kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


একাত্তরে ডালিম হোটেল ছিল মীর কাসেমের ডেথ ফ্যাক্টরি

নূপুর দেব, চট্টগ্রাম   

৯ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



একাত্তরে ডালিম হোটেল ছিল মীর কাসেমের ডেথ ফ্যাক্টরি

চট্টগ্রাম শহরে অবস্থিত ডালিম হোটেল। মুক্তিযুদ্ধের সময় মীর কাসেমের টর্চার সেল হিসেবে যার পরিচয়। ছবি : কালের কণ্ঠ

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াত নেতা মীর কাসেম আলীকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে ৩৫১ পৃষ্ঠার যে রায় দিয়েছিলেন তাতে ৮৫০ বার ডালিম হোটেলের নাম উল্লেখ রয়েছে। ট্রাইব্যুনাল পর্যবেক্ষণে বলেছেন, একাত্তরে চট্টগ্রামে আলবদর বাহিনীর সদর দপ্তর ডালিম হোটেল পরিণত হয়েছিল ডেথ ফ্যাক্টরি বা মৃত্যুর কারখানায়।

একাত্তরে এই হোটেলে আলবদর বাহিনীর পৈশাচিক নির্যাতনের নেতৃত্ব ও নির্দেশনায় ছিলেন সে সময় চট্টগ্রাম অঞ্চলে ওই বাহিনীর প্রধান মীর কাসেম আলী। তাঁর বিরুদ্ধে গঠন করা ১৪টি অভিযোগেরই ঘটনাস্থল এই ডালিম হোটেল।

একাত্তরের ১৭ ডিসেম্বর এই নির্যাতন ক্যাম্প থেকে ছাড়া পেয়ে সেখানে বন্দিদের ওপর কী ধরনের নির্যাতন করা হতো তার বর্ণনা দিয়েছিলেন নজমুল আহসান সিদ্দিকী। ‘হানাদারের নির্যাতন কক্ষে’ শিরোনামে ওই লোমহর্ষক কাহিনী পূর্বদেশ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল ১৯৭২ সালের ৭ জানুয়ারি।

নজমুল বলেছিলেন, ‘এ বন্দিশিবিরে যাদের আটক রাখা হতো তাদের প্রথম তিন দিন কিছুই খেতে দেওয়া হতো না। এ সময় যারা পানি চাইত, তাদের বেশির ভাগকে দেওয়া হতো মানুষের প্রস্রাব। কাঁচা নারকেলের পুরনো খোলসে করে যেদিন আমাকে পানি হিসেবে তারা খেতে দিল এতটুকু পানীয়, তখন আমি ভেবেছিলাম হয়তো বা অপরিষ্কার কোনো নালা-নর্দমার পানি হতে পারে। প্রতিদিনের ঘড়ি ধরা বিভিন্ন প্রকারের দৈহিক নির্যাতনের ফলে শরীরের অবস্থা এমন হয়েছিল যে আর কিছু খেতে ইচ্ছা না হলে মধ্যে মধ্যে পানির তেষ্টায় বুক ফেটে পড়তে চাইত। তাই পানি চাইতাম। আর তারা এনে দিত এ-জাতীয় জলীয় পদার্থ। প্রথম দিন মুখে নিতেই ধরা পড়ে যায় তাই গলাধঃকরণের আগে ফেলে দিয়েছিলাম। সে জন্য আরো কিছু শাস্তি মুহূর্তেই আমার উপর পড়ল। এরপর আর পানি খেতাম না। ’

একজন গবেষক জানান, চট্টগ্রাম নগরের নন্দনকানন এলাকায় টিঅ্যান্ডটি কার্যালয়ের পেছনের ডালিম হোটেলের প্রকৃত মালিকানা ছিল এক হিন্দু পরিবারের। তখন এর নাম ছিল ‘মহামায়া ডালিম ভবন’। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ওই পরিবার পালিয়ে গেলে হানাদার পাকিস্তানি সেনারা ভবনটি দখল করে তাদের ডেথ স্কোয়াড আলবদর বাহিনীকে ছেড়ে দিয়েছিল বন্দিশিবির হিসেবে ব্যবহার করতে। যুদ্ধের শুরু থেকে চট্টগ্রাম আলবদর বাহিনীর প্রধান ছিলেন মীর কাসেম আলী, যিনি শেষ দিকে ওই বাহিনীর তৃতীয় শীর্ষ পদে আসীন হয়েছিলেন। মীর কাসেম আলী ও তাঁর সহযোগীরা ভবনটির নাম দিয়েছিলেন ‘ডালিম হোটেল’।

