kalerkantho


বাংলা একাডেমির অভিধান

   

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৪ ০০:০০



প্রতিষ্ঠার পর মাত্র তিন বছরের মধ্যেই বাংলা একাডেমি 'পূর্ব পাকিস্তানি বাংলার আদর্শ অভিধান' নামে একটি প্রকল্প গ্রহণ করে। ১৯৫৮ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পে প্রস্তাব করা হয় যে এর প্রথম খণ্ডের নাম হবে 'আঞ্চলিক ভাষার অভিধান' এবং দ্বিতীয় খণ্ডের নাম হবে 'ব্যবহারিক বাংলা অভিধান।'

'আঞ্চলিক ভাষার অভিধান' প্রকাশিত হয় ১৯৬৫ সালে তিন খণ্ডে। সম্পাদক ছিলেন মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। বাংলাদেশের অভিধান চর্চার প্রথম নিদর্শন হিসেবে আঞ্চলিক ভাষার অভিধানটির গুরুত্ব অপরিসীম। অভিধানটি সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পেছনে মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে পর্যাপ্ত সহায়তা করেছিলেন সৈয়দ আলী আহসান, মুহম্মদ এনামুল হক, মুহম্মদ আবদুল হাই, মুনীর চৌধুরী ও কাজী দীন মুহম্মদ। অভিধানটির দ্বিতীয় সংস্করণ মুদ্রিত হয় ১৯৭৩ সালে দুই খণ্ডে এবং তৃতীয় সংস্করণ মুদ্রিত হয় অখণ্ডরূপে ১৯৯৩ সালে। দ্বিতীয় সংস্করণ বা তৃতীয় সংস্করণ বলা হলেও এগুলো আসলে প্রথম সংস্করণের পুনর্মুদ্রণ মাত্র।

ব্যবহারিক বাংলা অভিধানটির সংকলন ও সম্পাদনার প্রাথমিক কাজও শুরু হয় মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে। ১৯৬১ সালে তিনি 'পূর্ব পাকিস্তানি বাংলার আদর্শ অভিধানদ্বিতীয় খণ্ডের সংকলন ও সম্পাদনা পদ্ধতি' প্রণয়ন করেন। সেই পদ্ধতি অনুযায়ী অভিধানের শব্দসংগ্রহের কাজ অগ্রসর হতে থাকে। এ পর্যায়ে তাঁকে সহায়তা করেছিলেন আহমদ শরীফ, অজিত কুমার গুহ, মুনীর চৌধুরী প্রমুখ। তবে অভিধানের জন্য প্রয়োজনীয় ভুক্তি সংকলিত হওয়ার পূর্বেই মুহম্মদ শহীদুল্লাহ শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। ফলে অভিধানটির চূড়ান্ত সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করা তাঁর পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে। প্রথমে এটির সম্পাদনার দায়িত্ব পান কাজী দীন মুহম্মদ। পরে মুহম্মদ এনামুল হকের সম্পাদনায় অভিধানটির স্বরবর্ণ খণ্ড প্রকাশ পায় ১৯৭৪ সালে।

অভিধানটির ব্যঞ্জনবর্ণ অংশ প্রকাশ পায় ১৯৮৪ সালে শিবপ্রসন্ন লাহিড়ীর সম্পাদনায়। ১৯৯২ সালে অভিধানটির একটি অখণ্ড সংস্করণ প্রকাশ পায়, সেটিকে দ্বিতীয় সংস্করণ বলা হলেও অভিধানের প্রারম্ভিক অংশ ছাড়া তাতে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। ব্যবহারিক বাংলা অভিধানের পরিমার্জিত সংস্করণ প্রকাশ পায় ২০০০ সালে। তখন অভিধানটিতে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। এই সংস্করণের সম্পাদক এবং সহযোগী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন যথাক্রমে শিবপ্রসন্ন লাহিড়ী এবং বর্তমান লেখক। সংস্করণটিতে স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জনবর্ণের মধ্যে সমতা আসে। উচ্চারণ যুক্ত হয়। ব্যুৎপত্তি, প্রয়োগবাক্য, সংজ্ঞা, বানান, ভাষারীতি প্রভৃতি দিক দিয়ে অভিধানটি হালতক হয়ে ওঠে।

