kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


পর্যটন খাতে মন্দা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে তুরস্ক

সাজ্জাদুল ইসলাম নয়ন তুরস্ক থেকে ফিরে   

৩ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



পর্যটন খাতে মন্দা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে তুরস্ক

পাঁচ শ বছরের পুরনো ইস্তাম্বুলের গ্র্যান্ড বাজারের ভেতরের দোকানগুলোতে শোভা পাচ্ছে তুরস্কের জাতীয় পতাকা। ছবি : কেথ ইউয়েন, ট্রাভেল ইন্সপারেশন ৩৬০

ইউরোপের আকাশ থেকে টার্কিশ এয়ারলাইনসের এয়ারবাসের অপরিসর জানালা দিয়ে ইস্তাম্বুলের সর্বত্র লাল লাল ছোপের রহস্যটা ধরা যাচ্ছিল না। বোঝা গেল মাটিতে নেমে।

ইস্তাম্বুলের সর্বত্র ছেয়ে আছে দেশটির জাতীয় পতাকায়। বাসে-ট্রেনে, রাস্তায়-দোকানে, মারমারা সাগরের বুকে ছোট-বড় সব জাহাজের মাস্তুলে। এমনকি নির্মাণাধীন স্কাইস্ক্র্যাপারের চূড়ায়ও শোভা পাচ্ছে তুরস্কের চাঁদ-তারা খচিত লাল পতাকা। ছোট-বড় পতাকা এত লাল, লালে ধাঁধানো চোখ। বসফরাসের দুই তীরের এক পাশে ইউরোপ অন্য পাশে এশিয়া। দুইয়ের সংযোগ ঘটিয়েছে বসফরাস ব্রিজ। সেই ব্রিজের প্রতিটি সুউচ্চ চূড়ায় শোভা পাচ্ছে তুরস্কের বিশালাকার জাতীয় পতাকা। এত পতাকা কেন? দেশটিতে কি কোনো উৎসব বা জাতীয় দিবস পালিত হচ্ছে? ইস্তাম্বুল বিমানবন্দর থেকে গাড়িতে হোটেলে যাওয়ার পথে পাশে বসা সুদর্শনা তরুণী গাইড ওজলেম বাতাল বললেন, ‘এ বছরের শুরু থেকে বড় বড় কয়েকটি ঘটনা পুরো তুরস্ককে একত্রিত করতে সহায়তা করেছে। এর মধ্যে আছে তুরস্কের বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় আত্মঘাতী বোমা হামলা, গত ২৮ জুন আতাতুর্ক বিমানবন্দরে ইসলামী জঙ্গিদের নির্বিচার গোলাগুলি। সর্বশেষ গত ১৫ জুলাই দেশের সেনাবাহিনীর একাংশের ক্যু করার চেষ্টা। সব কিছু মিলে এসব ঘটনা রুখতে এবং এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও একাত্মতা প্রকাশের ভাষা হিসেবে এই পতাকা প্রদর্শন করছে তুর্কিরা। ’ তাঁর কাছেই জানা গেল, তুরস্কে জরুরি অবস্থা চলছে।

তবে এ বিষয়ে খোলাখুলি কথা বললেন ইস্তাম্বুলের সুলতান আহমেদ এলাকার আক্বায়েক রোডের ‘দুভারেজ’ রেস্তোরাঁর কর্মী আকিফ গায়েক। বেশ লম্বা-চওড়া আকিফ মূলত টার্কিশ আমেরিকান। ইংরেজি বলায় পারদর্শী বলে আমেরিকা থেকে এসে তুরস্কের এই রেস্তোরাঁটিতে বেশ ভালো বেতনে চাকরি করেন তিনি। বললেন, ‘শোন, ইন্টারনেট বিশ্বাস করো না। ওখানে সত্যের চেয়েও যেটি বেশি থাকে তা হলো তুরস্কবিরোধী পশ্চিমা প্রপাগান্ডা। আতাতুর্ক বিমানবন্দরে বোমা হামলাই বলো আর ক্যু-চেষ্টাই বলো, সবই পশ্চিমা ষড়যন্ত্র। তারা চাচ্ছে না হাজার বছরের পুরনো আমাদের এই ঐতিহ্যবাহী শহরে পর্যটক আসুক। আর সে কারণেই যত আত্মঘাতী বোমা হামলা হয়েছে সবই কিন্তু ঘটানো হয়েছে ইস্তাম্বুলের পর্যটকপ্রিয় এলাকাগুলোয়। ’

