kalerkantho


রাষ্ট্রভাষার প্রতি অবহেলা ও ভাষান্তরের প্রবণতা

মো. জাকির হোসেন

২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



রাষ্ট্রভাষার প্রতি অবহেলা ও ভাষান্তরের প্রবণতা

বুকের রক্ত দিয়ে হায়েনাদের জবরদস্তি থেকে মায়ের ভাষাকে রক্ষা করার ইতিহাস পৃথিবীতে বিরল। আবার রক্তমূল্যে কেনা মায়ের ভাষার প্রতি এত অনাদর আর অবহেলার ঘটনাও বিশ্ব চরাচরে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। আমি বাংলা ভাষার কথা বলছি। বাংলা ভাষার প্রতি আমাদের অনাদর আর অবহেলার সুযোগে ইংরেজি ভাষার দাসত্ব আমাদের সত্তা আর স্বতন্ত্র পরিচিতিকে একদিকে যেমন গিলে খেতে চাইছে, অন্যদিকে ভাষান্তরিত হওয়ার একটি প্রবণতাও ক্রমাগতই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বাংলা ভাষার প্রতি আমাদের দরদ অনেকাংশেই আনুষ্ঠানিকতার ফাঁদে আটকা পড়েছে। ‘মোদের গরব, মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা’ ওষ্ঠসেবার মধ্যে সীমিত হয়ে পড়ছে। গরব আর মর্যাদার জায়গা এখন বাংলা নয়, ইংরেজি ভাষা। বাংলার চেয়ে ইংরেজিকে মোক্ষ জ্ঞান করে আমাদের অনেকেই। ইংরেজি বলতে পারলে ভালো চাকরি মেলে। ইংরেজি যেখানে অনেক মুশকিল আসান করে দেয়, সেখানে বাংলার শক্তি ক্রমাগত ফুরাবেই—এ সত্যি অস্বীকার করার জো নেই। প্রতিদিন মুঠোফোনে যে খুদে বার্তাগুলো পাই তার বেশির ভাগ ইংরেজি ভাষার বর্ণমালা দিয়ে লেখা।

ভিন্ন কোনো ভাষার বর্ণমালা দিয়ে বিশেষ কোনো ভাষা লিখতে গেলে কী বিপর্যয় ঘটতে পারে, তার উদাহরণ পাওয়া যাবে বলিভিয়ার ভাষা থেকে। বলিভিয়ার মানুষ প্রধানত Quechua, Aymara ও Guarani ভাষায় কথা বলত। ষোড়শ শতাব্দীতে বলিভিয়ার খনিজ সম্পদ তেল ও সিসার আকর্ষণে যখন স্প্যানিশরা দলে দলে বলিভিয়ায় ঢুকে পড়ল, তখন দেখা দিল ভয়ংকর ভাষাবিপর্যয়। স্প্যানিশ ভাষায় লেখা হতে লাগল বলিভিয়ার মানুষের মনের ভাব। কয়েক বছরের মধ্যে স্প্যানিশ, আয়মারা, কুয়েছুয়া ও গুয়ারনি ভাষার মিশ্রণে সৃষ্টি হলো অদ্ভুত এক খিচুড়ি ভাষা। এক পরিসংখ্যান বলছে, বলিভিয়ার এক কোটি মানুষের মধ্যে আজ মাত্র ১০ লাখ মানুষ নিজেদের ভাষা ব্যবহার করে, বাকিরা চলে খিচুড়ি ভাষায়। স্প্যানিশ ভাষা দখল করে নিয়েছে Quechua, Aymara, Guarani ভাষার স্থান। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের লক্ষ্যে Quechua, Aymara, Guarani ভাষা পুনরুজ্জীবনের জন্য বলিভিয়া সরকার ভাষা প্রশিক্ষণ বৃত্তি ঘোষণা করে। এতেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন না হওয়ায় সরকার প্রাথমিক শিক্ষা থেকে বিশ্ববিদ্যালয় সর্বত্র Quechua, Aymara ও Guarani ভাষায় শিক্ষাদান প্রচলন করেছে। এর পরও অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্প্যানিশ ভাষার বদলে Quechua, Aymara ও Guarani ভাষায় শিক্ষাদানের সরকারি এ উদ্যোগ মেনে না নেওয়ায় ২০০৭ সালে বলিভিয়া সরকার স্কুল কর্তৃপক্ষ বরাবর নির্দেশনা জারি করে যে Quechua, Aymara ও Guarani ভাষা শিক্ষা নিশ্চিত করা না হলে সে স্কুল সরকারি স্বীকৃতি পাবে না। ইংরেজি ভাষার বর্ণমালা দিয়ে যেভাবে বাংলা লেখা হচ্ছে, দেশের সবকটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়সহ অনেক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয়ে ইংরেজি ভাষায় শিক্ষাদান বাধ্যতামূলক করে যে জগাখিচুড়ি অবস্থা তৈরি হয়েছে তাতে আমাদেরও বলিভিয়ার ভাগ্য বরণ করতে হয় কি না সে শঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

