অরণী ও আলভীর জন্য দুফোঁটা অশ্রু-333788 | উপ-সম্পাদকীয় | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

বুধবার । ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১৩ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৫ জিলহজ ১৪৩৭


সময়ের প্রতিধ্বনি

অরণী ও আলভীর জন্য দুফোঁটা অশ্রু

মোস্তফা কামাল

৯ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



অরণী ও আলভীর জন্য দুফোঁটা অশ্রু

এক সপ্তাহ ধরে ঠিকমতো পত্রিকার দিকে তাকাই না। তাকাতে পারি না। ফুলের মতো ফুটফুটে দুই শিশু অরণী ও আলভীর ছবি দেখলে বুকটা হাহাকার করে ওঠে। হূদয়ে রক্তক্ষরণ হয়। মাথার চারদিক থেকে প্রচণ্ড চাপ তৈরি হয়। সেই চাপ সহ্য করতে পারি না। বুকের ভেতরে অসহনীয় একটা যন্ত্রণা। কখনো কখনো দম বন্ধ হয়ে আসে। কোথাও স্বস্তি পাই না। অস্থিরতা পেয়ে বসেছে যেন। রাতে ঘুমাতে পারি না। কদিন ধরেই শেষ রাতের দিকে ঘুম ভেঙে যায়। আর ঘুম আসে না। বারবার চোখের সামনে ভেসে ওঠে অরণী ও আলভীর চেহারা। সেই চেহারায় হঠাৎ হঠাৎ আমি আমার দুই সন্তান মুগ্ধতা ও মুহিতের মুখ দেখতে পাই। তখন বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠি। অজানা ভয় আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়।

অরণী ও আলভীর মৃত্যুর ঘটনা আমার মনে অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এর নেপথ্যে অনেক রহস্য লুকিয়ে আছে বলে মনে হয়। একজন মা তাঁর সন্তানকে হত্যা করতে পারেন না। এটা আমি বিশ্বাস করি না। করতে পারি না। আমাদের সমাজ এতটা ক্ষয়ে যাবে, নিঃশেষ হয়ে যাবে তা হতে পারে না। আমাদের মানবতা, মানবিকতা ও মূল্যবোধের যত অবক্ষয়ই হোক, মাকে এসবের মধ্যে ঠেলে দেওয়া রীতিমতো অন্যায়। যদি কেউ ভুলবশত কিছু করেও বসে, তাহলে তা মমতাময়ী মায়ের কথা চিন্তা করে ভুল হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত।

কারণ, মায়ের চেয়ে এত কষ্টসহিষ্ণু, নির্লোভ ও ত্যাগী আর কেউ নন। আর কারো পক্ষে সম্ভবও নয়। সন্তানের মঙ্গলের জন্য তিনি সর্বস্ব বিলিয়ে দিতে কুণ্ঠিত হন না। সন্তানের কষ্টে তিনি কষ্ট পান। আবার সন্তান হাজারটা ব্যথা দিলেও সন্তান যখন মা বলে ডাকে, তখন তিনি হাসিমুখে সাড়া দেন। মায়ের অবদানের কথা কি লিখে শেষ করার মতো! ১০ মাস ১০ দিন সন্তানকে গর্ভে ধারণের কষ্ট তো মাকেই সইতে হয়! তার চুল পরিমাণ কষ্টও কি বাবা সহ্য করেন? তারপর নিজের বুকের দুধ খাইয়ে তিল তিল করে সন্তান বড় করে তোলেন মা। রাতের পর রাত নির্ঘুমে কাটান মা। সন্তানের ঠাণ্ডা লাগতে পারে সেই ভয়ে নিজে ভেজা জায়গায় শুয়ে সন্তানকে বুকের ওপর রাখেন! একটা ক্ষুদ্র পিঁপড়াও যাতে কামড়াতে না পারে, সে জন্য সারাক্ষণ কত সতর্কতা!

