kalerkantho


তরুণরাই আগামীর বাংলাদেশ

ড. আতিউর রহমান

৬ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



তরুণরাই আগামীর বাংলাদেশ

কয়েক দিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর সি মজুমদার হলে তরুণদের এক মিলনমেলায় উপস্থিত হয়েছিলাম। ‘ড্রিম ডিভাইজার’ নামের একটি তারুণ্যদীপ্ত সংগঠন এর আয়োজন করেছিল। ওই অনুষ্ঠানে তরুণদের উদ্দেশে কিছু বলার পর তাদের অনেক প্রশ্নেরও উত্তর দিয়েছিলাম। প্রশ্নোত্তর পর্বের অংশটিই আমার কাছে বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়েছে। সেদিনের কথাগুলোই এ নিবন্ধে স্থান পেয়েছে।

নিঃসন্দেহে তারুণ্যই আমাদের বড় সম্পদ। তরুণদের স্বাপ্নিক মুখ দেখলে সত্যি মন ভরে যায়। এখনো তারুণ্যদীপ্ত প্রগাঢ় স্বপ্নে নিজেকে আঁকি। আর কল্পনা করি সম্ভাবনাময় উন্নত বাংলাদেশের।

তারুণ্যনির্ভর এই স্বপ্নিল আয়োজনে তুলে এনেছিলাম দুটি প্রসঙ্গ—বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ। আমরা আজ যে স্বাধীন দেশে বাস করছি, খাচ্ছি, পরছি, নিঃশ্বাস নিচ্ছি, তার স্বপ্ন দেখেছিলেন আমাদের জাতির পিতা। তিনি সে সময়ের তরুণদের মাঝে এই স্বপ্নের বীজ দক্ষতার সঙ্গেই বপন করতে পেরেছিলেন। আবার সেই স্বপ্নের পরিধি তিনি নিজেই সম্প্রসারণ করেছিলেন। সেই স্বপ্নের ফসল আজকের বাংলাদেশ। তিনি আজীবন স্বপ্ন দেখেছেন সমৃদ্ধ সোনার বাংলার। সেই উন্নত সোনার বাংলাই আমাদের সবার আরাধ্য।

সোনার বাংলা কেমন হবে? সেই ধারণাও তিনি দিয়েছিলেন। দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ৯ মাসের মধ্যেই বঙ্গবন্ধু আমাদের একটি সুন্দর সংবিধান দিয়েছেন। ওই সংবিধান শুধুই আইন-কানুনের সম্মিলন নয়। এটি আমাদের অতীত, বর্তমান এবং আগামীর এক সুদূরপ্রসারী বার্তাবাহক। আগামীর বাংলাদেশ যেসব নাগরিকের অংশগ্রহণে সমৃদ্ধিশালী দেশ হবে, সেই ধারণা আর তার বাস্তবায়নের পুরো চিত্র ও অবকাঠামো তিনি সংবিধানেই দিয়ে গেছেন।

তিনি শিশুদের বরাবরই ভালোবাসতেন। সত্তরের নির্বাচনে তিনি যে বেতার ও টিভিতে ভাষণ দিয়েছিলেন, সেখানে বলেছিলেন—প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয় করা হবে। আর তিনি তা করেও ছিলেন। সম্পদের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এক ধাক্কায় তিনি ৩৬ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয় করেছিলেন। তিনি এমন একটি বাংলাদেশের কল্পনা করতেন, ‘যেখানে শিশুরা খেলবে; মায়েরা হাসবে।’ তিনি তরুণদের খুবই ভালোবাসতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, আমাদের অর্থনীতির নেতৃত্ব দেবে আমাদের তরুণরা। অর্থনীতির চাকা সচল রাখবে কৃষক ভাইয়েরা। অর্থনীতিকে উড্ডয়নে রাখবে তরুণ উদ্যোক্তারা। সবাই মিলে এগিয়ে নিয়ে যাবে স্বপ্নের বাংলাদেশকে।

