kalerkantho


প্রকাশের আগেই প্রতিবেদন ফাঁস

রোহিঙ্গা ‘গণহত্যা’র স্বীকৃতি চান অনেক মার্কিন কর্মকর্তা

মেহেদী হাসান   

১৭ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



রোহিঙ্গা ‘গণহত্যা’র স্বীকৃতি চান অনেক মার্কিন কর্মকর্তা

রোহিঙ্গাদের ওপর গত বছরের ২৫ আগস্ট থেকে শুরু হওয়া নতুন মাত্রার নিধনযজ্ঞকে ‘জেনোসাইড’ (গণহত্যা) হিসেবে অভিহিত করতে চান যুক্তরাষ্ট্রের ধর্মীয় স্বাধীনতা বিষয়ক অ্যাম্বাসাডর অ্যাট লার্জ স্যাম ব্রাউনব্যাকসহ পররাষ্ট্র দপ্তরের মানবাধিকারবিষয়ক ব্যুরোর অনেক কর্মকর্তা। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের আইনবিষয়ক বিভাগ ‘গণহত্যা’ হিসেবে অভিহিত করার বিষয়ে নিশ্চিত নয়। কারণ গণহত্যা হিসেবে অভিহিত করলে যুক্তরাষ্ট্রকে এটি মোকাবেলায় যে সামরিক ব্যবস্থা নিতে হবে, বর্তমান বাস্তবতায় তা কতটা সম্ভব তা নিয়ে তারা সন্দিহান। ‘গণহত্যা’ বলার বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া পররাষ্ট্র দপ্তরের পূর্ব এশিয়া ও প্যাসিফিক ব্যুরো শঙ্কিত মিয়ানমারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে। তাদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারকে চীনা বলয় থেকে বের করে আনতে কয়েক বছর ধরে যে চেষ্টা চালিয়ে আসছে তা বিফলে যাবে রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করলে।

রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞকে যুক্তরাষ্ট্র গত বছরই ‘জাতিগত নিধনযজ্ঞ’ হিসেবে অভিহিত করেছে। আরো তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে একে ‘গণহত্যা’ হিসেবে অভিহিত করা হবে কি না এ নিয়ে নির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেননি পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তারা। তাই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞের বার্ষিকী উপলক্ষে এ সপ্তাহেই তাঁর এসংক্রান্ত একটি ঘোষণা দেওয়ার কথা রয়েছে।

এদিকে রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞকে সংজ্ঞায়িত করা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তাদের মতপার্থক্য ও প্রকাশিতব্য একটি প্রতিবেদনের কিছু অংশ ইতিমধ্যে মার্কিন সংবাদমাধ্যম পলিটিকোতে ফাঁস হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র হিদার নোয়ার্ট গত বুধবার রাতে সংবাদ সম্মেলনে এসংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তরে বিষয়টি অস্বীকার করেননি, বরং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হওয়ার আগেই তথ্য ফাঁস হওয়া নিয়ে গভীর হতাশা প্রকাশ করেছেন।

ঢাকার কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলেছে, বাংলাদেশ সরকারের সম্মতি নিয়েই বিগত কয়েক মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষজ্ঞরা কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবিরে মিয়ানমারে তাদের ওপর সংঘটিত নিপীড়নের বিষয়ে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছেন। সেই তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্র কী সিদ্ধান্ত নেয় তা দেখার অপেক্ষায় আছে বাংলাদেশও।

গত বছরের ডিসেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞের অন্যতম হোতা মিয়ানমারের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে চিহ্নিত করে তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। সে সময়ই তিনি রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আরো তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও নৃশংসতার মাত্রার ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছিলেন।

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার জায়িদ রা’দ আল হুসেইন গত বছরের শেষ দিক থেকেই রোহিঙ্গারা গণহত্যার শিকার হচ্ছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে আসছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম পলিটিকো ডট কমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র প্রায় সময়ই ‘গণহত্যা’ শব্দটি ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকে। কারণ কোনো ঘটনাকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে আখ্যায়িত করলে সেই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এবং বিশেষ করে সেই ঘটনা চলমান থাকলে এটি মোকাবেলা ও প্রতিকারে ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব বর্তায়। গণহত্যা প্রতিরোধ ও গণহত্যা সংঘটনকারীদের শাস্তি দেওয়ার লক্ষ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্র গণহত্যাবিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদে সই করেছে।