ডালিম হোটেলে নির্যাতনের সময় বন্দিদের আর্তনাদ এখনো যেন তাড়িয়ে বেড়ায় মুক্তিযোদ্ধা-সাংবাদিক নাসিরুদ্দিন চৌধুরীকে। নির্যাতনের কথা ভেবে এখনো শিউরে ওঠেন তিনি।

গতকাল মঙ্গলবার মীর কাসেমের চূড়ান্ত রায়ের পর নাসিরুদ্দিন চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তাদের নির্যাতনের পদ্ধতি ছিল পৈশাচিক। প্রতিদিনই তিন তলা ভবনের বিভিন্ন কক্ষ থেকে বন্দিদের আর্তনাদের শব্দ পেতাম। মীর কাসেমের নির্দেশে সেখানে অমানুষিক নির্যাতন করা হতো। ’

একাত্তরে জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংগঠন ছাত্রসংঘের সভাপতি ছিলেন মীর কাসেম আলী। আপিলের রায়েও তাঁর মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকায় মামলার সাক্ষী, নির্যাতিত মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধার স্বজনসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ সন্তোষ প্রকাশ করেছে। নগরের বিভিন্ন স্থানে মিষ্টিমুখ, আনন্দ মিছিল ও সমাবেশ হয়েছে। নির্যাতনের শিকার মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা একাত্তরের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে আবেগতাড়িত হয়ে পড়ে।

মুক্তিযোদ্ধা জসিম উদ্দিনসহ কয়েকজনকে হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় আপিলেও মীর কাসেমের মৃত্যুদণ্ড বহাল রয়েছে। এই শহীদ মুক্তিযোদ্ধার মামাতো বোন মামলার অন্যতম সাক্ষী হাসিনা খাতুন বলেন, ‘৪৫ বছর পর এ রকম একটি রায় পেয়ে আমরা খুশি। এখন আমরা যত দ্রুত সম্ভব ফাঁসি কার্যকর চাই। তাহলে আমার ভাইয়ের আত্মা শান্তি পাবে। ’

প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা সাইফুদ্দিন আহমেদ খানের স্ত্রী নূরজাহান খান বলেন, ‘আমার স্বামী ডালিম হোটেলের নির্যাতনের চিহ্ন শরীরে বয়ে বেড়িয়েছিলেন। আজ যদি আমার স্বামী বেঁচে থাকতেন তাহলে মীর কাসেমের মুখে থুথু দিতেন। ’ একাত্তরের ২৪ নভেম্বর শহরের মাদারবাড়ী পোড়া মসজিদের পাশের আজিজ কলোনি থেকে মুক্তিযোদ্ধা সাইফুদ্দিনকে ডালিম হোটেলে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। যুদ্ধাহত এই মুক্তিযোদ্ধা ২০০৭ সালে মারা যান।

একাত্তরের ৩০ নভেম্বর চান্দগাঁও এলাকার বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় চট্টগ্রাম শহরের বিএলএফের একজন কমান্ডার সৈয়দ মোহাম্মদ এমরান ও তাঁর পরিবারের পাঁচ সদস্যকে। এমরান বলেন, ‘মীর কাসেমের নির্দেশেই চোখ বাঁধা অবস্থায় বন্দিদের দিগম্বর করে পেটানো হতো। রক্তাক্ত অবস্থায় আমাদের অন্ধকার কক্ষে ফেলে রাখা হতো। দুই দিন পর বাসি খাবার দেওয়া হতো এবং পানি চাইলে টয়লেট থেকে বদনায় করে পানি দেওয়া হতো। অনেককে পানির বদলে প্রস্রাব খেতে দেওয়া হয়েছে। ’

মীর কাসেমের নির্যাতনের শিকার আরেক মুক্তিযোদ্ধা জাহাঙ্গীর চৌধুরী। তিনি ট্রাইব্যুনালে মীর কাসেমের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘ওই হোটেলের প্রতিটি কক্ষ থেকে আসত নির্যাতিতদের গোঙানি ও আর্তনাদের আওয়াজ। বদর সদস্যরা আমার ঠোঁট থেঁতলে দিয়েছিল। ’

মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধের গবেষণা কেন্দ্রের চেয়ারম্যান ডা. মাহফুজুর রহমান তাঁর প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘এই নরঘাতকের নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের কথা বলে শেষ করা যাবে না। মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিকামী মানুষকে ধরে নিয়ে নির্যাতন এবং হত্যা করা হতো। ’

ডালিম হোটেল সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন গণজাগরণ মঞ্চ চট্টগ্রামের সমন্বয়কারী শরীফ চৌহান।


মন্তব্য