kalerkantho

টাকার রং

মযহারুল ইসলাম বাবলা

১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



কাগজের মুদ্রা টাকার যে রং রয়েছে, সেটা আমাদের সবাই জানা। পরিমাণভেদে টাকার রংও ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। এই রং বৈচিত্র্যপূর্ণ তো বটেই এবং বহু রঙের সমাহারে। আমাদের আলোচ্য বিষয় দৃশ্যমান টাকার রং নিয়ে নয়, টাকাকে দুই পৃথক রঙে বিভক্তিকরণের সামাজিক আচার নিয়ে। বর্ণিল রঙের এই টাকাকে আমাদের সমাজে সচরাচর সাদা-কালো দুই পৃথক রঙে চিহ্নিত করার অলিখিত নিয়ম প্রচলিত ছিল ও রয়েছে। সেটা বহুকাল যুগ আগে থেকেই। অতীতে সামাজিক মান-মর্যাদার প্রশ্নটিও প্রচলিত টাকার রঙের ওপর নির্ভর করত। অর্থাৎ ব্যক্তির অর্থ বৈধ, না অবৈধ সেটা নির্ধারিত হতো ব্যক্তির অর্থ বা টাকা সাদা না কালো নির্ধারণের ভিত্তিতে। হঠাৎ বিত্তবান ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে কিংবা আয়ের সঙ্গে সম্পদ ও ব্যয়ের অসংগতিতে সামাজিক জীবনে ওই ব্যক্তিকে নিয়ে মানুষের কৌতূহল সৃষ্টি হতো। জন্ম দিত নানা জল্পনা-কল্পনার।

একসময় সমাজে অনৈতিক অপকর্ম-অপকীর্তি নিয়ে মানুষ সরব হয়ে উঠত। সমাজের সামাজিক শক্তপোক্ত ভিত্তি ছিল; যেটি উপেক্ষা করার শক্তি কোনো ব্যক্তির ছিল না। সামাজিক নিয়ম-নীতিতে সৎ ও স্বাভাবিক জীবনাচরণে মানুষ বাধ্য হতো। সমাজচ্যুতির ভয় ছিল বলেই মানুষ সমাজকে অগ্রাহ্য করতে পারত না। সমাজে তখনো অর্থনৈতিক বৈষম্য ছিল; কিন্তু আজকের মতো এতটা ব্যাপক ও নির্লজ্জভাবে ছিল না। সামাজিক মান-মর্যাদাকে মানুষ সমীহ-মান্য করত। এ বিষয়ে সবার কমবেশি সচেতনতা ছিল; যেটি আজ ছিটেফোঁটাও অবশিষ্ট নেই। সমাজবিচ্যুতির ভয় এখন কারো নেই। সমাজকে এখন কেউ গ্রাহ্য করে না। যে যার খুশি ও ইচ্ছানুযায়ী চলে। সামাজিক মানুষ এখন আর সামাজিক পরিমণ্ডলের বৃত্তে নেই। আত্মকেন্দ্রিকতায় নিমজ্জিত। ব্যক্তিগত উন্নতির পেছনে মানুষ অবিরাম ছুটছে। এই ছুটে চলার মধ্যে নীতি-নৈতিকতার ধার কেউ আর ধারে না। সবাই চায় ব্যক্তিগত উন্নতি। সেটা যেকোনো উপায়ে হোক। সামাজিক বিচ্ছিন্নতা আমাদের সমাজে এখন স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনকি পরিবারে পরিবারে পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছে।

