kalerkantho


লক্ষ্মীপুর সদর

সৌন্দর্যে মুগ্ধ সেবায় ক্ষুব্ধ

কাজল কায়েস লক্ষ্মীপুর   

৮ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



সৌন্দর্যে মুগ্ধ সেবায় ক্ষুব্ধ

মালয়েশিয়াফেরত যুবক রিয়াজ হোসেন বিপ্লব সন্ধ্যায় থানায় ঢোকার সময় মুগ্ধ হন। বর্ণিল বাতি, পাতাবাহারসহ বিভিন্ন শীতকালীন ফুলগাছ তাঁর চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল, গ্রেপ্তার হওয়া মামা মুদি ব্যবসায়ী সেলিমের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা।

থানা ভবনের কলাপসিবল গেটে যাওয়ার পর কনস্টেবল শাহ আলম জানতে চান, কার কাছে এসেছেন? জবাব শুনে চেঁচিয়ে উঠলেন ওই পুলিশ সদস্য। আঙুল উঁচিয়ে তাঁকে পাশের বৈঠকখানা (গোলঘর) দেখিয়ে দিয়ে বসতে বলেন। ১০ মিনিট পর শাহ আলম সেখানে গিয়ে তাঁকে (রিয়াজকে) বেরিয়ে যেতে বলেন। তিনি বলেন, ‘ওসি সাহেব বের হয়ে জানতে চাইবেন এরা কারা?’ এ জন্যই থানা এলাকা থেকে বের হয়ে যাওয়ার জন্য রিয়াজকে তাঁর এ তাগিদ। এতে রিয়াজ চরম ক্ষুব্ধ হন।

এমন চিত্র লক্ষ্মীপুর মডেল সদর থানার শনিবার (৬ জানুয়ারি) সন্ধ্যার।

শুধু রিয়াজ নন, তাঁর মতো অনেকেই থানায় এসে সুন্দর পরিবেশে মুগ্ধ হন। কিন্তু সেবা নিতে গিয়ে সেই মুগ্ধতা ক্ষোভে পর্যবসিত হয়।

শনিবার থানায় কয়েক ঘণ্টা অবস্থান করে দেখা যায়, সন্ধ্যা ৭টা ৫ মিনিটে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা এসে থানা প্রাঙ্গণে থামে। একে একে চার যুবককে অটোরিকশা থেকে নামিয়ে থানায় ঢোকানো হয়। তাদের উপজেলার শাকচরের কাচারিবাড়ী এলাকা থেকে গাঁজা সেবনের অভিযোগে আটক করা হয়েছে। উপপরিদর্শক (এসআই) হাবিবের নেতৃত্বে পুলিশ সাদা পোশাকে গিয়ে তাদের আটক করে নিয়ে আসে। পরে তাদের দু-একজন স্বজন এসে দূর থেকে খোঁজ নিয়ে চলে যায়।

বিষণ্ন মনে থানার গোলঘরের পাশেই বসে ছিলেন পৌরসভার শমশেরাবাদের ফেরদৌসী বেগম ও তাঁর ভগ্নিপতি চরলরেঞ্চ বাজারের পান ব্যবসায়ী মো. বাহার। ফেরদৌসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, সকাল ১০টার দিকে মোবারক কলোনি থেকে তাঁর ভাই রাছেল ও আরেকজনকে আটক করেছে পুলিশ। ইয়াবা সেবনের অভিযোগে শহর ফাঁড়ি পুলিশ ধরে থানায় নিয়ে আসে। পরে তার কাছে একটি ইয়াবা পাওয়া গেছে বলে ২৫ হাজার টাকা দাবি করা হয়। না হয় ২০০ ইয়াবা সঙ্গে দিয়ে আদালতে সোপর্দ করা হবে বলে তাঁদের জানানো হয়। পরে বাধ্য হয়ে নিজের স্বর্ণ বন্ধক রেখে ১০ হাজার টাকা, আত্মীয়ের কাছ থেকে ভগ্নিপতি বাহার আরো ১৫ হাজার সংগ্রহ করেন। পরে তা পুলিশকে দেওয়া হয়। টাকা পেয়ে আটককৃতদের ৫৪ ধারায় আদালতে পাঠানো হবে বলে তাদের আশ্বস্ত করা হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে শহর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘আটকের পর দুজনকে থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। টাকা লেনদেন হয়েছে কি না আমি অবগত নই। আপনি (এ প্রতিবেদক) এসআই আবু নাছেরের সঙ্গে কথা বলেন।’

