kalerkantho


খেলার মাঠ রক্ষায় ভরসা শুধুই আদালত!

আশরাফ-উল-আলম   

১ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



খেলার মাঠে গড়ে উঠছে বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবন। দেশব্যাপী দখলের খেলা চলছে খেলার মাঠ ঘিরে। দখলদারদের থাবায় রাজধানীসহ সারা দেশে যেসব খেলার মাঠ আছে, তা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। মাঠ রক্ষায় বরাবরই আদেশ-নির্দেশ লাগছে উচ্চ আদালতের। এর পরও সরকারসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর দায়সারা আচরণে খেলার মাঠ হারাচ্ছে তার চরিত্র। খোলা মাঠে খেলার সুযোগ পাচ্ছে না শিশু-কিশোররা। এতে দেশ, জাতির দীর্ঘমেয়াদি চরম ক্ষতি হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার নুর-উল-মতিন জ্যোতি কালের কণ্ঠকে বলেন, শিশুর সুস্বাস্থ্যের জন্য খেলাধুলার বিকল্প নেই। এ জন্য খোলা মাঠের প্রয়োজন। সেই খেলার মাঠ নষ্ট করে ফেলছেন এক ধরনের প্রভাবশালীরা। এতে শিশুকে সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। কাজেই খেলার মাঠ রক্ষা করার দায়িত্ব সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের। কিন্তু তারা তা পারছে না। সর্বোচ্চ আদালতের হস্তক্ষেপ লাগছে, এটা লজ্জাজনক।

বাংলাদেশ আইন ও আন্তর্জাতিক বিষয় ইনস্টিটিউটের (বিলিয়া) গবেষণা কর্মকর্তা শাহ নেওয়াজ কালের কণ্ঠকে বলেন, শিশুর মানসিক বিকাশ ঘটানোর জন্য যেমন সুষম খাদ্যের প্রয়োজন, তেমনি শরীরচর্চারও প্রয়োজন। আর শরীরচর্চার জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ প্রয়োজন। এমনিতেই বাংলাদেশে পর্যাপ্ত খেলার মাঠ নেই। যেগুলো আছে তা-ও দখল হয়ে যাচ্ছে। খেলার মাঠ কমে যাচ্ছে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগের ব্যর্থতা দায়ী। খেলার মাঠের দিকে নজর না দিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ভয়াবহ শারীরিক বিপর্যয় নেমে আসবে। মেধাশূন্যতা দেখা দেবে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ২০১৪ সালের ১৪ মে দেশের সব খাল, খেলার মাঠ ও পার্ক রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে সরকারকে নির্দেশ দেন হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ। সরকারের পক্ষে স্থানীয় সরকার সচিব, পরিবেশসচিব, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব, অর্থসচিব এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালককে অবিলম্বে দেশের সব জেলা প্রশাসককে (ডিসি) এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিতে বলা হয়। বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি এ বি এম আলতাফ হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ জনস্বার্থে করা এক রিটের শুনানি নিয়ে এ আদেশ দেন। একই সঙ্গে আদেশ বাস্তবায়নের বিষয়ে ৩০ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অগ্রগতি প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেন। পরিবেশ ও মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের পক্ষে ২০১৩ সালের এপ্রিলে এ রিট করা হয়।

খেলার মাঠ রক্ষায় এ আদেশ দেওয়ার পরও বিভিন্ন সময়ে খেলার মাঠ দখল করে স্থাপনা নির্মাণ অব্যাহত থাকে। এরপর সেসব মাঠ রক্ষায় একের পর এক আদেশ দিতে হয় হাইকোর্টকে। রাজধানীর ধানমণ্ডি খেলার মাঠ থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম চন্দনাইশের স্কুল মাঠ রক্ষার্থে হস্তক্ষেপ করতে হয় হাইকোর্টকে।

