kalerkantho


দিবাযত্ন কেন্দ্রে যত্ন নেই শিশুদের

আরিফুর রহমান   

৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



দিবাযত্ন কেন্দ্রে যত্ন নেই শিশুদের

৩৫তম বিসিএসে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে (ইআরডি) যোগ দেওয়া বিবি করিমুনন্নেসা তাঁর ১০ মাস বয়সী শিশুকন্যাকে নিয়ে বেশ বিপাকে পড়েছেন। এই কর্মকর্তা অফিস চলাকালীন সময় তাঁর শিশুসন্তানকে পরিকল্পনা কমিশনে স্থাপিত দিবাযত্ন কেন্দ্রে রেখে এত দিন নিশ্চিন্ত ছিলেন। কিন্তু হঠাৎ সেখানে ছন্দপতন ঘটে। ওই দিবাযত্ন কেন্দ্রে সেবা দেওয়া কর্মীরা আন্দোলন শুরু করায় সেখানকার কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়ে। কেন্দ্রে সেবা বন্ধ হয়ে পড়ায় শিশুসন্তানটিকে এখন কোথায় রাখবেন, এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তিনি। শুধু করিমুনন্নেসাই নন; কমিশনের দিবাযত্ন কেন্দ্রে রাখা আরো ৪১টি শিশুর কর্মজীবী মায়েরা পড়েছেন একই ধরনের সমস্যায়।

পরিকল্পনা কমিশনের দিবাযত্ন কেন্দ্রে সরেজমিনে ঘুরে সেবাদানকারী কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এক বছর ধরে তাঁরা বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। মহিলা অধিদপ্তর থেকে বার বার তাঁদের অপেক্ষা করতে বলা হলেও শেষ পর্যন্ত কোনো সুরাহা হয়নি। ফলে অন্য কোনো উপায় না থাকায় বকেয়া বেতনসহ নিয়মিত বেতনের দাবিতে তাঁরা আন্দোলনে নেমেছেন। মহিলা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কাজী রওশন আক্তারের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তাঁদের সমস্যার কথা মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি, সচিব নাছিমা বেগমও জানেন। তার পরও কিছুতেই কিছু হচ্ছে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মী কালের কণ্ঠকে ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘আপনি (প্রতিবেদক) ঢাকায় থাকেন। ঢাকায় একটি পরিবারে কেমন খরচ হয় জানেন। যেখানে এক মাস বেতন ছাড়া একটি পরিবার অচল হয়ে যায়, সেখানে আমরা এক বছর বেতন পাচ্ছি না। খুবই দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে আমাদের জীবন। আমরা আমাদের নিয়মিত বেতন চাই।’

পরিকল্পনা কমিশনের দিবাযত্ন কেন্দ্র ছাড়াও রাজধানীতে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির কর্মজীবী নারীদের শিশুদের জন্য তৈরি করা হয়েছে আরো ১০টি দিবাযত্ন কেন্দ্র। মূলত কেন্দ্রগুলোর সেবাদানকারী ১১২ জন কর্মীর আন্দোলনের কারণে মুখ থুবড়ে পড়েছে সব কেন্দ্র। সেবাদানকারী এসব কর্মীর মধ্যে রয়েছেন আয়া, রাঁধুনি, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও নিরাপত্তাকর্মী। এই কর্মীদের আন্দোলনের কারণে শিশুসন্তান নিয়ে বিপাকে পড়েছেন নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত কর্মজীবী নারীরা। কর্মজীবী এই নারীরা বলছেন, যত দ্রুত সম্ভব এই জটিলতার নিরসন হওয়া জরুরি।

রাজধানীর একাধিক দিবাযত্ন কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় অনেক উপকরণ নষ্ট হয়ে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। টিভি, ডিভিডি, কম্পিউটার, প্রিন্টার, খেলাধুলার উপকরণ ব্যবহারের অনুপযুক্ত। সেখানকার ভেতরের পরিবেশও অত্যন্ত নাজুক। দীর্ঘদিন ধরে কাপড়চোপড়,  বিছানাপত্র পরিষ্কার না করায় শিশুদের স্বাস্থ্যের জন্য তা মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ ছাড়া শিশুদের জন্য সকাল, দুপুর ও বিকেলে যেসব খাবার পরিবেশন করার কথা, তাও সঠিকভাবে করা হচ্ছে না। আবার একটি দিবাযত্ন কেন্দ্রে যত শিশু আসে, অর্থ হাতিয়ে নিতে দেখানো হয় তার চেয়ে বেশি শিশু।

