kalerkantho


উড়ুক্কু, নাসরীন জাহান এবং কিছু কথা

কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর   

২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪ ০০:০০



উড়ুক্কু, নাসরীন জাহান এবং কিছু কথা

ছবি : কাকলী প্রধান

নাসরীন জাহান আমাদের কথনশিল্পের উল্লেখযোগ্য কথাশিল্পী। আমরা তাঁকে নানাভাবে দেখতে, বুঝতে ও জানতে পারি। তাঁর লেখা আমরা পড়ছি সেই আশির দশক থেকেই। তিনি গল্পের মানুষ, উপন্যাসের মানুষ, এমনকি নাটক আর লিটলম্যাগেরও মানুষ। তাঁকে লেখালেখি দিয়ে এমনিতর নানাভাবে দেখা যায়। সেটা শুধু দেখাদেখির ভেতর রাখার কোনো সুযোগ নেই। কারণ তাঁকে দিয়ে আমরা একটা সময়কে চিহ্নিত করতে বাধ্য হব। কোন সে সময়? সে সময়টা আমাদের মুক্তচৈতন্য চিহ্নিত করার সময়, একে বিকশিত করার সময়। এ জন্য যত ধরনের অপশক্তি আছে, তাকে নাশ করারও সময়। স্বৈর শাসনকে মোকাবিলা করার সময়। তিনি সেই সময় লিটলম্যাগের সঙ্গে যুক্ত হন। সময়টাই যেন ছিল দ্রোহের, প্রতিবাদের, প্রতিষ্ঠানকে মোকাবিলা করার। সাহিত্যের আড্ডায় তিনি মেতে থাকেন। পারভেজ হোসেন, সেলিম মোরশেদ, শহীদুল আলম বা আরো অনেকের সঙ্গে সাহিত্য নিয়ে তপ্ত-উত্তপ্ত থাকেন তিনি। তাঁর মতো করে কথাসাহিত্য নিয়ে মেতে থাকতে কোনো রমণীকে দেখিনি। আমি জানি এখানে, এভাবে রমণী শব্দের প্রয়োগে কেউ কেউ বিচলিত হবেন, আমার ওপর হয়তো নাখোশও হবেন। কিন্তু আমাকে তা করতে হচ্ছে। আমি নিজেও হয়তো কিছুটা হতচকিত হচ্ছি। নিজেকে আবারও পরখ করে নিচ্ছি। তাঁকে আমরা অনেকেই 'উড়ুক্কুর' লেখক হিসেবে জানি, এভাবে আমরা তাঁকে আলাদাও করে থাকি। অথবা তাঁকে আমরা স্মরণ করি। কিন্তু এই স্মরণ রাখার ভেতর তাঁকে কিন্তু আমরা ভুলেও যাই। কারণ তিনি তো 'চন্দ্রলেখার জাদুবিস্তার' বা 'এলেন পোর বিড়াল' নামে গল্পের সিরিজই লেখেননি, নাটক লিখেছেন, টিভি নাট্যরূপ দিয়েছেন, লিটলম্যাগ আন্দোলনে ছিলেন, সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

তাঁর সঙ্গে পাঠকের সম্পর্কটি গবেষণার দাবি রাখে। এ এক জটিল সমীকরণও বটে। প্রথম উপন্যাসে তিনি পেলেন ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার। এরই যোগসাজশে তাঁর পাঠকের হৃদয়েও জায়গা পাওয়ার তুমুল সম্ভাবনা দেখা দিল। তার মানে কি তিনি পাঠকের মনে এখন আর নেই? তাও ঠিক নয়। তবে পাঠক সৃষ্টির কোনো কৌশলে তিনি যাননি। পাঠককে তিনি পোষ মানাননি। এমনকি পাঠকের মায়ায়ও তিনি পড়েননি। এ হয়তো এক ধরনের সৃষ্টিশীল জান্তবতা! তবু তিনি তা করেছেন।

গল্পকার, ঔপন্যাসিক, সাহিত্যকাতর সত্তা- আমরা এই তিন সত্তার ভেতর নাসরীন জাহানকে কোন সত্তায় অধিক মোহনীয়রূপে গ্রহণ করব? এ এক বিষয় বটে। তাঁর উপন্যাস যখন পাঠ করব, তখন মনে হবে এর ভাঁজে ভাঁজে, এমনকি বাক্যে, চরিত্রের বিন্যাসে অনেক অনেক গল্প আমরা পেরিয়ে যাচ্ছি। গল্পের সাঙ্কেতিকতা তাঁর একটা অতি প্রিয় বিষয়। আবার আমরা তাঁর গল্প পাঠ করলে মনে হতে পারে, এখানে উপন্যাসের বীজ একেবারে চকচক করছে। আবার সব কিছু মিলিয়ে যদি দেখি, তাহলে তাঁকে একজন সাহিত্যকাতরসত্তা বলেই মনে হবে। গল্পকার আর ঔপন্যাসিক যেন তাঁর অনুষঙ্গ। যা-ই হোক, এভাবে, নানাভাবে তাঁকে দেখার সুযোগ থেকেই যায়।

