kalerkantho


দায়ী অসচেতন অভিভাবক ও প্রযুক্তির অপব্যবহার

রেজাউল করিম   

৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



দায়ী অসচেতন অভিভাবক ও প্রযুক্তির অপব্যবহার

ভয়ংকর সব অপরাধে কিশোরদের সম্পৃক্ততা বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে। দেশজুড়ে হত্যা, ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, চাঁদাবাজিসহ ছোটখাটো নানা অপরাধে জড়াচ্ছে উঠতি বয়সীরা।

এ জন্য তথ্য-প্রযুক্তির অপব্যবহার ও মা-বাবার অসচেতনতাকেই সবার আগে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছোটবেলা থেকে শিশুদের সঠিক পরিচর্যা, ভালোভাবে বেড়ে উঠতে উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা, পারিবারিকভাবে তাদের সামনে উন্নত আদর্শ তুলে ধরা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করে এসব অপরাধ থেকে কিশোরদের বিরত রাখা সম্ভব। পাশাপাশি সামাজিকভাবে সচেতনতা বৃদ্ধি ও শিশু-সংক্রান্ত আইনগুলো যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ ধরনের অপরাধের লাগাম টেনে ধরা যেতে পারে।

ঢাকায় কিশোরদের অপরাধ বিচারে গঠিত ‘কিশোর আদালত’ সূত্রে জানা যায়, গত ২০১৫ সাল থেকে চলতি বছরের বর্তমান সময় পর্যন্ত দেশে মোট ৫১৪টি মামলা দায়ের হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৫ সালে ২০০টি, গত বছর ৩০৬টি ও চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত আটটি মামলা রয়েছে। হত্যা, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, যৌন হয়রানি ও নানা ছোটখাটো অপরাধের এসব মামলায় অভিযোগ রয়েছে কিশোরদের বিরুদ্ধে।

কিশোর আদালতের সরকারি আইনজীবী শাহাবুদ্দিন মিয়া জানান, এসব মামলার বাইরে গত পাঁচ বছরে শুধু ঢাকা শহরেই প্রায় ১৫টি আলোচিত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কিশোর-কিশোরীদের জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। গত ৬ জানুয়ারি রাজধানীর উত্তরায় আদনান (১৪) নামের এক কিশোরকে হত্যা করে ১৮ থেকে ২০ জন কিশোর। ওই ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় দুই কিশোর আসামি রিমান্ডে এমন তথ্য জানায়।

এ রকম অনেক ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কিশোর ও তরুণরা জড়িত।

গত ২৮ জানুয়ারি ছাত্রী উত্ত্যক্তের প্রতিবাদ করায় বরিশালে সাইদুর রহমান হৃদয় গাজী নামের এক স্কুল ছাত্রকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। আরেক স্কুল ছাত্র সাঈদ আবেদীন আবদুল্লাহ ও তার সহযোগীরা ওই হামলা চালায় বলে অভিযোগ রয়েছে।

গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর মিরপুরের পল্লবীতে মেহেদী হাসান নামের এক কিশোর ক্রিকেটার নিহত হয়। স্থানীয় দুই সিনিয়র ও জুনিয়র দুই কিশোর গ্রুপের রেশারেশির জের ধরেই তাকে খুন করা হয়। একই ধরনের ঘটনায় মিরপুরে মাইদুল ইসলাম নামের এক কিশোর নিহত হয় অপর কিশোর গ্রুপের হাতে।

গত বছরের জুন মাসে রাজধানীর শনির আখড়ায় ১৫ বছরের এক কিশোরকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গাড়ির যন্ত্রাংশ চুরির মামলার আসামি ওই কিশোরকে পরে কিশোর বিকাশ কেন্দ্রে পাঠান আদালত। এক মাস পর জামিন পেয়ে সে আর অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়ায়নি বলে জানান তার আইনজীবী সাখাওয়াত হোসেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক জিয়া রহমান ক্রমবর্ধমান কিশোর অপরাধের জন্য তথ্য ও প্রযুক্তির অপব্যবহারকেই দায়ী করছেন। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, তথ্য-প্রযুক্তি এখন হাতের নাগালে। যে যখন যা ইচ্ছা সে ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারছে। আর এর অপব্যবহার করে যে নোংরা মানসিকতা তৈরি হচ্ছে ঘরের বাইরে গিয়েই সে তা প্রয়োগ করছে।

জিয়া রহমান বলেন, এমন অনেক পরিবার রয়েছে যারা দ্রুতই অনেক টাকা-পয়সার মালিক হয়ে গেছে। কিন্তু তাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই। ফলে সন্তানকে সুপথে পরিচালিত করার পর্যাপ্ত যোগ্যতা ও দক্ষতা নেই তাদের। এসব পরিবারের কিশোররা বেশির ভাগ অপরাধে জড়িত হচ্ছে প্রযুক্তির অপব্যবহারের প্রভাবে। অন্যদিকে ছিন্নমূল ও সহায়হীন অনেক কিশোরও জড়িত হচ্ছে নানা অপরাধে। অভিভাবকহীন অবস্থায় ছোটবেলা থেকেই অপরাধ জগতের সঙ্গে বেড়ে ওঠায় ওরা নানা ধরনের অপরাধ সংঘটন করছে। আর ফেসবুক, ভিডিও গেমসহ নানা কিছুর যথেচ্ছ ব্যবহারেও কিশোররা অপরাধে জড়াচ্ছে।

