kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


প্রাচীন নর্থব্রুক হল লাইব্রেরি

বই পড়তে অনুমতি লাগে ডিসিসির

আপেল মাহমুদ   

১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



বই পড়তে অনুমতি লাগে ডিসিসির

বই পড়ার জন্যই লাইব্রেরি। সাধারণত তা সবার জন্যই থাকে উন্মুক্ত।

ব্যতিক্রম ছাড়া কারো ব্যক্তিগত লাইব্রেরিতেও সাধারণত অন্যদের বই পড়ার সুযোগ থাকে। অথচ পুরান ঢাকার নর্থব্রুক হল চত্বরে গড়ে ওঠা দেশের অন্যতম পুরনো নর্থব্রুক হল লাইব্রেরিতে চলছে আজব নিয়ম। এখানে কেউ বই পড়তে পারে না। কেউ আগ্রহ প্রকাশ করলে লাইব্রেরিয়ানের সোজাসাপ্টা জবাব, তাঁর কাছে আলমারির কোনো চাবি নেই। সেই কারণে পাঠকদের তিনি বই সরবরাহ করতে পারেন না। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিসিসি) দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার অনুমতি পেলেই কেবল বই পড়ার সুযোগ মিলতে পারে। ডিসিসির ওই কর্মকর্তার কাছে রক্ষিত থাকে বইয়ের আলমারির চাবি। বেশ কিছুদিন ধরেই এমন আজব নিয়মে চলছে লাইব্রেরিটি।

একতলাবিশিষ্ট লাইব্রেরি ভবনটি কয়েক বছর আগে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে। দরজায় তালা লাগিয়ে দেয়ালে একটি সাইনবোর্ড সেঁটে দেওয়া হয়েছে। তাতে শুধু সংবাদপত্র পড়ার সুযোগ ছিল। মাস দেড়েক আগে ভবনটি সম্পূর্ণভাবে ব্যবহারের অনুপযোগী ঘোষণা করা হয় ডিসিসির পক্ষ থেকে। লাইব্রেরির বই নিয়ে রাখা হয়েছে পাশের একটি ভবনের তিনতলায়। কিন্তু বিষয়টি সাধারণ পাঠকদের অজ্ঞাতই রয়ে গেছে। কারণ তথ্যটি জানানোর জন্য সেখানে কোনো নোটিশ দেওয়া হয়নি। এ কারণে আগ্রহী অনেক পাঠকই লাইব্রেরির সামনে এসে বন্ধ দেখে ফিরে যাচ্ছে।

লাইব্রেরিতে গিয়ে জরাজীর্ণ ভবনটি দেখে মনে হলো, ভবনটি ডিসিসির নিদারুণ অবহেলার শিকার। প্রায় ১৫০ বছরের প্রাচীন ভবনটি কোনো কালেই সংস্কার করা হয়নি। ফলে দেয়ালে ফাটল ধরেছে। ছাদ চুইয়ে পড়ছে পানি। বর্ষার স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে ভবনটি বলতে গেলে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। পুরনো ও দুষ্প্রাপ্য হাজার হাজার বইপুস্তক আলমারিসহ অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। সেগুলোর কী হাল সে ব্যাপারে দেখভালের প্রয়োজন বোধ করছেন না করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

ঢাকা কেন্দ্রের চেয়ারম্যান ও ফরাশগঞ্জের আদি বাসিন্দা মোহাম্মদ আজিম বখশ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নর্থব্রুক হল লাইব্রেরিটি দেশের অন্যতম সেরা লাইব্রেরি। অনেক দুষ্প্রাপ্য বইয়ের আধার লাইব্রেরিটি চোখের সামনে ধ্বংস হয়ে গেল। একসময় দেশি-বিদেশি পর্যটক ও গবেষকরা রাতদিন এখানে বসে জ্ঞানচর্চা করতেন। বর্তমান সময়ে এসে লাইব্রেরিটির শত শত মূল্যবান বই, জার্নাল ও পত্র-পত্রিকা উইয়ের পেটে চলে গেছে। তবে সদিচ্ছা থাকলে এখনো নষ্ট হয়ে যাওয়া বইপুস্তকগুলো পুনর্প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। কিন্তু সিটি করপোরেশন এ ক্ষেত্রে দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়ে চলেছে। ’