আকিফের কথার সঙ্গে মিল পাওয়া গেল ব্লু মসক এলাকার অ্যান্টিক ও গয়না বিক্রেতা শানজাল আবদেল হাদির কথায়। তিনি বললেন, “গ্রিসের রুগ্ণ অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে একসময় বিলিয়ন বিলিয়ন ইউরো ঋণ দিয়েছিল ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন (ইইউ)। কিন্তু দেশটি দেউলিয়া হয়ে গেলে ‘ইইউ’ শঙ্কায় পড়ল তাদের ঋণ পরিশোধের বিষয় নিয়ে। এখন ইইউর সেই দেশগুলো আমেরিকার সঙ্গে জোট বেঁধে ষড়যন্ত্র পাকাচ্ছে—ইস্তাম্বুল থেকে ট্রানজিটটা উঠে গেলে গ্রিস হতে পারে পূর্ব-পশ্চিমের বড় আন্তর্জাতিক ট্রানজিট রুট। আর এ কারণেই তুরস্ককে, বিশেষ করে আতাতুর্ক বিমানবন্দরটিকে অকার্যকর করার চেষ্টা করছে তারা। চেষ্টা চলছে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দেশে আর রুটে চলাচলকারী আমাদের টার্কিশ এয়ারলাইনসের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার। ” আবদেল হাদি জানালেন, এ দেশে বর্তমানে পাঁচটি ইসলামী ও ভিন্নমতাবলম্বী জঙ্গিদল সক্রিয়। ওদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মদদ দিচ্ছে পশ্চিমা দেশগুলো। আর জঙ্গি উপদ্রব বাড়ার কারণে এখানে পর্যটক কম আসছে।

ইস্তাম্বুলের ইতিহাসে গত জুন থেকে পরবর্তী তিন মাস অনেক কম বিদেশি পর্যটক এসেছে। এটি বিরল অভিজ্ঞতা বলে জানালেন ইটিলার ইস্তাম্বুলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা গোচিহ মেরিক। থাকসিম স্কয়ারে মেট্রোতে তাঁর সঙ্গে পরিচয়। তিনি জানালেন, গত বছর সরকারি পরিসংখ্যানে এ দেশে বিদেশি পর্যটক এসেছিল প্রায় সাড়ে চার কোটি। বিশ্বে পর্যটন খাতে উপার্জনকারী দেশ হিসেবে তুরস্কের অবস্থান ১০ নম্বরে, আর জনপ্রিয়তায় ছয়ে। অথচ এ বছর পর্যটনের ভরা মৌসুম জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিদেশি পর্যটকদের দেখাই মেলেনি। এ প্রভাব পড়েছে দেশটির পর্যটন খাতে। বিশেষ করে ইস্তাম্বুলের হোটেল-রেস্তোরাঁগুলোয় এখন বিদেশি পর্যটকদের দেখাই যায় না। বসফরাস প্রণালিসংলগ্ন রেস্তোরাঁগুলোয় এখন সুনসান নীরবতা। তবে তাঁর ধারণা, আগামী তিন মাসের মধ্যে এ অবস্থার অনেক উন্নতি ঘটবে।

‘তবে আগস্টের শুরুতে আবার পর্যটক বাড়তে শুরু করেছে আয়া সোফিয়া, টপক্যাপি প্যালেস, ব্যাসেলিকা সিসটার্ন, সোলেমানিয়া মসজিদ, থাকসিম স্কয়ার, পাঁচশ বছরের পুরনো স্পাইস মার্কেট ও গ্র্যান্ড বাজার এলাকায়। ’ জানালেন ছেলমা আবদুলামেদ নামের ইস্তাম্বুলের এক নারী পর্যটন গাইড। জুনের পরবর্তী তিন মাসের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে তিনি বলেন, ‘আমরা এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছি। পশ্চিমা দেশগুলোর পর্যটকরা আসছে না তেমন। আগে লাতিন, আমেরিকান, জার্মান, রাশিয়ান, ইউরোপের পর্যটকে ভরপুর থাকত ইস্তাম্বুল। এখন আর তাদের দেখা যায় না। তবে আশার কথা, আস্তে আস্তে তারা আসতে শুরু করেছে। আরব, চীনা, অস্ট্রেলিয়ান, রাশিয়ান পর্যটকরা এরই মধ্যে আসা শুরু করেছে। তবে আমেরিকান পর্যটকদের এখনো দেখা নেই। ’ রাশিয়ার সঙ্গে রাজনৈতিক টানাপড়েন এরই মধ্যে শেষ হয়ে গেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এখন রাশিয়ার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক অনেক ভালো। আর কিছুদিনের মধ্যে আমাদের আর রাশিয়া যেতে ভিসা লাগবে না। এগুলো আমাদের জন্য শুভ লক্ষণ। ’

