চেতনাদীপ্ত মার্চে ঐক্য ও সংহতির শপথ-331513 | উপ-সম্পাদকীয় | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

শুক্রবার । ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১৫ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৭ জিলহজ ১৪৩৭


চেতনাদীপ্ত মার্চে ঐক্য ও সংহতির শপথ

ড. হারুন রশীদ

৩ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



চেতনাদীপ্ত মার্চে ঐক্য ও সংহতির শপথ

মার্চ বাঙালির জীবনে এক অনন্য মাস। এই মাসেই প্রতিরোধ সংগ্রামের ডাক এসেছিল পাকিস্তানি জান্তাদের বিরুদ্ধে। গোটা বাংলা জ্বলে উঠেছিল। স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে একাত্তরের মার্চ ছিল উত্তাল। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে দীর্ঘ আকাঙ্ক্ষিত মুক্তির ডাক এসেছিল এই মার্চেই, তাই বাঙালি নতুন করে শপথ নেয়। শাণিত করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে।

ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় মার্চের প্রতিটি দিনই অত্যন্ত ঘটনাবহুল ও তাত্পর্যময়। রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন সংগঠন মাসজুড়েই নানা কর্মসূচি পালন করে। গণমাধ্যমও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে অগ্নিঝরা মার্চের মহিমাকীর্তন করে। তত্কালীন রেসকোর্স ময়দানে ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ, ২৫ মার্চে পাকিস্তানি জান্তার ‘অপারেশন সার্চলাইট’ চালিয়ে নির্বিচারে বাঙালি নিধন, বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া, গ্রেপ্তার হওয়ার আগে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা, সর্বোপরি মুক্তিকামী জনতা একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের জন্য আনুষ্ঠানিক রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করে এই মার্চ থেকেই। 

১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর বাঙালি যে তার অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীনতা আন্দোলনের পথে এগোচ্ছিল তা নির্ধারিত হয়ে যায় এই মার্চেই। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তত্কালীন রেসকোর্স ময়দানে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে ঐতিহাসিক ভাষণ দেন তাতেই স্পষ্ট হয়ে যায় অনেক কিছু। যে ভাষণে বঙ্গবন্ধু তাঁর বজ্রনিনাদ কণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ এই ঘোষণার পর বাঙালির মধ্যে দেখা গেল এক নতুন উজ্জীবন। তাদের আর বুঝতে বাকি রইল না স্বাধীনতার লাল সূর্য ছিনিয়ে আনতে এবার একটা কিছু করতেই হবে। ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণেই বঙ্গবন্ধু ‘যার হাতে যা আছে’ তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকতে বললেন। ‘আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি’ বলে তিনি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার আহ্বান জানালেন। এই দুর্গ গড়ে তোলার অর্থ যে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশনা তা বুঝতে কারো বাকি রইল না। শত্রুর মোকাবিলা করার দৃপ্ত আহ্বানও ভেসে উঠল তাঁর বজ্রকণ্ঠে। ‘তোমরা ব্যারাকে থাকো’ বলে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রতিও তিনি উচ্চারণ করলেন সতর্কবাণী। প্রয়োজনে খাজনা-ট্যাক্স বন্ধ করে দেওয়ার কথাও বললেন তিনি। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে যে ম্যান্ডেট তিনি পেয়েছিলেন বস্তুত সেই ম্যান্ডেটই তাঁকে প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছিল। যে কারণে বাঙালি জাতিকে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম ভূখণ্ড উপহার দিতে তিনি সক্ষম হয়েছিলেন।