সামাজিক মানুষ এখন আত্মকেন্দ্রিকতার বৃত্তে আটকে পড়েছে। ব্যক্তিগত উন্নতি ছাড়া আর কিছুই তার সামনে গ্রাহ্য নয়। নীতি, নৈতিকতা, দেশপ্রেম, মানবিকতা বিসর্জনে ব্যক্তিগত অর্থবিত্ত, ভোগ-বিলাসিতাই মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামষ্টিক দৃষ্টিভঙ্গির আকাল পড়েছে আমাদের সুবিধাভোগী শ্রেণির মধ্যে। অর্থনৈতিক উন্নতির অভিলাষে বৈধ-অবৈধ, অনৈতিকতার বিবেচনা করছে না। টাকা চাই, টাকা চাই, হেনতেন যেকোনো উপায়ে। শুধু নিজ উন্নতির অভিমুখে ছুটে চলা তো পুঁজিবাদী দর্শন। পুঁজিবাদ ব্যক্তির উন্নতির দর্শন, সমষ্টির নয়। আমাদের বিদ্যমান পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পুঁজিবাদী দর্শন সমাজের সর্বস্তরে বিস্তার লাভ করেছে। ব্যক্তিগত উন্নতির এই অভিযাত্রায় ধনীর সংখ্যা বেড়েছে বটে, দারিদ্র্যপীড়িতদের সংখ্যা কিন্তু কমেনি। বরং ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে অতীতের তুলনায়। মূল কারণটি চিহ্নিত করতে না পারলে পরিত্রাণের উপায় আমরা পাব কোথা থেকে!

টাকার সাদা ও কালো রঙের বিষয়টি রাষ্ট্রীয়ভাবেও দেখা হয়। রাষ্ট্রও সাদা ও কালো টাকা চিহ্নিত করে। দেশের এযাবৎকালের প্রায় সব সরকারের শাসনামলে কালো টাকাকে সাদায় পরিণত করার সুযোগ দেওয়া হয় কিছু শর্ত আরোপে। অর্থাৎ কালো টাকা রাষ্ট্রীয়ভাবে বৈধতা পেয়ে সাদায় পরিণত হতে পারে। রাষ্ট্রই যেখানে কালোকে সাদা রূপান্তরের সহজ সুযোগ করে দেয়, সেখানে সমাজের আর সাধ্য কী! সমাজ তো রাষ্ট্রেরই অধীন। রাষ্ট্র যেখানে অবাধে ছাড় দেয়, সমাজ তো সেখানে নিষ্ক্রিয় হতে বাধ্য। সমাজে এখন মান-মর্যাদা ও যোগ্যতা অর্থবিত্তের মাপকাঠিতে নির্ধারিত। কে কোন উপায়ে অর্থবিত্তের মালিক হয়েছে, সে বিবেচনাও করা হয় না।

আমাদের সামাজিক জীবনে মানবিক ও স্বাভাবিক মূল্যবোধও ক্রমান্বয়ে পাল্টে গেছে। অতীতের সমাজ আর বর্তমানের ক্ষয়িষ্ণু সমাজের বৈপরীত্য মোটা দাগে দৃশ্যমান। টাকাকে এখন আর সাদা-কালো বিভাজনে কেউ বিভাজিত করে না। টাকা টাকাই, সেটা আবার সাদা-কালো বলা কেন! কে কোন পথে কিংবা উপায়ে অর্থবিত্ত অর্জন করেছে, সেটা বিবেচ্য নয়। বরং ব্যক্তির আর্থিক অর্জনকেই যোগ্যতা বলে মান্য করা হয়।

টাকার রং নিয়ে সমাজে আর উচ্চবাচ্য কেউ করে না। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে করা হয় মাত্র। শর্তাধীনে সে ক্ষেত্রে পরিত্রাণের সুযোগও করে দেয় স্বয়ং রাষ্ট্রই। আয়বহির্ভূত অর্থকে আয়ভুক্ত বা বৈধতা প্রদান করার সুযোগ দেওয়া হয় রাষ্ট্রকে অর্থদণ্ড প্রদানে। অর্থাৎ কালো টাকাকে সাদায় রূপান্তর করার রাষ্ট্রীয় স্বাভাবিক (!) ব্যবস্থাধীনে। তাই এখন টাকার পরিমাণগত শব্দ ও রংই টাকার পার্থক্য নির্ধারণ করে, সাদা-কালোর বিভাজনে নয়। টাকা এখন টাকাই, সে যে উপায়ে অর্জিত হোক না কেন, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি লাভে বাধাগ্রস্ত হয় না। ঘৃণা-ধিক্কারের যোগ্যও থাকে না, বিপরীতে পায় নিষ্কণ্টক রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক স্বীকৃতি।

 

লেখক :  নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত

 


মন্তব্য