kalerkantho


বাংলাদেশে কিডনি রোগ, অঙ্গ প্রতিস্থাপন আইনের অসম্পূর্ণতা ও কিছু প্রস্তাব

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী

২০ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



বাংলাদেশে কিডনি রোগ, অঙ্গ প্রতিস্থাপন আইনের অসম্পূর্ণতা ও কিছু প্রস্তাব

সরকারি তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রায় দুই কোটি মানুষ বিভিন্ন প্রকার কিডনি রোগে ভুগছে এবং দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের (Chronic Kidney Disease) বিস্তার ক্রমেই বাড়ছে। দ্রুত নিয়মিত যথাযথ চিকিৎসা না হলে ক্রনিক কিডনি রোগ বিকল কিডনি রোগে (End Stage Renal Disease–ESRD/ Kidney Failure) পরিণত হয়। বিকল কিডনি রোগ ক্যান্সার, হৃদরোগ ও চোখের ছানি (Cataract) রোগের মতো একটি অসংক্রামক রোগ (Non Communicable Disease-NCD)। হৃদরোগ আক্রমণে (Heart Attack) মৃত্যুর তুলনায় চিকিৎসাবঞ্চিত বিকল কিডনি রোগীর মৃত্যুর আশঙ্কা দশ গুণ বেশি।

বিকল কিডনি রোগের কারণ

ছেলেবেলায় প্রায়ই খোসপাঁচড়া (Scabies), কিডনির প্রদাহ (Glomeruli nephritis), নেফ্রটিক সিনড্রোম (Nephrotic syndrome), পারিবারিক কিডনি রোগ, দীর্ঘদিন ধরে অত্যধিক ব্যথানাশক সেবন, ছোটখাটো রোগে প্রায়ই অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার, ঘন ঘন পরিবর্তন করে অপর্যাপ্ত মাত্রায় বিবিধ অ্যান্টিবায়োটিক সেবন, কিডনিতে পাথর, অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ ও বহুমূত্র রোগ (Diabetes), পর্যাপ্ত পানি পান না করা, পানিস্বল্পতা ও রক্তক্ষরণের দ্রুত সময়মতো চিকিৎসা না নেওয়া বিকল কিডনি রোগের মূল কারণ।

স্থূলতা (Obesity) উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস সৃষ্টিতে বিশেষ প্রণোদনা জোগায়। তদুপরি স্থূলতার দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ ও বিকল কিডনি সৃষ্টিতে প্রত্যক্ষ ভূমিকা আছে।

স্থূল ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে কিডনিকে রক্ত পরিশীলনের জন্য স্বাভাবিকের তুলনায় অতিরিক্ত শ্রম করতে হয় রক্ত পরিশোধনে এবং শরীরে মেটাবলিক (Metabolic) প্রয়োজন মেটানোর জন্য। স্থূলতা দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের সৃষ্টির উপাদান ও অন্যতম কারণ।

জলবায়ু পরিবেশের অবনতি ও ভেজাল খাদ্যগ্রহণ বিকল কিডনি রোগ বিস্তারের অন্যতম কারণ।

বিকল কিডনি রোগের প্রধান উপসর্গসমূহ

বমি বমি ভাব ও ক্ষুধামান্দ্য, রক্তস্বল্পতা ও শ্বাসকষ্ট, শরীরে পানি জমা (Oedema), উচ্চ রক্তচাপ, প্রস্রাব কমে যাওয়া ও প্রস্রাবে প্রোটিন নির্গমনের কারণে তীব্র গন্ধ ও ফেনা, কোনো চর্মরোগ ছাড়াই শরীর চুলকানো, শরীরের অংশবিশেষ কালচে হয়ে যাওয়া, বহুমূত্র, দুর্বলতা ও দৈনন্দিন শারীরিক কর্মক্ষমতা লোপ পাওয়া।

