kalerkantho

শুক্রবার । ২ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যয়

যুদ্ধাপরাধীদের রায় কার্যকর অব্যাহত থাকবে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



যুদ্ধাপরাধীদের রায় কার্যকর অব্যাহত থাকবে

যত বাধা, যত কিছুই আসুক যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় কার্যকর অব্যাহত থাকবে বলে নিজের প্রত্যয়ের কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি গতকাল বুধবার বিকেলে ছাত্রলীগের এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ মন্তব্য করেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বঙ্গমাতা ফজিলাতুননেসা মুজিবের শাহাদাতবার্ষিকী স্মরণে রাজধানীর খামারবাড়ীর কৃষিবিদ মিলনায়তনে এর আয়োজন করা হয়।

প্রধানমন্ত্রী তাঁর ৩২ মিনিটের বক্তব্যে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর খুনিদের পুরস্কৃত করা ও ইতিহাস বিকৃতির দায়ে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের সমালোচনা করেন। আজকে তরুণদের জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ার নেপথ্যে সেই বিকৃতির প্রভাব রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচার এবং রায় কার্যকর করেছি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারও জাতির পিতা শুরু করেছিলেন। আমরা সেই বিচার আবার করতে পেরেছি এবং রায়ও কার্যকর করে যাচ্ছি। এটা অব্যাহত থাকবে। যারা স্বজন হারাবার বেদনা নিয়ে বেঁচে আছে, তাদের দুঃখ, তাদের কষ্ট আমি বুঝি। তাই যেমন আমার পিতামাতা হত্যার বিচার করেছি, তেমনি অন্য যারা আপনজন হারিয়েছে, নিশ্চয় তাদের বিচার পাওয়ার অধিকার আছে। সেই বিচারও আমরা করেছি এবং করে যাব। এটাই আমার প্রতিজ্ঞা। যত বাধা, যত কিছুই আসুক। ’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যদি সংকল্প দৃঢ় থাকে, যেকোনো অর্জন সম্ভব। আর বঙ্গবন্ধুই বলেছেন—মহত্ অর্জনের জন্য মহান ত্যাগের দরকার। যেকোনো ত্যাগ স্বীকারে আমি সব সময় প্রস্তুত, এ দেশের জন্য, এ দেশের মানুষের জন্য। ’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে আমি মনে করি, ছাত্রসমাজেরও বিরাট ভূমিকা রয়েছে। আমাদের হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস আবার মানুষের সামনে তুলে ধরতে হবে। আমাদের গৌরবের ইতিহাস, বিজয়ের ইতিহাস আমরা কখনো ভুলতে পারি না, পারব না। ভুলে গেলে আমাদের অস্তিত্বই থাকবে না। ওই আলবদর, রাজাকার তাদের হাতের ক্রীড়নক হয়ে আমরা থাকতে পারি না। ’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘পঁচাত্তরের হত্যাকাণ্ড যারা ঘটিয়েছিল তারা কারা? যারা এ দেশের স্বাধীনতা চায়নি, বাঙালির বিজয় মেনে নিতে পারেনি, তাদেরই কিছু দোসর, এ দেশের দালাল ওই জঘন্য ঘটনা ঘটায়। ১৫ আগস্টের পর থেকে আমরা কী দেখেছি? বাংলাদেশের ইতিহাস বিকৃতি। মুক্তিযুদ্ধের সব বিজয়ের ইতিহাসকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলার চেষ্টা। একটা প্রজন্ম এ দেশের সঠিক ইতিহাসই জানতে পারেনি। পঁচাত্তরের পর ছিয়ানব্বই—এই ২১ বছর বাংলাদেশে জাতির পিতার নাম নিষিদ্ধ ছিল। ৭ মার্চের ভাষণ বাজাতে দিত না। এই ভাষণ বাজাতে গিয়ে জীবন দেয় আমাদের ছাত্রলীগের নেতা চুন্নু। এভাবে আওয়ামী লীগের বহু নেতাকর্মী জীবন দিয়েছে, প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে দিয়ে তারা কিন্তু বঙ্গবন্ধুর চেতনাকে ধরে রাখার চেষ্টা করেছে। ’

