kalerkantho


আলো-আঁধারে কয়েকটি সোনালি মাছ

ইকবাল হাসান

৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



আলো-আঁধারে কয়েকটি সোনালি মাছ

কুয়াশা এমন নেমেছে যে খালপাড় থেকে একটু দূরে, যদিও নদী আছে কি নেই তা-ই বা কে জানে। পবনের স্মরণ হয় যে এই বাদুরতলা ও ওপারে নলবুইন্না গ্রাম, যেখানে তার ইষ্টিকুটুমসহ মোট ১২টি পরিবার ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল একদা, তাদের অন্নদাতা বিশখালী নদী, এখানেই ছিল এবং এখনো যদি থেকে থাকে তবে তা দৃষ্টির অগোচরে ঘন কুয়াশার তলদেশে পলায়নরত; আর এ অবস্থায় তার নৌকাটির বন্ধনহীন ভেসে যাওয়ার একটা অশুভ সম্ভাবনা পবনকে কিঞ্চিত বিভ্রমের দিকে ঠেলে দিলে সে সহসাই অস্থির হয়ে ওঠে।

ডানে-বামে তাকিয়ে দেখার যথাসাধ্য চেষ্টা করে আশপাশে কারো উপস্থিতির কিন্তু চারদিকে কুয়াশার দেয়াল আর এই কুয়াশাপ্লাবিত ভোরবেলা, মানুষের তো আর খেয়েদেয়ে কাজ নেই যে তারা আধা আন্ধা পবনকে সঙ্গ দিতে আসবে এবং এখন কাউকে না দেখতে পেয়েও তার ধারণা হয় যে কেউ না কেউ নিশ্চয়ই আছে আশপাশে কুয়াশার ভিতর। ডাক দিলেই সাড়া পাওয়া যাবে। অতএব সে যখন ‘ও হাতেম, আইছো নাহি’— বলে ডেকে ওঠে, না বাম দিক থেকে, না ডান দিক থেকে তখনো কারো সাড়াশব্দ আসে না। কিছুক্ষণের জন্য হতভম্ব হয়ে যায় পবন। [পবন মাঝির নাও ]

চোখের সাদায়, দৃষ্টি যেহেতু পলকহীন ও নিশ্চল, স্থির সকালের আলো। যা বেশি মাত্রায় অকাব্যিক এবং ফুটে ওঠার আগেই এ মতো দৃশ্যের ফাঁক-ফোকর দিয়ে মাছিরা পলায়নরত। কারণ আলো ফুটে উঠতে না উঠতে দু-একজন করে লোক কুণ্ডলী পাকানোর মতো ভিড় রচনা করে এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই ওই রচিত ভিড়ের ভিতর আলোচ্য বিষয় হয়ে ওঠে একতাল রক্তের ওপর শুয়ে থাকা মানুষটি।

কেউ কেউ তাকে শনাক্ত করতে পারে বটে, আবার পারেও না। ভয় তাড়া করে তাদের।

ফলে যদিও আপাত দৃষ্টিতে ওই কুণ্ডলী পাকানো ভিড়ে তাদের দণ্ডায়মান দেখায় কিন্তু তারা হয় ভিতরে ভিতরে মাছিদের মতোই পলায়নরত। আশ্চর্য সবাই তখন, কারো কারো দৃষ্টি দূরগামী নৌকোর মাস্তুলের মতো অবাক ও অপসৃয়মাণ এবং এক অর্থে ভ্রমণরত, কারণ তা লাশের শরীরে স্থির না থেকে কখনো বা জল ও দীর্ঘশ্বাসের অতলে তলিয়ে যায় যেন। আবার কখনো অস্থির বিচরণ করে সূর্য যেদিক থেকে উঠছে তার বিপরীত দিকের গাছপালার ওপর।

[কিংবদন্তির ছায়া]

অতঃপর একদিন রাতের দ্বিপ্রহরে আবার আমরা মিলিত হই, বাদুরতলা-মঠবাড়ি সাঁকোর নিচে, আধো আলো আধো অন্ধকারে। আমার বা পাশে শামছু আর ডান পাশে শ্যামল। শামছুর গলা আজ উন্মুক্ত এবং তা বাম দিকে কাত হয়ে আছে। সদ্য জবাই করা খাসির গলার মতো চাপাতির কোপে গভীর ক্ষত জায়গাটায় এখন ঠিকরে পড়ছে দূরের কোনো গ্রহ থেকে ছুটে আসা একটুকরো হিরন্ময় আলো। এবং অপার্থিব আলোতে এই ক্ষত এখন যথেষ্ট লাল ও দগদগে। যেন এই মাত্র খুন হয়েছে শামছু, হিরন্ময় অপার্থিব আলোতে নয়, বরং যেন লাল টকটকে রক্তে ভেসে যাচ্ছে ওর শরীর। এ মতো ভাবনা আমাদের দিশাহারা করে তোলে। আমরা হতবিহ্বল হয়ে বিষখালির দিকে তাকিয়ে থাকি। [আলো-আঁধারে কয়েকটি সোনালি মাছ]

আলো-আঁধারে কয়েকটি সোনালি মাছ গল্পগ্রন্থটিতে রয়েছে ১৩টি গল্প। ভাষা ও বিষয়বৈচিত্র্য বিবেচনায় এই গ্রন্থটি আমার লেখা অন্যান্য গল্পগ্রন্থ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এক ধরনের অস্থিরতা আর মনোকষ্ট থেকে এই গল্পগুলো লেখা। বাস্তব-অবাস্তবের আধো আলো আধো অন্ধকারের সুড়ঙ্গপথে ঘোর ও বিভ্রমের মায়াজাল পাঠককে ক্ষণকালের জন্য হলেও আচ্ছন্ন করে রাখবে আশা করি। নিজের লেখা নিয়ে আমার উচ্চাশা সীমিত, কী লিখলাম, কী আছে গল্পে—পাঠকরাই বলবেন।

আলো-আঁধারে কয়েকটি সোনালি মাছ। প্রকাশক : সময়। প্রচ্ছদ : ধ্রুব এষ। মূল্য : ১৫০ টাকা।

 


মন্তব্য