kalerkantho

বুধবার । ৭ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


রাজনৈতিক সংস্কৃতির মান

ড. মীজানুর রহমান

২ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



রাজনৈতিক সংস্কৃতির মান

দেশের অর্থনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি যেভাবে এগিয়েছে, রাজনৈতিক সংস্কৃতি সেভাবে এগোয়নি। রাজনীতিতে পিছিয়ে থাকার মূল কারণ হলো সব ব্যাপারে পাল্টাপাল্টি অবস্থান।

প্রতিটি রাজনৈতিক দলের ইতিহাস ও পরম্পরা থাকে। রাজনৈতিক দলগুলোর ঐতিহাসিক তথ্য-উপাত্তের মধ্যে পাল্টাপাল্টি একটা কিছু দাঁড় করানোর প্রবণতা আমাদের রাজনীতিতে একটি নৈমিত্তিক বিষয় হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে।

যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমকে দেশে ফিরিয়ে আনা জিয়াউর রহমানের বড় ভুল ছিল। এমন মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপির এক নেতা বললেন, জিয়াউর রহমানের বড় ভুল হচ্ছে শেখ হাসিনাকে দেশে আসতে দেওয়া। আমাদের রাজনৈতিক পদগুলো এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, যেখানে রাজনৈতিক কাউন্টার দিতে যা ইচ্ছা তাই বলা হচ্ছে। এমন কথাও শুনেছি, ১৫ আগস্টের ঘটনা ওই দিন ঘটানো ভুল হয়েছে। কয়েক দিন পরে যখন শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা দেশে ফিরতেন, তখন ঘটালে এমন ঝামেলা হতো না। তবে অগ্রহণযোগ্য লোকদের এসব কথা বলে কোনো লাভ হয়—এটা বলা যাবে না, তিক্ততা বাড়ে। মানুষের কল্যাণ, দেশ ও জাতির মঙ্গল হয় এমন কথাবার্তা রাজনৈতিক নেতাদের বলা উচিত। আমাদের দেশে চাকরির সব স্তরে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু যাঁরা রাজনীতি করেন, জাতিকে যাঁরা নেতৃত্ব দেবেন, তাঁদের কোনো প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেই।

পাবলিক স্পিচ দেওয়ার জন্য উন্নত দেশ—যেমন আমেরিকা ও ইউরোপে আলাদা ইনস্টিটিউট আছে। রাজনৈতিক নেতাদের কী রকম বক্তব্য প্রদান করা উচিত, শব্দচয়ন কেমন হবে এবং কী ধরনের যোগাযোগ করলে তা অধিক কার্যকর হবে—এসব বিষয়ে আমাদের কোনো গবেষণা ও প্রশিক্ষণ নেই। আমরা অন্যান্য ক্ষেত্রে অনেক দূর এগিয়ে গেছি। ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্য আয়ের এবং ২০৪১ সালে গিয়ে উন্নত দেশ হবে। এর সঙ্গে যদি রাজনৈতিক সংস্কৃতির উন্নতি না হয়, তাহলে আমরা পিছিয়ে যাব। উন্নত হওয়ার জন্য সমাজের সব      শাখা-প্রশাখায় যেমন অগ্রগতি হওয়া দরকার, তেমনি রাজনীতিতে পরিবর্তন আনা অনস্বীকার্য।

রাজনীতিতে শব্দচয়ন নিয়ে এত শঙ্কিত হওয়ারও কিছু নেই। আমাদের সাহিত্য ও চিত্রকলার ভাষা দেখলে বোঝা যায়, ২০-৩০ বছর আগে যে শব্দ অশ্লীল মনে হতো, এখন তা আমাদের চলচ্চিত্র বা নাটকে ভালোভাবে ব্যবহূত হচ্ছে। এগুলো আমাদের বাস্তবতা এবং মেনেই নিতে হবে। আধুনিকতার নামে অনেক কিছু চলে আসবে, যা পরিহারযোগ্য; কিন্তু বেশি পরিহার করা যাবে না। অতি ভদ্রলোককেও মানুষ ভোট দেয় না—এ ক্ষেত্রে তাদের বক্তব্য হলো ভদ্রলোক    চোর-বাটপাড়দের সামলাবে কিভাবে। আমাদের রাজনীতিতে কিছু ঘটনার সঙ্গে ইতিহাসের সম্পর্ক রয়েছে। যেমন—আমরা বলি, মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা সমগ্র জাতি ঐক্যবদ্ধ ছিলাম। কিন্তু এ কথা ঠিক নয়। ওই সময় বহু স্বাধীনতাবিরোধী লোক ছিল। বর্তমানে এর সংখ্যা কমেনি, বরং বেড়েছে। কারণ তাদের বংশবিস্তার হয়েছে, প্রজন্ম তৈরি হয়েছে। ১৫ আগস্ট, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মতো ঘটনাবলি আমাদের রাজনীতিতে এক ধরনের তিক্ততা ও বিভাজন সৃষ্টি করছে। তবে এগুলো মীমাংসা করার সুযোগ রয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সময়ের পরিবর্তনে নানা ঘটনাই পুনঃসংশোধন হয়ে থাকে। আমাদের সংসদের ইতিহাসই বা কদিনের। পাঁচ-সাত শ বছরের পুরনো সংসদে হট্টগোল, মারামারি একটি চিরাচরিত ঘটনা। আমাদের দেশে রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য প্রদান এবং যোগাযোগের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনীতিতে এই সংশোধন খুব কম সময়ে হওয়া সম্ভব নয়। একাত্তরের স্বাধীনতাবিরোধী, পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের খুনি, ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা—এ সবই কিন্তু একই গোষ্ঠী। এগুলো মীমাংসা না হওয়া পর্যন্ত রাজনীতিতে পরিবর্তন সম্ভব নয়। যেভাবেই হোক মীমাংসা হতে হবে। এতে এক পক্ষকে জয়ী হতে হবে। তবেই কেবল রাজনীতিতে সুফল মিলবে।

 

লেখক : উপাচার্য

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য