kalerkantho

বুধবার । ১৮ জানুয়ারি ২০১৭ । ৫ মাঘ ১৪২৩। ১৯ রবিউস সানি ১৪৩৮।


জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল

শিশুদের জন্য ব্যয়বহুল চিকিৎসা বিনা মূল্যে

তৌফিক মারুফ   

১২ জানুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



শিশুদের জন্য ব্যয়বহুল চিকিৎসা বিনা মূল্যে

তিন বছর বয়সী নূরানীকে ট্রলিতে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল লিফটের দিকে। সদ্যই তাকে বের করে আনা হয়েছে ক্যাথ লাবের অপারেশন থিয়েটার থেকে, তখনো জ্ঞান ফেরেনি। পেছনে পেছনে ছুটছেন মা নূরজাহান বেগম। কী হয়েছে—জানতে চাইলে তিনি থেমে বললেন, ‘অপারেশন করিল। জন্মের কাল দিয়া নাকি বুকের মইধ্যে ছিদ্র আছিল। কিন্তু ধরা পড়িল মাত্র কয়েক দিন আগে। এখন নাকি আর কোনো সমস্যা হইব না। ’ 

হাসপাতালে এমন রোগী আর এমন অপারেশন নিত্যদিনের ঘটনা। তবে নূরানীর এ চিকিৎসায় আছে ভিন্নতা। প্রায় দুই লাখ টাকার চিকিৎসা বিনা মূল্যে পেয়েছে সে।

কেবল নূরানীই নয়, তার মতো জন্মগত হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ঝুঁকিতে থাকা প্রায় ১০০ শিশুকে বিনা মূল্যে কাটাছেঁড়া ছাড়া মূল্যবান বিভিন্ন ডিভাইস পরিয়ে দেওয়া হচ্ছে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে। গত ৭ জানুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে তালিকাভুক্ত শিশুদের জন্য এ ধরনের সেবা, যে শিশুদের সবাই দেশের বিভিন্ন এলাকার হতদরিদ্র পরিবারের সন্তান। আগামীকাল বৃহস্পতিবার শেষ হবে এ কার্যক্রম। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের শিশু হৃদরোগ বিভাগের উদ্যোগে এ কার্যক্রম বাস্তবায়ন হচ্ছে কাতার রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির আর্থিক ব্যবস্থাপনায়।

জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. আফজালুর রহমান জানান, জন্মগত শিশু হৃদরোগ একটি মারাত্মক ব্যাধি। দেশে বর্তমানে প্রায় তিন লাখ শিশু এ রোগে আক্রান্ত। প্রতিবছর আরো প্রায় ৪০ হাজার শিশু এমন ঝুঁকিপূর্ণ রোগ নিয়ে জন্মগ্রহণ করে, যাদের মধ্যে ৫০ শতাংশ বিনা চিকিৎসায় মারা যায়। এ রোগের চিকিৎসা অত্যধিক ব্যয়বহুল হওয়ায় দরিদ্র পরিবারের পক্ষে এর চিকিৎসা করানো সম্ভব হয় না। এ ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে প্রতিবছর কিছুসংখ্যক শিশুকে বিনা মূল্যে এ চিকিৎসা দেওয়া হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। তবু চেষ্টা অব্যাহত রাখা হয়। এর অংশ হিসেবেই বাইরের বিভিন্ন সংস্থার সহায়তায় বিশেষ কার্যক্রমের আওতায় কয়েক বছর ধরে বেশিসংখ্যক শিশুর জন্য এমন ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

এবারের ছয় দিনব্যাপী এ বিশেষ সেবা কার্যক্রমের সমন্বয়কারী জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের শিশু হৃদরোগ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুস সালাম কালের কণ্ঠকে বলেন, এ সেবা দেওয়া হয় একটি কর্মশালার মাধ্যমে, যাতে এ হাসপাতালের চিকিৎসকরাও শিখতে পারেন। এর আগে ২০১১ সাল থেকে আরো সাতটি এমন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়। এতে ২৮৫ শিশুকে চিকিৎসা দেওয়া হয়, যারা সবাই এখন সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠছে। আগে অন্য একটি সংস্থার আর্থিক সহায়তায় এ কার্যক্রম হলেও এবার সহায়তা দিচ্ছে কাতার রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি। এবার প্রাথমিকভাবে ৬৬টি শিশুর তালিকা করা হলেও তা বেড়ে ১০০টির কাছাকাছি হয়ে যাচ্ছে।

ডা. এ বি এম আব্দুস সালাম জানান, কাটাছেঁড়া ছাড়া বা নন-সার্জিক্যাল ব্যবস্থায় এনজিওগ্রাফি পদ্ধতিতে এ চিকিৎসা দেওয়া হয়। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের নিজস্ব সক্ষমতা বাড়াতে পারলে নিয়মিত এ সেবা দিয়ে বহু শিশুর জীবন রক্ষা করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন সরকারের উদ্যোগ, জনবল ও অবকাঠামোগত সমস্যা দূর করা এবং প্রয়োজনীয় ডিভাইস জোগান দেওয়া। নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় এ সেবার সুযোগ তৈরি করা গেলে বাইরের কোনো সংস্থার অপেক্ষায় তাকিয়ে থাকতে হবে না।

কাতার রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির রিসোর্স মোবিলাইজেশন বিভাগের প্রধান আহমেদ আলি আল খুলাইফি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাংলাদেশের জন্মগত হৃদরোগে আক্রান্ত দরিদ্র পরিবারের শিশুদের জীবন সুরক্ষায় এগিয়ে আসতে পেরে আমরাও খুব খুশি। সুযোগ পেলে আগামীতেও আমরা এ কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারি। ’

ওই কর্মকর্তা জানান, এ কার্যক্রমের আওতায় চিকিৎসার সুযোগ পাওয়া প্রতিটি শিশুর পেছনে তাঁদের পক্ষ থেকে ব্যয় হচ্ছে প্রায় দুই হাজার ২০০ মার্কিন ডলার করে। প্রথমে ৬৬ জনের নাম তালিকা করা হলেও তা এখন প্রায় ১০০ জনে ঠেকেছে।  

ডা. এ বি এম আব্দুস সালাম বলেন, প্রায় পাঁচ ধরনের ডিভাইস ও চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। সাধারণ সময়ে চিকিৎসার জন্য জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের ভেতর থেকেই বিশেষ কমিটির মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করে প্রকৃত হতদরিদ্র পরিবারের সন্তানদের বিনা মূল্যে এ চিকিৎসার জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। তবে বিদেশি সংস্থার পক্ষ থেকে এ কার্যক্রমের আওতায় প্রতি রোগীর জন্য যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে সাধারণ সময়ে সচ্ছল ব্যক্তিদের জন্য জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে একই চিকিৎসা অনেক কম খরচে দেওয়া হয়ে থাকে।


মন্তব্য