kalerkantho


মুশতাক হোসেন

মিলনকে কেন হত্যা করা হলো?

স্মরণ

২৭ নভেম্বর, ২০১৫ ০০:০০



মিলনকে কেন হত্যা করা হলো?

১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্বর ডা. শামস উল আলম খান মিলনকে অজ্ঞাতপরিচয় বন্দুকধারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারসংলগ্ন রাস্তায় গুলি করে হত্যা করে। মিলনকে কেন হত্যা করা হলো?

মিলন কোনো এলোপাতাড়ি গোলাগুলির শিকার ছিলেন না। একটি মাত্র বুলেট মিলনের হƒৎপিণ্ড ভেদ করে যায়। মিলন রিকশার ওপর একাই বসে অপেক্ষা করছিলেন জালাল ভাইয়ের জন্য। বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) তৎকালীন মহাসচিব ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন আরেকটি রিকশায় আসছিলেন পিজি হাসপাতালের (বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়) ডাক্তারদের সভায় যোগ দিতে। অপর রিকশায় মিলনকে দেখে তিনি থামতে বলেছিলেন। তিনি নিজের রিকশা ছেড়ে দিয়ে মিলনের রিকশায় ওঠার আগে তাঁর রিকশার সহযাত্রী যুবলীগ নেতা নজরুলের সঙ্গে কথা বলছিলেন। এমন সময় গুলি মিলনের পিঠকে বিদ্ধ করলে মিলন বলে ওঠেন, ‘জালাল ভাই দেখেন তো, আমার পিঠে কী হয়েছে?’ জালাল ভাই এগিয়ে আসেন। মিলন জালাল ভাইয়ের হাতে ঢলে পড়েন।

এটা পরিষ্কার যে মিলনকে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু করেই হত্যা করা হয়েছে। ১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্বর সকালে মিলন যখন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ থেকে বেরিয়ে যান তখনই হত্যা স্কোয়াডের গোয়েন্দারা সে খবর পৌঁছে দেয় বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় অবস্থান নেওয়া হত্যা স্কোয়াডের কাছে। একমাত্র ওয়্যারলেস সেটের মাধ্যমেই সে খবর পৌঁছে দেওয়া সম্ভব ছিল। কারণ তখন বাংলাদেশে মোবাইল ফোন চালু হয়নি। আর যে ব্যক্তি মিলনকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়েছে সে নিয়মিত প্রশিক্ষণ নেওয়া রাইফেল শুটার। মিলনের বুকের নিচে স্টার্নাম থেকে বের করা সে বুলেট মিলন হত্যা মামলার আলামত হিসেবে পুলিশের কাছে সংরক্ষিত ছিল।

মিলন হত্যার একটা বিচার হয়েছে নিন্ম আদালতে। কিন্তু কোনো খুনি পাওয়া যায়নি। মামলার পুনঃ তদন্তের জন্য অ্যাডভোকেট শামসুল হক চৌধুরীর মাধ্যমে মিলনের মা আবেদন করেছিলেন। এ পর্যন্ত তার কোনো ফলাফল জানা যায়নি।

মিলনকে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু করে হত্যা কেন করা হলো?

এরশাদের অবৈধ সরকারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে আপসহীন হাতে গোনা যে কয়েকজন নেতা ছিলেন, মিলন ছিলেন তাঁদের একজন। সমগ্র চিকিৎসক সমাজ এরশাদের সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেয় গণবিরোধী স্বাস্থ্যনীতি চাপিয়ে দেওয়ার জন্য। আন্দোলনকে সংগঠিত করা, তাকে আপসহীন রাখা, গণতান্ত্রিক সব রাজনৈতিক দল, ছাত্রসংগঠন ও অন্যান্য পেশাজীবী সংগঠনকে চিকিৎসকদের আন্দোলনে সম্পৃক্ত করা-এগুলোতে মিলনের অবদান ছিল মৌলিক ও নির্ধারক। সেটা এরশাদ জান্তার অজানা ছিল না।