 

রাষ্ট্রভাষা বাংলার প্রতি আমাদের অনাদর-অবহেলা ও বাংলা থেকে ভাষান্তরিত হওয়ার প্রবণতা যেসব বিষয়ের দিকে লক্ষ করলে সহজেই উপলব্ধি করা যায়, তা হলো এক. ১৯৭১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমির একুশের অনুষ্ঠানমালা উদ্বোধনকালে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমাদের হাতে যেদিন ক্ষমতা আসবে সেদিন থেকেই সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু হবে। সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু করতে গিয়ে সে বাংলা যদি ভুল হয় তবে পরে সংশোধন করে নেওয়া হবে। ’ কথা রেখেছিলেন বঙ্গবন্ধু। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে বাংলা প্রচলনে উদ্দীপনা দেখা দিয়েছিল। শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ আস্থা তৈরি হয়েছিল যে বাংলা শিখলে চাকরি পাওয়া যাবে, মিলবে সামাজিক-অর্থনৈতিক স্বীকৃতি। তাই বাংলা শেখার আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছিল চতুর্দিকে। ১৯৭৫ সালের ১২ মার্চ রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক আদেশে বলেন, ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। বাংলা আমাদের জাতীয় ভাষা। তবুও অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে লক্ষ করেছি যে স্বাধীনতার তিন বছর পরও অধিকাংশ অফিস-আদালতে মাতৃভাষার পরিবর্তে বিজাতীয় ইংরেজি ভাষায় নথিপত্র লেখা হচ্ছে। মাতৃভাষার প্রতি যার ভালোবাসা নেই, দেশের প্রতি যে তার ভালোবাসা আছে এ কথা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। দীর্ঘ তিন বছর অপেক্ষার পরও বাংলাদেশের বাঙালি কর্মচারীরা ইংরেজি ভাষায় নথিতে লিখবেন, সেটা অসহনীয়। এ সম্পর্কে আমার পূর্ববর্তী নির্দেশ সত্ত্বেও এ ধরনের অনিয়ম চলছে। আর এ উচ্ছৃঙ্খলতা চলতে দেওয়া যেতে পারে না। এ আদেশ জারি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সব সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা ও আধাসরকারি অফিসসমূহে কেবলমাত্র বাংলার মাধ্যমে নথিপত্র ও চিঠিপত্র লেখা হবে। এ বিষয়ে কোনো অন্যথা হলে উক্ত বিধি লঙ্ঘনকারীকে আইনানুগ শাস্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। বিভিন্ন অফিস-আদালতের কর্তাব্যক্তিগণ সতর্কতার সঙ্গে এ আদেশ কার্যকর করবেন এবং আদেশ লঙ্ঘনকারীদের শাস্তি বিধান ব্যবস্থা করবেন। ’ কিন্তু পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর অন্য অনেক বিষয়ের মতো বিপরীতমুখিতা সৃষ্টি হয় বাংলার ক্ষেত্রেও। বাংলাদেশ বেতার, চালনা বন্দর, পৌরসভা, রাষ্ট্রপতি প্রভৃতি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে রেডিও বাংলাদেশ, পোর্ট অব চালনা, মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন, প্রেসিডেন্ট