kalerkantho


ফসলি জমি ‘ন্যাড়া’ করে অবৈধভাবে মাটি কিনছে ইটভাটা

হাওরপারের মাটি নৌপথে যাচ্ছে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জের ইটভাটায়ও

নাসরুল আনোয়ার, নিকলী (কিশোরগঞ্জ) থেকে   

২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার ঘোড়াউত্রা নদীর পশ্চিম পারে ভেড়ানো থাকে বিশাল বাল্কহেড কার্গো। এক্সক্যাভেটরে কাটা হয় পারের ফসলি জমির মাটি।

সেই মাটি পরে এক্সক্যাভেটরে করেই তোলা হয় নৌযানে। সেখান থেকে কার্গোবোঝাই মাটি চলে যায় ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন ইটভাটায়। চার-পাঁচ মাস ধরেই লাখ লাখ ঘনফুট মাটি এভাবে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনকে হাত করে কিছু লোক অবৈধভাবে মাটির এই ব্যবসা করছে।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, নিকলী, বাজিতপুরসহ কিশোরগঞ্জের অধিকাংশ ইটভাটায় ফসলি জমির মাটি পোড়ানো হচ্ছে। বাজিতপুর উপজেলার হিলচিয়া, নিকলীর জারইতলাসহ কয়েকটি ইউনিয়নে রয়েছে বেশ কিছু ইটভাটা। এসব ভাটায় এখন চলছে ইট তৈরির কাজ। আশপাশের বিভিন্ন জমি থেকে মাটি কিনে ট্রাক্টরে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ওই সব ভাটায়। বাজিতপুর-নিকলী সড়কে গেলে সারা দিন ট্রাক্টরে মাটি বহনের দৃশ্য চোখে পড়বে।

এসংক্রান্ত আইনে মাটি কাটা নিষিদ্ধ করা হলেও আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হওয়ায় মাটি কাটা থামছে না। এভাবে মাটির ওপরের স্তর কেটে নেওয়ায় এ অঞ্চলের ফসলি জমিও হারাচ্ছে উর্বরতা। মাটিবাহী গাড়ির ধুলার কারণে সাধারণ মানুষের এ রাস্তায় চলাচলও কষ্টকর হয়ে পড়েছে।

ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩-এর ৫-এর ১ ধারায় উল্লেখ আছে, ‘কোনো ব্যক্তি ইট প্রস্তুত করার জন্য কৃষিজমি বা পাহাড় বা টিলা থেকে মাটি কেটে বা সংগ্রহ করে তা ইটের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে না। ’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিশেষ করে বোরো ফসল চাষাবাদ করে লোকসানের কবলে পড়া হাওরের কৃষকরা টাকার বিনিময়ে জমির মাটি (টপ সয়েল) বিক্রি করে দিচ্ছে। আবার নদীভাঙনের কবলে পড়া জমির মাটিও বিক্রি হচ্ছে দেদার।

সরিষাপুর গ্রামের গৃহবধূ শরমিন আক্তার জানান, গ্রামের একটি ইটখোলার পাশে তাঁর ২০ শতাংশ জমি আছে। তিনি ওই জমির মাটি বিক্রি করেছেন ৩০ হাজার টাকায়। ইটভাটার মালিক ওই জমির উপরিভাগের প্রায় চার ফুট মাটি কেটে নিয়েছেন। মাটি বিক্রির কারণ জানতে চাইলে তিনি জানান, ইটখোলা স্থাপনের পর থেকে ওই জমিতে ফসল হতো না। পরে বাধ্য হয়ে মাটিই বিক্রি করে দেন তিনি। তাঁর মতো আরো অনেক জমিওয়ালা ইটভাটায় মাটি বিক্রি করেছে।      

বাজিতপুরের দীঘিরপাড় ইউনিয়ন পরিষদের ৬ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য শেখ আলমগীর এবার ঘোড়াউত্রা নদীর পূর্ব পারে ৫০ শতাংশ জমির মাটি বিক্রি করেছেন ৯০ হাজার টাকায়। তাঁর গ্রাম পাটুলীর আরো ৭০-৮০ জন কৃষকও তাদের জমির মাটি এবার বিক্রি করে দিয়েছেন। এর কারণ বলতে গিয়ে শেখ আলমগীর জানান, কয়েক বছর ধরেই পাউবো (পানি উন্নয়ন বোর্ড) বাঁধের পশ্চিম অংশ নদীতে তলিয়ে যাচ্ছে। এর পর থেকেই কৃষকরা তাদের জমির মাটি বিক্রি করে দিচ্ছে।

দেখা যায়, মাইলের পর মাইলজুড়ে নদীপারের মাটি কাটা চলছে। নিকলীর গুরুই মৌজার অন্তর্ভুক্ত নদীপার ঘুরে দেখা যায়, কয়েকটি এক্সক্যাভেটর জমির মাটি কাটছে। কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে অগণিত শ্রমিক এ কাজে জড়িত। ছাতিরচর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ইয়ার খান চৌধুরী জানান, কয়েক বছর ধরেই এভাবে নদীপারের মাটি কেটে নেওয়া হচ্ছে। তাঁর মতে, এর ফলে পারও ভাঙছে বেশি।