তাই প্রথমেই তিনি মনে করেছেন যে দেশ গঠনে শিক্ষা খুবই জরুরি। এবং সেই শিক্ষা যে বিজ্ঞাননির্ভর হতে হবে, সে গুরুত্বও তিনি দিয়েছেন কুদরাত-এ-খুদা কমিশনের মাধ্যমে। সমকালীন বড় বিজ্ঞানী কুদরাত-এ-খুদার নেতৃত্বে তিনি একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষার ভার থাক শিক্ষকের হাতেই। তাই তিনি শিক্ষাসচিব বানালেন অধ্যাপক কবীর চৌধুরীকে। পরবর্তী সময়ে তিনি শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান করলেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় শিক্ষক অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ চৌধুরীকে। পরিকল্পনা কমিশনের দায়িত্ব দিলেন আমাদের শিক্ষকদের শিক্ষক অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক নুরুল ইসলামকে। সঙ্গে অধ্যাপক মুশাররফ হোসেন, রেহমান সোবহান ও আনিসুর রহমান। এ ছাড়া অনেক শিক্ষক, গবেষক ও বিজ্ঞানীকে জড়ো করেছিলেন পরিকল্পনা কমিশনে। পরবর্তী সময়ে অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ চৌধুরী ও অধ্যাপক এ আর মল্লিককে যথাক্রমে শিক্ষামন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী করেছিলেন। উদ্দেশ্য দ্রুত স্বদেশের উন্নতি নিশ্চিত করা। এমন নজির বিশ্বে বিরল। কেউ ভাবতেও পারত না, সমসাময়িক সময়ে তিনি শিক্ষা খাতকে এতটা গুরুত্ব দিতে পারেন। অবকাঠামোর এত অভাব, তবু তিনি আগামীর বাংলাদেশ নির্মাণের প্রশ্নে ছিলেন আপসহীন। তাই তিনি শিক্ষায় এতটা গুরুত্ব দিতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষার ভালোমন্দ শিক্ষার সঙ্গে জড়িতরাই ভালো বুঝবে। তাঁর হাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ১৯৭৩ সালে এক আইন জারি করা হয়। এর মূলে ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন।

তিনি জানতেন, তরুণদের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে হলে প্রথমেই শিক্ষায় গুরুত্ব দিতে হবে। এবং তিনি তা-ই দিয়েছেন।

বঙ্গবন্ধু উচ্চাভিলাষী ছিলেন। একই সঙ্গে তাঁর পরিকল্পনাও ছিল সুদূরপ্রসারী। তা না হলে ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে ওই সময় তিনি স্বদেশকে নিয়ে এত বড় স্বপ্ন কী করে দেখতে পেরেছিলেন? বাহাত্তরে আমাদের অর্থনীতির আকার ছিল মাত্র আট বিলিয়ন ডলার। রাস্তাঘাট, সেতু, কালভার্ট, রেল, বন্দর—সব কিছু বিধ্বস্ত। প্রতিষ্ঠান নেই। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে এক ডলারও নেই। দারিদ্র্য ৮০ শতাংশেরও বেশি। প্রত্যাশিত জীবনের গড় আয়ু মাত্র ৪৭ বছর। মাথাপিছু আয় মাত্র ৮৯ ডলার। তিনি এমন একটি দেশে দাঁড়িয়ে বলেছেন, ‘আমরা মাথা উঁচু করে বাঁচতে চাই।’