বিকল কিডনি রোগের চিকিৎসা

ডায়ালিসিস ও কিডনি প্রতিস্থাপনে (Kidney Transplant) বিকল কিডনি রোগের চিকিৎসা সীমাবদ্ধ। বহুল প্রচলিত সহজ চিকিৎসা হচ্ছে হাসপাতাল বা ক্লিনিকে চার ঘণ্টা অবস্থান করে সপ্তাহে দু-তিনবার রক্ত পরিশোধন করে কয়েক লিটার পানি ও ক্ষতিকর পদার্থবিশেষ এক সূক্ষ্ম পরিশোধন যন্ত্রে বের করা।

ডায়ালিসিসের (Haemodialysis) পদ্ধতিতে চিকিৎসা কষ্টকর নয়, তবে খরচ আকাশচুম্বী। কেন্দ্রভেদে মাসে খরচ হয় ৪০ হাজার থেকে লাখ টাকা। বিশেষ পরিশোধন যন্ত্র ব্যতিরেকে কোনো হাসপাতাল বা ডায়ালিসিস সেবাকেন্দ্রে না গিয়ে নিজ বাড়ি বা অফিসে বসে বিকল কিডনি রোগী সরাসরি নিজে পেটের অন্তঃস্থ আবরণের (Peritoneum) ভেতর বিশেষ ধরনের ফ্লুয়িড প্রবেশ করিয়ে শরীরের নিজস্ব ফ্লুয়িড পরিশোধন করে শরীরের ক্ষতিকর বা অপ্রয়োজনীয় পদার্থগুলো বের করা যায়। এই ডায়ালিসিস পদ্ধতির নাম CAPD ক্রমাগত পেরিটোনিয়াল ডায়ালিসিস (Contineus Ambulatory Peritoneal Dialysis: CAPD)।

পদ্ধতিটি সহজ; কিন্তু ব্যয়বহুল। সরকারি শুল্ক সুবিধা না থাকার কারণে প্রতি মাসে এ পদ্ধতিতে পরিশোধন ব্যয় ৪০ হাজার টাকার বেশি। তদুপরি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিশুদ্ধ পরিবেশে CAPD গ্রহণ না করলে পেটের অভ্যন্তরীণ আবরণে ভয়ানক প্রদাহ ‘পেরিটোনাইটিস’ (Peritonitis) হওয়ার আশঙ্কা সমধিক থাকে।

দেশের প্রখ্যাত কিডনি রোগবিশারদ অধ্যাপক হারুনুর রশীদের হিসাবে দেশে প্রায় ৮০ হাজার বিকল কিডনি রোগী ডায়ালিসিস চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত। বাংলাদেশে ১৩টি সরকারি ডায়ালিসিস সেন্টার ও ১২৫টি বেসরকারি কেন্দ্রে ডায়ালিসিস সুবিধা আছে। যারা চিকিৎসা নেয়, তাদের মধ্যে আর্থিক দীনতার কারণে ৯০ শতাংশের বেশি রোগী তিন বছরের মাথায় চিকিৎসা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় এবং মৃত্যুমুখে পতিত হয়।

কিডনি প্রতিস্থাপন

বিকল কিডনির উত্তম চিকিৎসা হচ্ছে সুস্থ ব্যক্তি থেকে একটি কিডনি সংগ্রহ করে বিকল কিডনি রোগীর শরীরে প্রতিস্থাপন (Transplant)।

বাংলাদেশে অন্যূন ১০ হাজার বিকল কিডনি রোগী প্রতিবছর কিডনি প্রতিস্থাপন দ্বারা স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারে। দুর্ভাগ্যবশত বাংলাদেশে মাত্র ১০টি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে বছরে দুই শর অনধিক কিডনি প্রতিস্থাপন (Transplant) হয়ে থাকে।

