kalerkantho


বিলোনিয়া যুদ্ধ

জাদুঘরে ‘স্যান্ড মডেল’

নওশাদ জামিল   

৬ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



জাদুঘরে ‘স্যান্ড মডেল’

আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরকে গতকাল বিলোনিয়া যুদ্ধের মডেল হস্তান্তর করেন সেনাপ্রধান জেনারেল আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হক। সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর এই মডেল গ্রহণ করেন। ছবি : কালের কণ্ঠ

১৯৭১ সালের ৪ নভেম্বর। দিন ছাড়িয়ে রাতেও বৃষ্টি।

বৃষ্টিভেজা রাতের অন্ধকারে ফেনীর বিলোনিয়ায় হানাদার পাকিস্তানি ঘাঁটির দিকে এগোতে থাকেন দশম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্যরা। মুক্তিযুদ্ধে সাবসেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন (অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল) জাফর ইমাম দলটির অধিনায়ক। তাঁর সঙ্গে আছেন একদল প্রশিক্ষিত ইপিআর সদস্য ও বেসামরিক মুক্তিযোদ্ধা। রাতেই শুরু হয়ে যায় তুমুল যুদ্ধ। কয়েক দিনের টানা সম্মুখযুদ্ধের পর ১০ নভেম্বর সম্পূর্ণভাবে পরাজিত হয় শত্রুপক্ষ। আত্মসমর্পণে বাধ্য হয় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। আত্মসমর্পণ করে হানাদার বাহিনীর ৭২ জন সেনা ও দুজন সেনা কর্মকর্তা। মুক্তিযুদ্ধে সেটিই ছিল পাকিস্তানি সেনাদের প্রথম আত্মসমর্পণ।

একাত্তরের রণাঙ্গনে এক গৌরবোজ্জ্বল ঘটনা এই বিলোনিয়া যুদ্ধ।

মুক্তিযোদ্ধারা প্রচলিত রীতির বাইরে গিয়ে নিয়েছিলেন ভিন্নধর্মী রণকৌশল। বিলোনিয়া যুদ্ধের এই কৌশল ‘স্যান্ড মডেল’ নামে পরিচিত। সহজ কথা হলো, শত্রুঘাঁটিতে অতর্কিতে ঢুকে পড়ে তাদের অপ্রস্তুত ও বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া। বিলোনিয়া যুদ্ধের সেই রণকৌশল মডেল ঠাঁই পেল মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের নতুন ভবনে। তরুণ প্রজন্মের সামনে এই যুদ্ধের বীরত্বগাথা তুলে ধরতে এই স্যান্ড মডেল হস্তান্তর করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।

রাজধানীর শেরেবাংলানগরে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনে গতকাল রবিবার সকালে এ উপলক্ষে আনন্দঘন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হকের কাছ থেকে বিলোনিয়া যুদ্ধের মডেল গ্রহণ করেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বিলোনিয়া যুদ্ধে সরাসরি নেতৃত্ব দেওয়া বীর মুক্তিযোদ্ধা অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল জাফর ইমাম, মেজর জেনারেল ইমাম-উজ-জামান, মেজর মিজানুর রহমান, মেজর দিদার আতোয়ার হোসেন, মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফা প্রমুখ। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ডা. সারওয়ার আলী ও মফিদুল হক।

অনুষ্ঠানে লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) জাফর ইমাম বীরবিক্রম শুরুতে শোনান বিলোনিয়া যুদ্ধের ঘটনা। সমুদ্রপথে আসা ট্যাংক ও মাইনের মতো আধুনিক সব সমরাস্ত্র চট্টগ্রাম বন্দর থেকে গাড়িবহরের মাধ্যমে যাবে দেশের নানা প্রান্তে হানাদার বাহিনীর ঘাঁটিগুলোতে। ফেনীতে যুদ্ধরত অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর দায়িত্ব পড়ল সমরাস্ত্রবাহী গাড়িগুলোর পথ রুখে দেওয়ার। শুরু হলো প্রচণ্ড যুদ্ধ। হানাদার বাহিনী সম্মুখযুদ্ধে পেরে না উঠে যুদ্ধবিমান থেকে ছুড়তে থাকে বোমা। তাতেও দমেননি মুক্তিসেনারা! তাঁরা রণকৌশল বদলে নিয়ে ভূপাতিত করেন পাকিস্তানি যুদ্ধবিমান। এই যুদ্ধে হানাদারদের পক্ষে ব্যাপক প্রাণহানির পাশাপাশি শহীদ হন অনেক মুক্তিসেনাও। তবে ১০ নভেম্বর ঠিকই আসে কাঙ্ক্ষিত বিজয়।

জাফর ইমাম বলেন, ‘ভৌগোলিক দিক থেকে বিলোনিয়া যুদ্ধটি বেশ কঠিন একটি যুদ্ধ ছিল। রণকৌশলের দিক থেকে এই যুদ্ধ ছিল বেশ দুরূহ। আর পাকিস্তানি সেনারা কিন্তু মিত্রবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেনি। তারা করেছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে। ’

