকার্য। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাও দেশের সুশাসনের অনিবার্য। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় আইন জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণ করে। মিডিয়ার ইতিবাচক ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কারণে সাধারণ মানুষ সুরক্ষা পেয়ে থাকে। এ কথা ঠিক আইন রক্ষা করবে জনস্বার্থ, নিশ্চিত করবে সবার সমান মর্যাদা ও অধিকার, সংরক্ষণ করবে মানবাধিকার এবং যেকোনো অধিকার লঙ্ঘনের প্রতিকার করবে। এসবই সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য জরুরি।    

বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে ‘সুশাসন’ ও ‘গণমাধ্যম’ এ দুটি বিষয় পরস্পর গভীরভাবে সম্পৃক্ত। গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা আর আইনের শাসনকে যারা বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শনে ধৃষ্টতা রাখে, রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে গণমাধ্যম তাদের সমুচিত জবাব দিতে পারে। তবে এটাও সত্য, কোনো কোনো গণমাধ্যমকর্মী গণমাধ্যমের স্বাধীনতার অপব্যবহার করে ক্ষেত্রবিশেষে গ্রহণযোগ্যতা ও অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রসঙ্গে কেউ কেউ বিরোধী অবস্থান নিয়েছেন। আজ বিশ্বব্যাপী এ কথা স্বীকৃত যে গণমাধ্যমের মাধ্যমেই নিজেদের পরিশীলিত করা যায়। এ জন্য সুশাসন প্রতিষ্ঠায় গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। উপরন্তু দেশে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে সাংবাদিকদের নিরাপত্তাও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দরকার। গণমাধ্যম রাষ্ট্র, সরকার ও জনগণের মধ্যে সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করে। এ দেশে গণসচেতনতা তৈরির মাধ্যমে বিভিন্ন বিপর্যয় রোধে গণমাধ্যম তাত্পর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। সুষম আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বস্তুনিষ্ঠ ও ইতিবাচক ভূমিকা রাখছেন নিবেদিত সংবাদকর্মীরা।

শিশু হত্যাকাণ্ড, ব্লগার, বিদেশি হত্যাকাণ্ড, লেখক ও প্রকাশক খুন, জঙ্গিবাদীদের অপতত্পরতাসহ বড় ধরনের অপরাধ আমাদের সমাজে নানা কারণেই বেড়েছে। তবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কাজটি চলছে যুদ্ধাপরাধের বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার মধ্য দিয়ে। ইতিমধ্যে বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর হয়েছে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচারের রায় কার্যকর করায়। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বর্তমান সরকার প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। সে আলোকে আইনকানুন, নিয়মনীতি, পরিকল্পনা ও বিভিন্ন কৌশল প্রণয়ন করা হয়েছে এবং তা বাস্তবায়ন অব্যাহত আছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। কিন্তু সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য কেবল রাষ্ট্রীয় নিয়মনীতি, আইনকানুন প্রণয়ন ও প্রয়োগই যথেষ্ট নয়; তার জন্য সামগ্রিক এবং নিরবচ্ছিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ প্রয়োজন। সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সামগ্রিক উদ্যোগের সহায়ক কৌশল হিসেবে ‘সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয় : জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল’ প্রণয়ন করা হয়েছে। এই কৌশল বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, সুধীসমাজ এবং বেসরকারি শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন। চরিত্রনিষ্ঠা আনার জন্য মানুষের জীবনের একেবারে গোড়া থেকে, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেই কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। রাজনীতিতেও শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। গণমাধ্যম সেই উদ্দেশ্যে গোলটেবিল বৈঠকসহ নানা কর্মসূচির মাধ্যমে সমাজে সুস্থ ধারার রাজনীতিচর্চায় উৎসাহ দিচ্ছে। 

