kalerkantho


‘অ্যাম্বাসাডরস ফর চেঞ্জ’

নারী ছাড়া মধ্যম আয়ের দেশ হওয়া কি সম্ভব?

৮ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



নারীর প্রতি সহিংসতার কারণে যেসব ক্ষতি হয় তা সামাল দেওয়া যেকোনো দেশের জন্যই কঠিন। এর কারণে বাংলাদেশের ক্ষতি হয় মোট দেশজ উৎপাদনের আনুমানিক ২.১ শতাংশ।

সহিংসতা প্রতিদিন একটি মেয়েকে বিদ্যালয়ে যেতে এবং একজন নারীকে চাকরি করতে বাধা দেয়। ফলে ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের আপস করতে হয়। তাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়।   সহিংসতার শিকার যারা হয়, তারা শারীরিক ও মানসিক ক্ষত নিয়ে বেঁচে থাকে এবং সামাজিক ও আইনি সহায়তা কার্যক্রমকেও সংগ্রাম করতে হয় তাদের সাহায্য করার ক্ষেত্রে। দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী যদি অর্থনীতিতে অবদান রাখতে না পারে তাহলে মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা অর্জনের দিকে বাংলাদেশ কি তার যাত্রা অব্যাহত রাখতে পারবে?

নারী-পুরুষ সমতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারগুলোর একটি। কন্যাশিশু ও নারীদের জীবনমান উন্নয়নে বাংলাদেশ দারুণ অগ্রগতি সাধন করেছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েদেরও ভর্তি করছে। মা ও শিশু মৃত্যুহার অনেকাংশে কমেছে এবং নারীরা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মেরুদণ্ড তৈরি করছে। বাংলাদেশের বৃহত্তম রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্প ৪০ লাখের কর্মসংস্থান করেছে, যাদের বেশির ভাগই নারী।

এ শিল্পটি যেহেতু কাঠামোগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তাই দেশের নীতিমালা ও কর্মসূচিতে নারীদের অংশগ্রহণ ও ভূমিকার অবশ্যই অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। ক্ষুদ্রঋণের সৃষ্টি ও প্রসারে নারী উদ্যোক্তাদের অগ্রাধিকার দেওয়ায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে এবং বৈশ্বিক সমৃদ্ধিতে বাংলাদেশের এই ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে।

নারীর প্রতি সহিংসতা এই অগ্রগতিকে রুখে দেয়। বাংলাদেশে বর্তমানে ৮০ শতাংশেরও বেশি বিবাহিত নারীর জীবদ্দশায় কমপক্ষে একবার নির্যাতনের শিকার হয়, তা সে শারীরিক, যৌন, মানসিক বা আর্থিক অথবা আচার-আচরণ নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে। গত বছরে আনুমানিক দুই-তৃতীয়াংশ বিবাহিত নারী স্বামীদের দ্বারা নিগ্রহের শিকার হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানা গেছে। বাল্যবিবাহ এবং জোর করে বিয়ে দেওয়ার উচ্চ হার লাখ লাখ মেয়েকে স্বাস্থ্য ও যৌন নির্যাতনের ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়। আর এর শিকার যারা, তাদের মধ্যে কমসংখ্যকই অভিযোগ জানায়। কারণ আইনি অধিকারের কথা তারা জানে না। অথবা তারা প্রতিশোধ, দুর্নামকে ভয় পায় বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সাহায্য পায় না বলে তাদের কাছে যায় না। কর্মক্ষেত্রে সহিংসতার শিকার হওয়ার ভয় অথবা রাস্তাঘাটে চলাফেরার সীমাবদ্ধতা নারীদের উপার্জনের সুযোগ সীমিত করে দেয়। এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করা গেলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির আরো প্রসার ঘটবে।

নারীর প্রতি সহিংসতার অবসান ন্যায় আর অন্যায়ের মতো সরল একটি বিষয়। একটি অহিংস সমাজ গড়ে তোলার প্রচেষ্টার প্রাথমিক পদক্ষেপ হচ্ছে নারী ও মেয়ে শিশুরা যেন কোনো ধরনের নির্যাতন আর সহিংসতার ভয় ছাড়াই বেঁচে থাকতে পারে—এমন সমাজব্যবস্থা নিশ্চিত করা। শুধু নারী ও কন্যাশিশুদের জন্যই নয়, পুরুষ ও পুত্রশিশুদের ক্ষেত্রেও তা নিশ্চিত করতে হবে। সহিংসতার চক্রের অবসান ঘটাতে প্রয়োজন সমাজের সর্বস্তরে সচেতনতা গড়ে তোলা এবং সবার সংশ্লিষ্টতা। পরিবর্তন শুরু হতে পারে স্থানীয় উদ্যোগের মাধ্যমেও।