পলিটিকোর প্রতিবেদন থেকে ধারণা পাওয়া যায়, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর যে গণহত্যা চালানো হয়েছে তা নিয়ে দ্বিমত নেই। গণহত্যা বলা হবে কি না এবং এটি বললে যুক্তরাষ্ট্র কতটা ব্যবস্থা নিতে পারবে তা নিয়েই কর্মকর্তারা দ্বিধাবিভক্ত।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ১১টি দেশের ১৮ জন অত্যন্ত উচ্চ যোগ্যতাসম্পন্ন তদন্তকারী দিয়ে কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে ১৫ হাজার পৃষ্ঠারও বেশি তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছে। এক হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা তাদের সাক্ষাৎকারে মিয়ানমারে তাদের ওপর মাত্রাতিরিক্ত ধারাবাহিক নির্যাতন-নিপীড়নের তথ্য দিয়েছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনী রোহিঙ্গা নারী ও শিশুদের প্রতি সবচেয়ে বর্বর আচরণ করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের খসড়া প্রতিবেদনে রোহিঙ্গাদের বেশ কিছু বক্তব্যের সারাংশ পেয়েছে পলিটিকো ডট কম। সেখানে বলা হয়েছে, ‘মিয়ানমারের সেনারা ছোট শিশুদের আগুন, নদী, কুয়া এবং আগুন লাগানো ঘরে ছুড়ে ফেলেছে’ এবং ‘একজন শরণার্থী (রোহিঙ্গা) বলেছে, সেনারা একটি শিশুকে শূন্যে ছুড়ে মারে এবং লম্বা ছুরি শিশুটির শরীরে ঢুকিয়ে হত্যা করে।’

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর এই তদন্তকাজে রোহিঙ্গাদের সাক্ষাৎকার নেওয়া ছাড়াও গোয়েন্দা ও গবেষণা ব্যুরো, ন্যাশনাল জিয়োস্পেশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সিকে দিয়ে ভূউপগ্রহ থেকে পাওয়া ছবি ও তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করিয়েছে। রোহিঙ্গা গ্রামগুলো ধ্বংসের তথ্য-প্রমাণ হিসেবেও সেসব ছবি ব্যবহার করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের তদন্ত থেকে পাওয়া বিষয়বস্তুর সঙ্গে জাতিসংঘের ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং মিশন, বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও সাংবাদিকদের প্রতিবেদনের সাদৃশ্য পাওয়া যায়। গত বছরের ২৫ আগস্ট কথিত রোহিঙ্গা জঙ্গিগোষ্ঠী আরসার হামলার কথা বলে মিয়ানমার বাহিনী রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করলেও এর প্রস্তুতি অনেক আগে থেকে ছিল বলেও যুক্তরাষ্ট্রের খসড়া প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

এত তথ্য-প্রমাণের পরও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও যদি রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে অভিহিত করতে না চান তাহলে অন্তত একে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ হিসেবে অভিহিত করার অনুরোধ জানিয়েছেন পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকরা। এটি আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে গণহত্যার তুলনায় কিছুটা কম তাৎপর্যপূর্ণ হলেও ভবিষ্যতে অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার সুযোগ থাকবে।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ‘গণহত্যা’ হিসেবে অভিহিত করলেই ট্রাম্প প্রশাসন রোহিঙ্গাদের রক্ষায় মিয়ানমারে সেনা পাঠাবে এমন সম্ভাবনাও দেখছে না পলিটিকো ডট কম। বিশেষ করে এমন একটি সময়ে যুক্তরাষ্ট্র রোহিঙ্গা ইস্যুতে তাদের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করছে যখন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বড় অংশই মিয়ানমার ছেড়ে বাংলাদেশে চলে এসেছে এবং রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর আগের মতো হত্যাযজ্ঞ চলছে না বলেই বিশ্ব সম্প্রদায় মনে করছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের বিগত সরকারগুলো এ ধরনের পরিস্থিতিতে সচেতনভাবেই ‘গণহত্যা’ শব্দটি এড়িয়ে গেছে। ১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডার লাখ লাখ তুতসিকে হত্যা করা হলেও তৎকালীন ক্লিনটন প্রশাসন একে গণহত্যা বলেনি। ২০০৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কন্ডোলিৎসা রাইস সুদানের দারফুরের ঘটনাকে গণহত্যা বলে আখ্যায়িত করার আগে কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছিলেন কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দায় যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বর্তাবে না।

 



মন্তব্য