বাংলাদেশে ১৯৮২ সালে আইপিজিএমআরে প্রথম কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট শুরু হয়েছিল। বিগত ৩৪ বছরে ১০টি ট্রান্সপ্লান্ট সেন্টারে প্রায় এক হাজার ৬০০ কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। বিগত ৯ বছরে সফলভাবে সুলভে সবচেয়ে বেশি কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়েছে শ্যামলীর সেন্টার ফর কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি হাসপাতালে (CKDU)

বিগত ৯ বছরে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি কিডনি প্রতিস্থাপন করেছেন অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম, MBBS, FCPS, MS (Urology), FRCS (Urology)। তিনি ২০১৬ সালে ৮৪টি সফল কিডনি প্রতিস্থাপন করেছেন।

কিডনি প্রতিস্থাপন খুব বেশি কঠিন শল্যচিকিৎসা নয়, মহাকাশ বিহোন নয়তো বটে। প্রথমত, সুস্থ দাতা ব্যক্তিকে কাত করে শুয়ে পেট কেটে দাতার দুটি সুস্থ কিডনির একটি কিডনি বের করে এনে যথাস্থানে সেলাই করে দেওয়া হয়। এতে এক ঘণ্টার অনধিক সময় লাগে।  লেপোরেস্কপিক পদ্ধতি অনুসরণ করলে আধাঘণ্টার মতো সময় প্রয়োজন হয়।

পরবর্তী সময়ে ভিন্ন অপারেশন থিয়েটারে গ্রহীতা বিকল কিডনি রোগীর পেটের নিম্নদেশে কেটে দাতার কিডনি স্থাপন করা হয় এবং দাতার কিডনির শিরা ও ধমনি গ্রহীতার অন্যতম রক্ত সরবরাহ নালি এক্সটার্নাল ইলিয়াক শিরা ও ধমনির সঙ্গে এবং দাতার কিডনির সঙ্গে গৃহীত প্রস্রাব নালি ইউরেটারকে মূত্রথলিতে ধীরেসুস্থে স্থাপন করা হয়। এতে প্রায় দেড় ঘণ্টা সময় ব্যয় হয়।

কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর ন্যূনতম ৩০০ কোটি টাকা পাচার

বাংলাদেশে প্রতিবছর নতুন ৪৫ হাজার বিকল কিডনি রোগীর চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে প্রতিবছর অন্যূন ১০ হাজার  বিকল কিডনি রোগী কিডনি প্রতিস্থাপন সাধারণত চিকিৎসা দ্বারা উপকৃত হতে পারে। বাংলাদেশে দুই থেকে পাঁচ লাখ খরচ করে কিডনি প্রতিস্থাপন করা যায়। তবে দু-তিনটি প্রাইভেট হাসপাতালে ১০-১২ লাখ টাকা খরচ লাগতে পারে। ভারত ও শ্রীলঙ্কায় ৩০ লাখ টাকা খরচ পড়ে। সিঙ্গাপুর ও যুক্তরাষ্ট্রে কিডনি ট্রান্সপ্লান্টে দুই কোটি টাকা খরচ হয়। বাংলাদেশে ১০টি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে বছরে দুই শর অনধিক কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়। প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও এত কম কিডনি প্রতিস্থাপনের মূল কারণ দেশে বিদ্যমান ১৯৯৯ সালের মানবদেহে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আইনের অসংগতি ও সংকীর্ণতা। দ্বিতীয়ত, জনসাধারণের অঙ্গদান সম্পর্কে অজ্ঞতা ও অহেতুক ভীতি। তৃতীয়ত, দানের মতো একটি মহৎ কাজে নাগরিকদের উৎসাাহিত করার জন্য সরকারের কোনো প্রণোদনা ও প্রচারণা নেই।

যেসব অন্তঃস্থ অঙ্গ একাধিক আছে তার একটি কাউকে দান করা যে প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকার, তা স্বীকৃতি প্রদানে সরকারের শুধু অনীহা নয়, বরং ভুল আইন সৃষ্টি করে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।