তাই তিনি বিশ্বাস করতেন যে অর্থনীতির ভালোমন্দ অর্থনীতিবিদরাই ভালো বুঝবেন। বাস্তবেও তিনি তা করে দেখাতে পেরেছিলেন। আমাদের অর্থনীতি ছিল নিঃস্ব। ভাবতে অবাক লাগে, সেই অর্থনীতি আজ কত বড় হতে পেরেছে। আমাদের বর্তমান গড় আয়ু ৭৩ বছর। নারীর গড় আয়ু ৭৫ বছর। আমাদের মূল্যস্ফীতি কমে এখন ৫ শতাংশের সামান্য ওপরে। ১০ বছর আগেও তা ছিল ১২-১৩ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি বেশি মানেই প্রান্তিক মানুষের জন্য অভিশাপ। এতে তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। কিন্তু ৫ শতাংশের আশপাশে মূল্যস্ফীতি মানেই আমাদের প্রকৃত আয় বাড়ন্ত। আমরা এমডিজির লক্ষ্যমাত্রাগুলো পূরণ করে দেখিয়েছি, আমরাও পারি। এসডিজিও পূরণ করতে পারব বলে আশা করছি। আমরা পারি, আমরা পারব। আমরা মাতৃমৃত্যুর হার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে এনেছি। হাজারে মাতৃমৃত্যুর হার ০.৪ শতাংশ। শিশুমৃত্যুর হারও কমেছে। আমরা এভাবেই সব সূচকে এগিয়ে যাচ্ছি। বিশ্বব্যাংক বলেছে, হিউম্যান ক্যাপিটালে আমরা ভারত ও পাকিস্তান থেকে অনেক এগিয়ে। গত ২৭ বছরে হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্সে আমরা ৫৭ শতাংশ এগিয়েছি। উন্নয়নশীল দেশের গড় বেড়েছে ৩১ শতাংশ। আর ভারতে বেড়েছে মাত্র ২১ শতাংশ। আমরা এখন আর ছোট্ট শিশুর মতো হামাগুড়ি দিচ্ছি না, বরং দৌড়াচ্ছি। স্বপ্ন দেখছি, ২০৩০ সালে আমাদের হবে বিশ্বের ২৬তম অর্থনীতি। সর্বশেষ ব্লুমবার্গ প্রক্ষেপণ করেছে যে ২০২৩ সাল নাগাদ বাংলাদেশ বিশ্বে ২০টি প্রধান দেশের একটি হবে। বিশ্ব অর্থনীতির ১ শতাংশ অবদান রাখবে বাংলাদেশ। ২০৪১ সালে হবে উন্নত বাংলাদেশ। আর এসব অর্জন সম্ভব হচ্ছে, কারণ বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নকে ধারণ করে অগ্রসরমাণ বাংলাদেশের নেতৃত্বে রয়েছেন।

বঙ্গবন্ধু যে তরুণদের স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই স্বপ্ন অনেকটাই বাস্তবায়ন করছে তরুণদের এই প্ল্যাটফর্ম ‘ড্রিম ডিভাইজার’। এই মঞ্চের দুজন হামিমুর রহমান ওয়ালিউল্লাহ ও শাহিদ শাওন ওদের ভাবনার একটি নান্দনিক পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন দিয়েছে সেদিন। কিভাবে দেশের নতুন নেতৃত্ব তৈরিতে ভূমিকা রাখা সম্ভব, সে বিষয়টি ছিল এই উপস্থাপনার মূলকথা। ওরা সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছে তথ্যের অবাধ প্রবাহের ওপর। ইন্টারনেটের কল্যাণে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তথ্যপ্রবাহ খুবই গতিময় হয়েছে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট চালুর পর এই গতি আরো বেড়েছে। এর সুফল যেমন অনেক আবার কুফলও কম নয়। বিশেষ করে, তরুণ প্রজন্মের কাছে অনেক ক্ষেত্রে তা নেশার পর্যায়ে চলে গেছে। ফলে সন্তানদের সঙ্গে মা-বাবার স্বাভাবিক যোগাযোগ ক্ষুণ্ন হচ্ছে। সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁরা বেশ খানিকটা উদ্বিগ্ন। যে যার মতো সামাজিক মাধ্যমে নেতিবাচক কনটেন্ট দিচ্ছে। যা খুশি তা-ই পোস্ট দিচ্ছে। কখনো এর নেতিবাচক ফল মাত্রাতিরিক্ত হারে হচ্ছে। প্রতিদিন যুক্ত হওয়া নতুন ব্যবহারকারীর সংখ্যা দেড় লাখের বেশি। এদের প্রতি তিনজনের একজন শিশু। ইউনিসেফের এক জরিপ থেকে এ তথ্য জানা যায়। যেসব তথ্য যোগাযোগমাধ্যমে পাওয়া যায়, তা কিন্তু সবার জন্য নয়। কিন্তু এগুলো আলাদা করে পরিবেশনের সুযোগও নেই। তাই অভিভাবকদের শঙ্কা বাড়ছে। তবে সরকার এদিকে নজর রাখছে।