তিনি বলেন, ‘একটা জাতি যদি বিকৃত ইতিহাস শুনতে থাকে তাহলে তাদের চরিত্রও বিকৃত হয়ে যায়। সেই বিকৃতি এখন আমরা আমাদের সমাজে দেখি। যেখান থেকে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসের উত্থান ঘটেছে, যা সমাজকে কুরে কুরে খাচ্ছে। আমি ছাত্রদের একটা কথাই বলব, নিজেদের উপযুক্ত নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। আমি কিন্তু ছাত্রদের হাতে কাগজ-কলম তুলে দিয়েছিলাম। কিন্তু আমরা জানি ’৭৫-এর পরে জিয়াউর রহমান মেধাবী ছাত্রদের হাতে তুলে দিয়েছিল অস্ত্র, অর্থ। যা তাদের বিকৃতির পথে নিয়ে যায়। এই ছাত্রসমাজকে তারা ধ্বংস করতে চেয়েছিল। কারণ তারা জানে, এই ছাত্রসমাজই দেশের প্রতিটি অর্জনের পেছনে অবদান রেখেছে। ’ 

তিনি বলেন. ‘ছাত্রদের প্রধান কাজ হলো লেখাপড়া করা। হ্যাঁ, রাজনীতি অবশ্যই করবে। ছাত্রসমাজ রাজনীতি করেই তো স্বাধীনতার চেতনা মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। কিন্তু আজ আমরা স্বাধীন। এখন দেশকে গড়ে তুলতে হবে। ’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ১৯টা ক্যু হয়েছে। সারা রাত কারফিউ। অনেকে দাবি করে, তারা গণতন্ত্র দিয়েছে। গণতন্ত্র নয়, কারফিউ গণতন্ত্র দিয়েছিল। মার্শাল ল দিয়ে, অর্ডিন্যান্স জারি করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করেছিল। আর যারা বাংলাদেশ থেকে চলে গিয়েছিল পাকিস্তানে সেই গোলাম আযমসহ তাদের দেশ ফিরিয়ে আনল। যুদ্ধাপরাধীদের মন্ত্রী করল। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার বন্ধে অর্ডিন্যান্স জারি করল। খুনিদের বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করল। খুনিরা প্রকাশ্যে বলত, আমরা শেখ মুজিবকে হত্যা করেছি, কে আমাদের বিচার করবে। তারা বিবিসিতে ইন্টারভিউ দিয়ে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিল। ’

বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী বেগম ফজিলাতুননেসা মুজিবের অবদানের কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ‘জাতির পিতা চেয়েছিলেন বাঙালি জাতি হিসেবে বিশ্বের দরবারে অধিষ্ঠিত হবে। একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে। তাঁর সেই সংগ্রামের ফসল আমাদের স্বাধীনতা। এই সংগ্রাম করতে গিয়ে অনেক ঝড়-ঝঞ্ঝা সয়েছেন, কিন্তু তিনি একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে গেছেন। আর তাঁর এই কাজে সহযোগিতা করেছেন আমার মা। আমার মা কখনো জনসমক্ষে আসেননি, প্রচারে আসেননি। কিন্তু তিনি সব সময় পাশে থেকে প্রেরণা জুগিয়েছেন, শক্তি জুগিয়েছেন। এ পর্যন্ত যত সংগ্রাম আমরা দেখেছি, প্রতিটির ক্ষেত্রেই আমার মায়ের একটি দৃঢ়চেতা ভূমিকা সব সময় ছিল। নিজের জীবনে তিনি কখনো কিছু চাননি। ’