জীবনের তাগিদে, সুস্থভাবে বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষায় বছরে কম করে হলেও এক হাজার বিকল কিডনি রোগী বাংলাদেশ থেকে দাতা সঙ্গে নিয়ে ভারত, শ্রীলঙ্কা, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাষ্ট্র প্রভৃতি দেশে গিয়ে কিডনি প্রতিস্থাপন করে আসছে।

এতে প্রতি রোগীর কম করে হলেও ৩০ লাখ টাকা খরচ হয়।

প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে আনুমানিক ৩০০ কোটি টাকা কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য বিদেশে পাচার হচ্ছে। কী করণীয়?

মানবদেহে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন, ১৯৯৯-এর বৈশিষ্ট্য ও অসম্পূর্ণতা

জনগণের কল্যাণে মানবদেহে অন্যের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংযোজন বিধান করার উদ্দেশ্যে সৃষ্ট বিধানটি ১৩ এপ্রিল ১৯৯৯ (৩০ চৈত্র ১৪০৫) তারিখে রাষ্ট্রপতির সম্মতি লাভ করে আইনে পরিণত হয়। এটি ১৯৯৯ সালের ৫ নম্বর আইন রূপে পরিচিত। দুর্ভাগ্যবশত উপরোক্ত আইন অসম্পূর্ণ এবং এর পরিধি সীমিত বলে রোগগ্রস্ত বৃহত্তর জনগোষ্ঠী সৃষ্ট আইনের মূল উদ্দেশ্য ও সুফল থেকে বঞ্চিত এবং ব্যাপকসংখ্যক রোগী প্রয়োজনীয় অঙ্গ প্রতিস্থাপন (Transplant) সুবিধা থেকে বঞ্চিত।

আইনটি অসম্পূর্ণ বলে কিছু মধ্যস্বত্বভোগী দালাল শ্রেণির ব্যক্তি সহজে গ্রামের সরল মানুষকে প্রতারণা করে আইনের সীমাবদ্ধতার সুযোগ নিয়ে ভিন্ন দেশে নিয়ে গিয়ে অঙ্গ কেনাবেচা করে।

মানবদেহে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আইন, ১৯৯৯-এর ১১টি ধারা আছে।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ধারা-৩ হচ্ছে জীবিত ব্যক্তির অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দানসংক্রান্ত।

সুস্থ ও সাধারণ জ্ঞানসম্পন্ন যেকোনো ব্যক্তি তার দেহের এমন কোনো অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, যা বিযুক্তির কারণে তার স্বাভাবিক জীবনযাপনে ব্যাঘাত সৃষ্টির আশঙ্কা নেই, তা তার কোনো নিকটাত্মীয়র দেহে সংযোজনের জন্য দান করতে পারবে।

‘তবে শর্ত থাকে যে নিম্নবর্ণিত ব্যক্তিরা তাহাদের দেহের শুধু অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দান করিতে পারিবেন না, যথা—

৩(ক) : ১৮ বৎসরের কম বয়স্ক ব্যক্তি, তবে রিজেনারেটিভ টিস্যুর ক্ষেত্রে যদি দাতা ও গ্রহীতাগণ ভাই-বোন সম্পর্কের হোন, এই শর্ত কার্যকর হইবে না।

৩(খ) : এইরূপ ব্যক্তি যাহার টিস্যু HbsAg, Anti H –C, V অথবা HIV পজিটিভ এবং

৩(গ) : মেডিক্যাল বোর্ড কর্তৃক এই ধারার উদ্দেশ্যে দান করার অযোগ্য বলে ঘোষিত হয় কোনো ব্যক্তি।

২(গ) : ধারায় নিকটাত্মীয়র সংজ্ঞায় বলা হয়েছে,

নিকট-আত্মীয় অর্থ পুত্র, কন্যা, পিতা, মাতা, ভাই, বোন ও রক্ত সম্পর্কিত আপন চাচা, ফুফু, মামা, খালা ও স্বামী-স্ত্রী।

