kalerkantho


বিশ্ব নদী দিবস আজ

নগরসংশ্লিষ্টতায় ২৮টি নদী দখল ও দূষণের শিকার

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



নগরসংশ্লিষ্টতায় ২৮টি নদী দখল ও দূষণের শিকার

আজ বিশ্ব নদী দিবস। ঘটা করেই পালন করা হবে দিবসটি। দেশের নদ-নদীগুলো প্রতিদিন কোনো না কোনোভাবে দখল, ভরাট বা দূষণ হচ্ছে, কিন্তু দেখার কেউ নেই। বুড়িগঙ্গা নদীর পার ভরাট করে দখলের পাশাপাশি বিষাক্ত কেমিক্যালযুক্ত পলিথিন ধোয়াসহ সবই চলছে। ছবিগুলো গতকাল পুরান ঢাকার ইসলামবাগ, কামালবাগ ও সোয়ারীঘাট এলাকা থেকে তোলা। ছবি : লুতৎফর রহমান

নগরায়ণের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় সারা দেশে ২৮টি নদী দখল ও দূষণের শিকার। রাজধানী ঢাকাকে ঘিরে থাকা চারটি নদী বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু ও তুরাগ নাগরিক বর্জ্যে মারাত্মকভাবে দূষিত। দখলে দখলে ক্রমেই শীর্ণ আকার ধারণ করছে সেগুলো। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি খারাপ অবস্থা বুড়িগঙ্গার। এ ছাড়া বিপদে আছে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী, যশোরের কপোতাক্ষ ও ভৈরব এবং নেত্রকোনার মগড়া। বেসরকারি সংস্থা রিভারাইন পিপল নগরের সঙ্গে সম্পৃক্ত এমন ২৮টি নদী চিহ্নিত করেছে।

দখল-দূষণের এ প্রতিযোগিতার মধ্যেই সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও আজ রবিবার বিশ্ব নদী দিবস পালিত হচ্ছে। এবারের দিবসের প্রতিপাদ্য ‘সুস্থ নদী, সুস্থ নগর’। ১৯৮০ সাল থেকে প্রতিবছর সেপ্টেম্বরের শেষ রবিবারকে বিশ্ব নদী দিবস হিসেবে পালন করতে শুরু করে কানাডার ব্রিটিশ কলম্বিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি, যার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছিল বিসি রিভারস ডে পালনের মধ্য দিয়ে। ১৯৮০ সালে কানাডার খ্যাতনামা নদীবিষয়ক আইনজীবী মার্ক অ্যাঞ্জেলো দিনটি ‘নদী দিবস’ হিসেবে পালনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। বাংলাদেশে ২০১০ সাল থেকে এ দিবস পালিত হয়ে আসছে।

দিবসটি উপলক্ষে গতকাল শনিবার বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), রিভারাইন পিপলসহ ২৫টি পরিবেশবাদী সংগঠনের যৌথ উদ্যোগে পুরান ঢাকার বাহাদুরশাহ পার্ক থেকে সদরঘাট পর্যন্ত ‘নদীর জন্য পদযাত্রা’ শীর্ষক এক কর্মসূচি পালন করা হয়। এর আগে প্রকৌশলী ম. ইনামুল হকের সভাপতিত্বে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন বাপার সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মতিন। রিভারাইন পিপলের মহাসচিব শেখ রোকন, বাংলাদেশ নদী বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ড. আনোয়ার হোসেনসহ অন্যরাও বক্তব্য দেন।  

বক্তারা বলেন, ‘আমাদের অবহেলা ও নিষ্ঠুরতায় নদীমাতৃক বাংলাদেশের অনেক নদীই আজ প্রায় ইতিহাস।

গত ১০০ বছরে মারা গেছে আমাদের অসংখ্য প্রিয় নদ-নদী। সংবাদপত্রের পাতা খুললেই প্রায় প্রতিদিন জানা যায় নদীর অনেক দুঃসংবাদ। একদিকে দখলের চিত্র, অন্যদিকে প্রতিদিন শত শত টন বর্জ্য মিশে যাচ্ছে নদীর পানিতে। প্রতিনিয়ত নদী হচ্ছে দূষিত, জলজ বাসস্থান হয়ে পড়ছে বিপন্ন। এই ক্রমাগত দূষণ আর দখলে নদী আজ সংকীর্ণ থেকে সংকীর্ণতর। ’