টার্কিশ এয়ারলাইনসের আতিথেয়তায় গত ৫ থেকে ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইস্তাম্বুল ঘুরে এলেও যাওয়ার আগে মনে একটি ভয় ছিল—দেশটিতে ইসলামী জঙ্গির সংখ্যা বাড়ছে, গেলে না জানি কী হয়! কিন্তু সে রকম কিছুই মনে হলো না দেশটিতে নেমে। অথচ যাওয়ার আগের কয়েক দিন ইস্তাম্বুল সম্পর্কে যতটুকু পড়েছি সর্বত্র ছিল রক্ত হিম করা সতর্কবার্তা। পশ্চিমা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম, সংবাদ সংস্থা ও ভ্রমণসংক্রান্ত ওয়েবসাইটগুলোয় ‘দেশটি মোটেও নিরাপদ নয়’—এ রকমই বার্তা দেওয়া হয়েছিল। দেশটি আসলে কেমন চলছে সেটা দেখাতেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সাংবাদিকদের ইস্তাম্বুলে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল টার্কিশ এয়ারলাইনস।

৬ সেপ্টেম্বর ইস্তাম্বুলে সংস্থার প্রধান কার্যালয়ে রাষ্ট্রীয় এ সংস্থাটির চেয়ারম্যান মোহামেদ ইলকার অ্যাইচি আমন্ত্রিত সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, “হাজার বছরের পুরনো আমাদের সংসদের ঐতিহ্য। এটা ভেঙে ফেলতে বহু চেষ্টাই হয়েছে। কিন্তু আমাদের দৃঢ়তা আর পুরো জাতি হিসেবে তা মোকাবিলার সক্ষমতা সব ষড়যন্ত্রই ব্যর্থ করে দিয়েছে। আতাতুর্কে নির্বিচারে ইসলামী জঙ্গিদের গুলিবর্ষণে ৪৭ জন যাত্রী প্রাণ হারিয়েছে। কোনো ষড়যন্ত্রই আমাদের রুখতে পারেনি। ‘তোমার পৃথিবীকে প্রসারিত করো’ (ওয়াইডেন ইওর ওয়ার্ল্ড)—এই মন্ত্র ধারণ করেই কাজ করে যাচ্ছে টার্কিশ এয়ারলাইনস। ” বর্তমানে তুরস্কের জিডিপিতে রাষ্ট্রীয় এ বিমান সংস্থার অবদান ৫.৯ শতাংশ বলে জানান তিনি।

সংস্থার মিডিয়া রিলেশন স্পেশালিস্ট ওমর ছেলাল তাবাক কালের কণ্ঠকে বলেন, “এত কিছুর পরও টার্কিশ এয়ারের অগ্রযাত্রা রুখতে পারেনি কেউ। বর্তমানে বিশ্বের ১১৬টি দেশের ২৯৪ রুটে তিন শর বেশি বিমানে যাত্রী পরিবহন করছে আমাদের এয়ারলাইনস। ২০৩৪ সালে টার্কিশ এয়ার ৩৮ কোটি যাত্রী পরিবহনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। ইস্তাম্বুলকে ‘বিশ্বের যাত্রী পরিবহনের ট্রানজিটকেন্দ্র’ করার লক্ষ্য নিয়েই কাজ করছে তুরস্ক। এ ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালে বছরে আট কোটি যাত্রী ব্যবস্থাপনায় সক্ষম এ রকম আরো একটি বিমানবন্দর চালু হবে আতাতুর্ক থেকে ২০ কিলোমিটার দূরের সিলভি এলাকায়। ”


মন্তব্য