৪ ধারা : মৃত ব্যক্তির অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিযুক্তকরণ সম্পর্কিত।

৫ ধারা : ব্রেইন ডেথ ঘোষণা সম্পর্কিত।

৬ ধারা : অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দাতা ও গ্রহীতার যোগ্যতা—(১)  কোনো ব্যক্তির অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অন্য কোনো দেহে সংযোজনযোগ্য হইবে না, যদি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দাতার—

৬ (১) (ক) :  মৃত ব্যক্তির ক্ষেত্রে বয়স দুই বৎসরের কম অথবা পঁয়ষট্টি বৎসরের ঊর্ধ্বে হয় এবং জীবিত ব্যক্তির ক্ষেত্রে ১৮ বৎসরের ঊর্ধ্বে হয়।

৬ (১) (খ) : সংশ্লিষ্ট অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কার্যকারিতা কোনো কারণে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

৬ (১) (গ) : কতক নির্ধারিত রোগাক্রান্ত হইলে।

৬ (২) : যে ব্যক্তির দেহে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংযোজন করা হইবে তাহাকে—

(ক) : তাহাকে দুই বৎসর হইতে সত্তর বৎসর বয়সসীমার মধ্যে হইতে হইবে, তবে পনেরো বৎসর হইতে পঞ্চাশ বৎসর পর্যন্ত বয়সসীমার ব্যক্তিরা অগ্রাধিকার লাভ করিবেন।

(খ) : যে সকল রোগের কারণে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংযোজনের সামান্য বিঘ্নিত হইতে পারে, সে সকল রোগ হইতে মুক্ত হইতে হইবে এবং—

(গ) : মেডিক্যাল বোর্ড কর্তৃক এতদুদ্দেশ্যে যোগ্য বলিয়া বিবেচিত হইতে হইবে। 

৭ ধারা : মেডিক্যাল বোর্ড গঠন সম্পর্কিত।

৮ ধারা : প্রত্যেক মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল, মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, পোস্টগ্র্যাজুয়েট চিকিৎসা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট হাসপাতাল এবং গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত ও মরণাপন্ন রোগীর চিকিৎসা করা হয়—এমন চিকিৎসালয়ে প্রয়োজনীয় তথ্যাবলি সংরক্ষণ রেজিস্টার সম্পর্কিত।

৯ ধারা : অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ক্রয়-বিক্রয় নিষিদ্ধসংক্রান্ত।

১০ ধারা-দণ্ড : এই আইনের বিধান লঙ্ঘনকারী বা লঙ্ঘনে সহায়তাকারী ব্যক্তি ও চিকিৎসক সর্বোচ্চ সাত বৎসর অন্যূন তিন বৎসর সশ্রম কারাদণ্ড অথবা তিন লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় প্রকারের দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন। চিকিৎসকদের ক্ষেত্রে তাহার রেজিস্ট্রেশন বাতিল হইবে।

মানবদেহে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন, ১৯৯৯-এর প্রস্তাবিত সংস্কার ও সংশোধনী

সাধারণ মানুষকে প্রতারণা থেকে রক্ষা করা এবং বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে সংবিধান মোতাবেক অতিরিক্ত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রচলিত আইনটির সংস্কার ও সংশোধনের সুপারিশ করা হচ্ছে।

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ প্রতিস্থাপন (Transplant) একটি বিজ্ঞান স্বীকৃত জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসাপদ্ধতি। অঙ্গ প্রতিস্থাপন জীবন রক্ষাকারী তো বটেই, এতে অভাবনীয় আর্থিকও সাশ্রয় হয়।