তবে মডেল সদর থানার এসআই আবু নাছের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আটক রাছেলকে চুরি ও রবিনকে মাদক মামলায় আদালতে পাঠানো হয়েছে। এ জন্য হয়তো তারা টাকা লেনদেনের কথা বলতে পারে।’

রাত ১০টার দিকে থানার প্রধান গেটের সামনের এক চা দোকানে এক ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সদস্যসহ মধ্যবয়সী চারজনের জটলা দেখা গেল। তাঁদের কথায় কান পেতে বোঝা গেল, পুলিশ নিরীহ কিছু মানুষকে ধরে এনে টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দিচ্ছে। এ কাজটি বেশি করেন থানার এসআই গোলাম হাক্কানি ও রেজাউল করিম। এ জন্য তাঁদেরকে ‘গরম অফিসার’ হিসেবে মানুষ জানে। প্রতিবেদক এ বিষয়ে কথা বলতে চাইলে তাঁরা চুপ হয়ে যান এবং তাঁদের নাম-পরিচয় প্রকাশে অনীহা প্রকাশ করেন।

রাত ১১টার দিকে থানার সামনে দোকানপাটগুলো বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় লোকশূন্য হয়ে পড়ে সামনের সড়কটি। রাত দেড়টার দিকে একটি অটোরিকশা এসে মূল ফটকের পাশে দাঁড়ায়। এ প্রতিবেদক এগিয়ে গেলে দ্রুত স্থান ত্যাগ করে অটোরিকশা। ওই অটোরিকশায় কারা ছিল, তা জানা যায়নি।

সময় টেলিভিশনের লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি মাহবুবুল ইসলাম ভূঁইয়া ৪ জানুয়ারি ফেসবুকে আক্ষেপ করে একটি স্ট্যাটাস দেন। তিনি লেখেন, গত রাতে ঘরের তালা ভেঙে তাঁর মোটরসাইকেলটি চুরি করার চেষ্টা হয়েছে। এ ছাড়া ২০১৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ঘরের দরজা ভেঙে স্বর্ণালংকারসহ প্রায় ১৫ লাখ টাকার জিনিস চুরি হয়। সদর থানায় মামলা করা হলেও পুলিশ এখনো মালামাল উদ্ধার এবং চোর গ্রেপ্তার করতে পারেনি। চোরের উপদ্রবে শহরের মানুষ নিরাপত্তাহীন থাকলেও পুলিশকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। তাঁর এমন স্ট্যাটাসের নিচে অনেকেই মন্তব্য লিখেছেন। এর মধ্যে আরটিভির প্রতিনিধি পলাশ সাহা লিখেছেন, ‘আমাদের বাসা থেকেও লক্ষাধিক টাকার মালামাল চুরি হয়। থানায় অভিযোগ করার পরও কোনো ফল হয়নি।’

থানা সূত্র জানায়, কর্মকর্তাসহ প্রায় ৫০ জন পুলিশ সদস্য এখানে দায়িত্ব পালন করছেন। রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং বিশেষ সময়ে জেলা পুলিশ লাইনস থেকে অতিরিক্ত পুলিশ আনা হয়। ১৯৭১ সালে থানার মূল ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে, সেখানে পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম পরিচালনা করা যাচ্ছে না। এতে বেগ পেতে হয় তাঁদের। ভবনের দোতলায় ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় সদস্যরা বসবাস করছেন। পর্যাপ্ত আবাসনব্যবস্থা না থাকায় সংস্কার করেই গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে তাঁদের।

ওসির কক্ষের সামনেই ঝোলানো রয়েছে, অপরাধীদের তথ্য-তালিকা বোর্ড। কিন্তু সেখানে দেখা গেল, কোনো তথ্য-লেখা-ছবি নেই। কাচে ঘেরা বোর্ডটি রং করা রয়েছে। পুলিশের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, নতুন করে শিগগিরই অপরাধীদের নাম-ছবিসহ তথ্য সংগ্রহ করা হবে।

থানার সেবার মান নিয়ে জানতে চাইলে লক্ষ্মীপুর মডেল সদর থানার ওসি মোহাম্মদ লোকমান হোসেন বলেন, ‘থানার সৌন্দর্য বর্ধনের কৃতিত্ব লক্ষ্মীপুরবাসীর। আমি শুধু উদ্যোগ নিয়েছি। এ ছাড়া নিজেদের নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও জনগণকে নিয়মিত সেবা দিচ্ছি। সার্ভিস ডেলিভারি সেন্টার ও অবকাঠামো নির্মাণ করা হলে জনগণকে শতভাগ সেবা দেওয়া সম্ভব হবে।’



মন্তব্য