kalerkantho


শুকনাকালেই চিকুনগুনিয়া ও ডেঙ্গুর ১৯ রেড জোন!

তৌফিক মারুফ   

৪ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



শুকনাকালেই চিকুনগুনিয়া ও ডেঙ্গুর ১৯ রেড জোন!

গেল বছর বর্ষা মৌসুমে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উদ্যোগে এক জরিপের মাধ্যমে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের আওতাধীন ৪৪টি এলাকাকে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার জন্য অধিকতর ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করা হয়েছিল। এরপর চিকুগুনিয়ার বিস্তার আরো ব্যাপক হয়ে উঠেছিল। এ নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। সেদিকে নজর রেখে এবার শুকনা মৌসুমে এডিস মশার প্রভাব খুঁজতে শুরু করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এ দফায় দুই সিটি করপোরেশনের ৯২টি ওয়ার্ডেই জরিপ চালানো হয়। এর আওতায় চিকুনগুনিয়া ও ডেঙ্গু পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, এডিস মশার অবস্থান এবং প্রজনন পরিস্থিতিসহ আরো কিছু বিষয় খুঁজে দেখা হয়। এর মাধ্যমে পাওয়া ফলাফলের ভিত্তিতে ঢাকায় শুকনাকালে চিকুনগুনিয়া ও ডেঙ্গু বিস্তারে ১৯টি এলাকাকে রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিশেষজ্ঞরা জানান, আসন্ন বর্ষায় পরিস্থিতি আরো খরাপ হয়ে ওঠার আশঙ্কাই বেশি। ফলে এখনই সেদিকে নজর রেখে কাজ করতে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. সানিয়া তহমিনা কালের কণ্ঠকে বলেন, জরিপের সময় দেখা গেছে, শুধু ডাবের খোসা, ফুলের টব, পরিত্যক্ত টায়ার বা ছোটখাটো পাত্রই নয়, নির্মাণাধীন বা পরিত্যক্ত ভবন, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি অফিসের পরিত্যক্ত পরিবহনের মতো নতুন স্বচ্ছ পানি জমাট থাকার ক্ষেত্র চিহ্নিত হচ্ছে, যেখানে এডিস মশার লার্ভা বা প্রজননঘাঁটি সৃষ্টি হচ্ছে।

সানিয়া তহমিনা আরো বলেন, ‘বৃষ্টি-ঠাণ্ডা-গরম অর্থাৎ তাপমাত্রার ওপরও মশার প্রজনন এবং বিস্তারের বিষয়টি নির্ভর করে। আমাদের দেশের আবহাওয়া ও পরিবেশ এডিস মশার প্রজনন সহায়ক। এ ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের সচেতনতা বাড়ানো দরকার। সবাই যদি যার যার বাসাবাড়ি ও প্রতিষ্ঠান ঠিকমতো পরিষ্কার রাখে, মশা জন্ম নেওয়ার মতো পরিবেশ থাকতে না দেয় তবে মশা যেমন দূর হবে, তেমনি ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়াসহ মশাবাহিত অন্য সব রোগ থেকেই মুক্ত থাকা যাবে।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার কর্মসূচি ব্যবস্থাপক ডা. আকতারুজ্জামান সোহেল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা আসন্ন বর্ষার দিকে খেয়াল রেখেই আগাম প্রস্তুতি হিসেবে শুকনা মৌসুমে এডিসের অবস্থা কেমন থাকে, তা দেখতে চেয়েছিলাম। আমরা উদ্বেগের সঙ্গে দেখতে পেলাম ৯২টি ওয়ার্ডের ১০০টি এলাকার মধ্যে ১৯টিতে এডিসের বিস্তার এতই বেশি যে এসব এলাকা সহজেই চিকুনগুনিয়া ও ডেঙ্গুর প্রকোপ হওয়ার উপযুক্ত। আর সেখান থেকে বর্ষায় ওই পরিস্থিতি আরো ভয়ানক হতে পারে।’

ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘মশা নিয়ে মানুষের যত উৎকণ্ঠা আছে সে অনুসারে মানুষের মধ্যে মশার উৎস নিধনে তেমন কোনো সচেতনতা নেই। ফলে অনেক বাসাবাড়ি বা স্থাপনাতেই এডিস মশা বিস্তারের উপযুক্ত পরিবেশ দেখতে পেয়েছি। সেই সঙ্গে ছিল লার্ভা ও পিউপার উপস্থিতি, যা থেকেই মূলত বড় মশার বিস্তার ঘটে। শুধু বাসাবাড়ি নয়, পরিত্যক্ত ও নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত গাড়ি, টায়ারসহ নানা ধরনের পরিত্যক্ত জিনিসপত্র এডিস মশার ঘাঁটিতে পরিণত হয়ে আছে।’

মশা-লার্ভা ঘুরচক্কর!