তিনি বলেন, ‘ছয় দফা দেওয়ায় বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তারের পর ৭ জুনের হরতাল সম্পূর্ণভাবে অর্গানাইজ করেন আমার মা। তিনি লুকিয়ে, বোরখা পরে আজিমপুর কলোনিতে আমাদের এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের বাড়িতে চলে যেতেন। সেখানে ছাত্রনেতারা আসতেন। মা তাঁদের নির্দেশনা দিতেন। আমার মায়ের প্রখর স্মরণশক্তি ছিল। তিনি যখন কারাগারে বাবার সঙ্গে দেখা করতে যেতেন তখন বঙ্গবন্ধুকে সব জানাতেন। আর কী করণীয় সেই নির্দেশনা নিয়ে আসতেন। ’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমার বাবার কথা অনেক লেখা হয়। কিন্তু মায়ের কথা হয় না। তাই আমি চেষ্টা করি, যতটুকু পারি সেই কথাগুলো মানুষের মাঝে তুলে ধরতে। কত বড় মহান ত্যাগ তিনি করে গেছেন। আমরা যদি দেশকে গড়ে তুলতে চাই, সবাইকে এ ধরনের ত্যাগের জন্য সব সময় প্রস্তুত থাকতে হবে। এটাই রাজনীতি। যেকোনো রাজনীতিকের জীবনে মানুষের আস্থা, বিশ্বাস অর্জনই সব থেকে বড় সম্পদ। এর থেকে বড় আর কিচ্ছু না। ’

তিনি বলেন, ‘১৯৬৬ সালে যখন বঙ্গবন্ধু ছয় দফা দেন তখন তাঁকে বারবার গ্রেপ্তার করা হয়। একেকটা জনসভা করেন, বক্তৃতা দেন, তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। মুক্তি পান, আবার গ্রেপ্তার করা হয়। ছাত্রলীগকে তিনি কিন্তু সব সময় একটি অগ্রবর্তী দল হিসেবে দিকনির্দেশনা দিতেন। আজকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের যে স্লোগান, যে পতাকা, স্বাধীন বাংলাদেশের যা যা করণীয় তা করাতে ছাত্রলীগকেই কিন্তু তিনি মাঠে নামাতেন। আমার এখনো মনে আছে, বঙ্গবন্ধু নির্দেশ দিলেন জয় বাংলা স্লোগান মাঠে নিতে হবে। ছাত্রলীগ স্লোগান দিতে শুরু করে। বাংলাদেশের পতাকা কী হবে, সেই নির্দেশনাও বঙ্গবন্ধু ছাত্রলীগকে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, জাপান হচ্ছে উদিত সূর্যের দেশ, সাদার মধ্যে লাল, আর বাংলাদেশ সবুজ দেশ, সবুজের মধ্যে লাল। ’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘ছাত্রলীগ এ দেশের প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রাম এবং বাঙালি জাতির অধিকার আদায়ের অগ্রসেনানী। জাতির পিতার হাতে গড়া এ সংগঠন। আমাদের ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, ভোট ও ভাতের আন্দোলন—প্রতিটি সংগ্রামেই ছাত্রলীগ সব সময় অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছে। ছাত্রলীগের বহু নেতাকর্মী আত্মত্যাগ করেছে। কাজেই ছাত্রলীগের একটা ঐতিহ্য রয়েছে। জাতির পিতা সব সময় বলতেন বাঙালির ইতিহাস ছাত্রলীগের ইতিহাস, ছাত্রলীগের ইতিহাস বাঙালির ইতিহাস। ’

ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘লেখাপড়ায় মনোনিবেশ করতে হবে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। আর সবাইকে অনুরোধ কর, বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনীটা সবাই যেন একবার পড়ে, সেটা থেকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করে। কারণ অনেক কষ্ট করে এই খাতাগুলো সংগ্রহ করতে হয়েছে। এরপর বঙ্গবন্ধুর ডায়েরিও আমি সবার হাতে তুলে দিতে পারব। আরো অনেক অধ্যায় সেখানে আসবে। আমি চাই, ছাত্রলীগ বঙ্গবন্ধুর আদর্শে নিজেদের গড়ে তুলুক। ’

আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন ছাত্রলীগ সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ। বক্তব্য দেন সাংবাদিক বদরুল আহসান ও ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইন।


মন্তব্য