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ মোস্তাফা জব্বার অবশ্য অভিভাবকদের অসচেতনতাকেই বেশি দায়ী করছেন। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, তথ্য-প্রযুক্তির অপব্যবহরের চেয়ে একজন কিশোর অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার পেছনে বড় দায়ী তার মা-বাবা। সন্তান কিভাবে কোনটার ব্যবহার করবে, তার ভিত্তি রচিত হয় পরিবার থেকে। এখানে প্রযুক্তিকে ঢালাওভাবে দায়ী করার সুযোগ নেই। মোস্তাফা জব্বার বলেন, কিশোর অপরাধ কমিয়ে আনতে প্রথমত পরিবারকে সচেতন হতে হবে। শিশু-কিশোরদের সামনে আদর্শ স্থাপন করতে হবে। এ ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যথাযথ পরিবেশ ও শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

জাতীয় মানসিক রোগ ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ডা. মেখলা সরকার বলেন, সাধারণত ১৪ থেকে ১৮ বছরের শিশুদের কিশোর হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। নানামুখী বিকাশের এই সময়টাতে ওদের মাঝে অনেক আবেগ থাকে। আর অপরিণত আবেগ অনেক সময় ওদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে উৎসাহিত করে। এই সময়টাতে সন্তানের মানসিক চাহিদা বুঝতে হবে মা-বাবাকে। সন্তানের সঙ্গে তাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ার মাধ্যমে এ ধরনের সমস্যা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। তিনি বলেন, কিশোর অপরাধ নতুন কিছু নয়। তবে বর্তমান সময়ে এসে এই অপরাধ বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে।

ডা. মেখলা সরকার আরো বলেন, একটি শিশু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার মধ্যে স্বকীয়তা তৈরি হতে থাকে। এ সময়টাতে তার মতামতকে প্রাধান্য দিতে হবে। পাশাপাশি ওদের হাতে যে স্মার্ট ডিভাইস, ল্যাপটপ, কম্পিউটার তুলে দেওয়া হচ্ছে, এসব বিষয়ে যথাযথ পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম সম্প্রতি এক সেমিনারে বলেন, মাঠের অভাবে রাজধানীতে একটি শিশু বা কিশোর ঘরবন্দি থেকে তথ্য-প্রযুক্তিতে আসক্ত হচ্ছে। উঠতি বয়সে এই ঘরবন্দি জীবনে তার মনে নানা কুচিন্তার সৃষ্টি হয়। আর সুযোগ পেলেই সেই কুচিন্তার বহিঃপ্রকাশ ঘটায় সে। এভাবে সে ধীরে ধীরে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে।

বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ নূর খান বলেন, প্রথমে কিশোর বা শিশু অপরাধের মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিতে হবে। আর অপরাধের সংস্পর্শে কিশোররা যাতে না আসতে পারে সে জন্য সংশ্লিষ্ট আইনগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। এ ছাড়া তথ্য-প্রযুক্তির খারাপ প্রভাবের বিষয়টি সরকার ও অভিভাবকদের খেয়াল রাখতে হবে। বিশেষ করে মোবাইল ফোনের যথেচ্ছ ব্যবহারের কারণে কিশোর অপরাধ ক্রমে বেড়ে যাচ্ছে।

জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেন, ‘সারা দেশে কিশোর অপরাধের মামলার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। তবে এমন মামলার সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। সাধারণ ও ধনী পরিবারের সন্তানরা নানা অপরাধে জড়িত হচ্ছে। আবার কিশোর অপরাধীদের একটি বড় অংশই অভিভাবকহীন, পথশিশু ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন অংশ। এসব অপরাধীকে আইনের আওতায় এনে সংশোধনের ব্যবস্থা নিতে হবে। মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়াটাও জরুরি। ’

সালমা আলী বলেন, ‘বর্তমান সময়ে সাধারণ মানুষও আদালতে বা কারাগারে গেলে এমনিতেই তার মধ্যে একটি খারাপ প্রবণতা তৈরি হয়। ভালো হওয়ার মানসিকতা নষ্ট হয়ে যায়। শিশু-কিশোররা যাতে অপরাধের সঙ্গে না জড়ায় সেজন্য অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। প্রতিটি স্কুলে একজন করে মনোবিজ্ঞানী রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। এ ছাড়া অভিভাবকহীন শিশুদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে। একটি পথশিশু তার জীবন চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু পেলে সে আর অপরাধের সঙ্গে জড়াবে না। ’

বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও শিশু আইন বিশেষজ্ঞ ড. নাহিদ ফেরদৌসী বলেন, শিশুরা অপরাধের সংস্পর্শে আসার আগে ও পরে দুই রকম পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। একটি শিশু বা কিশোর অপারাধীকে আইনের কাছে সোপর্দ করার পর তাকে অবশ্যই সংশোধন কেন্দ্রে পাঠাতে হবে। পাশাপাশি সংশোধন কেন্দ্রেও উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। আইন অনুযায়ী একজন কিশোরকে উপযুক্তভাবে সংশোধন প্রক্রিয়ার মধ্যে আনা গেলে সে অবশ্যই সংশোধন হবে।


মন্তব্য