জানা যায়, আগারগাঁওয়ে নবনির্মিত মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরকে সমৃদ্ধ করতে গত বছরের ২৫ জুলাই মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর কর্তৃপক্ষ বিলোনিয়া যুদ্ধের মডেল তৈরির জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সহায়তা চায়। ওই চিঠির ভিত্তিতে বিলোনিয়া যুদ্ধের মডেল তৈরির কাজে হাত দেয় সেনাবাহিনী। তৈরি করা হয় সেই রণকৌশলের মডেল। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নিজস্ব জনবল ও সরঞ্জাম ব্যবহার করে গত বছরের ১০ ডিসেম্বর বিলোনিয়া যুদ্ধের মডেল তৈরির কাজ সম্পন্ন করে। গতকাল সেটি হস্তান্তর করা হয় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে।

মডেলটিতে উঠে এসেছে বিলোনিয়া যুদ্ধ পরিকল্পনার মানচিত্র। কোন দিক থেকে মুক্তিযোদ্ধারা আক্রমণ করেছিলেন, কোন দিকে ছিল পাকিস্তানি সেনাদের ঘাঁটি, কোথায় রেলপথ, কোথায় বাংকার—কাচঘেরা একটি বড় মানচিত্রে তা তুলে ধরা হয়েছে। দর্শনার্থীরা এ মডেল দেখার মধ্য দিয়ে বিলোনিয়া যুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস যেমন জানতে পারবে, তেমনি জানতে পারবে সেই যুদ্ধের রণকৌশল।

মডেল হস্তান্তরের পর সেনাপ্রধান জেনারেল আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হক বলেন, ‘বিলোনিয়া যুদ্ধের মডেল তৈরি এবং হস্তান্তরের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের বিশাল কর্মযজ্ঞে ক্ষুদ্র পরিসরে সম্পৃক্ত হতে পেরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী গর্ববোধ করছে। ভবিষ্যতে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের যেকোনো ধরনের কর্মকাণ্ডে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সম্পৃক্ত হবে। ’ সেনাপ্রধান বলেন, ‘মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বিলোনিয়া যুদ্ধের অসামান্য সাফল্যগাথা মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। এই ইতিহাস নতুন প্রজন্মকে আলোকিত করার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করবে। একই সঙ্গে সামরিক বাহিনীর রণকৌশল নির্ধারণেও এই যুদ্ধের ইতিহাস অবশ্যপাঠ্য। ’

মুক্তিযুদ্ধকে বিশ্ব ইতিহাসের ‘এক অনন্য জনযুদ্ধ’ উল্লেখ করে সংস্কৃতিমন্ত্রী বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের প্রতিটি অধ্যায় নিয়ে অসাধারণ সব উপন্যাস লেখা যেতে পারে; নির্মিত হতে পারে চলচ্চিত্র। দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধাদের কাহিনিগুলো লিপিবদ্ধ ও সংরক্ষণ করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের গর্বিত উত্তরাধিকার নতুন প্রজন্ম যেন এই ইতিহাস ধারণ করতে পারে, সে জন্য সব বাধা অপসারণ করতে হবে। ধর্মান্ধ ও উগ্র মৌলবাদীগোষ্ঠী নানাভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আলোকিত হয়ে সর্বশক্তি দিয়ে তা প্রতিহত করতে হবে। ’

সমাপনী বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক বলেন, ‘আমাদের একটি চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ দ্রুততম সময়ে বিলোনিয়া যুদ্ধের মডেল তৈরি করেছে এবং এ উদ্যোগের সঙ্গে বিলোনিয়া যুদ্ধের মুক্তিযোদ্ধারাও সম্পৃক্ত ছিলেন। তাঁরা আমাদের জানালেন, এটি হস্তান্তরের সময় সেনাপ্রধান উপস্থিত থাকতে চান। এ ঘটনাটি আমাদের অভিভূত করেছে। ’

বিলোনিয়া যুদ্ধের মডেল তৈরির সঙ্গে সম্পৃক্ত সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ জানিয়ে মফিদুল হক বলেন, ‘১৯৯৬ সালে সেগুনবাগিচার একটি ভাড়া বাসায় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের যাত্রা শুরু হয়। তখন সামনের পথরেখা আমাদের জানা ছিল না। যেমন মুক্তিযুদ্ধে যখন বাঙালি ঝাঁপ দিয়েছিল তখন কেউ জানত না সামনে কী ঘটবে। কিন্তু সবার অন্তরে এই আস্থাটা ছিল—সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে যে লড়াই, গোটা জাতিকে বঙ্গবন্ধু যেভাবে ঐক্যবদ্ধ করেছেন এবং সেই ঐক্যের শক্তিতে বাঙালি সব বাধা অতিক্রম করে এগিয়ে যাবে। ’


মন্তব্য