ওই জরিপের মাধ্যমে আরেকটি বিষয় বড় হয়ে উঠেছে বিশেষজ্ঞদের সামনে। আগে মুরগি না ডিম—এ ঘুরচক্করের মতো দেশে তৈরি হয়েছে মশা ও লার্ভা নিয়ে আরেক ঘুরচক্কর! মশার উত্পাত থেকে বাঁচতে মশা মারা নিয়েই চলে যত হৈ-হুল্লোড়। বাজার সয়লাব স্প্রে আর কয়েলে। সরকারের দিক থেকেও সাধারণ মানুষ আশা করে মশা নিধনের দৃশ্যমান কার্যক্রম। তবে মশার আগে লার্ভার দিকে যেন কোনো নজরই নেই সাধারণ মানুষ কিংবা কর্তৃপক্ষের। নামমাত্র কিছু কার্যক্রম চলে। ফলে উড়ন্ত মশা নিধন হলেও লার্ভা থেকে ঠিকই আবার মশা জন্ম নিয়ে ভরে যায় সব দিক। এমন পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একই সঙ্গে মশা আর লার্ভা নিধন কার্যক্রম চালাতে হবে, নয়তো কখনো কার্যকর সাফল্য পাওয়া যাবে না।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাহাবুবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মশা যেহেতু মানুষকে কামড়ায়, তাই সবাই সাধারণত মশা নিধনেই বেশি নজর রাখে। কিন্তু এই মশার চেয়ে যে লার্ভা নিধন বেশি জরুরি, তা মানুষ বুঝতে পারছে না। লার্ভা হয়তো কামড়াতে পারে না বলেই এমন অসচেতনতা হতে পারে।’

ওই কীটতত্ত্ব বিজ্ঞানী বলেন, দেশেই লার্ভা নিধনে লার্ভিসাইড আর বড় মশা নিধনে অ্যাডাল্টিসাইড রয়েছে। যদি নিয়ম মেনে লার্ভিসাইড প্রয়োগ করা যায়, তবে মশা এমনিতে কমে যাবে। মশা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে যে সংস্থাগুলো আছে, তাদের এই বিষয়ে আরো বেশি নজর দেওয়া উচিত।

অন্যদিকে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান-আইইডিসিআর সূত্র জানায়, গত বছর এক গবেষণায় দেখা যায় যে পুলিশের হাতে আটক যেসব যানবাহন ও অন্যান্য সামগ্রী খোলা জায়গায় রাখা হয়েছে, সেখানে বৃষ্টির পানি জমা আছে। এ ছাড়া নৌবন্দর, বিমানবন্দর ও স্থলবন্দরেও একইভাবে খোলা জায়গায় পড়ে থাকা যানবাহন, কনটেইনার ও অন্যান্য যন্ত্রপাতিতে বৃষ্টির পানি জমে মশার প্রজনন সহায়ক পরিবেশ তৈরি হয়। পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি ভবনের ছাদ ও কার্নিশে বৃষ্টির পানি জমতে পারে। গাছের কোটর ও বড় পাতার ভাঁজে পানি জমতে পারে। ব্যক্তিগত বাগান, খামার, পার্ক, রাস্তার পাশের ঝোপঝাড় ও গাছপালায় বিভিন্নভাবে স্বচ্ছ পানি জমার পরিবেশ থাকতে পারে, যা এডিস মশার উপযুক্ত প্রজননক্ষেত্র। তাই এসব ব্যাপারেও সর্তক থাকা প্রয়োজন।

অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার কারণে এডিস মশা নিয়ে আলোচনা বেশি। তবে দেশে মোট ১২৩ প্রকার মশা রয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কবিরুল বাশার গত মঙ্গলবার স্বাস্থ্য অধিপ্তরের এক সভায় জানান, সবাই এডিসসহ সাধারণত চার থেকে পাঁচ প্রকারের মশা নিয়েই বেশি আলোচনা করে থাকে। অন্য অনেক মশার ক্ষতিকারক দিক ও গতিবিধি এখন পর্যন্ত বের করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি।

 


মন্তব্য