kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


পারভেজ হুদভয়

পাকিস্তান অতীতেই পড়ে আছে

মেহেদী হাসান   

১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



যুদ্ধাপরাধী মীর কাসেম আলীর ফাঁসি কার্যকর করা নিয়ে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দুঃখ প্রকাশকে কপটতা হিসেবে অভিহিত করেছেন দেশটির বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, সমাজকর্মী ও পরমাণু পদার্থবিদ পারভেজ হুদভয়। ওই ঘটনায় দেওয়া ইসলামাবাদের বিবৃতি ও জাতীয় পরিষদে নিন্দা প্রস্তাব গ্রহণের ঘটনায় যখন বাংলাদেশের সঙ্গে দেশটির দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নতুন করে টানাপড়েন চলছে, তখন ডন পত্রিকায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে হুদভয় এ প্রসঙ্গ তুলে ধরেছেন।

এর আগেও তিনি একাধিকবার ১৯৭১ সালের গণহত্যা ও নৃশংসতার জন্য পাকিস্তানকে বাংলাদেশের কাছে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

মীর কাসেমের ফাঁসি নিয়ে পারভেজ হুদভয় তাঁর এবারের নিবন্ধে লিখেছেন, পাকিস্তানের নিজের বিচারব্যবস্থায় যেখানে অনেক সমস্যা, সেখানে তারা অন্য একটি দেশের বিচারব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে না। বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচার হচ্ছে উন্মুক্ত ও বেসামরিক আদালতে। অন্যদিকে পাকিস্তান তার বেসামরিক নাগরিকদের রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে উসকানি দেওয়ার অপরাধে বিচার করছে গোপন ও সামরিক আদালতে। পাকিস্তানের ওই আদালতগুলোয় অভিযুক্ত ব্যক্তির আইনজীবী পাওয়ার,  এমনকি ওই আদালতের বিচার সম্পর্কিত তথ্য-উপাত্ত জানারও সুযোগ নেই। পাকিস্তানের এই চর্চা বিচারব্যবস্থার আধুনিক ধারণার পুরোপুরি বিপরীত।

পারভেজ হুদভয় লিখেছেন, যে মীর কাসেম আলীর ফাঁসিতে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দুঃখ প্রকাশ করেছে, সেই ব্যক্তি নির্যাতন, একাধিক হত্যা ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগে বাংলাদেশের আদালতে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিল। তিনি প্রশ্ন করেন, কিন্তু পাকিস্তান কেন বাংলাদেশের বিচারপ্রক্রিয়ার শুদ্ধতা নিয়ে এত উদ্বিগ্ন? আর কেনই বা আমাদের (পাকিস্তানের) সরকার অন্য একটি দেশের নাগরিক, যে আবার জঘন্যতম অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়েছে, তার মৃত্যুর ব্যাপারে এত সংবেদনশীল? এর উত্তর হলো—বাংলাদেশ প্রসঙ্গে পাকিস্তান এখনো তার অতীতে শিকলাবদ্ধ হয়ে যায়।

তিনি লিখেছেন, পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কেন এমন জোরালো মনোভাব প্রকাশ করে তার কোনো ব্যাখ্যা নেই। বিশ্বে অসংখ্য ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রে তো এমনটা দেখা যায় না। সৌদি আরবে মাদকপাচারের অভিযোগে অনেক পাকিস্তানির শিরশ্ছেদের প্রসঙ্গ তুলে পারভেজ হুদভয় লিখেছেন, এ দেশের নাগরিকরা যখন বিদেশে হত্যার শিকার হয় তখনো ইসলামাবাদ নীরব থাকে।

তাঁর মতে, মীর কাসেম আলীকে নিয়ে পাকিস্তানের তৎপরতার একমাত্র কারণ, সে পাকিস্তানপন্থী মিলিশিয়া আলবদরের প্রধান ছিল। আলশামস ও রাজাকারদের নিয়ে আলবদর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে মিলে ১৯৭১ সালে নির্মমভাবে বাঙালিদের দমন করতে চেয়েছিল। ফলে পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে।

পারভেজ হুদভয় লিখেছেন, ২০১৩ সাল থেকে মীর কাসেম আলীর মতো আরো যে পাঁচ যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি কার্যকর হয়েছে, তারা দ্বিজাতি তত্ত্বের পক্ষে ছিল বলে পাকিস্তান সরকার মনে করে। পারভেজ হুদভয় এ তত্ত্বের বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে লিখেছেন, দ্বিজাতি তত্ত্বকে পেছনে ফেলে রাখার এখনই সময়। পাকিস্তানকে অবশ্যই বুঝতে হবে যে তৎকালীন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতিগত পার্থক্যের কারণ ভারত নয়।

তিনি আরো লিখেছেন, একই জঠরে জন্ম নেওয়া সাদৃশ্যহীন যমজ শিশুর মতো আমাদের একসঙ্গে থাকার সুযোগ খুব কমই ছিল। দুঃশাসনের বাড়তি চাপে সম্পর্ক ভেঙে পড়েছিল। ভারত আমাদের (পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান) মধ্যে বৈসাদৃশ্য সৃষ্টি করেনি। বরং আমাদের সংযুক্ত নাড়ি কেটে দিয়ে ভারত বাংলাদেশের জন্মে ধাত্রীর ভূমিকা পালন করেছে।

বর্তমান বাংলাদেশের গুরুত্ব অনুধাবন করে পারভেজ হুদভয় পাকিস্তানকে তার চিন্তা ১৯৭১ সালে সীমিত না রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। অনেক পাকিস্তানির মতো তিনিও মনে করেন, যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি সন্তুষ্টি আনলেও শান্তি, স্থিতিশীলতা ও গণতন্ত্র আনবে না। এর পরও দুঃখ ও বেদনাময় ওই অধ্যায় শেষ করে সামনে এগিয়ে যাওয়া দরকার।

পারভেজ হুদভয় লিখেছেন, সম্পর্কোন্নয়নে বাংলাদেশের চেয়ে পাকিস্তানের করণীয় বেশি। এর প্রথম ধাপ হিসেবে, তরুণ পাকিস্তানিদের অবশ্যই প্রকৃত ইতিহাস পড়তে দেওয়া উচিত। বাঙালিদের ওপর  নৃশংসতার ইতিহাস তাদের এখনো পড়তে দেওয়া হয়নি। ১৯৭১ সালে যা হয়েছে, তা অস্বীকার বা যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষ নেওয়ার চেয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টায় নামা উচিত পাকিস্তানের। সত্য স্বীকার ও সমস্যা মিটমাট করা প্রয়োজন।


মন্তব্য