আমরা তাঁর কথনশিল্পকে আলাদা করে মনে কেন রাখব? তিনি কি আলাদা কোনো প্রতিষ্ঠান যে তাঁকে স্মরণ করতেই হবে! তাহলে এ প্রশ্ন আসে- ব্যক্তিপ্রতিষ্ঠান বলে কিছু আছে কি না। ব্যক্তি কি আকাশ থেকে ঝরে পড়া কোনো অস্তিত্বের নাম? আমরা তাঁকে এভাবে আলাদা করতে চাই না। তবে এটা ঠিক, তাঁর ভাষা আলাদা, বর্ণনাভঙ্গি আলাদা, ঘটনার বিস্তার আলাদা। সেই আলাদাটা তাহলে কী ধরনের? আমরা কি তার থেকে কোনো উপকার পাই? শিল্পের আলাদা কোনো জায়গা-জমিন তৈরি করতে পারি? হ্যাঁ, তা পারি তো। তিনি ঘটনার বর্ণনা করেন চরম কাব্যিকতা প্রয়োগ করে, ভাষার ভেতরে কথিত মেদময়তা তাঁর থাকে না। তিনি যেন চরিত্রকে দেখছেন, তাদের সঙ্গে আছেন, তাদের শাসন করছেন না; কিন্তু তাদের ব্যাপক মায়ায় রাখছেন, দেখে দেখে, নিজে থেকে তাদের কথা বলাচ্ছেন। তারা যেভাবে কথা বলে, কথাকে কাহিনীর ভেতর বাড়তে দেয়, তাতে পাঠকের মননে বারবার চরম যোগাযোগ দাবি করে। পাঠক তাঁর পাঠ থেকে নজর ফিরিয়েছেন তো কথনের মাদকতা থেকেই নিজেকে বঞ্চিত করছেন। তাহলে তাঁর পাঠ মানে ভিন্ন কিছু? তিনি স্বাধীনতা চান। মানুষের স্বাধীনতা, যৌনতার মুক্তিও তাঁর প্রিয় বিষয়। একটা চরিত্র তাঁর মতো করেই জীবনকে দেখে, ভালোবাসার বিকাশ ঘটায়। এ জন্য তিনি কোনো মতবাদের কাছে নিজেকে বন্ধক দেন বলে মনে হয় না। বরং পাঠকই তাঁর সৃষ্টিশীলতার সাহায্যে একটা স্তরে পৌঁছান।

তাঁর উল্লেখযোগ্য গল্পগ্রন্থ হচ্ছে- 'স্থবির যৌবন', 'বিচূর্ণ ছায়া', 'পথ, হে পথ', 'সারারাত বিড়ালের শব্দ'। তার সৃজিত কিশোর উপন্যাস 'পাগলাটে এবং গাছ বুড়ো', 'আশ্চর্য দেবশিশু'। তাঁর উপন্যাস 'উড়ুক্কু', 'চন্দ্রের প্রথম কলা', 'মন-ময়ূরী', 'শঙ্খ-নর্তকী', 'চন্দ্রকলার জাদুবিস্তার' ইত্যাদি। তিনি সম্পাদনার যে আলাদা একটা আবহ রাখতে পেরেছেন, তার বড় প্রমাণ বাংলা একাডেমি থেকে বের হওয়া আশির দশকের গল্প। তিনি শুধু কিছু গল্পকারের গল্পই সংগ্রহ করেননি- এর ভেতর দিয়ে একটা মেজাজে, সেই সময়ের আবহকে স্পর্শ করতে পেরেছেন। তিনি তাতে যুক্ত করেছেন চমৎকার এক সম্পাদকীয়।

এখনো তিনি লিখছেন। তাঁর লেখার একটা স্টাইল আর পরিমিতিবোধ আছে; বছরে সাধারণত একটা উপন্যাস লিখে থাকেন, কিছু গল্প লেখেন। তবে তিনি যে সাহিত্যমুখর মানুষ, তা তাঁর কথনে, মেজাজে, আবহে বোঝা যায়। তাঁর এ সাহিত্যমুখরতা একটা চলমান ক্রিয়া হোক। এই জগতে তাঁর বিচরণ আরো পাঠকবহুল হোক- এটাই আমাদের বড় কামনা। একজন কথাশিল্পী তখনই সজীব, জ্যান্ত, প্রাণময় থাকেন, যখন তাঁকে নিয়ে নিরন্তর কথা হয়। তিনি এমনই এক কথাসাহিত্যিক, যাঁকে আমাদের আলোচনার এক প্রয়োজনীয় নাম হিসেবে নিতে পারি। সাহিত্যই তাঁকে ভিন্ন এক জীবন দিয়েছে। তিনিও এখানে চিহ্নময় সত্তা বলে নিজেকে প্রমাণ করতে পেরেছেন। সেভাবেই আমরা তাঁকে স্মরণ করতে চাই।

 

 

 



মন্তব্য