জানা যায়, ভাটাগুলোতে ইট তৈরির জন্য উপযুক্ত এঁটেলজাতীয় মাটির বেশ কদর রয়েছে। হাওরে এ মাটি সহজলভ্য। এ ছাড়া এখানে মাটির দামও অনেক কম। এ কারণে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকার ইটভাটা মালিকরা হাওরাঞ্চল থেকেই এ মাটি সংগ্রহ করছে। যে কারণে ফসলি জমি উর্বরতা শক্তি হারানোর পাশাপাশি হাওরপারে ব্যাপক ভূমিধসেরও আশঙ্কা করছে স্থানীয় লোকজন।   

বিশেষজ্ঞদের মতে, জমির উপরিভাগে ১০-১৫ ইঞ্চি মাটিতে জৈব পদার্থ থাকে। এতে আছে নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাসিয়াম। কিন্তু ইটভাটায় পোড়ানোর জন্য কয়েক ফুট মাটি কেটে নেওয়া হয় বলে ওই জমি উর্বরাশক্তি হারায়।  

এক্সক্যাভেটরচালক লালমনিরহাটের হাতিবান্ধার জিয়াউর রহমান জানান, তাঁর এক্সক্যাভেটরে প্রতি ঘণ্টায় তিনি দুই হাজার ঘনফুট মাটি কাটতে পারেন। বেশ কিছুদিন ধরেই তিনি এখানে মাটি কাটছেন। মাটি বহনকারী কার্গো এমভি রাসেলের শ্রমিক ভোলার আরিফ ও আলী আকবর জানান, গত এক মাসে তাঁদের কার্গো এখান থেকে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন ইটখোলায় সাতবার মাটি নিয়ে গেছে। এ রকম অগণিত ছোট-বড় কার্গো ও বাল্কহেড নৌযান নিয়মিত হাওরের মাটি অন্যত্র নিয়ে যাচ্ছে।

জানা যায়, এ ধরনের একেকটি কার্গো সাত-আট হাজার ঘনফুট মাটি বহন করতে পারে। সেই হিসাবে একটি কার্গোই এক মাসে প্রায় সাড়ে ছয় লাখ ঘনফুট মাটি পাচার করেছে। মাটিকাটা ও নৌযান শ্রমিকরা জানায়, এলাকার একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট তাদের মাধ্যমে মাটির ব্যবসা করছে।   

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইটভাটার মালিক জানান, ভাটার জন্য ফসলি জমির প্রতিফুট মাটি সাধারণত এক থেকে দুই টাকা দরে কেনা হয়। হাওরপারের মাটি অনেক সস্তা। প্রতিফুট বিক্রি হয় ৪০-৫০ পয়সা হারে। সে কারণে উজানের মাটির পরিবর্তে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জের ইটভাটা মালিকরা হাওরের মাটি কেনে।

অবাধে মাটি কাটার অভিযোগ পেয়ে কিশোরগঞ্জ-৫ (বাজিতপুর-নিকলী) আসনের আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য মো. আফজাল হোসেন নিজেই গত ১৬ ফেব্রুয়ারি বিকেলে ঘোড়াউত্রা নদীর পারে যান। জানা যায়, তিনি এভাবে মাটি কাটার দৃশ্য দেখে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হন। পরে সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) মাটি কাটা বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। পরের দিন নিকলীর ইউএনও মো. নাসির উদ্দিন মাহমুদ চার মাটি ব্যবসায়ীকে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা করেন।       

বাজিতপুরের ইউএনও ভাস্কর দেবনাথ বাপ্পি জানান, তাঁর উপজেলার মাটি ব্যবসায়ীদের খুঁজে বের করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।  

কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. আজিমউদ্দিন বিশ্বাস গত ১৮ ফেব্রুয়ারি কালের কণ্ঠকে জানান, জেলার উজান এলাকায় ফসলি জমির ‘টপ সয়েল’ কেটে ইটভাটায় কাজে লাগানোর কথা তিনি শুনেছেন। হাওরপারের জমি থেকে এভাবে মাটি নিয়ে যাওয়ার কথা এর আগে শোনেননি। তিনি তাৎক্ষণিক সংশ্লিষ্ট ইউএনওদের এ ব্যাপারে নির্দেশনা দেওয়ার কথা জানিয়ে বলেন, ‘অবৈধভাবে মাটি কেটে নেওয়ার ব্যাপারে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’

সংসদ সদস্য মো. আফজাল হোসেন জানান, ইটভাটার জন্য এর আগে এভাবে তিনি কোথাও মাটি কাটতে দেখেননি। এসব অবৈধ মাটি ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।


মন্তব্য