আমি আমার মাকে দেখেছি। এখন স্ত্রীকে দেখছি। সন্তানের জন্য তাঁদের সর্বোচ্চ ত্যাগের কথা লিখে শেষ করা যাবে না। সেই মা কি সন্তানকে হত্যা করতে পারেন! আমি তো দেখি, আমার দুই সন্তান তার মাকে ছাড়া ঘুমাতে পারে না। না খাইয়ে দিলে খাওয়া হয় না। সেই মায়ের দিকে আমার সন্তান কি সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকাবে? সেকি কোনো দিন বলবে, মা, তোমাকে বিশ্বাস করতে পারছি না! আমাদের নেতিবাচক রিপোর্টিংয়ের মাধ্যমে সন্তানদের আমরা সেই জায়গায় নিয়ে যাচ্ছি না তো!

ইদানীং আমাদের দেশে সংসার ভাঙার হারও বেশ বেড়েছে। সেখানেও দেখা যায়, সংসার ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে বাবা হয়তো আরেকটি বিয়ে করে নতুন করে ঘর বাঁধেন। কিন্তু মা সন্তানের বিপদের কথা চিন্তা করে নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য জলাঞ্জলি দেন। এই তো আমাদের সমাজ! সমাজে দু-একজন এর ব্যতিক্রম থাকতেই পারে। সেটা উদাহরণ হতে পারে না। ক্ষয়ে যাওয়া সমাজ কিংবা ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া পারিবারিক বন্ধনকে জোড়া লাগানোর দায়িত্ব আমাদের সবার। এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের দায়িত্ব কিন্তু অনেক বেশি। দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা খুবই জরুরি। অরণী ও আলভীর হত্যাকাণ্ড নিয়ে কোনো কোনো পত্রিকা রং লাগিয়ে একের পর এক প্রতিবেদন প্রকাশ করছে। কেউ কেউ বলার চেষ্টা করছেন, অরণী ও আলভীর মা মাহফুজা মালেক জেসমিন মানসিক বিকারগ্রস্ত। আবার কেউ বলছেন, তাঁর সঙ্গে অন্য পুরুষের সম্পর্ক ছিল। কেউ কেউ বাবার পরকীয়ার কথাও লিখছেন। আমরা কি এসব জেনে লিখছি? একজন মাকে কলঙ্কিত করে তাঁরা কী স্বার্থসিদ্ধি করতে চান, তা জানতে ইচ্ছা করছে।

আমরা যাঁরা একজন মাকে কলঙ্কিত করার চেষ্টা করছি, তাঁরাও কিন্তু একেকজন মায়ের সন্তান! দয়া করে আপনারা আপনার মায়ের মুখটির দিকে একবার তাকান তো! দেখুন, আপনার মা কতটা লজ্জা পাচ্ছেন আপনার নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে! আপনি হয়তো জানেন না, আপনি আপনার মাকে কতটা কষ্ট দিচ্ছেন।

আমরা যদি ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকেও মাকে দেখি, তাহলে দেখা যায়, আল্লাহর আনুগত্যের পরেই তাঁর আনুগত্যের কথা বলা হয়েছে। সেবা-শুশ্রূষার ক্ষেত্রেও মায়ের অধিকার সবচেয়ে বেশি। এ প্রসঙ্গে মহানবী (সা.)-এর একটি বাণী উদ্ধৃত করছি। একজন সাহাবি মহানবী (সা.)-এর কাছে জানতে চাইলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! মানুষের মধ্যে আমার কাছে সর্বোত্তম সেবা লাভের অধিকার কার?’ নবী করিম (সা.) বললেন, ‘তোমার মায়ের।’ সাহাবি আবার জানতে চান, ‘তারপর কার?’ তিনি বললেন, ‘তোমার মায়ের।’ সাহাবি পুনরায় প্রশ্ন করেন, ‘তারপর কার?’ মহানবী বললেন, ‘তোমার মায়ের।’ চতুর্থবার সাহাবি জিজ্ঞাসা করেন, ‘তারপর কার?’ মহানবী (সা.) বললেন, ‘তোমার পিতার।’ (বুখারি ও মুসলিম)

শুধু ইসলাম নয়, অন্যান্য ধর্মেও কিন্তু মাকে মাথার ওপরেই স্থান দেওয়া হয়েছে। মা সবার ওপরে। সন্তান যদি অন্ধ, আঁতুড়, বোবাও হয়, তাহলে মায়ের কাছে সে পরম আদরের। তিনি অন্য সবল-সুস্থ সন্তানকে যেমন ভালোবাসেন, প্রতিবন্ধী সন্তানটিকেও তিনি ঠিক তেমনি ভালোবাসেন। তিনি তাঁর সন্তানকে মেরে ফেলতে পারেন—এটা বিশ্বাস করাও পাপ।

