kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


দক্ষিণ চীন সমুদ্রে উত্তেজনা

এম আবদুল হাফিজ

৬ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



দক্ষিণ চীন সমুদ্রে উত্তেজনা

যখন মার্কিন নৌবহরের একটি পি-৮ বিমান দক্ষিণ চীন সমুদ্রের স্প্রাতলি দ্বীপপুঞ্জের কাছে সম্প্রতি নিরীক্ষণার্থে উড়াল দেয়, চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়া ওয়াই বিমানটিকে কমপক্ষে আটবার সতর্ক করে দেন এই বলে যে চীন তার সার্বভৌমত্ব রক্ষার্থে প্রস্তরবৎ দৃঢ়। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী অ্যাশটন কার্টার প্রত্যুত্তরে বলেছিলেন, ‘কোনো ভুলের অবকাশ যেন না থাকে, যুক্তরাষ্ট্র তার নৌবহর আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী না হলে বিশ্বের সর্বত্র পরিচালনার অধিকার রাখে।

’ এই বাক্য বিনিময়ের জের ধরে দক্ষিণ চীন সমুদ্রে একটি চীন-মার্কিন সংঘর্ষ আসন্ন হয়ে উঠতে লাগল।

১৯৯৪ সালে চীন দক্ষিণ চীন সমুদ্রে প্রবাল প্রাচীর নির্মাণ শুরু করে। যদিও ফিলিপাইন তা তাদের বলে দাবি করে। আসলেও তা চীনের উপকূলের চেয়ে ফিলিপাইন উপকূলের বেশি কাছাকাছি। যুক্তরাষ্ট্র এক ঘোষণায় জানায় যে দেশটি পাঁচটি রাষ্ট্রের সাড়ে সাত শর মতো এই চক্রাকার প্রবালদ্বীপের ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতায় নিজস্ব কোনো অবস্থান নেই, যদিও স্প্রাতলি দ্বীপপুঞ্জ বিশাল এলাকায় বিস্তৃত এবং তা দক্ষিণ চীন সমুদ্রের চার লাখ ২৫ হাজার বর্গকিলোমিটার জুড়ে মালিকানা বিতর্কিত। যুক্তরাষ্ট্র বরং চেয়েছিল যে ওই বিতর্কিত সমুদ্র যারা দাবি করছে তারাই শান্তিপূর্ণভাবে বিবাদের বিষয়গুলো মিটিয়ে ফেলুক।

যুক্তরাষ্ট্র আরো চায় দক্ষিণ চীন সমুদ্র জাতিসংঘের টঘঈখঙঝঝ বা ‘ল অব দ্য সি’র তত্ত্বাবধানে থাক। কেননা এই সামুদ্রিক অঞ্চলে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ আছে, যা মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহে ব্যবহূত হয়। ইউরোপ থেকে বিশ্বের এই অংশের জন্য আগত কনটেইনার সার্ভিসগুলোই এই সমুদ্রপথ ব্যবহার করে। এই অঞ্চলের আকাশপথে চলে সামরিক ও বেসামরিক বিমান।

চীন তার রাষ্ট্রীয় সমুদ্র এলাকার দাবি করতে গিয়ে তার ন্যাশনালিস্ট শাসনামল থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত এক মানচিত্রের ওপর নির্ভর করেছে। ঘরহ-ফধংযবফ ষরহব নামে পরিচিত এই মানচিত্র চীনকে মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় এক হাজার ৬০৯ কিলোমিটার দক্ষিণে বিস্তৃত দেখায়, যা চীনকে ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, ব্রুনেই এবং ফিলিপাইনের ৭০-৮০ কিলোমিটার সন্নিহিত প্রদর্শন করে। ফলে উল্লিখিত রাষ্ট্রগুলোর ঊীপষঁংরাব ঊপড়হড়সরপ তড়হব চীনের সঙ্গে প্রত্যেকে সমুদ্র আইনের (টঘঈখঙঝঝ) আওতায় সাংঘর্ষিক হয়। এসব দেশ টঘঈখঙঝঝ-এর আওতায় ৩২২ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকা দাবি করে।

