kalerkantho

নির্বাচিত কবিতা

মাসুদুজ্জামান

১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



নির্বাচিত কবিতা

কথাটা বোধ হয় বিনয় মজুমদারই বলেছিলেন, কবিতায় তিনি নিরন্তর ‘এলিমিনেশন’ করে চলেন। কিন্তু বিনয়েরও অনেক আগে ঠিক এই এলিমিনেশনের কথা বলেছিলেন উনিশ শতকের ফরাসি কবি স্তেফান মালার্মে।

বলেছিলেন, ‘মাই ওয়ার্ক ওয়াজ ক্রিয়েটেড অনলি বাই এলিমিনেশন। ’ কাকতালীয় বলব কি একে?  হতে পারে, কিন্তু না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ মালার্মে-র্যাঁবোর কবিতা কোনো বাঙালি কবি পড়েননি, তাঁদের কবিতা ভাবনার সঙ্গে পরিচয় ছিল না—এ রকমটা ভাবা কঠিন। তো কবিতায় এই যে বিযুক্তি ও বর্জন, অর্থাৎ অনেক কথাই অনর্গল বলতে পারি, কিন্তু কেন বলব? এই যে সংহতি ও পরিমিতি, বর্জন ও বিচ্যুতি—আমার মনে হয় আধুনিক কবিতার প্রধান লক্ষণ। সৌন্দর্যতত্ত্বের একটি বড় সূত্র। শঙ্খ ঘোষও কি বলেননি, ‘আধুনিকতার প্রকাশ হতে চায় সংহতির ঘনতায়, দিব্য এক কার্পণ্যে?’ এই যে সংহতি, নিবিড়তা অবচেতনার গহন থেকে উঠে এসে কবিতার পঙিক্ততে পঙিক্ততে মনীষার দীপ্তি—এ রকম কবিতাই তো লিখতে চাইবেন একজন আধুনিক কবি। ‘আধুনিক’—এও আরেক বিভ্রম! কোনো এক জিজ্ঞাসুকে ফ্রস্টই তো বলেছিলেন, আধুনিক মানুষকে যিনি তাঁর সময়ের কথা শোনাতে পারেন, তিনিই আধুনিক। শোনানো কি যায় সেটা? কিভাবে?

কবিতা লিখতে গিয়ে এ রকম সময়োচিত বিভাবের মধ্যে আবর্তিত হতে হয়েছে আমাকে। তাই নিজের লেখা কবিতা সম্পর্কে কী বলা যায়—নিজের বই সম্পর্কে কী লেখা যায়, কুণ্ঠিত লাবণ্যে বিনম্রচিত্তে ছোট্ট এই রচনায় পাঠকের উদ্দেশে তাই কিছু কথা নিবেদন করছি।

আমার যে বইটি এবার বেরোচ্ছে তার নাম ‘নির্বাচিত কবিতা’। খুবই প্রথাসিদ্ধ নাম তো? ঠিকই। কিন্তু নিজে যখন নিজেরই বিগতকালের কিছু কবিতার বইয়ের কবিতা দিয়ে সাজিয়ে মলাটবদ্ধ করেছি, তখন ‘নির্বাচিত’ না বলে উপায় কী।

কিন্তু সেও ছিল আরেক দুরূহ কাজ। কোন বই থেকে কোন কবিতাগুলো বেছে নেব? কেন? সব কবিকেই—যাঁরা কবিতার বই বের করেন কিংবা এ রকম কোনো সংকলন করেন— এসব আত্মপ্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়ার পরই কোনো একটা সংকলন দাঁড় করাতে পারেন বলে মনে হয়। কিন্তু সেই পথটা সরল নয়। প্রতিটি লেখার সঙ্গেই তো লেখকের ভালোবাসার সম্পর্ক, তাই কাকে ছেড়ে কাকে রাখি। ফলে কোন কবিতাটা বাদ দিয়ে কোনটাকে অন্তর্ভুক্ত করব, এই টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে যেতে যেতে রক্তাক্ত হতে হয়েছে আমাকে।