প্রশ্ন জাগে, অরণী ও আলভীর মা মাহফুজা কেন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন? কেন তিনি অস্থিরতা আর সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভুগেছেন? র‌্যাব হেফাজতে তিনি দুই সন্তানকে হত্যার যে বর্ণনা দিয়েছেন তাও অবিশ্বাস্য। নিজের একটি সন্তান হত্যা করার পর আরেকটি সন্তানকে হত্যার মতো মানসিক শক্তি তিনি কোথায় পেলেন? একজন পেশাদার খুনিরও তো বুক কাঁপার কথা! অথচ মা ঠাণ্ডা মাথায় দুই সন্তানকে খুন করলেন! তারপর সন্তানদের চায়নিজ খাওয়ার যে গল্প বানিয়েছেন, তাও কি কোনোভাবে বিশ্বাস করা যায়?

পত্রিকায় প্রতিবেদন থেকে জেনেছি, ইশরাত জাহান অরণী ভিকারুননিসা নূন স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ত। আর আলভী আমান পড়ত হলি ক্রিসেন্ট স্কুলে নার্সারিতে। স্কুলের শিক্ষকরা বলেছেন, ওরা দুজনেই মেধাবী ছিল। পরীক্ষায় ভালো ফল করেছে। তাদের পড়াশোনা নিয়ে মা মাহফুজার দুশ্চিন্তা করার কথা নয়। তা ছাড়া তিনি উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন এবং একসময় শিক্ষকতা পেশায় ছিলেন। সন্তানের পড়াশোনার কথা চিন্তা করেই হয়তো নিজের ক্যারিয়ারের চিন্তা বাদ দিয়েছিলেন। অথচ সেই মাকেই আজ আমরা ‘ঘাতক মা’ হিসেবে চিত্রায়িত করছি।

এ ঘটনায় র‌্যাবের অতি-উৎসাহ নিয়েও জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। র‌্যাব কেন তড়িঘড়ি করে মাহফুজা মালেককে আটক করে তাঁর কাছ থেকে স্বীকারোক্তি নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করল! এর নেপথ্যে কী আছে? নিশ্চয়ই কোনো রহস্য লুকিয়ে আছে বলে অনেকেই ধারণা করছে। সত্য একদিন বেরিয়ে আসবেই। আগুন যেমন চাপা দিয়ে রাখা যায় না, সত্যও কোনো দিন চাপা দিয়ে রাখা যায় না। আমরা সেদিনের অপেক্ষায় রয়েছি।    

আমার এক সহকর্মী জানালেন, কোনো কোনো সন্তান নাকি তার মায়ের দিকে সন্দেহ আর অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকায়। কেউ কেউ এমনও প্রশ্ন করে, মা, তোমার ওপর শতভাগ বিশ্বাস রাখতে পারি তো? তুমি আমাদের নিরাপদ আশ্রয় তো! বিব্রত মা কী জবাব দেবেন সন্তানের কাছে? তিনি শুধু মনে মনে ভাবেন, হায় রে আমাদের মিডিয়া! এরা তো দেখছি ভেতরে ভেতরে শিশু-মনের ওপর বড় ক্ষতের সৃষ্টি করছে!

প্রিয় অরণী ও আলভী, তোমরা যে নিষ্ঠুরতার শিকার হয়েছ, তার জন্য আমরা দুঃখিত, লজ্জিত ও ব্যথিত। পৃথিবীর নিষ্ঠুর মানুষগুলো তোমাদের বাঁচতে দেয়নি। তোমরা আমাদের ক্ষমা করে দিয়ো বাবা! তোমাদের জন্য আমরা লাখো মা-বাবা চোখের পানি ফেলছি। হাত তুলে দোয়া করছি। তোমরা যেখানে গেছ, সেখানে অনেক ভালো থাকবে। সেখানে কেউ তোমাদের প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করবে না। তোমাদের জন্য অনেক অনেক ভালোবাসা। শুভকামনা।

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

mostofakamalbd@yahoo.com

মন্তব্য