মিলন শুধু চিকিৎসকদের আন্দোলনের জন্যই এরশাদ জান্তার লক্ষ্যবস্তু ছিলেন না। মিলন এরশাদবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শুরু ১৯৮২ থেকেই নির্ধারক ভূমিকা পালন করেন। ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্র“য়ারি এরশাদের শিক্ষানীতি বাতিলের দাবিতে হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীর বিশাল শান্তিপূর্ণ মিছিলে পুলিশ-বিডিআরের পাইকারি গুলিবর্ষণে জয়নাল নামের একজন ছাত্র যখন লাশ হয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আসেন তখন তাঁর মরদেহ পুলিশ ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল। মিলনের নেতৃত্বে চিকিৎসক ও মেডিক্যালের ছাত্ররা পুলিশের সে চেষ্টা ব্যর্থ করে দেন। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের কর্মীরা জয়নালের মরদেহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় নিয়ে আসেন। একইভাবে ১৯৯০ সালের ১০ অক্টোবর পুলিশের গুলিতে নিহত আরো এক ছাত্র নাজিরুদ্দীন জেহাদের লাশ পুলিশি ছিনতাই থেকে বাঁচিয়ে মিলনের নেতৃত্বে চিকিৎসক ও মেডিক্যালের ছাত্ররা সংগ্রামী ছাত্রদের কাছে হস্তান্তর করেন। এই জেহাদের লাশকে সামনে রেখেই গড়ে ওঠে বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ঐক্যের কাঠামো সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য। পরদিন ১১ অক্টোবর পুলিশি হামলায় সদ্য গঠিত সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের নেতারা আহত হয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য এলে মিলনের নেতৃত্বে চিকিৎসক ও মেডিক্যালের ছাত্ররা সব ছাত্রনেতাকে মেডিক্যালের ছাত্রদের চিকিৎসার জন্য নির্ধারিত কেবিনে ভর্তি করেন। সে ছাত্র কেবিনই ছাত্র ঐক্যকে অটুট করতে ভূমিকা রাখে এবং পরবর্তী দিনগুলোর আন্দোলনের পরিকল্পনা রচনার কার্যালয় হিসেবে কাজ করে। সমাজের সর্বস্তরের গণতন্ত্রকামী মানুষ সেই ছাত্র কেবিনে এসে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে একাÍতা প্রকাশ করে। স্বৈরাচারী রাষ্ট্রযন্ত্রের পাহারাদাররা মিলনের এ ভূমিকা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে এবং মিলনকে নিবৃত্ত করার ষড়যন্ত্র আঁটতে থাকে।

মিলন শুধু এরশাদবিরোধী ছাত্র গণ-আন্দোলনেই ভূমিকা রাখেননি। এ দেশে একটি কৃত্য-পেশাভিত্তিক প্রশাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার আন্দোলনে মিলন দৃঢ় ভূমিকা রাখেন ইন-সার্ভিস ট্রেইনি চিকিৎসক পরিষদের আহŸায়ক হিসেবে ১৯৮৩ সাল থেকেই, প্রকৌশলী-কৃষিবিদ-চিকিৎসক (প্রকৃচি) সমন্বয় কমিটির সদস্য হিসেবে। এরপর ১৯৮৬ সাল থেকে বিএমএ কার্যকরী পরিষদের কর্মকর্তা হিসেবে মিলন আরো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। প্রকৃচির পক্ষ থেকে আমলা গোষ্ঠীর সঙ্গে এরশাদ স্বৈরাচারের আঁতাতের স্বরূপ প্রকাশ করা হয় এবং এরশাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে জি-১০ নামে খ্যাত আমলাদের চিহ্নিত করা হয়। বলাবাহুল্য, মিলন ছিলেন কথিত জি-১০ ভুক্ত শীর্ষ আমলাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার কণ্ঠ এবং তাঁদের গণবিরোধী ভূমিকা উšে§াচনে অগ্রণী। মিলনের এ ভূমিকা আন্দোলনকারী শক্তিগুলোর সামনে সামরিক-বেসামরিক আমলা গোষ্ঠীর আঁতাতকে তুলে ধরে এবং আন্দোলনকারীরা তাদের শত্রুকে আরো ভালোভাবে চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়। এ গোষ্ঠীর কাছেও মিলন ছিলেন প্রতিপক্ষ। এর প্রমাণ পাই আমরা এরশাদ-পরবর্তী শাসনামলেও। মিলনের স্মৃতিকে সম্মান জানানোর জন্য দেশের কোনো রাজপথ কিংবা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা মিলনের নামে নামাঙ্কিত করার প্রস্তাব যখনই এসেছে তখনই প্রশাসনে ঘাপটি মেরে থাকা ও পরবর্তী সময়ে নতুন শাসকদের দ্বারা পুনর্বাসিত এ মিলিত চক্র বিভিন্ন অজুহাতে তা হিমাগারে নিক্ষেপ করেছে। এমনটি ঘটেছে শহীদ কর্নেল আবু তাহেরের বেলায়ও।