নর্থব্রুক হল চত্বরে কথা হলো প্রবীণ অধ্যাপক মনোয়ারুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি লাইব্রেরির বর্তমান অবস্থা দেখে হতবাক। বললেন, ‘আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম। গবেষণার জন্য একটি বই দরকার হলে সেটা পাওয়ার জন্য আমি কলকাতা, আগরতলা এমনকি পাটনার খোদাবক্স লাইব্রেরিতে গিয়েও পাইনি। অবশেষে নর্থব্রুক হল লাইব্রেরিতে এসে সেটি পেয়ে যাই। ত্রিপুরা মহারাজবংশের প্রাচীন ইতিহাসসংবলিত বইটি পাওয়ার পর আমার গবেষণার কাজটি শেষ করতে পেরেছিলাম। ’

নর্থব্রুক হল লাইব্রেরিটি স্থানীয় বিদ্যোৎসাহীদের অর্থানুকূল্যে গড়ে উঠেছিল ১৮৮২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি। এর আগে ১৮৮০ সালের দিকে বাংলার বড়লাট নর্থব্রুক ঢাকা সফরে এলে তাঁর স্মৃতি জাগরূক রাখার লক্ষ্যে এখানে একটি পাবলিক মিলনায়তন গড়ে তোলা হয়। এটির নামকরণ করা হয় তাঁর নামানুসারে নর্থব্রুক হল। ঢাকার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা ওই হলের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগদান করতে আসতেন। এ কারণে এই হল প্রাঙ্গণে একটি লাইব্রেরি গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেন নগরীর খ্যাতনামা কয়েকজন ব্যক্তি। তাঁরা গাঁটের পয়সা খরচ করে সেখানে দুষ্প্রাপ্য বইপুস্তক, জার্নাল ও পত্র-পত্রিকার একটি বৃহৎ লাইব্রেরি গড়ে তোলেন। নর্থব্রুক হল চত্বরে এটা গড়ে ওঠার কারণে এর নামকরণ হয় নর্থব্রুক হল লাইব্রেরি।

ঐতিহাসিক তথ্য সূত্রে জানা যায়, লাইব্রেরিটি গড়ে তোলার জন্য ভাওয়ালের রাজাদের অবদান ছিল সবচেয়ে বেশি। রাজা কালীনারায়ণ রায়ের ছেলে রাজা রাজেন্দ্র নারায়ণ রায় একাই লাইব্রেরির জন্য পাঁচ হাজার টাকা দান করেন। এরপর ত্রিপুরার মহারাজা এক হাজার, জয়দেবপুরের বলিয়াদীর জমিদার রাজেন্দ্র কুমার রায় এক হাজার এবং মহারানী স্বর্ণময়ী দেবী ৭০০ টাকা দান করেন। তাঁদের পাশাপাশি ঢাকার ধনাঢ্য ব্যবসায়ী এবং জমিদার শ্রেণিও লাইব্রেরির জন্য অনেক টাকা দান করে। ওই টাকা দিয়ে কলকাতা, ত্রিপুরা, দিল্লি, বিলেত কিংবা ইউরোপ থেকে অনেক ইংরেজি রেফান্সের বই ও জার্নাল আমদানি করা হয়েছিল। এ কারণে লাইব্রেরিটি স্থানীয় লোকজন ছাড়াও বিদেশিরা ব্যবহার করত।

ফরাশগঞ্জের প্রায় শতবর্ষী হরিচরণ কর্মকার জানান, ব্রিটিশ আমলে লাইব্রেরিটি মূলত তৎকালীন পূর্ববঙ্গের জমিদারদের অর্থায়নে গড়ে ওঠে। তাঁদের সংগ্রহ থেকে অনেক পুরনো এবং মূল্যবান বই-জার্নাল সেখানে দান করা হয়েছিল। এমনকি তাঁদের দানেই লাইব্রেরিটির আলমারিসহ আনুষঙ্গিক আসবাব তৈরি করা হয়। বইয়ের পাতায় জমিদারদের সিলমোহর এবং আলমারির গায়ে তাঁদের নাম খোদাই করা ছিল। কিন্তু অব্যবস্থা আর অনাদরে সেই সব মূল্যবান বই ও আসবাবের বেশির ভাগই ধ্বংস হয়ে গেছে।

লাইব্রেরিয়ান জাহিদুল আলম বলেন, পুরনো ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে অনেক বইপুস্তক নষ্ট হয়ে গেছে। বর্তমানে প্রায় চার হাজার বই জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এসব বই ঠিক করার জন্য অনেক টাকা দরকার। এ ধরনের বাজেট সিটি করপোরেশনের না থাকায় সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেওয়া হয়েছে। সেখান থেকে বাজেট পাওয়া গেলে লাইব্রেরি ভবন পুনর্নির্মাণ ও বইপুস্তকগুলো ঠিক করা সম্ভব হবে।


মন্তব্য