১৮ বছর বা ততোধিক বয়সের বাংলাদেশের যেকোনো সচেতন সুস্থ নাগরিক, যিনি বুদ্ধি-বিবেচনায় অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দান বিষয়ে যুক্তিসংগত বিবেচনা (Informed consent) দিতে সক্ষম, তিনিই অঙ্গদানের অধিকার রাখেন। তবে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অঙ্গদানে সম্মতি গ্রহণযোগ্য হবে না।

অঙ্গদান প্রত্যেক নাগরিকের মানবিক ও মৌলিক অধিকার। একজন নাগরিক যেমন টাকা দান করতে পারে, জমি দান করতে পারে, সম্পত্তি বা কম্পানি শেয়ার দান করতে পারে, রক্ত দান করতে পারে; ঠিক তেমনি নিজের অসুবিধা না করে দুটি অঙ্গের একটি দান করতে পারে। এটা তার নাগরিক অধিকার। এরূপ দানকে উৎসাহিত করতে হবে এবং অঙ্গদাতাকে সম্মান দিতে হবে।

সংশোধনীসমূহ

৩ ধারার ‘নিকটাত্মীয়র’ স্থলে যেকোনো প্রাপ্তবয়স্ক সুস্থ নাগরিক সংযোজন করা প্রয়োজন।

৬ (১) (ক) : স্থলে ভ্রূণ হইতে ৮০ বৎসর পর্যন্ত সংশোধন প্রয়োজন।

৬ (২) (ক) স্থলে অঙ্গগ্রহীতার বয়স মাতৃগর্ভস্থ ভ্রূণ হইতে ৯০ বৎসর পর্যন্ত বয়সসীমার মধ্যে হইতে হইবে। তবে কম বয়সীরা অগ্রাধিকার লাভ করিবেন।

৭ ধারা—মেডিক্যাল বোর্ডসংক্রান্ত : অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক সহকারী অধ্যাপক অথবা ১০ বৎসরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন যেকোনো বিভাগের বিশেষজ্ঞ (Consultant) দ্বারা স্থানীয় জেলা পর্যায়ে মেডিক্যাল বোর্ড গঠিত হইবে।

৮ ধারা : চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানের তালিকায় বাংলাদেশের জেলা সকল হাসপাতাল এবং উন্নত বেসরকারি হাসপাতালসমূহ অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।

‘ব্রেইন ডেথের’ আধুনিক সংজ্ঞা প্রযোজ্য হইবে।

মেডিক্যাল বোর্ড গঠন সম্পর্কিত ধারায় সংশোধিত হইবে—

কেন্দ্রীয় রেজিস্ট্রেশন কর্তৃপক্ষ (Central Registration Authority)

অত্র আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিতকরণ, জীবিত বা মৃত ব্যক্তির অঙ্গদান, কোনো জীবিত ব্যক্তির অকেজো অংশের বিচ্ছেদ করে নতুন অঙ্গ সংযোজন সম্পর্কিত আইনের পরিপ্রেক্ষিতে উদ্ভূত সমস্যা নিরসন এবং সকল অঙ্গদাতা ও গ্রহীতার পূর্ণ তথ্য সঠিকভাবে সংরক্ষণের জন্য কেন্দ্রীয় রেজিস্ট্রেশন কর্তৃপক্ষ (Central Registration Authority) সৃষ্ট হলো। এ কর্তৃপক্ষের চেয়ারপারসন এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হবেন একজন অবসরপ্রাপ্ত মেডিক্যাল শিক্ষক বা অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, ভোক্তা সংগঠনের প্রধান কিংবা খ্যাতনামা পাবলিক হেলথ স্পেশিয়ালিস্ট অথবা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অবসরপ্রাপ্ত সচিব বা অতিরিক্ত সচিব। তিনি তিন বৎসরের জন্য নিযুক্ত হবেন। তিনি নির্ধারিত বেতন-ভাতা ও গাড়ির সুবিধা পাবেন। তাঁর একটা ছোট অফিস ও আধুনিক ল্যাবরেটরি থাকবে, যেখানে সকল দাতা ও গ্রহীতার সকল তথ্য সংরক্ষিত থাকবে। ল্যাবরেটরিতে প্রয়োজনীয়সংখ্যক বিজ্ঞানী ও টেকনিশিয়ান থাকবেন।

