kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ঐতিহাসিক নিদর্শন

সাদ্দামের প্রাসাদে জাদুঘর

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



সাদ্দামের প্রাসাদে জাদুঘর

গুলি-বোমায় ক্ষতিগ্রস্ত সাদ্দামের প্রাসাদটি সংস্কার করে জাদুঘরে রূপ দেওয়া হচ্ছে। ছবি : বিবিসি

ইরাকের একসময়ের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী রাষ্ট্রনায়ক। কঠোর হাতে দেশ শাসন করেছেন ২৪ বছরেরও বেশি সময়।

তাঁর হাতে পরমাণু অস্ত্র আছে, এই ‘মিথ্যা’ অভিযোগ তুলে তাঁর বিরুদ্ধে ২০০৩ সালে অভিযান চালায় মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনী। অভিযানে প্রথমে তিনি ক্ষমতাচ্যুত, পরে হন আটক। ২০০৬ সালে তাঁকে ঝুলতে হয় ফাঁসির দড়িতে। ইরাকের সেই আলোচিত প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন; যিনি নিজের জন্য তৈরি করেছিলেন ৭০টির বেশি প্রাসাদ। এর একটি প্রাসাদ এখন পরিণত হয়েছে জাদুঘরে। সম্প্রতি সেটি খুলে দেওয়া হয়েছে দর্শনার্থীদের জন্য।

জাদুঘর বানানো সেই প্রাসাদ ইরাকের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর বসরায় অবস্থিত। ইরাকের সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক বহু প্রত্ন রাখা হয়েছে জাদুঘরটিতে, যা দেখতে প্রতিদিন ভিড় করছে হাজার হাজার ইরাকি ও বিদেশি দর্শনার্থী। বিশাল লোহার ফটক ঠেলে ঢুকতে হয় এর ভেতরে। নিদর্শনগুলো চুরির হাত থেকে রক্ষার জন্যই লোহার ফটকটি বসানো হয়েছে বলে দায়িত্বশীলরা জানিয়েছেন।  

সাদ্দাম হোসেনের মৃত্যুর পর তাঁর বসরার প্রাসাদে কী স্থাপন করা হবে, তা নিয়ে চলে বিস্তর চিন্তাভাবনা। শেষমেশ ব্রিটিশ সেনাবাহিনী এবং জাদুঘরের প্রকল্প পরিচালক কাহ্তান আল-ওবেইদের মাথা থেকে বের হয় প্রাসাদটিকে জাদুঘরে রূপান্তরের পরিকল্পনা।

ইরাক যুদ্ধের সময় প্রাসাদটির বিদ্যুত্ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যায়। ভেঙে পড়ে পানির পাইপলাইনও। প্রাসাদটির সামনের অংশ হয় পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত। ব্রিটিশ সেনাবাহিনী যখন বসরায় মোতায়েন ছিল, তখন এই প্রাসাদকে তারা ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার

করেছিল। প্রাসাদটিকে জাদুঘর করার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হওয়ার পর সেখানে শুরু হয় ব্যাপক সংস্কারকাজ, আর এর দায়িত্ব দেওয়া হয় মাহদি আলুসাভি নামে ২৭ বছর বয়সী যুবকের হাতে। তিনি তিন বছর ধরে প্রাসাদটির ধোয়ামোছা, মেরামত ও চুনকামের কাজ তদারকি করেন।

মাহদি আলুসাভি বলেন, ‘সাদ্দাম হোসেনের মালিকানাধীন এই প্রাসাদ আগের মতো করে সাজানোর কাজ শুরুর আগে আমাকে নিজের সঙ্গে নিজের বোঝাপড়া করতে হয়েছে। ’ প্রাসাদটি নির্মাণ করা হয় নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে। ঠিক ওই সময় ইরাকে যুদ্ধ ও দুর্ভিক্ষ চলছিল।

মাহদি বলেন, ‘যেদিন প্রথম আমি প্রাসাদটি দেখি, সেদিনই অনুধাবন করতে পারি, শুধু ইট দিয়ে প্রাসাদটি তৈরি হয়নি, এর সঙ্গে বহু মানুষের রক্ত মিশে আছে। আর যেদিন প্রাসাদটি জনগণের জন্য খুলে দেওয়া হলো, সেদিন আমি আবেগ ধরে রাখতে পারিনি, আনন্দে কেঁদে ফেলেছিলাম। ’ 