কিন্তু যখন মিসচিয় রিফে ছড়িয়ে পড়ে চীনারা তাদের দাবীকৃত ঘরহ-ফধংযবফ ষরহব ব্যাখ্যা দিতে অসমর্থ হওয়ায় শেষমেশ শুধু চিহ্নিত এলাকা চীনের অধিকারভুক্ত বলে মেনে নেয়। ফলে সমুদ্র আইনের জাতিসংঘ ব্যাখ্যাই বলবৎ থাকে। এভাবেই যুক্তরাষ্ট্র ও চীন দুই দশক ধরে দক্ষিণ চীন সমুদ্রে সংঘাত এড়াতে সক্ষম হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাত এড়ানো সম্ভব হলেও চীন তার সামুদ্রিক (গধত্রঃরসব) প্রতিবেশীদের সঙ্গে মতান্তর এড়াতে পারেনি। এতদসত্ত্বেও যদিও চীন প্রতিবেশীদের সঙ্গে সুসম্পর্কে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিল, আসিয়ানের মাধ্যমে চীন এই সম্পর্ক বহাল রাখতে সব সময় তার অধিক শক্তিসম্পন্ন  সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করেছে। এই উঠতি শক্তি বিশেষ করে ২০১২ সালে একবার ভিয়েতনাম ও আরেকবার ফিলিপাইনের সঙ্গে তার সামরিক শক্তি ব্যবহার করেছে। ২০১৪ সালে চীন সমুদ্র থেকে জ্বালানি উত্তোলনের চেষ্টা করেছে, যা ভিয়েতনাম আইনত তাদের বলে দাবি করে। এর ফলে দুই দেশে চীনাবিরোধী দাঙ্গাও হয়েছিল।

এ অবস্থায়ও যুক্তরাষ্ট্র এসব বিভেদ ও সংঘাতে জড়াতে চায়নি। তবে চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রকে জড়াতে হয়েছে কিন্তু সেসব বৈশ্বিক ইস্যুর অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে। উত্তেজনা, মতানৈক্য বা পরস্পরবিরোধী দাবির মানে এই নয় যে তার নিষ্পত্তি হুমকি-ধমকির মধ্য দিয়েই আসতে হবে। নিঃসন্দেহে দক্ষিণ চীন সমুদ্রে স্প্রাতলি দ্বীপপুঞ্জকে ঘিরে চীনের সমস্যা দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় প্রতিবেশীদের সঙ্গে জটিল, বিশেষ করে যখন যুক্তরাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ ও তার প্রশান্ত মহাসাগরীয় মিত্রদের নির্ভরতা সুস্পষ্ট।

যুক্তরাষ্ট্র একটি ‘অপরিহার্য’ ও চীন একটি ‘উত্থানরত’ পরাশক্তি। সংকট যতই জটিল হোক, উভয়ের সামনে রয়েছে শক্তি ও  কূটনীতির  রাস্তা। এ সময় পর্যন্ত উভয়ে দায়িত্ববোধের পরিচয় দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যাতে দক্ষিণ চীন সমুদ্রে প্রতিযোগিতামূলক সার্বভৌমত্ব দাবি না করে বসে সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত অত্যন্ত সতর্ক। কেননা চীনের সঙ্গে তার আরো অনেক বেশি স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনার ও মতৈক্যে আসার অপেক্ষায় আছে।

তবে এই শান্তির আবহ ও স্থিতিশীলতা সাময়িক। দক্ষিণ চীন সাগরের কৌশলগত গুরুত্ব এবং এতে নিমজ্জিত সম্পদ যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উভয়কে প্রচণ্ড আকর্ষণ করে। একে আয়ত্তে নিতে তাই উভয় দেশই প্রথম সুযোগ গ্রহণের চেষ্টা করবে। জানা যায় যে চীন নাকি এরই মধ্যে এই অঞ্চলের দিকে তার ক্ষেপণাস্ত্র তাক করে রেখেছে। কয়েক বছর ধরেই যুক্তরাষ্ট্র বলতে কোনো কার্পণ্য করেনি যে এশিয়া-প্যাসিফিকই হবে পরাশক্তিটির সব কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু। সে ক্ষেত্রে এ অঞ্চলের স্থিতিশীলতা প্রলম্বিত করতে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ জাতিসংঘ প্রণীত সমুদ্র আইন ও সংগঠনটির সেই আইনের দক্ষ প্রয়োগ।

 

লেখক : সাবেক মহাপরিচালক, বিআইআইএসএস


মন্তব্য