পাকিস্তানের শোষণ, নিপীড়ন-নির্যাতন আর বৈষম্যের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতি স্বাধীনতার জন্য উন্মুখ হয়ে ছিল দীর্ঘদিন থেকে। এ দেশের তরুণ-তরুণী, আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সবাই সেদিন এই একটি কণ্ঠের মন্ত্রমুগ্ধে আবিষ্ট হয়ে বাঙালির মুক্তিসংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য যার যার মতো করে প্রস্তুতি গ্রহণ করে। স্বাধীনতা ও মুক্তির ঐকতানে বাঙালি জাতি জাতি-ধর্ম-বর্ণ, আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা নির্বিশেষে এক হয়। এরই মধ্যে নানা কূটকৌশল চালাতে থাকে তত্কালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করা হয়। নির্বাচিত প্রতিনিধির হাতে ক্ষমতা হন্তান্তরে টালবাহানা করতে থাকে। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনার নামে চতুরতার সঙ্গে সময়ক্ষেপণ করতে থাকে তারা। এভাবেই ঘনিয়ে আসে ২৫ মার্চের কালরাত্রি।

পাকিস্তানি জান্তারা ভারী অস্ত্র, কামান নিয়ে অপারেশন সার্চলাইটের নামে এ দেশের ছাত্র, জনতাসহ নিরীহ বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে নির্মম হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠে। তারা রাজারবাগ পুলিশ লাইনসেও হামলা চালায়। সেই রাতেই বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। গ্রেপ্তার হওয়ার আগে ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। সেই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে গর্জে ওঠে গোটা জাতি। ‘যার হাতে যা আছে’ তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করার জন্য ঘর থেকে বেরিয়ে যায় এ দেশের মুক্তিপাগল মানুষ। শুরু হয় ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রাম।

দুই.

এ বছর স্বাধীনতার ৪৫ বছর পূর্ণ হচ্ছে। এবারের মার্চ এসেছে এমন একসময়, যখন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বাংলাদেশের শাসনক্ষমতায়। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তাঁর সরকার এর মধ্যেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করছে। চিহ্নিত চার যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দণ্ডও কার্যকর হয়েছে। অনেকেই এখন কারাগারে। তাদের বিচার চলছে, যারা এ দেশের লাখ লাখ মানুষকে হত্যায় সহায়তা করেছে, মা-বোনদের তুলে দিয়েছে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে। তাই এ দেশের আপামর জনতার দাবি যুদ্ধাপরাধের বিচার। কেননা রাজাকার, আলবদর, আলশামসদের বিচার সম্পন্ন হলেই আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম প্রকৃত অর্থে পূর্ণতা পাবে।

যুুদ্ধাপরাধের বিচারের মাধ্যমে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালে জামায়াতে ইসলামী ও তার সহযোগী ছাত্রসংগঠনের ভয়ংকর ধ্বংসাত্মক চেহারাটি সবার কাছে ক্রমেই সুস্পষ্ট হয়ে উঠছে। সে সময় জামায়াতের নেতাকর্মীরা এ দেশে পাকিস্তানি হানাদারদের সবচেয়ে বড় সহযোগী ছিল। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হত্যা, লুটপাট ও ধ্বংসযজ্ঞের সঙ্গে তারা গভীরভাবে জড়িত ছিল। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে নানা কারণে তাদের অপরাধের বিচার সম্পন্ন হয়নি। পরবর্তীকালে সামরিক শাসকরা জামায়াতের যুদ্ধাপরাধীদের রাজনীতিতে পুনর্বাসন করে। এ সময় থেকেই জামায়াত গোপনে জঙ্গি তত্পরতা ছড়িয়ে দিতে থাকে।

বিএনপি-জামায়াত জোটের শাসনামলে জামায়াতের জঙ্গি তত্পরতা বহু গুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল। মূলত বিএনপির আশ্রয়-প্রশ্রয়ে জামায়াতের জঙ্গি কর্মীরা সারা দেশে তাদের গোপন ঘাঁটি গড়ে তুলেছিল। জামায়াত যে এ দেশের প্রগতিশীল রাজনীতিকে ধ্বংসের জন্য গভীরভাবে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। সুতরাং সরকারকে অবশ্যই সারা দেশে জামায়াতের ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। নির্বাচন কমিশনে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল হয়েছে। কিন্তু সংগঠন হিসেবে এখনো নিষিদ্ধ নয় জামায়াত। যুদ্ধাপরাধের বিচারে আদালতের পর্যবেক্ষণে জামায়াতকে অপরাধী সংগঠন বলা হয়েছে। জামায়াত নিষিদ্ধের দাবিও দীর্ঘদিনের। কাজেই সময় এসেছে এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার। কারণ মুক্তিযুদ্ধের সরাসরি বিরোধিতাকারী শক্তিকে জিইয়ে রেখে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন অসম্ভব। 

মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসমৃদ্ধ মার্চে আত্মোপলব্ধি করতে হবে স্বাধীনতার মাধ্যমে কী অর্জন আমাদের। এটা ঠিক স্বাধীনতা লাভের ৪৫ বছরে প্রাপ্তি যেমন আছে, তেমনি আছে না পাওয়ার বেদনাও। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মিত হচ্ছে। আর্থিক সক্ষমতার দিক থেকে এটা অনেক বড় অর্জন। বেড়েছে মাথাপিছু আয়। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ  রেকর্ড পরিমাণ। উড়াল সেতুসহ অবকাঠামোগত অনেক উন্নয়ন এখন দৃশ্যমান। শিক্ষা, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য খাতেও হয়েছে প্রভূত উন্নতি। যুদ্ধাপরাধের বিচারে শীর্ষস্থানীয় চার রাজাকারের ফাঁসির দণ্ড কার্যকরও অনেক বড় প্রাপ্তি। তবে এখনো অনেক অপ্রাপ্তি রয়ে গেছে। দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে দেশের অনেক মানুষ। শিক্ষার আলো ঘরে ঘরে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। বিদ্যুৎ উত্পাদন বাড়লেও এখনো সারা দেশে বিদ্যুৎ পৌঁছানো যায়নি। বেকারত্ব, যানজট, পরিবেশদূষণ, নদী দখলের মতো সমস্যা রয়েই যাচ্ছে। ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য বাড়ছে। নগরায়ণের কারণে মানুষজন শহরমুখী। ফলে শহরে জনসংখ্যার চাপ বাড়ছে। কমে যাচ্ছে কৃষি জমি।

সর্বব্যাপী দুর্নীতি রোধ করা যাচ্ছে না। দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী কার্যকর হতে পারেনি। রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় উন্নতি ঘটেনি। পারস্পরিক সন্দেহ-অবিশ্বাসের কারণে নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা নিয়ে একমত হতে পারছে না রাজনৈতিক দলগুলো। রাজনীতি ঘুরপাক খাচ্ছে নির্বাচনব্যবস্থাকে কেন্দ্র করেই। এরই মধ্যে জঙ্গিবাদের বৈশ্বিক সমস্যা থেকে বাংলাদেশও মুক্ত নয়। সামাজিক অসহিষ্ণুতা, অবক্ষয়, কুসংস্কার দূর হচ্ছে না। লেখক, প্রকাশক, ব্লগার, শিশুহত্যার মতো ঘটনা ঘটেই চলেছে। সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী তাদের মরণ থাবা বসাচ্ছে। এই অবস্থায় একটি অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ, দুর্নীতি ও শোষণ-বঞ্চনাহীন দারিদ্র্যমুক্ত মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নিতে হবে চেতনাদীপ্ত মার্চে। সার্থক করতে হবে শহীদের আত্মদান।

অত্যাচার, নিপীড়ন আর নির্যাতনের বিরুদ্ধে স্মারক মাস হিসেবে মার্চ প্রতিবারই আমাদের নতুন করে পথ দেখায়। তাই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তি গণতন্ত্রে বিশ্বাসী সব দেশপ্রেমিক দলকে চেতনাদীপ্ত মার্চে নতুন করে শপথ নিতে হবে। সব অপশক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। তবে তা করতে হবে রাজনৈতিক সংহতি ও ঐক্য বজায় রেখেই।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট, টিভি-উপস্থাপক

harun_press@yahoo.com

মন্তব্য