kalerkantho

দূর্গোৎসব

ঢাকায় ‘বেলুড় মঠ’

নওশাদ জামিল ও শাহাদত হোসেন   

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



ঢাকায় ‘বেলুড় মঠ’

দোরগোড়ায় দুর্গোৎসব। দেবী দুর্গা সাজছেন মনোরম সাজে। রাজধানীর খামারবাড়ি মণ্ডপ থেকে গতকাল তোলা ছবি। ছবি : কালের কণ্ঠ

প্রকৃতি এখন শরত্ময়। ভাদ্র শেষে এসেছে আশ্বিন।

সুনীল আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে ছেঁড়া মেঘের পাল। নদীর তীরজুড়ে বাতাসে লুটোপুটি খাচ্ছে কাশফুল। এমনই অপরূপ প্রকৃতিতে বাজছে পূজার ঘণ্টা। মহা ধুমধামে সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা উদ্যাপনে প্রস্তুতি শেষ করে এনেছে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা।

রাজধানীর বিভিন্ন পূজামণ্ডপ ঘুরে দেখা যায়, শারদীয় দুর্গোৎসব ঘিরে সাজ সাজ রব চারদিকে। শেষ মুহূর্তের কাজে ব্যস্ত পূজারিরা। দশভুজা দেবী প্রতিমা সাজাতে তুমুল ব্যস্ত শিল্পীরা। সাজসজ্জার কাজে এদিক থেকে ওদিক ছুটছে মণ্ডপের স্বেচ্ছাসেবকরা। কেউ পরিষ্কার করছে প্রদীপ, কেউ ঘষেমেজে চকচকে করছে ধূপচি।

সময় যে আর বাকি নেই। আর মাত্র এক দিন পরই আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়ে যাচ্ছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপূজা।

দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় গত ১৯ সেপ্টেম্বর মহালয়ার মধ্য দিয়ে। আজ সোমবার হবে বোধন। এ উপলক্ষে রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ

মিশনে বিকেল ৪টায় পূজা শুরু হবে। আগামীকাল মঙ্গলবার ষষ্ঠীপূজা আরম্ভ। জাঁকজমকপূর্ণভাবে সারা দেশে একযোগে শুরু হবে দুর্গাপূজার মহাযজ্ঞ। ষষ্ঠীপূজার মধ্য দিয়ে মর্তে আগমন ঘটবে দেবী দুর্গার। পরদিন ২৭ সেপ্টেম্বর মহাসপ্তমীপূজা এবং ২৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হবে মহা-অষ্টমী ও সন্ধিপূজা। ২৯ সেপ্টেম্বর মহানবমীপূজায় থাকবে আরতি প্রতিযোগিতার আয়োজন। ৩০ সেপ্টেম্বর বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের দুর্গোৎসব।

রাজধানীর খামারবাড়ির কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন (কেআইবি) প্রাঙ্গণের পাশেই বিশাল আকারে তৈরি করা হয়েছে পূজামণ্ডপ। গতকাল রবিবার বিকেলে মণ্ডপ ঘুরে দেখা যায়, উৎসব ঘিরে বিরাজ করছে আনন্দ ও উচ্ছ্বাসের আবহ। বর্ণিল আলোকসজ্জার মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে গ্রামবাংলার নানা সংস্কৃতি। এবার মণ্ডপটি তৈরি করা হয়েছে ভারতের বিখ্যাত বেলুড় মঠের আদলে। পশ্চিমবঙ্গের হাওড়ায় অবস্থিত বিখ্যাত বেলুড় মঠ প্রতিষ্ঠা করেন সনাতন ধর্মের বিখ্যাত পুরুষ স্বামী বিবেকানন্দ। তাঁর অসাম্প্রদায়িক চেতনা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে মণ্ডপের সাজসজ্জায়। এখানে বর্ণিল পূজামণ্ডপটি তৈরি করেছে সনাতন সমাজকল্যাণ সংঘ। প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোগে এটি ২৬তম আয়োজন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পৃথিবীর প্রধান চারটি ধর্ম ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান স্থাপত্যের সমন্বয়ে তৈরি করা হয়েছে মণ্ডপটি। এতে বিখ্যাত বেলুড় মঠের বাহ্যিক অবয়বের প্রধান বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। মণ্ডপের মূল প্রবেশপথ বৌদ্ধ ধর্মীয় আদর্শে, ওপরের স্তম্ভ দক্ষিণ ভারতীয় মন্দিরের আদর্শে, জানালা উত্তর ভারতের রাজপুত ও ইসলামী মোগল স্থাপত্যের আদর্শে এবং কেন্দ্রীয় গম্বুজটি ইউরোপীয় রেনেসাঁ স্থাপত্যের আদর্শে নির্মাণ করা হয়েছে। মণ্ডপজুড়ে রয়েছে খ্রিস্টান স্থাপত্যের নিদর্শনও। সব মিলিয়ে ধর্মীয় সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে ফুটে উঠেছে মণ্ডপটি।