তথ্যের সংমিশ্রণে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়াটা স্বাভাবিক। তাই ‘ড্রিম ডিভাইজার’ প্রথমেই চিন্তা করে, কিভাবে একটি ইতিবাচক কনটেন্টের প্ল্যাটফর্ম বা মঞ্চ তৈরি করা যায়। তাদের মঞ্চে যত কনটেন্ট থাকবে, তা অবশ্যই ইতিবাচক হতে হবে। দ্বিতীয়ত, এই কনটেন্টগুলো যেন তরুণদের স্বপ্ন দেখতে এবং দেখাতে সাহায্য করে। এবং সব শেষে ওদের মূল বিশেষত্ব হলো, এই সাইটে যত ধরনের কনটেন্ট আছে, সব কটিই বাংলা দন্ত্য-স বর্ণ দিয়ে। উদ্দেশ্য, সদর্থক। ইতিবাচক। স্বপ্নকাতর।

বিশ্বে অসংখ্য ভার্চুয়াল সাইট আছে। কোনোটি কনটেন্টের, কোনোটি নিউজের, কোনোটি ব্লগ, কোনোটি আবার প্রাতিষ্ঠানিক বুকলেট। কোনোটিকেই একটি বর্ণ দিয়ে ধরা যায়নি। ‘ড্রিম ডিভাইজার’ কিন্তু তা করে দেখিয়েছে। এবং মজার সব নাম দিয়ে এটি তারা করেছে। এর জন্য তাদের প্রচুর গবেষণা করতে হয়েছে।

স্বপ্ন, সুশিক্ষা, সুযোগ, স্বাধীনতা, স্বদেশ, সমৃদ্ধি, সীমানায়-সংযোগ, সংস্কৃতি, সেরা-সন্তান—এমন সব সদর্থক নাম দিয়ে এই সাইট তারা সমৃদ্ধ করেছে। সাইটটিকে ওরা বলছে ‘স্বপ্নের সন্দেশ’ (dreamdeviser.net)। সন্দেশ এখানে সংবাদ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।

তবে সন্দেশ আবার মিষ্টান্নও বটে। যেহেতু ওরা এই সাইটে স্বপ্নময় সব মজার তথ্য, উপাত্ত ও কনটেন্ট দিয়ে থাকে, তাই এসব আগে মিষ্টি খাদ্য হতে হবে। ওদের জন্য বলেছিলাম, তোমাদের অন্যের আগে নিজেদের জন্য খাদ্য বানাতে হবে। প্রসঙ্গক্রমে মনে পড়ে রবীন্দ্রনাথের কথা। রবীন্দ্রনাথ তরুণদের জন্য প্রচুর লিখেছেন। তাঁর শিক্ষাভাবনায় তরুণদের চাওয়া-পাওয়া বিরাট আকারে স্থান পেয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘শিক্ষা হতে হবে জীবনের খাদ্য।’ খাদ্য যেমন সুস্থ রাখে এবং কর্মচঞ্চলতার জন্য সজীব রাখে, শিক্ষাকেও তা-ই হতে হবে। শিক্ষা শুধু পাঠ্যপুস্তকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার বিষয় নয়। তিনি বলেছেন, ‘আমরা কী হইব এবং কী শিখিব (এ কথা দুটি গায়ে গায়ে লাগানো।’

আমাদের তাই বেশ কিছু বিষয় মাথায় রাখতে হবে। প্রথমেই আমরা উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা মাথায় রাখতে চাই। তবে তা শুধু কতকের জন্য নয়। হতে হবে তা সবার জন্য। উন্নয়নে তাই সবার অংশগ্রহণ থাকতে হবে। আর বৈষম্য যাতে না বাড়ে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। আজকে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের কল্যাণে একজন রিকশাচালকও ব্যাংকিং করছেন। তাঁর প্রতিদিনের রোজগার তিনি তাঁর পরিবারের কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। এতে তাঁর পরিবারের সদস্যদের জীবনমান বাড়ছে। এখন প্রতিদিন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে এক হাজার কোটি টাকারও বেশি লেনদেন হচ্ছে। কোটিখানেক কৃষক ১০ টাকায় ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক চার লাখ বর্গা চাষি পরিবারকে এ পর্যন্ত চার হাজার কোটি টাকার বেশি সস্তায় ঋণ দিয়েছে। এদের বেশির ভাগই নারী বর্গা চাষি। গত এক দশকে কৃষিঋণের পরিমাণ কয়েক গুণ বেড়েছে। তাই প্রবৃদ্ধিও বাড়ছে। আমার বিশ্বাস, অচিরেই প্রবৃদ্ধির হার ডাবল ডিজিটে পৌঁছবে। আর সেটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থব্যবস্থার মাধ্যমেই সম্ভব। একই সঙ্গে তাকে সবুজও রাখতে চাই।

