kalerkantho


টিআইবির গবেষণা প্রতিবেদন

ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রের বরাদ্দের ৩০ শতাংশ ভাগবাটোয়ারা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রের বরাদ্দের ৩০ শতাংশ ভাগবাটোয়ারা

দেশের ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর অধিকাংশই নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে তৈরি। এর কারণ—এসব আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণে যে অর্থ বরাদ্দ করা হয় গড়ে তার ৩০ শতাংশই বিভিন্ন পর্যায়ে ভাগবাটোয়ারা হয়ে যায়। বিভিন্ন সরকারের সময়ই এ অনিয়ম হয়েছে বলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবির এক গবেষণায় এ তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

গত বছর মে মাসে ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর পরে এ গবেষণা চালানো হয়। গতকাল বুধবার ‘ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু : দুর্যোগ মোকাবিলায় সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে গবেষণার এ ফল প্রকাশ করা হয়।

টিআইবির ওই গবেষণা প্রতিবেদনে নানা ঘাটতির কথা বলা হয়। এর মধ্যে রয়েছে আশ্রয়কেন্দ্র কখনো কখনো রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা ব্যক্তিগত কাছে ব্যবহার করেন। আর সেগুলো যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণও করা হয় না। সেই সঙ্গে দুর্যোগের ঝুঁকি যথাযথভাবে চিহ্নিত না করা এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে ঘাটতির নানা চিত্র ফুটে উঠেছে এ প্রতিবেদনে।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, উপনির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের, টিআইবির গবেষণা ও পলিসি পরিচালক মোহম্মদ রফিকুল হাসান প্রমুখ।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশের অর্জন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশংসিত হয়েছে। এই অর্জনকে এগিয়ে নিতে এ গবেষণায় ঘূর্ণিঝড়-পূর্ব এবং পরবর্তী কার্যক্রমে সুশাসনের চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে।

টিআইবি আশা করে, এই প্রতিবেদনে উপস্থাপিত তথ্য, বিশ্লেষণ ও সুপারিশ বাংলাদেশে দুর্যোগ মোকাবিলায় গৃহীত পদক্ষেপে অধিকতর স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, নাগরিক অংশগ্রহণ এবং শুদ্ধাচার চর্চা নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।

ড. ইফতেখারুজ্জামান আরো বলেন, দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষমতাকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব যে—ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে একজন লোকও মারা যাবে না। তবে এ জন্য সঠিক ঝুঁকি নিরূপণ ও ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য গৃহীত সব পর্যায়ে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও জন অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

ঘাটতির কথা তুলে ধরে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর আগে গবেষণার আওতাভুক্ত ১০টি ইউনিয়নে কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ, পোল্ডার, আশ্রয়কেন্দ্র চিহ্নিত করায় ঘাটতি ছিল। এ ছাড়া আটটি ইউনিয়নে চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ, পোল্ডার, আশ্রয়কেন্দ্র সংস্কারের পদক্ষেপ গ্রহণে ঘাটতি ছিল। এ ছাড়া ঘাটতি ছিল ঘূর্ণিঝড়ের আগে ১০টি ইউনিয়নের কোনো কোনো এলাকার জনগণকে ঝুঁকি-সংক্রান্ত তথ্য জানানোর ক্ষেত্রে। ১০টি উপজেলায়ই ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস মোকাবিলায় নিয়মিত প্রস্তুতি বা মহড়ার আয়োজন করা হয়নি। উপকূলীয় এলাকায় পাঁচ হাজার ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রের চাহিদার বিপরীতে আছে মাত্র তিন হাজার ৭৫১টি। ছয়টি ইউনিয়নের কোনো কোনো ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণে অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর সময় সেই আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর ব্যবহার উপযোগিতা ছিল না।

এ গবেষণায় ঘূর্ণিঝড়ের আগে ও পরে সরকারের গৃহীত কার্যক্রমে সুশাসনের প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। গবেষণার ফলাফলে বলা হয়, ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর আগে কিছু কিছু ক্ষেত্রে আশ্রয়কেন্দ্র প্রভাবশালীদের ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার হয়েছে। আবার প্রভাবশালীদের প্রভাবে আশ্রয়কেন্দ্র যথাস্থানে নির্মাণ না করা, নির্মাণে অনিয়ম ছিল। আর ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর পরবর্তী কার্যক্রমে কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ইচ্ছামাফিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়। তা ছাড়া প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকাভুক্তিতে ও ত্রাণ বিতরণে রাজনৈতিক সমর্থনকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ত্রাণ আত্মসাৎ অন্যতম চ্যালেঞ্জ ছিল।

গবেষণা ফলাফলের ভিত্তিতে টিআইবি বেশ কিছু সুপারিশ করেছে। একে ঘূর্ণিঝড়প্রবণ এলাকায় ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি চিহ্নিত করে তা মোকাবিলা-সংক্রান্ত তথ্য স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে অবহিত করতে বলা হয়। তা ছাড়া সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও দুর্গম এলাকায় ঘূর্ণিঝড়ের সতর্কবার্তা প্রচারের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ব্যবস্থা নিশ্চিতের পাশাপাশি কমিউনিটি রেডিও এবং মোবাইল ফোনের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়। আর সঠিক সতর্কবার্তা প্রচারের ক্ষেত্রে জাতীয় পর্যায়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের সঙ্গে আবহাওয়া অধিদপ্তর এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে বলা হয়। সেই সঙ্গে প্রয়োজনীয় তহবিল বরাদ্দ এবং কর্মী নিয়োগ করা; আশ্রয়কেন্দ্র রক্ষণাবেক্ষণে কমিউনিটিভিত্তিক  আশ্রয়কেন্দ্র  ব্যবস্থাপনা  কমিটি করার সুপারিশ করে টিআইবি।


মন্তব্য