হয়ে উঠতে থাকে। বাংলার মর্যাদা হ্রাস করা হয়, সেই সঙ্গে ক্রমেই কমতে থাকে বাংলার অর্থমূল্য আর বাড়তে থাকে ইংরেজির কদর। রাষ্ট্র ঔপনিবেশিক কায়দায় পুনরায় ইংরেজিমুখী হয়ে ওঠে। ইংরেজির অর্থমূল্য বাড়ার প্রক্রিয়ায় শহরের অলিগলি থেকে গ্রামের ধান ক্ষেত পর্যন্ত বিস্তৃত হতে শুরু করে ইংরেজি মাধ্যমের কিন্ডারগার্টেন। ইংরেজি ভাষার প্রতি প্রীতি দোষের কিছু নয়, কিন্তু বাংলাকে বিসর্জন বা নির্বাসন দেওয়া অবশ্যই অপরাধ। তদুপরি বাংলাকে বাদ দিয়ে ভালোভাবে ইংরেজি শেখা যাবে কি? এসএসসিতে জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থী আমি জিপিএ ৫ পেয়েছি এর ইংরেজি অনুবাদ করতে গিয়ে ‘আই অ্যাম জিপিএ ফাইভ’ বলায় এত সমালোচনা হচ্ছে, অথচ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, বিশেষ করে হাতেগোনা কয়েকটি বাদ দিলে অন্যান্য প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ইংরেজির অবস্থা কী তা বিবেচনা করে দেখেছেন কি? কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের ইংরেজি লেখা উত্তরপত্র যদি আপনি দেখেন মূর্ছা যাবেন। ভয়ংকর ইংরেজির কারণে অনেক সহকর্মী আমাকে পরামর্শ দেন ভাষার দিকে না তাকিয়ে ভাবের দিকে তাকিয়ে নম্বর দিতে। আমি তাঁদের বলি, ওই গরুটি আমার বাবার—এর ইংরেজি যদি হয় ‘দ্যাট কাউ ইজ মাই ফাদার’, তাহলে এখানে ভাব কোথায়, পুরোটাই তো ‘অভাব’। একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত নামিদামি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকার ১৮ অক্টোবর ২০১৪ তারিখে দেওয়া ফেসবুক স্ট্যাটাসে লেখা ছিল : ‘Every year I am forgeted my birthday but my son, he is not forgeted. 19 October he give me Birthday gift. Jear Melaire brand watch. Feeling happiness.’ আমাদের অনেকেরই ইংরেজির অবস্থা এর চেয়ে বেশি ভালো নয়। আমাদের ইংরেজির জ্ঞান উচ্চশিক্ষা গ্রহণের উপযোগী না হওয়া সত্ত্বেও দেশের সব প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষাদান যে বাধ্যতামূলক করা হলো তার পেছনে ইংরেজির অর্থমূল্য ও ভাষান্তরিত হওয়ার প্রবণতা লক্ষণীয়। দুই. মর্যাদাবান কারো প্রতি যাতে ভুল না হয় সে জন্য আমরা সব সময় সতর্ক থাকি। এর পরও ভুল হয়ে গেলে নিজের কাছে সংকোচ বোধ হয়। আর যাকে খুব একটা সমীহ করি না তার প্রতি ভুল হলে সে ভুলকে আমরা পাত্তাই দিই না। ভুল ইংরেজি বলা বা লেখার বিষয়ে আমরা সন্ত্রস্ত থাকি, লজ্জিত হই; কিন্তু ভুল বাংলায় আমাদের কোনো ভাবান্তর হয় না। বাংলা ভাষার প্রতি আমাদের অনাদর এভাবেই প্রকাশ পায়। তিন. অকারণে অনাবশ্যকভাবে ইংরেজির ব্যবহার হচ্ছে। শহরের সামান্য দোকানের নামফলক থেকে শুরু করে বেতার ও দূরদর্শনের