অভিধান প্রণয়নের ব্যাপারে বাংলা একাডেমির দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গৃহীত হয় ১৯৮৩ সালে মহাপরিচালক মনজুরে মওলার উদ্যোগে এবং শামসুজ্জামান খান ও বশীর আলহেলালের নেতৃত্বে। এই উদ্যোগের ফলে কয়েক মাসের পরিশ্রমে 'ছোটদের অভিধান' নামে একটি কিশোর অভিধান প্রকাশিত হয়। সংকলক ও সম্পাদক হিসেবে এই অভিধানে বশীর আলহেলাল, শামসুজ্জামান খান, মুহম্মদ আবদুর রাজ্জাক, আজহার ইসলাম, সুব্রত বড়ুয়া, নূরুল হুদা, সেলিনা হোসেন, রশীদ হায়দার, আলমগীর জলীল, মুহম্মদ নূরুল হুদা, তপন চক্রবর্তী, ফরহাদ খান, ওবায়দুল ইসলাম, ফজলুর রহিম ও কল্যাণী ঘোষের নাম ছাপা হয়।

১৯৮৫ সালে উদ্যোগ নেওয়া হয় 'বাংলা একাডেমি সংক্ষিপ্ত বাংলা অভিধান'-এর। ঠিক করা হয়, ব্যবহারিক বাংলা অভিধানের ওপর ভিত্তি করে অভিধানটি প্রণীত হবে। সম্পাদনার দায়িত্ব পান আহমদ শরীফ। অভিধানটির পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৯৯৬ সালে। প্রথম সংস্করণ ও দ্বিতীয় সংস্করণে সম্পাদককে সহযোগিতা করেন বাংলা একাডেমির কর্মকর্তা শামসুজ্জামান খান, আজহার ইসলাম, আশফাক-উল-আলম, ওবায়দুল ইসলাম, আবদুল হান্নান ঠাকুর ও আ ব ম শামসুদ্দীন। বর্তমান লেখক পরিমার্জিত সংস্করণে সহযোগী ছিলেন। পরিমার্জিত সংস্করণে সহযোগী সম্পাদক হিসেবে সবার নাম ছাপা হয়।

বাংলা একাডেমির ইংরেজি-বাংলা অভিধানটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা। ১৯৮৫ সালে এ ধরনের একটি অভিধান প্রণয়নের ব্যাপারে প্রাথমিক উদ্যোগ গ্রহণ করেন তৎকালীন মহাপরিচালক মনজুরে মওলা। ১৯৮৭ সালে জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীকে এর সম্পাদক নিযুক্ত করা হয়। ১৯৮৮ সালে মহাপরিচালক আবু হেনা মোস্তফা কামাল পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করলেও সত্যিকার অর্থে এটি শেষ হয় মহাপরিচালক মোহাম্মদ হারুন-উর-রশিদের সময়, ১৯৯৩ সালে। সে সময় শামসুজ্জামান খান ও সেলিনা হোসেনের যোগ্য তত্ত্বাবধানে অভিধানটি আলোর মুখ দেখে। অভিধানটির সংকলক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন জাহাঙ্গীর তারেক, কাশীনাথ রায়, খোন্দকার আশরাফ হোসেন, রাজীব হুমায়ুন, এ এম এম হামিদুর রহমান, শফি আহমদ, নূরুল হুদা, মুহম্মদ নূরুল হুদা ও আফজাল হোসেন। প্রকাশের সময় অভিধানটির নাম ছিল 'বাংলা একাডেমি ইংলিশ-বেঙ্গলি ডিকশনারি'। ২০০২ সালে এর পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ পায়। তখন অভিধানটির নাম হয় 'বাংলা একাডেমি ইংলিশ-বাংলা অভিধান'।

ইংরেজি-বাংলা অভিধান সংকলনের কাজ যখন প্রায় শেষ পর্যায়ে, ১৯৯১ সালের সূচনায় তেমন এক সময়ে 'বাংলা একাডেমি বাংলা-ইংলিশ অভিধান' প্রণয়নের প্রস্তাব করা হয়। ১৯৯৪ সালের মাঝামাঝি অভিধানটির মুদ্রণের কাজ শেষ হয়।

'বাংলা একাডেমি সহজ বাংলা অভিধান' নামের একটি কিশোর অভিধান প্রণয়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় ১৯৯৪ সালে। ১৯৯৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে এটি প্রকাশ পায়। বাংলা একাডেমি প্রকাশিত অন্যান্য অভিধান থেকে ভুক্তি সংকলন করে অভিধানটি প্রণয়ন করা হয়। এটি বাংলা একাডেমির কর্মকর্তাদের যৌথ প্রচেষ্টার ফল। এর সম্পাদক ছিলেন মহাপরিচালক মোহাম্মদ হারুন-উর-রশিদ।