বক্তারা আরো বলেন, বাংলাদেশের প্রকৃতি-পরিবেশ-নদী-অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ উন্নয়নের স্বার্থে নদীর পাড়, নদীকে অবশ্যই ফিরিয়ে দিতে হবে। নদীবান্ধব নীতি ও কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে।

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ৪৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের নদীর পানি সবচেয়ে বেশি দূষিত হচ্ছে। ওই প্রতিবেদনে জাতীয় পানি নিরাপত্তার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থানকে বিপজ্জনক বা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শহর ও শিল্পাঞ্চলগুলোর ৮০ শতাংশ পয়োবর্জ্য কোনো ধরনের পরিশোধন ছাড়াই পানিতে ফেলা হচ্ছে। এর ফলে নদীগুলোতে রাসায়নিক পদার্থের দূষণ বাড়ছে। নদীর স্বাস্থ্য দিন দিন খারাপ হচ্ছে।

রিভারাইন পিপলের পক্ষে দেশে মোট ২৮টি নদী চিহ্নিত করা হয়েছে, যেগুলো নগরসংশ্লিষ্টতার কারণে দখল বা দূষণের শিকার। এর মধ্যে রয়েছে রাজশাহী ও পাবনা অঞ্চলের বড়াল, কুমিল্লার ডাকাতিয়া, চট্টগ্রামের কর্ণফুলী, নেত্রকোনার মগড়া, খুলনার ময়ূর, হবিগঞ্জের খোয়াই, রংপুরের ঘাঘট, সিলেটের সুরমা ও পিয়াইন, চুয়াডাঙ্গা-ঝিনাইদহ অঞ্চলের নবগঙ্গা, টাঙ্গাইলের লৌহজং, ঢাকা অঞ্চলের বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু ও তুরাগ, বান্দরবানের শঙ্খ, কক্সবাজারের বাঁকখালী, ময়মনসিংহ অঞ্চলের পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, দিনাজপুরের পুনর্ভবা, বগুড়ার করতোয়া, নওগাঁ-জয়পুরহাটের ছোট যমুনা, নাটোরের নারোদ, কুড়িগ্রামের সোনাভরি, বরিশালের সন্ধ্যা, ফরিদপুরের কুমার, সাতক্ষীরার আদি যমুনা, যশোরের কপোতাক্ষ ও ভৈরব।

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, মালয়েশিয়ার মালয় বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশের মত্স্য অধিদপ্তরের চার গবেষক সম্প্রতি কর্ণফুলী নদীর পানিতে ২০ দশমিক ৩ মিলিগ্রাম ক্রোমিয়াম, ৮১ দশমিক শূন্য ৯ মিলিগ্রাম আর্সেনিক ও সিসার উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন। ওই গবেষণায় কর্ণফুলীদূষণের কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে সমুদ্রবন্দর ও অপরিশোধিত বর্জ্য নিঃসরণকে। শীতকালে পানিপ্রবাহ কম থাকায় নদীর তলদেশে ভারী ধাতুর পরিমাণ বেড়ে যায়। ক্রোমিয়ামের পরিমাণ বেশি হওয়ার কারণ হিসেবে জ্বালানি, সার ও বস্ত্র কারখানা থেকে অপরিশোধিত বর্জ্য ফেলাকে দায়ী করা হয়েছে। আর কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার, কপার আর্সেনেট দিয়ে কাঠ সিজনিংকে আর্সেনিকের মাত্রা বৃদ্ধির জন্য দায়ী করা হয়। এ ছাড়া সিমেন্ট কারখানা, ট্যানারি, ব্যাটারি ও সিএফএল বাল্বসহ বিভিন্ন উৎস থেকে সিসা, পারদের মতো ভারী ধাতু মিশছে নদীর পানিতে।

 


মন্তব্য