নাম, সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম, যা ইংরেজিতে রাখার কোনো প্রয়োজন নেই, সেখানেও ইংরেজিতে নামকরণ করে জাতে ওঠার প্রবণতা লক্ষণীয়। ইংরেজি আমাদের ফুটানির ভাষায় পরিণত হয়েছে। বিয়ের নিমন্ত্রণপত্র লেখা হয় ইংরেজিতে। বেতার, দূরদর্শনে বাংলা-ইংরেজি মিলিয়ে জগাখিচুড়ি ভাষায় অনুষ্ঠান প্রচার করা ও বাংলা উচ্চারণকে বিদেশি ভাষার আদলে উচ্চারণ এক ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। ছেলে-মেয়েকে ইংরেজি মাধ্যমে পড়ানো আভিজাত্যের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। পশ্চিমা দেশে ছেলে-মেয়েরা ১৮ বছর পূর্ণ হলে ডেটিং না করলে মা-বাবা তাদের শারীরিক সমস্যা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ে। আর আমাদের ইংরেজি মাধ্যমে পড়ুয়া ছেলে-মেয়েরা সারাক্ষণ ইংরেজিতে কথা না বললে ‘জাত গেল’ বলে মা-বাবা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। চার. রাষ্ট্রভাষার প্রতি আমাদের অনাদর আর অবহেলা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে শুধু সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতায় কাজ না হওয়ায় সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালুর জন্য ১৯৮৭ সালে বাংলা ভাষা প্রচলন আইন করতে হয়েছে। তার পরও অবস্থা তথৈবচ। রোগী ইংরেজি বুঝুক আর না বুঝুক ডাক্তার সাহেব ব্যবস্থাপত্র ইংরেজিতে লিখবেনই, গ্রাহকের ইংরেজি জ্ঞান থাকুক আর না থাকুক ব্যাংক-বীমার কাগজপত্র ইংরেজিতে লেখা হবেই, বিচারপ্রার্থীর ইংরেজি জ্ঞান যা-ই হোক, উচ্চ আদালতের বিচারকাজ ইংরেজিতেই হবে। ১৯৮৭ সালের বাংলা ভাষা প্রচলন আইনে বলা হয়েছে, ‘এই আইন প্রবর্তনের পর বাংলাদেশের সর্বত্র তথা সরকারি অফিস-আদালত, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বিদেশের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যতীত অন্য সব ক্ষেত্রে নথি ও চিঠিপত্র, আইন-আদালতে সওয়াল-জবাব ও আইনানুগ কার্যাবলি অবশ্যই বাংলায় লিখতে হবে। উল্লিখিত কোনো কর্মস্থলে যদি কোনো ব্যক্তি বাংলা ভাষা ব্যতীত অন্য কোনো ভাষায় আবেদন বা আপিল করেন তাহলে তা বেআইনি বা অকার্যকর বলে গণ্য হবে। ’ বাংলা ভাষার এ বাধ্যবাধকতা উচ্চ আদালতের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কারণ সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদ মতে, ‘আদালত অর্থ সুপ্রিম কোর্টসহ যেকোনো আদালত’। বাংলা ভাষা প্রচলন আইনের ১(২) ধারায় আইনটি ‘অবিলম্বে বলবৎ হইবে’ বলা হয়। ৩(৩) ধারার হুঁশিয়ারি, কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী এই আইন অমান্য করলে তা হবে অসদাচরণ। তজ্জন্য তার বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা ও আপিল বিধি অনুসারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই আইন জারির পর আমাদের নিম্ন আদালতে ও সরকারি অফিসে বাংলা ভাষার প্রচলন বৃদ্ধি পায়। কিন্তু শুধু ব্যতিক্রম ঘটে আমাদের উচ্চ আদালতে। ১৯৯১ সালে বিখ্যাত হাসমতুল্লাহ বনাম আজমেরি বেগমের মামলা। মামলায় উচ্চ আদালত সংবিধানে স্বীকৃত রাষ্ট্র ভাষা থেকে আদালতের ভাষাকে বিচ্ছিন্ন করে রায় দেন। এই রায়ের মাধ্যমে তিন ধরনের ভাষার উদ্ভব ঘটানো হয়। রাষ্ট্রভাষা, সরকারি ভাষা ও আদালতের ভাষা হিসেবে তিনটি ভাষাকে সংজ্ঞায়িত করে আদালতের আবশ্যিক ভাষা হিসেবে বাংলাকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। এ প্রবণতা সত্ত্বেও উচ্চ আদালতের বেশ কয়েকজন বিচারপতি বাংলায় রায় লিখেছেন। সাবেক প্রধান বিচারপতি হাবিবুর রহমান মনে করেন, ‘যে ভাষায় বিচারকর্ম সমাধা হয় না, সে ভাষা বল সঞ্চার করে না, দুর্বল হয়ে থাকে। ’ আদালতে রাষ্ট্রভাষার দাবিটা শুধু ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্যই নয়, বরং নিজের ভাষায় রায় পাওয়ার সর্বজনীন অধিকার প্রত্যেকটি মানুষেরই রয়েছে। ১৯৯৮ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্ট স্পষ্টতই বলেন, বিচারপ্রার্থীর বোধগম্য ভাষাতেই বিচার পাওয়ার অধিকার তার রয়েছে। একান্তই সম্ভব না হলে সেটার অনুবাদ তাকে করে দিতে হবে। মালয়েশিয়ার সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদ ও ১৯৬৩ সালের জাতীয় ভাষা আইনের ৮ ধারা মতে, আদালতের আরজি, আপিল, রায় ইত্যাদি বাহাসা ভাষায় লেখা বাধ্যতামূলক। ২০০৯ সালে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের দায়ের করা আপিল ইংরেজিতে লেখার কারণে মালয়েশিয়ার কোর্ট অব আপিল তা খারিজ করে দিয়েছিলেন। সোভিয়েত রাশিয়া, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, চীন, ফ্রান্স, জাপানসহ বিশ্বের অনেক দেশের আদালত তাদের নিজেদের ভাষায় চলে। আমাদের সংবিধানের ৩৫(৩) অনুচ্ছেদ মতে, ‘প্রকাশ্য বিচারলাভ’ মৌলিক অধিকার। অন্ধ ব্যক্তির কাছে সাদা আর কালোর মধ্যে পার্থক্য করা যেমন মুশকিল, তেমনি ইংরেজি না জানা বা না বোঝা আসামির বিচার ইংরেজি ভাষায় হলে প্রকাশ্য বিচার আর গোপন বিচার তো একই কথা।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মাতৃভাষাকে মাতৃদুগ্ধের মতো স্বাস্থ্যদায়ক বলে অভিহিত করেছেন। রাষ্ট্রভাষার প্রতি আমাদের অনাদর, অবহেলা তো মা, মাতৃদুগ্ধকে অবহেলা করা। ভাষান্তরিত হওয়ার প্রবণতার বিরুদ্ধে এখনই সচেতন না হলে কোন দিন না আমরা বলিভিয়ার ভাগ্যবরণ করব, কে জানে? তখন আরেকটি ভাষাযুদ্ধ কি আমাদের জন্য নিয়তি হয়ে উঠবে না?

লেখক : অধ্যাপক, আইন বিভাগ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

zhossain@justice.com 


মন্তব্য