তবে মিলনের প্রতি এ অবহেলা একক কোনো ঘটনা নয়। এরশাদ স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ৯ বছরব্যাপী সংগ্রামে যাঁরা শহীদ ও নির্যাতিত হয়েছেন, তাঁদের সবার ভাগ্যেই কমবেশি অবহেলা জুটেছে। কেননা ক্ষমতা থেকে ব্যক্তি এরশাদের বিদায় ঘটলেও স্বৈরাচারী ব্যবস্থা ও তাঁর সুবিধাভোগীদের গায়ে কোনো আঁচড় পড়েনি। প্রথমে কয়েক দিন ভোল পাল্টে জনতার রুদ্ররোষ থেকে আÍরক্ষা করলেও আন্দোলনে বিজয়ী গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর অনৈক্যের সুযোগে স্বনামেই স্বৈরাচারের রাজনৈতিক প্রতিভূ গোষ্ঠী আবার আবিভূত হয় এবং আজ এর ঘাড়ে, কাল ওর ঘাড়ে হাত রেখে তারা পুনর্বাসিত হয়েছে। পুনর্বাসিত স্বৈরাচার যেখানে দাপটে ঘুরে বেড়ায়, সেখানে মিলনরা তো অবহেলিত হবেই।

কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, গণবিরোধী শক্তি শেষ বিচারে পরাজিত হবেই। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর একই প্রক্রিয়ায় রাজাকার-আলবদর গোষ্ঠী পুনর্বাসিত হয়েছিল। কিন্তু আজ স্বাধীনতার ৪৪ বছর পরে হলেও ইতিহাস আবার স্বমহিমায় উদ্ভাসিত হয়েছে, রাজাকারদের বিচার তথা তাদের রাজনৈতিক-সামাজিক পুনর্বাসনপ্রক্রিয়া উল্টে যেতে শুরু করেছে। এ দেশের জনগণ নিশ্চয়ই আবার স্বৈরাচারের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ভিত্তি ধ্বংস করার সংগ্রামে জয়ী হবে।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সফল করতে যেমন দীর্ঘ সংগ্রাম জারি রাখতে হয়েছে, তেমনি স্বৈরাচারের রাজনীতি-অর্থনীতিকে নির্মূল করার জন্য সংগ্রামকে এক মুহূর্তের জন্য বিরতি দেওয়া যাবে না। সামরিক স্বৈরাচারের দ্বারা সংঘটিত মিলন হত্যাসহ সব হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন ও নিপীড়নের বিচার, অবৈধ ক্ষমতা দখলের দায়ে সামরিক শাসন জারির জন্য এরশাদ ও অন্যদের বিচার, সামরিক শাসনের সুবিধাভোগীদের অবৈধ সম্পদ বাতিল ও প্রাসঙ্গিক অন্যান্য দাবিতে সোচ্চার থাকতে হবে। পাশাপাশি স্বৈরাচারের পতনের আগে ঘোষিত পাঁচ, সাত ও আট দলের যৌথ ঘোষণা বাস্তবায়ন, সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের ১০ দফা বাস্তবায়ন, শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের পাঁচ দফা বাস্তবায়ন প্রভৃতি দাবিতে সব গণতান্ত্রিক শক্তির মধ্যে সমন্বয় ও ঐক্য বজায় রাখতে হবে। এ সংগ্রাম যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে যত দেরিতে হোক না কেন, স্বৈরাচারী রাজনীতি-অর্থনীতির পতন অনিবার্য। সেদিনই কেবল মিলনের জীবনদান সফল হবে।

লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাবেক সাধারণ সম্পাদক

mushtuq@gmail.com



মন্তব্য