মহিলা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজধানীতে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত কর্মজীবী নারীরা অফিস চলাকালীন তাঁদের শিশুদের যাতে আশপাশে দিবাযত্ন কেন্দ্রে রাখতে পারেন এর জন্য ২০০৯ সালে একটি প্রকল্প অনুমোদন দেয় সরকার। ১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির কর্মজীবী নারীদের শিশুদের জন্য দিবাযত্ন কর্মসূচি’ শিরোনামের প্রকল্পটি ২০১৬ সালে শেষ হয়। এই প্রকল্পের আওতায় ঢাকায় মোট ১১টি দিবাযত্ন কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। যার মধ্যে সাতটি নিম্নবিত্ত শ্রেণির জন্য আর চারটি মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য। নিম্নবিত্তের জন্য তৈরি করা দিবাযত্নগুলো স্থাপন করা হয়েছে রাজধানীর বাড্ডা, আদাবর, ডেমরা, গাবতলী, মিরপুর-১০ ও সাভারে। আর মধ্যবিত্তের জন্য স্থাপন করা হয় উত্তরা, রাজারবাগ, পরিকল্পনা কমিশন চত্বর ও নাখালপাড়ায়। যেকোনো কর্মজীবী নারী তাঁর ছয় মাস থেকে ছয় বছর বয়সী সন্তানকে ৫০০ টাকা রেজিস্ট্রেশন ফি জমা দিয়ে দিবাযত্ন কেন্দ্রে রাখতে পারেন। এরপর প্রতি মাসে ফি দিতে হয় ৫০০ টাকা। শিশুদের খাবারসহ অন্যান্য উপকরণ মহিলা অধিদপ্তর থেকে সরবরাহ করা হয়। প্রতিটি কেন্দ্রে রয়েছে ৫০ শিশুর থাকার ব্যবস্থা। উন্নয়ন বাজেটে পরিচালিত প্রকল্পটি বর্তমানে রাজস্ব খাতে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে।

মহিলা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, প্রকল্পটিতে জটিলতা দেখা দিয়েছে মূলত আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া ১১২ জন সেবাদানকারী কর্মীকে নিয়ে। দিবাযত্ন কেন্দ্র পরিচালনা করতে দুই ভাগে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ১১টি কেন্দ্রে ডে-কেয়ার অফিসার, শিক্ষক-কাম-কম্পিউটার অপারেটর এবং স্বাস্থ্য শিক্ষক—এই তিনটি পদে নিয়োগ হয়েছে সরাসরি মহিলা অধিদপ্তর থেকে রাজস্ব খাতে। আয়া, কুক, গার্ড ও ক্লিনার—এই চারটি পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে। এদের মধ্যে কেউ প্রকল্পের শুরু থেকে কর্মরত, কেউ বা প্রকল্প শুরুর মাঝখানে এসেছে।

বেতন বন্ধ হওয়ার কারণ সম্পর্কে কজন সেবাদানকারী কর্মী ও মহিলা অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যমুনা স্টার সেভ গার্ড সার্ভিসেস লিমিটেডকে বাদ দিয়ে নতুন একটি কম্পানিকে নিয়োগ দিতে দরপত্র আহ্বান করে মহিলা অধিদপ্তর। এ কারণে আদালতে মামলা করে যমুনা স্টার সেভ গার্ড সার্ভিসেস লিমিটেড। মহিলা অধিদপ্তরের সঙ্গে তাদের দ্বন্দ্বে মূলত কর্মীদের বেতন বন্ধ। আর কর্মীরা অভিযোগ করেন, যমুনা সেভ গার্ড প্রতি কর্মীর কাছ থেকে মাসে ৫০০ টাকা করে কেটে রাখছে। এ ছাড়া প্রতিবছর তাদের ২০ হাজার টাকা করে দিতে হচ্ছে কর্মীদের। 

মহিলা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কাজী রওশন আক্তার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কর্মীদের বেতন দেওয়া নিয়ে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে, তা ঠিক হয়ে যাবে। সমাধানের পথ খোঁজা হচ্ছে। যেহেতু বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে, তাই একটু সময় লাগছে।’

সরেজমিনে পরিকল্পনা কমিশন ও আদাবরে স্থাপিত দিবাযত্ন কেন্দ্র ঘুরে জানা গেছে, দিবাযত্ন কেন্দ্রের শিশুদের রুটিন মোতাবেক খাবার দেওয়ার নিয়ম থাকলেও সেটি পূরণ করা হয় না। সকালে দুধ, পাউরুটি, দুধ-সুজি, দুধ-সেমাই দেওয়ার কথা থাকলেও তা সরবরাহ না করে অন্য খাবার বিতরণ করা হয়। বিকেলের খাবারে কলা, কমলা, আম, আপেল, পেঁপে, দেওয়ার কথা থাকলেও দেওয়া হয় বিস্কুটসহ অন্য খাবার।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে ১১টি দিবাযত্ন কেন্দ্রের নানা অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা। তাতে বলা হয়েছে, আদাবর দিবাযত্ন কেন্দ্রটির পরিবেশ ভালো নেই। সেখানে শিশুদের জন্য শিক্ষার উপকরণ, স্বাস্থ্য শিক্ষার উপকরণ, খেলনাসামগ্রী সরবরাহ করা হয়নি। নেই শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার জায়গা। আদাবর দিবাযত্ন কেন্দ্রটিতে স্থায়ী কর্মকর্তা ও চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের মধ্যে চলছে মানসিক দ্বন্দ্ব। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে শিশুদের ওপর। এ ছাড়া সেখানে ফ্রিজ, লাইটসহ সব ধরনের ইলেকট্রনিক পণ্য নষ্ট হয়ে রয়েছে। জিগাতলা দিবাযত্ন কেন্দ্রেরও একই চিত্র। সব ধরনের ইলেকট্রনিক পণ্য ও আসবাবপত্র নষ্ট অবস্থায় রয়েছে। গাবতলী দিবাযত্ন কেন্দ্রে বিনোদনের কোনো ব্যবস্থা নেই। অন্য কেন্দ্রগুলোরও প্রায় একই চিত্র।

 



মন্তব্য