চেয়ারপারসনকে সহায়তা করার জন্য ৭-১১ সদস্যের একটি অবৈতনিক নির্বাহী পরিষদ থাকবে। খ্যতিমান  চিকিৎসক, অবসরপ্রাপ্ত বিচারক (জেলা জজের নিম্ন পদের নয়) সমাজসেবী, আইনবিশারদ, সুধীসমাজের নেতা, এনজিওকর্মী প্রমুখ দ্বারা নির্বাহী পরিষদ গঠিত হবে। নির্বাহী পরিষদে অন্যূন তিনজন মহিলা সদস্যা থাকবেন।

কর্তৃপক্ষের কর্মপরিধি

১) কর্তৃপক্ষের কার্যাবলি পরিচালনা করার জন্য কেন্দ্রীয় রেজিস্ট্রেশন কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় বিধিমালা তৈরি করে প্রয়োগ করতে পারবেন। অপ্রয়োজনীয় বিধিমালা বাতিলও করতে পারবেন। ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে এই আইনের সংশোধনের জন্য স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সরকারকে জ্ঞাত করাবেন।

 

২) অঙ্গপ্রত্যঙ্গ গ্রহণে আগ্রহী রোগাক্রান্ত ব্যক্তি নির্ধারিত ফরমে কেন্দ্রীয় রেজিস্ট্রেশন কর্তৃপক্ষ এবং নিজের পছন্দমতো হাসপাতালে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে নাম লিপিবদ্ধ ( Register) করবেন।

৩) অঙ্গদানে আগ্রহী ব্যক্তি কেন্দ্রীয় রেজিস্ট্রেশন কর্তৃপক্ষের অফিসে নিজে উপস্থিত হয়ে নিজের নাম, ঠিকানা প্রভৃতি লিপিবদ্ধ করবেন।

রেজিস্টার প্রত্যেক মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল, মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, পোস্টগ্র্যাজুয়েট চিকিৎসা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট হাসপাতাল এবং গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত বা মরণাপন্ন রোগীদের চিকিৎসা করা হয় এইরূপ অন্যান্য চিকিৎসালয়ে নিম্নবর্ণিত তথ্যাবলিসংবলিত একটি রেজিস্টার সংরক্ষণ করতে হবে, যথা :

(ক) অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংযোজন গ্রহীতার রক্তের গ্রুপ ও টিস্যু টাইপসহ সকল প্রয়োজনীয় তথ্য সংরক্ষিত থাকবে। একটা কপি কেন্দ্রীয় রেজিস্ট্রেশন কর্তৃপক্ষের তথ্যভাণ্ডারে সংরক্ষিত থাকবে।

(খ) অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দাতার রক্তের গ্রুপসহ তার নিজের ও আইনানুগ উত্তরাধিকারীর সকল প্রয়োজনীয় তথ্য।

(গ) সকল প্রতিস্থাপন (Transplant), টিস্যু টাইপিং, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংযোজন সম্পর্কে জনসাধারণের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রতিস্থাপন প্রতিষ্ঠানসমূহের মান, সংরক্ষণ ও তদারকির পূর্ণ দায়িত্ব বর্তাবে কেন্দ্রীয় রেজিস্ট্রেশন কর্তৃপক্ষের (Central Registration Authority) ওপর।