সুশাসন প্রতিষ্ঠায় দুর্নীতি প্রতিরোধ একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। আর সে সম্পর্কে বিধান ব্রিটিশ আমল থেকেই চালু রয়েছে। বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা থেকে শুরু করে প্রশাসনের সর্বস্তরে বিস্তৃত দুর্নীতি নির্মূল করলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ত্বরান্বিত হবে। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন, পুলিশ প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক নেতাদের অযাচিত প্রভাবসহ বিভিন্ন কারণে বিচারপ্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এসব বাস্তবতা থেকেও আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। আগামী এক দশকে এ দেশে ক্ষুধা, বেকারত্ব, অশিক্ষা, বঞ্চনা ও দারিদ্র্য থাকবে না। দেশে বিরাজ করবে সুখ, শান্তি, সম্প্রীতি ও সমৃদ্ধি। সংবিধানের প্রস্তাবনা অনুযায়ী গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ‘এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা’ হবে, ‘যেখানে সব নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত’ হবে। এই লক্ষ্য পূরণে সুশাসন প্রতিষ্ঠা রাষ্ট্রের অবশ্য কর্তব্য এবং সেই সুশাসন প্রতিষ্ঠায় দুর্নীতি দমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য পরাকৌশল। কেবল আইন প্রয়োগ ও শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে দুর্নীতি নির্মূল করা সম্ভব নয়, তার জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ক্ষেত্রে একটি আন্দোলন গড়ে তোলা, যাতে নাগরিকরা চরিত্রনিষ্ঠ হয়, রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিমালিকানাধীন ও সুধীসমাজের প্রতিষ্ঠানগুলো শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠা পায়। সুশাসন প্রতিষ্ঠায় মানুষকে নৈতিক জীবনযাপনে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। সততা দ্বারা প্রভাবিত আচরণগত উত্কর্ষ যেন তা অনুসরণ করে চলে। তা যেন সমাজের কালোত্তীর্ণ মানদণ্ড, নীতি ও প্রথার প্রতি আনুগত্য থাকে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় ব্যক্তি পর্যায়ে কর্তব্যনিষ্ঠা ও সততা, তথা চরিত্রনিষ্ঠা খুব দরকার। এ জন্য বিদ্যমান আইনকানুন, নিয়মনীতির সঙ্গে দুর্নীতি দমনকে একটি আন্দোলন হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার করতে হবে। সেই অঙ্গীকারকে কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকারের সদিচ্ছার সঙ্গে সঙ্গে জনগণের প্রচেষ্টা গুরুত্বপূর্ণ। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও অপরাধ দমনে মানুষের সচেতনতা একটি অন্যতম দিক। রাজন ও রাকিব হত্যার পর সামাজিক মানুষের সচেতনতা লক্ষ করা গেছে। আর মামলায় ছয়জনের ফাঁসির রায় ঘোষণার মধ্য দিয়ে সুবিধাবঞ্চিত মানুষ ন্যায়বিচার পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী হয়ে উঠেছে। 

মূলত ন্যায়বিচারের নজির সাধারণ মানুষকে যেমন আইনের শাসনের ব্যাপারে সচেতন করে তোলে, তেমনি গণমাধ্যম সেই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হয়ে ওঠে। এ জন্য প্রচলিত বিচার কাঠামোর ওপর মানুষের আস্থা বেড়েছে। প্রকৃতপক্ষে সাধারণ মানুষের তথ্যপ্রাপ্তির অন্যতম উৎস হলো গণমাধ্যম। বলা হয়ে থাকে, গণমাধ্যম জনগণের মতামতকে ঠিক করে দেয়। অর্থাৎ গণমাধ্যমের এজেন্ডা পাবলিক এজেন্ডায় পরিণত হয়। সমাজে নানা ঘটনার মধ্যে কোনটি বেশি আলোচিত হবে বা গুরুত্ব পাবে গণমাধ্যমই তা নির্ধারণ করে দেয়। এর মধ্যে সহজবোধ্য ও দ্রুততম তথ্যপ্রাপ্তির উৎস হিসেবে ইলেকট্রনিক মিডিয়া একধাপ এগিয়ে। অতীত ও বর্তমানের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় গণমাধ্যম বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে যাবে। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর জন্য গণমাধ্যমের নিরপেক্ষতা যেমন নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি স্বাধীনভাবে কাজ করার যাবতীয় দিক উন্মোচন করতে হবে। তাহলে সুশাসন প্রতিষ্ঠার গতি আরো ত্বরান্বিত হবে।

 

লেখক : অধ্যাপক ও পরিচালক, জনসংযোগ, তথ্য ও

প্রকাশনা দপ্তর, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

writermiltonbiswas@gmail.com

মন্তব্য