একটি উদাহরণ হচ্ছে ‘সখি’ প্রকল্প। নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের অর্থায়নে এবং বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট), বাংলাদেশ উইমেন্স হেলথ কোয়ালিশন, মেরি স্টোপস বাংলাদেশ ও উই ক্যান বাংলাদেশের যৌথ সমন্বয়ে বাস্তবায়িত এ প্রকল্প ঢাকার ১৫টি বস্তির নারীদের তাদের পরিবারের জন্য আয়ের কৌশল প্রশিক্ষণ, চাকরি মেলা আয়োজনের মাধ্যমে চাকরি দাতাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে সহযোগিতা করে। কক্সবাজার জেলায় ঝুঁকির মুখে রয়েছে এমন নারীদের জীবিকা উন্নয়নে কাজ করা বিশ্ব খাদ্য সংস্থাকে (ডাব্লিউএফপি) সহায়তা দিচ্ছে অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাজ্য। সেখানে স্বনির্ভর নারীগোষ্ঠী ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলছে; সঞ্চয়ে অবদান রাখছে এবং প্রত্যেক নারী সম্পদ কিনতে ও উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য প্রশিক্ষণ নিতে পারছে।

সবাইকে সঙ্গে নিয়ে প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে ও দারিদ্র্য দূরীকরণের লক্ষ্যে মনোভাবের পরিবর্তন এবং অর্থনীতির মৌলিক বিষয়াবলী ও প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর যথাযথ ব্যবস্থাপনাই হবে মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা অর্জনের ফর্মুলার প্রধান নিয়ামক। নারীর সামাজিক মর্যাদা এবং তাদের অধিকার নিশ্চিতকরণ এ পরিবর্তনের খুবই গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নারীর প্রতি সহিংসতাকে প্রত্যাখ্যান, একে সহ্য না করা এবং যারা সহিংসতার শিকার, তাদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার মতো সাধারণ কিছু পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে আমরা প্রত্যেকেই এই পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করতে পারি। আমরা, ‘অ্যাম্বাসাডরস ফর চেঞ্জ’-এর যাঁরা প্রতিনিধিত্ব করছি অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, কানাডা, মালয়েশিয়া, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, শ্রীলঙ্কা, সুইডেন, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র সরকারের এবং ইউএনউইমেন, জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ), যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য সংস্থা (ইউএসএআইডি) এবং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডাব্লিউএফপি) হয়ে, আপনাদের প্রত্যেককে আহ্বান জানাচ্ছি, আমাদের পাশে দাঁড়াতে। আমরা আহ্বান জানাচ্ছি, আমাদের বাংলাদেশি বোন, পুরুষ সহকর্মীদের পাশে দাঁড়াতে; যাতে নারীর প্রতি সহিংসতাকে আমরা নির্মূল করতে পারি।

লেখক : বাংলাদেশে অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনার জুলিয়া নিবলেট, ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূত ওয়ানজা ক্যাম্পোস দ্য নোব্রেগা, ব্রুনাই দারুস সালামের হাইকমিশনার হাজাহ মাসুরেই বিন্তি হাজি মাসরি, কানাডার হাইকমিশনার বেনওয়া পিয়েরে লাঘামে, ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত সোফি ওবের, মালয়েশিয়ার হাইকমিশনার নুর আশিকিন মোহাম্মদ তায়েব, নেদারল্যান্ডসের রাষ্ট্রদূত লিওনি মারগারেথা কুলেনারে, নরওয়ের রাষ্ট্রদূত সিডসেল ব্লেকেন, শ্রীলঙ্কার হাইকমিশনার ইয়াসোজা গুনাসেকেরা, ব্রিটিশ হাইকমিশনার অ্যালিসন ব্লেক, যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট, ইউএসএআইডির কান্ট্রি ডিরেক্টর ইয়ানিনা ইয়ারুজেলস্কি, ইউএনউইমেনের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ ক্রিস্টিন হান্টার, ইউএনএফপিএর ভারপ্রাপ্ত কান্ট্রি ডিরেক্টর লরি কাটো এবং ডাব্লিউএফপির কান্ট্রি ডিরেক্টর ক্রিস্টা রাডার।

 


মন্তব্য