ওই অফিসের যাবতীয় খরচ ও অঙ্গদাতাকে পুরস্কৃত করার জন্য সম্মানী ভাতার জন্য প্রয়োজনীয় তহবিল জাতীয় স্বাস্থ্যের উন্নতিকল্পে সরকারি কোষাগারে থেকে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হবে। অত্র অফিসকে করপোরেট সংস্থা, কম্পানি ও ব্যক্তির দান গ্রহণ এবং লটারি প্রভৃতি পদ্ধতির মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের অধিকার দেওয়া গেল। অঙ্গদানে জনসাধারণকে উৎসাহিত করার জন্য কেন্দ্রীয় রেজিস্ট্রেশন কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন প্রকার সভার আয়োজন করবে। পত্রপত্রিকায় তথ্য প্রকাশ করবে এবং বিভিন্নভাবে জনগণকে অঙ্গদানে উদ্বুব্ধ করবে।

সকল অঙ্গগ্রহীতার কাছ থেকে তার সামাজিক শ্রেণিগত অবস্থানের ভিত্তিতে  অঙ্গ ব্যবস্থাপনার জন্য ফি ধার্য করতে পারবে। অঙ্গদাতা তার শারীরিক সুস্থতা ও পুষ্টির জন্য সরকারের পক্ষ থেকে সম্মান ও নগদ অর্থ পাবে এবং সারা জীবন যেকোনো সরকারি হাসপাতালে বিনা মূল্যে স্বাস্থ্যসেবার অধিকার অর্জন করবে। নগদ অর্থের পরিমাণ পাঁচ লাখ টাকার কম হবে না। কোনো অঙ্গদাতা সরকারি সম্মানী ভাতা গ্রহণ না করে পুরো বা আংশিক অর্থ তাহা কেন্দ্রীয় রেজিস্ট্রেশন কর্তৃপক্ষের তহবিলে দান করতে পারবে। কেন্দ্রীয় রেজিস্ট্রেশন কর্তৃপক্ষের তহবিলে সকল দান আয়করমুক্ত হবে। অঙ্গগ্রহীতার নিবন্ধন ফি এবং অঙ্গদাতার সম্মানী ভাতা কেন্দ্রীয় রেজিস্ট্রেশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিষদ স্থির করবে।  

নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান (Government Enlisted Institute) : অঙ্গ প্রতিস্থাপনে আগ্রহী জেনারেল বা বিশেষায়িত হাসপাতাল, যেখানে বড় সার্জারির উপযোগী অপারেশন থিয়েটার, অ্যানেসথেশিয়া ফ্যাসিলিটি, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিসমৃদ্ধ ICU, ডায়াগনস্টিক প্যাথলজি ও টিস্যু টাইপিং ল্যাবরেটরি, ডায়াগনস্টিক রেডিওলজি ও আলট্রাসনোগ্রাফি ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের ন্যূনপক্ষে সার্বক্ষণিক দুজন করে বিশেষজ্ঞ শল্যবিশারদ সার্জন, ইউরোলজিস্ট ও অ্যানেসথেটিস্ট, সার্বক্ষণিক মেডিসিন ও কার্ডিওলজি বিশেষজ্ঞ আছেন, এরূপ জেনারেল ও বিশেষায়িত হাসপাতাল অঙ্গ প্রতিস্থাপন সার্জিক্যাল কেন্দ্র হিসেবে নিবন্ধিত হতে পারবে। সকল প্রতিস্থাপন সার্জারির জন্য অঙ্গদানকারী ও অঙ্গগ্রহীতা ব্যক্তির পুরো ডাকনাম ও ঠিকানা এবং স্বাস্থ্যসংক্রান্ত পূর্ণ বিবরণ সংরক্ষণ করার নিশ্চয়তা নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানে থাকবে।

নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও অঙ্গদান কেন্দ্রীয় রেজিস্ট্রার অফিসে জমা দেবেন। নিবন্ধিত হাসপাতালগুলোর তদারকির দায়িত্ব কেন্দ্রীয় রেজিস্ট্রেশন কর্তৃপক্ষের ওপর বর্তাবে।

 

লেখক : ট্রাস্টি, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র



মন্তব্য