kalerkantho

অলংকার চক্কর

গলার হার

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



গলার হার

চেইন, চোকার ইত্যাদি আরো নাম আছে গলার হারের। এর ইতিহাসও সুদীর্ঘ। সময় সময় এর রূপ বদল হয়েছে। নারী ও পুরুষ উভয়ের কাছেই আদর পায়। আহনাফ সালেহীন খোঁজ নিয়েছেন

গলার হার, সোজা কথায় গলার মালা। এটি মানুষের একেবারে গোড়ার দিকের অলংকার। এর শুধু প্রকারভেদ নয়, রকমভেদও আছে। বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য এক রকম, ধর্মীয় অনুষ্ঠানের জন্য আরেক রকম। শোকসভায় পরে যাওয়ার জন্যও আছে আলাদা গলার হার। এতে লকেট, কবচ, ক্রুশ ঝোলানো হয়। হীরা, মুক্তা, চুনি, পান্না ইত্যাদি মূল্যবান রত্নও এর সঙ্গী। প্রাগৈতিহাসিক যুগে পাখির পালক, পশুর হাড়, ঝিনুক, গাছের পাতা ইত্যাদি দিয়ে গলার হার তৈরি করা হতো। হারে ধাতুর ব্যবহার শুরু হয় ব্রোঞ্জ যুগে। পাথরের ব্যবহার দেখা যায় ব্যাবিলনীয় সভ্যতায়। সুমেরীয়রা সোনা, রুপার ব্যবহারও করত। প্রাচীন মিসরে উচ্চবিত্তদের অনুষ্ঠানভেদে বিভিন্ন রকমের গলার হার ছিল। তারা পুঁতির মালাও পরত। প্রাচীন ক্রিটের সব শ্রেণির মানুষই গলার হার পরত। প্রাচীন গ্রিস সুন্দর সোনার হার তৈরিতে দক্ষতা অর্জন করেছিল। পাখি বা প্রাণীর আকারও দিতে পারত তারা গলার হারে। প্রাচীন রোমের বিত্তবানরা নীলকান্তমণি আর হীরার হার পরার প্রতিযোগিতা চালাত। রামায়ণে সোনার সরু হারের উল্লেখ আছে। বাইজান্টাইন যুগে ক্রিশ্চিয়ান জুয়েলারির প্রচলন হয়, যেগুলোতে ক্রুশ ঝোলানো হতো।

 

এলিজাবেথের মুক্তা

রানি প্রথম এলিজাবেথ রাজত্ব করেছেন ১৬ শতকে। মুক্তার মালা তাঁর খুব প্রিয় ছিল। তাঁর সময়ে পোর্ট্রেট পেইন্টিং উপহার দেওয়ার চল ছিল। এটি যেমন খুব বিখ্যাত। আর্মাডা পোর্ট্রেট নামের এই ছবিটিতে এলিজাবেথের গলায় অনেক মুক্তার মালা দেখা যায়। ১৫৮৮ সালে স্প্যানিশ নৌবাহিনীর বিরুদ্ধে ইংল্যান্ডের বিজয় ছবিটির উপলক্ষ। মুক্তা পছন্দ করতেন মোগল সম্রাটরাও। মুক্তার মালা গলায় সম্রাট আকবরের ছবি দেখতে পাওয়া যায়।

 

সম্রাট আকবর

 

 

সময়রেখা

খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ থেকে ৪০০ খ্রিস্টাব্দ : ব্রোঞ্জের তৈরি গলার হারের প্রচলন ছিল। কেল্টিকরা সিলভার, সোনা আর কাচের হারও পরত।

৪০০ থেকে ১৩০০ খ্রিস্টাব্দ : জার্মান ট্রাইবরা সোনা আর সিলভারের হার পরত, তবে সেগুলোয় জটিল নকশা থাকত। পাথর আর রঙিন কাচের ব্যবহার ছিল সেগুলোয়।

১৪০০ থেকে ১৫০০ খ্রিস্টাব্দ : রেনেসাঁ-ইউরোপে লকেটওয়ালা চিকন গলার হার পুরুষরা শখ করেই পরত। ১৫ শতকের বিত্তবান লোকেরা রত্নখচিত হার পরত।

নারীরা বেশি পরত পুঁতি ও মুক্তার হার (ফিতার মতো লেসি পার্ল)। ওই শতকের শেষ দিকে, বিশেষ করে ইতালিতে মোটা গলার হারের চল হয়।

১৫০০ থেকে ১৬০০ খ্রিস্টাব্দ : প্রবালের মতো প্রাকৃতিক উপকরণের হার এ শতকের বিশেষত্ব।