প্রাসাদটির সামনের দিকের ব্যালকনিটি মেরামত করতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি গর্ব অনুভব করেন মাহদি। এটি মেরামত করেন মূল নকশা অনুযায়ী। তিনি বলেন, ‘এই কাজ সহজ ছিল না। এটিই ছিল প্রকৃত ও আসল চ্যালেঞ্জ। আমি মনে করি, এটি খুব সুন্দর হয়েছে। ’ তিনি জানান, জাদুঘরের কাজ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। তবে একটি গ্যালারি খুলে দেওয়া হয়েছে।   

সাদ্দামের শাসনামলে বেশির ভাগ ইরাকিই জানত না, প্রাসাদের দেয়ালের আড়ালে কী হচ্ছে! তবে সবাই জানত, ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়ারিং এইচডাব্লিউএইচ কম্পানি প্রাসাদের নির্মাণকাজ তদারক করছে। আর ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করছেন ডুরে তৌফিক। সেদিনের সময়গুলোর কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, তাঁকে বলা হয়, প্রতিদিনই প্রাসাদে সাদ্দাম হোসেনের জন্য তিন বেলা খাবার রান্নাবান্না করা হতো। কিন্তু তিনি (সাদ্দাম) কখনোই সেখানে আসতেন না। একে তিনি নিদারুণ অপচয় বলে অভিহিত করেন।

মাহদি বলেন, ‘আমরা যখন প্রথম এখানে আসি তখন দেখি দেয়ালের চারদিকে ও কাঠের তৈরি শিল্পকর্মজুড়ে অন্তত দুই হাজার বার সাদ্দাম হোসেনের নাম লেখা রয়েছে। ’ নতুন প্রধানমন্ত্রী সব নাম মুছে ফেলতে বলেছিলেন জানিয়ে মাহদি বলেন, ‘আমরা দেয়ালগুলোর অনেক অংশই ধুয়েমুছে পরিষ্কার করে ফেলেছি। কিন্তু এখন অনুভব করতে পারছি, ওগুলোও তো আমাদের ইতিহাসের অংশ ছিল। ’

বসরার আগের জাদুঘরটি লুট হয়ে যায় ১৯৯১ সালে। সেই সময় চুরি যায় জাদুঘরের অর্ধেক নিদর্শন। গুলি করে হত্যা করা হয় জাদুঘরের পরিচালককেও। কিন্তু এখন সেই চুরি যাওয়া নিদর্শনগুলো উদ্ধারের চেষ্টা করছেন জাদুঘরের বর্তমান পরিচালক কাহ্তান আল-ওবেইদ। এরই মধ্যে বাগদাদ থেকে এনেছেন শতাধিক নিদর্শন। এ ব্যাপারে তাঁকে সহায়তা করছে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী ও ব্রিটিশ জাদুঘর।

ওবেইদ বলেন, ‘বসরায় সব সময়ই কবিতা পাঠ ও নাটক মঞ্চায়ন হতো। কিন্তু এটা এখন অনেকটাই আড়ালে চলে গেছে। আমরা চাইছি এই জাদুঘরকে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে; যেখানে মানুষ নির্দ্বিধায় আসা-যাওয়া করতে পারবে এবং বিনা মূল্যে সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারবে। এই কাজ করার জন্য আমাদের শুধু অর্থের প্রয়োজন। ’

এ কাজে মানুষের বেশ সাড়া পাচ্ছেন জানিয়ে ওবেইদ বলেন, ‘মানুষ যে কী পরিমাণ সাড়া দিচ্ছে, তা বলে বোঝাতে পারব না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিষয়টি ব্যাপক প্রচার পেয়েছে। ’ তিনি জানান, জাদুঘরটি উন্মুক্ত করার দিনই এক ব্যক্তি জানিয়েছেন তাঁর কাছে অনেক শিল্পকর্ম আছে, তিনি সেগুলো এই জাদুঘরকে দিয়ে দিতে চান।

ওবেইদ বলেন, এই জাদুঘরে থাকা অনেক নিদর্শনই সাদ্দামের তৈরি, যার অনেকগুলোর সঙ্গে গভীর ব্যথা-বেদনা জড়িয়ে আছে। কিন্তু শেষ বিচারে কে জিতবে, সাদ্দাম হোসেন নাকি সভ্যতা? সভ্যতাই তো জয়ী হয় সব সময়। সূত্র : বিবিসি।


মন্তব্য