দ্বিতীয়ত, অবশ্যই আমাদের প্রযুক্তিনির্ভর হতে হবে। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, আমরা ভেরাণ্ডার তেল দিয়ে কুপি জ্বালিয়ে থাকি। তাই বলে কি সারা জীবন তা-ই করব? তিনি নিজেই তার উত্তর দিয়েছেন : না, আমরা বিজলি বাতি চাই। তবে তা সবার জন্য চাই। প্রযুক্তির সুফল সবার ঘরে পৌঁছে দেওয়ার সেই লক্ষ্য আমরা এখন ডিজিটাল রূপান্তরের মাধ্যমে নিশ্চিত করছি। ডিজিটাল রূপান্তরের পথেই যে বাংলাদেশ হাঁটছে তার প্রমাণ—আমাদের তরুণ উদ্যোক্তারা সৃজনশীল সব ডিজিটাল প্রযুক্তি গ্রহণ করে দেশে এবং বিদেশে নানা কাজে নিজেদের ব্যস্ত রেখেছে। সংসদে সমাপনী ভাষণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জানালেন যে ২০২১ সালের মধ্যে শুধু আইসিটি খাত থেকেই ১০ বিলিয়ন ডলার আয় করব। আরো জানালেন, ইন্টারনেট ব্যবহারের হারে আমরা বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছি। ছয় লাখেরও বেশি তরুণ-তরুণী ঘরে বসেই ‘আউটসোর্সিং’য়ের মাধ্যমে বিদেশ থেকে অর্থ উপার্জন করছে। এক হাজারেরও বেশি ই-কমার্স সাইট আজ সক্রিয়। তা ছাড়া উবার, পাঠাও, সহজসহ অসংখ্য রাইড শেয়ারিং উদ্যোগের ফলে হাজার হাজার তরুণের কর্মসংস্থান হয়েছে। পাঁচ কোটিরও বেশি মোবাইল ব্যাংকিং হিসাব এখন সক্রিয়। তা ছাড়া ৯ লাখ এজেন্ট এই ধারার ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে যুক্ত। তারা সবাই উদ্যোক্তা। সবাই মিলে ২৭ লাখের বেশি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। জনপ্রশাসনে ই-সেবার বিপ্লব ঘটেছে। ২০২১ সালে এক হাজার ১৮৭টি ই-সেবা চালু হবে। এখনই সামাজিক নিরাপত্তা সেবাগুলো অনলাইন ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে পাওয়া যাচ্ছে। ফলে জনপ্রশাসনের স্বচ্ছতা ও ক্ষিপ্রতা বাড়ছে।

আমাদের এখন প্রযুক্তি খাতে আয় এক বিলিয়ন ডলারের ওপরে। অর্থাৎ তা অন্য খাতের ১০ বিলিয়ন ডলারের সমান। কারণ এ খাতে কাঁচামাল হলো মেধা। আমাদের কাঁচামাল বাইরে থেকে আমদানি করতে হচ্ছে না। শুধু মেধার ব্যবহার করে আমরা এ খাত সমৃদ্ধ করতে পারি।