১৬০০ থেকে ১৭০০ খ্রিস্টাব্দ : হীরা কাটার নতুন কৌশল আবিষ্কৃত হয়।

১৭০০ থেকে ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ : গলার হারসহ গয়নার ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছিল। কারণ নকল সোনার (ইমিটেশন গোল্ড) গয়না তৈরির কৌশল জানা হয়ে গিয়েছিল। নকল রত্নও ব্যবহৃত হচ্ছিল অনেক। এই শতকেই যুক্তরাষ্ট্রে মুক্তাদানার (সিড পার্ল) ব্যবহার শুরু হয়।

১৮০০ থেকে ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দ : সম্রাট নেপোলিয়নের দরবারে প্রাচীন গ্রিক স্টাইল ফিরে এসেছিল। রানি ইউজিন এমন হার চালু করলেন, যেটি ছিল পিঠ, কাঁধ ও বক্ষের আবরণমতো।

১৮৭০ থেকে ১৯১০ খ্রিস্টাব্দ : এডওয়ার্ডিয়ান এরায় (কিং এডওয়ার্ডের নাম থেকে। ১৮৯০ থেকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কাল পর্যন্ত ধরা হয়) মুক্তার ব্যবহার ফিরে আসে। ডগ কলার নেকলেস জনপ্রিয় হয়। আর্ট নভ্যু (প্রাকৃতিক উপকরণের ব্যবহার ও বক্র গড়নের বিশেষত্ব) আন্দোলন প্রভাব ফেলে অলংকার শিল্পেও। হাতির দাঁত, শিঙের ব্যবহার যেমন দেখা গিয়েছিল।

১৯১০ থেকে ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দ : কোকো শ্যানেল কস্টিউম জুয়েলারির (কানের, গলার, নাকের অলংকারের সঙ্গে পোশাকের মিল থাকে) প্রচলন ঘটান। জ্যামিতিক নকশার প্রকাশ দেখা যায় অলংকারে। লাভ বিডের গলার হার (হিপ্পি নারী ও পুরুষরা পুঁতির এ মালা হাতে বুনত) অনেক দেখা যায়।

মুক্তার মালা স্পেশাল

মার্কিন আর ব্রিটিশ নারীরা ১৬তম জন্মদিনে মুক্তার মালা উপহার পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা করেন। কারণ মুক্তা সম্পর্ক গভীর করে, মনকে প্রফুল্ল করে। অনেক সমাজে মুক্তাকে চাঁদ বলে ভাবা হয়। প্রাচীন চীনের লোকেরা আবার ভাবত ড্রাগন আর আগুন থেকে রক্ষা করার ক্ষমতা আছে মুক্তার। ভিক্টোরীয় ইংল্যান্ডে মুক্তার দানাকে অশ্রুবিন্দু ভাবা হতো। তাই শোকের দিনে মুক্তার মালা পরত ইংল্যান্ডবাসী। উপহার হিসেবে কুবলাই খানের কাছে মুক্তা নিয়ে গিয়েছিলেন মার্কো পোলো। ১৬ শতকে লা পেরেগ্রিনা নামের বিখ্যাত মুক্তাটি উপহার পেয়েছিলেন মেরি। তিনি স্পেনের প্রিন্স দ্বিতীয় ফিলিপের স্ত্রী ছিলেন। এই মুক্তাটিই পরে রিচার্ড বার্টন উপহার দিয়েছিলেন তাঁর গয়নাপ্রিয় স্ত্রী এলিজাবেথ টেইলরকে। মেরিলিন মনরোও পছন্দ করতেন মুক্তা। জাপানে হানিমুনে গিয়ে জো ডিম্যাগিও তাঁকে (মনরোকে) ১৬ ইঞ্চি দৈর্ঘ্যের একটি মুক্তার মালা দিয়েছিলেন। মুক্তা পছন্দ করতেন গ্রেস কেলিও। তাঁর স্বামী প্রিন্স রেইনিয়ার তাঁকে মুক্তা ও হীরার একটি দারুণ অলংকার দিয়েছিলেন, যেটি তিনি মাঝেমধ্যেই পরতেন।

 

আমাদের গলার হার

মাদুলি, সীতাহার, পুষ্প, সাতনরি, চিক ইত্যাদি অনেক নামের গলার হার আছে আমাদের এখানে। মুক্তার মালায় ছোট ছোট সোনার লকেট দিয়ে সাত ধাপে তৈরি হয় বলে নাম হয়েছে সাতনরি হার। আর সীতাহারের মাঝখানে থাকে লকেট। একসময় কড়ির মালাও অনেক দেখা যেত। ‘আমার গলার হার খুলে নে’ শিরোনামে বাংলায় বিখ্যাত একটি গান আছে। কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর প্রথম কাব্যগ্রন্থটির নাম ‘সাতনরী হার’ (১৯৫৫)।

 



মন্তব্য