সূত্র জানায়, রাজধানীর ধানমণ্ডি খেলার মাঠের অব্যবস্থাপনা, অবৈধ স্থাপনা ও যথেচ্ছ ব্যবহারের কারণে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) এবং আরেকটি পরিবেশবাদী সংগঠন ২০০৪ সালে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করেন। ওই বছরের ২৪ এপ্রিল ঢাকা সিটি করপোরেশনের প্রতি হাইকোর্ট রুল জারি করেন। একই সঙ্গে হাইকোর্ট দেশের সব মহানগরী, বিভাগীয় শহর, জেলা শহর ও পৌর এলাকার সব খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান, উদ্যান রক্ষার জন্য প্রাকৃতিক জলাধার আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।

গত বছর এপ্রিলে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার আলীগঞ্জ খেলার মাঠ দখল নিয়ে চরম উত্তেজনা দেখা দেয়। সেখানে ১১.৬৫ একর জমি ছিল খেলার মাঠ। সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য আটটি ১৫ তলা ভবন নির্মাণের জন্য গণপূর্ত বিভাগ এ মাঠে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়ায় উত্তেজনা দেখা দেয়। অথচ মাঠটি যাতে উন্মুক্ত রাখা হয় সে জন্য আগেই রিট আবেদন করা ছিল হাইকোর্টে। কিন্তু একনেক সেখানে সরকারি কর্মকর্তাদের ফ্ল্যাট নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়। এ সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে আলীগঞ্জ ক্লাব ও আলীগঞ্জ হাই স্কুলের সভাপতি বিশিষ্ট ক্রীড়ানুরাগী কাওসার আহমেদ পলাশ হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথের বেঞ্চ শুনানি শেষে আলীগঞ্জ খেলার মাঠে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য আবাসিক ভবন নির্মাণে একনেকের সিদ্ধান্ত কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না সে মর্মে রুল জারি করেন। কিন্তু রুলের জবাব না দিয়ে সেখানে ভবন নির্মাণের তৎপরতা চালাতে থাকে সংশ্লিষ্ট বিভাগ। একই বছরের ২৯ আগস্ট বিষয়টি হাইকোর্টের নজরে আনা হলে খেলার মাঠ রক্ষা করে ভবন নির্মাণ সম্ভব কি না, তা জানাতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নির্দেশ দেন আদালত। এর পরও ভবন নির্মাণের তৎপরতা অব্যাহত আছে।

এদিকে গত বছরের ১৭ জানুয়ারি চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার বরকল এস জেড উচ্চ বিদ্যালয়ের খেলার মাঠের একাংশে মার্কেট নির্মাণ কাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেন হাইকোর্ট। মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম চৌধুরী রিট আবেদন করলে আদালত শুনানি শেষে এ নিষেধাজ্ঞা দেন। পাশাপাশি নির্মাণাধীন স্থাপনা ভেঙে ফেলারও নির্দেশ দেন। জানা গেছে, শিক্ষার্থী ছাড়াও এলাকার লোকজন মাঠটিতে খেলাধুলা করে। আর এ মাঠে একাত্তরে মুক্তিযোদ্ধারা প্রশিক্ষণ নিতেন। এ কারণে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত মাঠটি রক্ষায় স্থানীয় লোকজন চেষ্টা করছে।

রাজধানীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) খেলার মাঠ থাকলেও সেখানে খেলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত শিক্ষার্থীরা। খেলার মাঠে নির্মাণসামগ্রী রাখায় খেলার পরিবেশ নষ্ট হলে ২০১২ সালে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ একটি রিট আবেদন করে। সে বছরের ২৬ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে নির্মাণসামগ্রী সরানোর নির্দেশ দেন।

কার্যত খেলার মাঠ রক্ষায় সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও প্রতিষ্ঠানগুলোর সদিচ্ছা না থাকায় হাইকোর্টের নির্দেশনা যথাযথভাবে পালিত হচ্ছে না। এমতাবস্থায় ক্রমেই বাড়ছে মাঠ দখলের প্রতিযোগিতা।

 

 

 


মন্তব্য