তৃতীয়ত, আমাদের উদ্যোক্তা তৈরির দিকে নজর দিতে হবে। তরুণদের উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে। এখন চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগ। আমাদের তরুণদের তাই প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তা হওয়ার রাস্তা প্রশস্ত করতে হবে। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘তুমি কেরানী নও। তুমি ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট থেকে বড়।’ তাই শুধু চাকরির পেছনে না ছুটে তরুণদের উদ্যোক্তা হতে হবে। তারাই স্বনিয়োজিত হবে এবং অন্য অনেককে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেবে। এ জন্য ঋণনীতি ও রাজস্বনীতিকে উদ্যোক্তাবান্ধব হতে হবে। তাদের উপযুক্ত প্রণোদনা দিতে হবে। তাদের হাত ধরেই আগামীর বাংলাদেশ হবে সবুজ ও উন্নত। সেই বাংলাদেশের জ্বালানিও হতে হবে সবুজ। এ খাতেও বিপুলসংখ্যক উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগ রয়েছে। ধরা যাক, সবাই নিজের বাসার ছাদে একটি করে সোলার প্যানেল, আর একটা নেটমিটার লাগাল। যে পরিমাণ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে, তা নিজেদের কাজে লাগাবে এবং বাকি বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে পাঠাবে। এক ইউনিট বিদ্যুৎ গ্রিড থেকে কেনার জন্য যে দাম গ্রাহক দেবে, তার তৈরি বিদ্যুৎ থেকে গ্রিডে দেওয়ার সময় তার দাম অন্তত ২৫ শতাংশ বেশি হবে। এই প্রণোদনার জন্য ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ তৈরির ধুম পড়ে যাবে। সঙ্গে বাড়বে উদ্যোক্তার সংখ্যাও। এভাবেই দেশে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে। সেই অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ইন্ডাস্ট্রিতে কাজে লাগানো যাবে। দেশে তখন বিনিয়োগও বেড়ে যাবে। তাই আমাদের এখন লক্ষ্য স্থির করতে হবে যে আগামী ২০৩০ সাল নাগাদ আমরা মোট জ্বালানির কত শতাংশ ‘রিনিউয়েবল’ উৎস থেকে পেতে চাই। এখন ভাবছি ১০ শতাংশ। এ লক্ষ্যমাত্রার হার কয়েক গুণ বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।

আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো মানবসম্পদ। উদ্যোক্তা তৈরি করতে হলে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়েই তাদের যাত্রা শুরু করতে হবে। সে সুযোগ আমাদের সৃষ্টি করতে হবে। আশার কথা যে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার্থীর সংখ্যা দিন দিনই বাড়ছে। বাড়ছে ইংরেজি শিক্ষার পরিধি। এরা উদ্ভাবন ও সমস্যা সমাধানে আগ্রহী। সব মিলে বিশ্ববাজারের এবং স্বদেশের নয়া চাহিদার আলোকে আমাদের সক্ষমতা বাড়ছে। প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রমের শেষ বছরে সাধারণত শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন বিষয়ে প্রজেক্ট জমা দেয়। এসব থেকে সবচেয়ে সফল কয়েকটি প্রজেক্টকে ‘চ্যালেঞ্জ ফান্ড’ থেকে অর্থায়ন করা গেলে নিশ্চয়ই নয়া উদ্যোক্তা তৈরির পথ সহজতর হবে। এর জন্য সরকারি তহবিল থেকে শিক্ষা ও গবেষণা কাজের জন্য বিশেষ বাজেট বরাদ্দ করতে হবে। শুনেছি, চট্টগ্রাম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন একটি ইনোভেশন ল্যাব করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় অনুষদেও এমন একটি ল্যাবের অনুমোদন সম্প্রতি দেওয়া হয়েছে। সব বিশ্ববিদ্যালয়, বিশেষত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ধরনের ল্যাব অত্যাবশ্যকীয় হয়ে পড়েছে। সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তি খাতের সিএসআর থেকেও এসব কাজে অনুদান আরো বাড়াতে হবে। শিল্প ও করপোরেটের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততা আরো বাড়াতে হবে। ২০০৯ সালে ব্যাংকগুলো মাত্র ৬০ কোটি টাকার সিএসআর বাবদ খরচ করত, যা ছয় বছরে ৬০০ কোটি টাকায় আমরা উন্নীত করতে পেরেছিলাম। যে সমাজ থেকে উদ্যোক্তা ব্যবসা করছে, সেই সমাজের মানবশক্তির উন্নয়নে তারা এ ধরনের সামাজিক বিনিয়োগ না করলে স্বদেশ এগোবে কী করে?