রক্তাক্ত? এ শুধু কবিতা বাছাই করার বেলায় ঘটেছে তা কিন্তু নয়। প্রতিটি কবিতার সঙ্গেই মিশে ছিল বিন্দু বিন্দু স্বেদ ও বিষাদ। কে কিভাবে কবিতা লেখেন জানি না। কিন্তু আমার নিজের বেলায় রক্ত-স্বেদ-অশ্রু মিলেমিশে গেছে। আমার প্রতিটি কবিতা তাই যেন আমারই প্রতিবিম্ব, বিষাদগাথা। প্রতিটি কবিতার পেছনে একটা গল্প আছে অথবা বলা যায়, সব কবিতার উৎস হচ্ছে একটিমাত্র গল্প। সে গল্প আমার নিজেরই যাপিত জীবন। লোরকাই তো বলেছিলেন, প্রত্যেক কবি নিরন্তর তাঁর নিজের জীবনকে লিখে চলেন। কিন্তু কবিতা কি এক রকম হয়, একই গল্প দিয়ে রচিত? এ কি শুধু নিজের মধ্যে আবর্তন আর ফেনিল আবেগের উচ্ছ্বাস? কবিতা হতে পারে মানুষের অন্তঃকরণে শিকড়িত আত্মকথন। কিন্তু এসব ছাপিয়ে পরিপার্শ্বের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে চায়।   কবিতা কবির যাপিত জীবন থেকে ছড়িয়ে পড়ে ভূমণ্ডলে, বাইরের পৃথিবীতে। অন্য মানুষের, সুনির্দিষ্ট করে বললে পাঠকের মনে, মননে হানা দেয়। এ রকম কবিতা লেখার প্রেরণাও তো কবিকে প্রাণিত করতে পারে। আমি নিজেও এ রকম আত্মপ্রেরণা থেকে চারপাশের দেখা জীবনকে কবিতায় তুলে আনার চেষ্টা করেছি। প্রেম যেমন হয়ে উঠেছে আমার যাবতীয় বিষাদের উৎস, যা আজও ক্ষতবিক্ষত করে চলেছে আমাকে, তৈরি হচ্ছে কবিতা তেমনি বৈরী প্রতিবেশও উঠে আসছে শব্দ আর ভাবছবিতে। এবারের বইমেলায় আমার প্রকাশিত ‘নির্বাচিত কবিতা’য় এর আগে প্রকাশিত চারটি কবিতার বই থেকে সেরা কবিতাগুলোই বেছে নেওয়া হয়েছে। সমকালের সামাজিক-রাজনৈতিক ঘটনাবলি যেমন এসব কবিতায় উঠে এসেছে, তেমনি আত্মমথিত প্রেমানুভবের রক্তিম বিচ্ছুরণও পাওয়া যাবে এর অনেক কবিতায়।

এই লেখার সূচনাসূত্রে ফিরে আসি। হ্যাঁ, এলিমিনেশন, অর্থাৎ বস্তু নয়, বস্তুপ্রতিভাসই আমাকে টেনেছে। ফলে ঘটনা নয়, ঘটনার নির্যাসই হয়ে উঠেছে আমার কবিতা। কবিতাগুলো তাই আমার মনে হয় তীব্রভাবে অনুভূতিপ্রবণ, ইন্দ্রিয়ঘন ভাবছবি। ভাবার্পণের পাশাপাশি মনোবাস্তবময়। অবিরল কথা বলে যাওয়া নয়, ঘন সংহত লিরিক বলা যায় এই কবিতাগুলোকে। জানি না, পাঠকের কেমন লাগবে কবিতাগুলো, কিন্তু পড়ার আমন্ত্রণ থাকল।

নির্বাচিত কবিতা, চৈতন্য, প্রচ্ছদ নির্ঝর নৈঃশব্দ্য, মূল্য ২০০ টাকা।


মন্তব্য