kalerkantho


বিদায়ী বছরের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আসক

অপহরণ গুম গুপ্তহত্যায় দেশজুড়ে ছিল আতঙ্ক

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



অপহরণ গুম গুপ্তহত্যায় দেশজুড়ে ছিল আতঙ্ক

বিদায়ী ২০১৭ সালে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে অপহরণ, গুম ও গুপ্তহত্যার অভিযোগের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের রহস্যজনক নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ছিল অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। এই বছরে অপহরণ, গুম ও গুপ্তহত্যার শিকার হয়েছে ৬০ জন। তাদের মধ্যে পরবর্তী সময়ে দুজনের লাশ উদ্ধার হয়েছে, গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে আটজনকে। পরিবারের কাছে ফেরত এসেছে সাতজন। বাকিরা এখনো নিখোঁজ। এ ছাড়া রহস্যজনক নিখোঁজ হয়েছে ৩১ জন, যাদের মধ্যে পরে ফেরত এসেছে ৯ জন এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গ্রেপ্তার দেখিয়েছে ছয়জনকে। বাকি ১৬ জনের হদিস নেই।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ২০১৭-এর বিষয়ে জানানোর জন্য গতকাল রবিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। উপস্থিত ছিলেন আসকের নির্বাহী পরিচালক শিফা হাফিজা, সিনিয়র উপপরিচালক নিনা গোস্বামী, ঊর্ধ্বতন উপপরিচালক অ্যাডভোকেট রওশন জাহান পারভীন ও সমন্বয়কারী আবু আহমেদ ফাইজুল কবির।

শিফা হাফিজা বলেন, ‘গুম, নিখোঁজ ও অপহরণ—এটা অন্যায়, অবিচার। একটা মানুষকে যখন ঘর থেকে তার অমতে বের করে নেওয়া হয় তখন তা মানবাধিকারের লঙ্ঘন। আমাদের এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য হচ্ছে, মানুষ যাতে জানে যে এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করার অধিকার তাদের আছে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে আন্দোলন করার অধিকার তাদের আছে। এর বিচার চাইতেই হবে রাষ্ট্রের কাছে। রাষ্ট্র যেন অনুধাবন করতে সক্ষম হয় যে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোনোভাবেই এত পরিমাণ মানবাধিকার লঙ্ঘন করে বেশি দিন চলা যায় না।’

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শিফা হাফিজা আরো বলেন, ‘এ বছর দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ ও চরম উদ্বেগজনক। সরকারের উচিত জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী মানবাধিকারের একটি সর্বজনগ্রাহ্য মান বজায় রাখা।’ আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক কারণে কেউ গুম বা নিখোঁজ হলে তার একটা যুক্তি খুঁজে পাওয়া যায়। কারণ আমাদের দেশে রাজনীতি আসলে একটা নোংরা খেলা। কখনো এটা প্লেইন ফিল্ডে হয় না। সেই গণ্ডি পেরিয়ে সাধারণ মানুষ যেমন টিচার, বিদেশ থেকে এসেছে সেখানে পড়াশোনা করে এমন শিক্ষার্থী, সাংবাদিক, পাবলিশার—বিভিন্ন রকমের মানুষ হারিয়ে যাচ্ছে। আমাদের কাছে মনে হয় এটা অনেক বেশি ভয়াবহ। অনেক বেশি আশঙ্কার কারণ।’

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে আবু আহমেদ ফয়জুল কবির বলেন, ‘২০১৭ সালে সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি ছিল চরম উদ্বেগজনক। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে অপহরণ, গুম ও গুপ্তহত্যার ঘটনার পাশাপাশি এ বছর বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের নিখোঁজ হওয়ার ক্ষেত্রে যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা। সাবেক রাষ্ট্রদূত থেকে শুরু করে সরকারি কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, প্রকাশক, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, রাজনৈতিক দলের নেতা, পৌর মেয়র কেউই বাদ পড়েনি গুম ও নিখোঁজের এই তালিকা থেকে। এ ছাড়া বিগত বছরগুলোর ধারাবাহিকতায় বছরজুড়ে অব্যাহত ছিল রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বাহিনীর ক্রসফায়ার, গুলিবিনিময় ও বন্দুকযুদ্ধের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড।’

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২০১৭ সালে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভিন্ন বাহিনীর সঙ্গে ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ, গুলিবিনিময় ও হেফাজতে ১৬২ জন নিহত হন। গত ১৮ জুলাই সন্ধ্যায় খুলনার গোয়ালখালী বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে শাহ জামাল ওরফে শাহ জালাল (৩১) নামের এক যুবককে পুলিশ ছিনতাইকারী সন্দেহে আটকের পর খালিশপুর থানায় নিয়ে যায়। শাহজালাল অভিযোগ করেন, খালিশপুর থানা থেকে পুলিশ তাকে হাসপাতালে নেওয়ার কথা বলে খুলনা বিশ্বরোড এলাকায় নিয়ে হাত-পা ও মুখ বেঁধে স্ক্রু ড্রাইভারের মতো কিছু একটা দিয়ে তাঁর দুই চোখ তুলে ফেলে।

আসকের এই কর্মকর্তা আরো বলেন, ‘তথ্য-প্রযুক্তি আইনের বিতর্কিত ৫৭ ধারা বাতিলের দাবিতে গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংগঠনসহ বিভিন্ন মহল সোচ্চার থাকলেও এই ধারার অপপ্রয়োগ অব্যাহত রয়েছে। ২০১৭ সালে ৫৭ ধারায় ৫৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘গত ৩০ নভেম্বর বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে সিপিবি-বাসদ ও গণতান্ত্রিক বাম মোর্চার হরতালে মিছিলকারীদের প্রতিহত করার জন্য ‘সাউন্ড স্টিমুলেটর’ নামে একটি যন্ত্রের ব্যবহার করে ডিএমপি। শব্দদূষণ নীতিমালা অনুসারে সর্বোচ্চ শব্দসীমা ৫০ ডেসিবল হলেও এই যন্ত্রের মাধ্যমে যে শব্দ সৃষ্টি করা হয়েছে, তা ১০০ ডেসিবলেরও বেশি। এতে হার্ট অ্যাটাক বা উচ্চ রক্তচাপে মৃত্যুর আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করেন চিকিৎসকরা।’

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বিদায়ী বছরে বিভিন্নভাবে ১২২ জন সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। রাজনৈতিক সংঘাতের সংবাদ সংগ্রহের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে একজন নিহত হয়েছেন। দেশের বিভিন্ন স্থানে হিন্দু সম্প্রদায়ের ২১২টি প্রতিমা, ৪৫টি বাড়িঘর ও ২১টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা-ভাঙচুর হয়েছে। এ বছর এক হাজার ৬৭৫টি শিশু হত্যা ও বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছে।


মন্তব্য