kalerkantho


বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস আজ

মনের রোগ আর চিকিৎসা পড়ে থাকছে পেছনেই

তৌফিক মারুফ   

১০ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



 মনের রোগ আর চিকিৎসা পড়ে থাকছে পেছনেই

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক আকতার জাহান জলি ও ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় একটি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবুল কাশেমের আত্মহত্যার সাম্প্রতিক ঘটনা দুটি দাগ কেটেছে মানুষের মনে। বাস্তবতা হলো, প্রায় প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন স্থানে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটছে।

এসবের নেপথ্যে প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য নানা কারণ নিয়ে আলোচনা থাকলেও বিশেষজ্ঞদের মতে এর গোড়ায় কারণ একটাই—মানসিক সমস্যা।

বিশেষজ্ঞরা জানান, দেশে সামাজিক ও পারিবারিক অস্থিরতার মাত্রা ক্রমান্বয়ে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ছে। রয়েছে সচেতনতার অভাব। অধিকাংশ ভুক্তভোগীই চিকিৎসক বা পরামর্শকের কাছে যেতে চায় না। তারা উল্টো সমস্যা লুকিয়ে রাখতে চায়। আবার অনেকে এটাকে নিজের মানসিক সমস্যা বা রোগ বলেই মানতে চায় না। একটা পর্যায়ে গিয়ে সমস্যাটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন বিশ্বে তিন হাজার মানুষ আত্মহত্যা করছে। আবার আত্মহত্যার চেষ্টা করছে এর প্রায় ২০ গুণ মানুষ।

এদের বেশির ভাগেরই কারণ অসম্পূর্ণ বা চিকিৎসাহীন বিষণ্নতা। বাংলাদেশে আত্মহত্যার চেষ্টা করা মানুষের চার ভাগের এক ভাগই ভুগছে বিষণ্নতায়, যাদের বেশির ভাগই কখনো চিকিৎসা পায়নি।

এমনই বাস্তবতার মধ্যে আজ সোমবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। দিবসটি উপলক্ষে আজ সরকারি ও বেসরকারিভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের উদ্যোগে গতকালও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় জনসচেতনতামূলক রোড শো করা হয়।

মানসিক বিশেষজ্ঞরা জানান, অ্যালকোহলে আসক্তদের ১৫ শতাংশ আত্মহত্যা করে। আবার হেরোইন আসক্তদের আত্মহত্যার ঝুঁকি মাদকমুক্তদের তুলনায় ২০ গুণ বেশি। অন্যান্য মানসিক রোগ যেমন—বিপর্যয়-পরবর্তী মানসিক চাপ বা পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজর্ডার, অহেতুক ভীতি বা ফোবিয়া, জেনারালাইজড অ্যাংজাইটি ডিজর্ডার বা অত্যধিক দুশ্চিন্তাজনিত রোগ এবং কিছু ব্যক্তিত্ব-বৈকল্য বা পারসোনালিটি ডিজর্ডারে আক্রান্তদের মধ্যেও আত্মহত্যার হার সাধারণের চেয়ে বেশি।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুল হামিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, কেবল আত্মহত্যা নয়, যারা বেেঁচ থাকে তাদের  সুস্থ-স্বাভাবিক রাখার জন্যও পর্যাপ্ত চিকিৎসা কিংবা সচেতনতা দরকার। তাতেও বড় ঘাটতি রয়েছে। কারণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় দেশে পরিচালিত সর্বশেষ এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের মোট জনসংখ্যার ১৬.০৫ শতাংশ বা দুই কোটির বেশি মানুষ কোনো না কোনো মানসিক রোগে ভুগছে। শিশুদের মধ্যেও ১৮ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত। একইভাবে মোট বয়স্ক জনগোষ্ঠীর ১৮ শতাংশের বেশি বিষণ্নতায় ভুগছে। বাস্তবতা হলো, এর বেশির ভাগই চিকিৎসার বাইরে থেকে যাচ্ছে। অথচ সময়মতো চিকিৎসার আওতায় আনা গেলে তারা সবাই সুস্থ হয়ে উঠতে পারে।

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক চিকিৎসক জানান, মানসিক সমস্যাগ্রস্তরা না জেনে-বুঝে কিংবা অন্য কোনো রোগের উপসর্গ ভেবে অন্য বিভাগের চিকিৎসকের কাছে গিয়ে বিভ্রান্ত হয়। স্নায়ুতান্ত্রিক চিকিৎসকের কাছে এ ধরনের রোগীর সমাগম ঘটে বেশি। কিন্তু ওই বিভাগের অনেক চিকিৎসক তাদের ছাড়তে চান না বা মানসিক চিকিৎসকের কাছে না পাঠিয়ে নিজেদের কাছেই রেখে দেন। এটা রোগীর জন্য খারাপ প্রভাব বয়ে আনে।

অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুল হামিদ জানান, দেশে মানসিক সমস্যাগ্রস্ত বিশাল জনগোষ্ঠীর চিকিৎসার জন্য উচ্চ পর্যায়ের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যাও অতি নগণ্য, মাত্র ২২০ জন। সারা দেশের সরকারি হাসপাতালে বেড আছে মাত্র ৮১৩টি। এর পরিধি না বাড়ালে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানো কঠিন। কারণ দিনে দিনে দেশে মানসিক সমস্যার মাত্রা বেড়েই চলেছে।

এদিকে প্রায় ১৮ বছর ধরে আটকে থাকা মানসিক স্বাস্থ্য আইনটি ঝুলে রয়েছে মন্ত্রণালয়ে। ফলে এ-সংক্রান্ত অনেক সমস্যারই সমাধান করা যাচ্ছে না। তবে মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক বলেন, ওই আইনের কাজ অনেকটাই এগিয়েছে। আশা করা যায়, দ্রুত সময়ের মধ্যে বাকি প্রক্রিয়া শেষ করে এটি আলোর মুখ দেখবে।

মানসিক সমস্যা বা রোগে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সালাউদ্দিন কাউসার বিপ্লব কালের কণ্ঠকে বলেন, সামাজিক ও পারিবারিক অস্থিরতার মাত্রা এক রকম নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে। সমাজে মানুষের ভুল ধারণা ও খারাপ আচরণ দূর করতে জনসচেতনতা জরুরি। এ ছাড়া মানসিক সমস্যাগ্রস্তরা যাতে অপচিকিৎসার কবলে না পড়ে সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। কারো মধ্যে মানসিক রোগের কোনো লক্ষণ দেখা গেলেই তাকে যেন চিকিৎসকের কাছে নিয়ে আসা হয়, এ জন্য সচেতনতা দরকার।


মন্তব্য