চতুর্থত, আমাদের আরো দক্ষ হতে হবে। তরুণদের আমি বলি, ‘তোমরাই ম্যাজিশিয়ান।’ তোমরাই আগামীর বাংলাদেশ। সমস্যা সমাধানের পথ তোমাদেরই খুঁজতে হবে। সেখানেই পাবে নতুন উদ্ভাবনী প্রকল্প। সেটি তখনই সম্ভব, যখন তোমরা দক্ষ হবে। তোমরা স্বদেশের চাহিদা জানবে। কোথায় কী উৎপাদন করা হচ্ছে, তা-ও জানবে। এরপর নিজেরা উদ্যোগ নেবে নতুন কিছু করার জন্য। ‘ড্রিম ডিভাইজার’—এই প্ল্যাটফর্মটির এটি একটি বিশেষ দিক। তারা জানতে চায়। তারা বলে, জানাতে হলে আগে জানতে হবে। তারা শিখতে চায়। তাই প্রতিনিয়ত তারা একটি বই পড়ে। সবাই মিলে একটি হলেও বই শেষ করে। তারা নিজেরাই খেলাধুলা করে নিজেদের সজীব রাখে। এবং এমন সেমিনার, ট্রেনিং প্রায়ই তারা আয়োজন করে, অংশগ্রহণ করে। এভাবে সবারই মনের পরিবর্তন ঘটে।

সব শেষে বলতে চাই, এসব তখনই সম্ভব, যখন তোমরা অনেকে মিলে একসঙ্গে কাজ করবে। আমি বরাবরই বলে থাকি, সহনেতা তৈরি করতে হবে। তোমরা যেভাবে দুজনের স্বপ্নকে আড়াই শতাধিক তরুণের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়ে তাদের সহনেতা করতে পারছ, সেটিই কাঙ্ক্ষিত পথ। এভাবেই সবার জন্য সবাইকে উৎসর্গ করতে হবে। জাতির পিতা প্রচুর সহনেতা তৈরি করেছিলেন। সেই নেতৃত্বের গুণেই আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। দেশপ্রেম জাগ্রত করতে হবে তরুণদের মধ্যে। তাদের বলতে হবে, ‘দেশে জন্মালেই দেশ আপন হয় না। দেশকে জানতে হয়। দেশকে ভালোবাসতে হয়।’ হতাশার মাঝে আশার আলো দেখতে হবে। মনে রাখবে, সাফল্য এবং ব্যর্থতা মিলেই তুমি। ব্যর্থতা তোমায় নতুন করে চলার পথ দেখাবে। সাফল্য তোমায় এগিয়ে নিয়ে যাবে।

দেশপ্রেম, জাতীয়তাবাদ, অনগ্রসরতা থেকে এগিয়ে যাওয়ার শিক্ষার বীজ বুনে গিয়েছিলেন আমাদের জাতির পিতা এবং তাঁর সহনেতারা। তাঁরা মূলত সুশিক্ষার কথা বলেছিলেন। সুশিক্ষার মাধ্যমেই মূলত স্বপ্নকে ধরা যায়। ‘ড্রিম ডিভাইজার’ যেটিকে বলছে ‘সুশিক্ষায় স্বপ্নবুনন’ মডেল। কোনো একটি স্বপ্নকে তারা সুশিক্ষার মাধ্যমে পূরণ করার কথা বলে। তারা ইতিবাচক কনটেন্ট বানানোর মাধ্যমে সেই স্বপ্নের পক্ষে তরুণদের উদ্বুদ্ধ করে থাকে।

দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার অদম্য ইচ্ছাশক্তি সবার মধ্যে প্রতিষ্ঠা হওয়ার মধ্য দিয়েই মূলত সুন্দর সবুজ-সজীব বাংলাদেশকে আমরা খুঁজে পাব। এই স্বপ্ন আমরা সবাই দেখে থাকি। তাই বলছি, হে তরুণ! তোমরাই আগামীর বাংলাদেশ। তোমরাই আমাদের ভবিষ্যৎ।

লেখক : অর্থনীতিবিদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর

dratiur@gmail.com



মন্তব্য