সনাতন সমাজকল্যাণ সংঘের সভাপতি কৃষিবিদ সমীর চন্দ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নান্দনিক দৃশ্য ও উপাসনার নিরিবিলি পরিবেশ বেলুড় মঠের আদলে পূজামণ্ডপ তৈরি করতে আমাদের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। তা ছাড়া সব ধর্মের স্থাপত্য নিদর্শনে নির্মিত বেলুড় মঠের আদলে আমাদের এ পূজামণ্ডপ অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও বাংলাদেশে সব ধর্মের মানুষের সম্প্রীতির বন্ধনের নিদর্শন বহন করে বলে আমি মনে করি। ’

মণ্ডপ ঘিরে রয়েছে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা। নিরাপত্তা নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে সমীর চন্দ্র বলেন, ‘আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিটি শাখা নিয়মিত আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও সর্বক্ষণ তত্পর। বাড়তি নিরাপত্তা হিসেবে মণ্ডপের ভেতরে ও সামনের রাস্তা মিলিয়ে ২৫টি সিসিটিভি ক্যামেরা, ফটকে দুটি আর্চওয়ে ও মেটাল ডিটেক্টর বসানো হবে। সার্বিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে ৬৫ জনের একটি স্বেচ্ছাসেবী দল থাকবে। ’

মূল মণ্ডপের ভেতরে সুউচ্চ বেদিতে স্থাপন করা হয়েছে সোনালি রঙের প্রতিমা। অপরূপ সাজে সেজেছে প্রতিমাগুলো। এতে আনা হয়েছে বৈচিত্র্য। চিরাচরিত প্রথা অনুযায়ী মণ্ডপগুলোতে লক্ষ্মী ও সরস্বতী দেবীর সঙ্গে একটি করে বাহন থাকে। কিন্তু এখানে লক্ষ্মীর সঙ্গে পেঁচার ঝাঁক বাহন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। দর্শনার্থী ও ভক্তদের কাছে আরো আকর্ষণীয় করে তোলাই ব্যতিক্রমী এ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য বলে জানান আয়োজকরা।

উৎসবের আমেজ ফুটিয়ে তুলতে ও দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করতে খামারবাড়ি গোলচত্বর থেকে ফার্মগেট মোড় পর্যন্ত মণ্ডপের সামনের রাস্তা এরই মধ্যে সেজেছে বর্ণিল আলোকসজ্জায়। এতে ফুটে উঠেছে গ্রামবাংলার প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও দৈনন্দিন আচার-অনুষ্ঠান। যেমন দোতারা হাতে বাউল, জেলের মাছ ধরা, কুমারের মাটির শিল্প, পালকিতে নববধূ, তাঁতির কাপড় বোনা, গৃহিণীর সন্ধ্যা প্রদীপ প্রজ্বালন ইত্যাদি। শিশুদের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলতে আলোকসজ্জায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে চিড়িয়াখানা ও বিভিন্ন জীবজন্তুর প্রতিকৃতি। মণ্ডপ প্রাঙ্গণে কোনো এক নারীকে দুর্গারূপে সাজিয়ে তার সঙ্গে ছবি তোলার সুযোগও থাকছে। ভাস্কর্যশিল্পী উত্তম কুমার রায়ের মুনশিয়ানায় ডিজিটাল পদ্ধতিতে ‘লাইভ দুর্গা’ শীর্ষক দেবী দুর্গার মাধ্যমে অসুরদের বধ দেখানো হবে। থাকবে অসুরের রক্ত থেকে অসুরের বিস্তার রোধে মা কালীর অসুরের রক্তপানের দৃশ্যও।

আয়োজকরা জানান, তিন মাস ধরে ৪৫ জন কর্মী ও প্রতিমা শিল্পী মণ্ডপ নির্মাণ কাজে নিয়োজিত রয়েছেন। মণ্ডপের প্রস্তুতি, প্রতিমার সাজসজ্জা, আলোকসজ্জা, ফটক নির্মাণ, অতিথিদের বসার জায়গা সব মিলিয়ে প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে।

বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর সারা দেশে ৩০ হাজার ৮১টি মণ্ডপে শারদীয় দুর্গোৎসব হচ্ছে। গত বছর ২৯ হাজার ৩৯৫টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। গত বছর রাজধানীতে ৩২৬টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হলেও এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩১টি।

 


মন্তব্য