ওপরে আলোচিত অভিধানগুলো বাংলা একাডেমির উদ্যোগে প্রণীত। এ ছাড়া বাংলা একাডেমি থেকে আরো অনেক অভিধান প্রকাশিত হয়েছে, যেগুলো মূলত ব্যক্তি উদ্যোগে প্রণীত, বাংলা একাডেমি সেখানে প্রকাশক।

ব্যক্তি উদ্যোগে প্রণীত এবং বাংলা একাডেমি প্রকাশিত অভিধানের মধ্যে শেখ গোলাম মকসুদ হেলালী সংকলিত 'পারসো-অ্যারাবিক এলিমেন্টস ইন বেঙ্গলি' গুরুত্বপূর্ণ। এটি ১৯৬৭ সালে প্রকাশ পায়। অভিধানটি সম্পাদনা করেছিলেন মুহম্মদ এনামুল হক।

বাংলা একাডেমির আরবি-বাংলা অভিধানের নামও প্রসঙ্গত স্মরণীয়। অভিধানটির সংকলক মুহম্মদ আলাউদ্দীন আল-আয্হারী। চার খণ্ডের এই অভিধান বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হতে শুরু করে ১৯৭০ সাল থেকে। এ বছর প্রকাশিত হয় এই অভিধানের প্রথম খণ্ড। দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশিত হয় ১৯৭২ সালে। তৃতীয় খণ্ড প্রকাশিত হয় ১৯৭৫ সালে এবং চতুর্থ খণ্ড প্রকাশিত হয় ১৯৮২ সালে। ১৯৯৩ সালে এই চার খণ্ডের সঙ্গে সর্বশেষ একটি খণ্ড যোগ করে সম্পূর্ণ অভিধানটিকে আবার বিন্যস্ত করা হয় এবং সম্ভাব্য পাঁচটি খণ্ডকে মোট তিন খণ্ডে প্রকাশ করা হয়।

চার খণ্ডে প্রকাশিত বাংলা একাডেমির বাংলা-উর্দু অভিধানও বাংলা একাডেমির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা। এর সম্পাদক ছিলেন এ এম ফয়েজ আহ্মদ চৌধুরী।

মুহম্মদ হাবিবুর রহমানের প্রতিশব্দের অভিধান 'যথাশব্দ' ১৯৭৪ সালে বাংলা একাডেমি প্রকাশ করে।

১৯৭৭ সালে নূর মোহাম্মদ সংকলিত 'স্টুডেন্টস ইংলিশ-বেঙ্গলি ডিকশনারি' প্রকাশ পায়। অভিধানটির সম্পাদক ছিলেন জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী।

১৯৮৯ সালে প্রকাশিত নরেন বিশ্বাসের 'উচ্চারণ অভিধানও' বাংলা একাডেমির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা।

আবু ইসহাকের 'সমকালীন বাংলা ভাষার অভিধান'-এর স্বরবর্ণ অংশ প্রকাশিত হয় ১৯৯৩ সালে। ১৯৯৮ সালে এর দ্বিতীয় খণ্ডে ক থেকে ঞ পর্যন্ত আদ্যবর্ণবিশিষ্ট শব্দ সংকলিত হয়। জামিল চৌধুরীর 'বানান-অভিধান' প্রকাশিত হয় ১৯৯৪ সালে। শীলরত্ন ভিক্ষু সংকলিত 'পালি-বাংলা অভিধান'টি প্রকাশিত হয় ২০০২ সালে। এটি বুদ্ধদত্ত মহাথেরো সংকলিত কনসাইজ পালি-ইংলিশ ডিকশনারির একটি বাংলা অনুবাদ।

মোহাম্মদ আবদুল কাইউম সম্পাদিত দুই খণ্ডের মধ্যযুগের বাংলা ভাষার অভিধানও (২০০৮) বাংলা একাডেমির গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রকাশনা।

জীবদ্দশায় দেখে যেতে না পারলেও মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তাঁর একাধিক লেখায় ও বক্তৃতায় আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছিলেন, বাংলা ভাষার একটি বিবর্তনমূলক অভিধান প্রণীত হোক। সম্প্রতি (২০১৪) বাংলা একাডেমি মুহম্মদ শহীদুল্লাহর এই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়েছে। প্রকাশ করেছে প্রায় ৩২০০ পৃষ্ঠা সংবলিত তিন খণ্ডের একটি অভিধান; এ পর্যন্ত প্রকাশিত বৃহত্তম বাংলা অভিধান। নাম রাখা হয়েছে 'বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধান'। এর সম্পাদক গোলাম মুরশিদ এবং সহযোগী সম্পাদক বর্তমান লেখক।



মন্তব্য