kalerkantho

25th march banner

১০ বছর পর চৈত্রে ৪৬ শতাংশ বেশি বৃষ্টি

আরিফুর রহমান   

৩ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



১০ বছর পর চৈত্রে ৪৬ শতাংশ বেশি বৃষ্টি

এবারের চৈত্র যেন চিরাচরিত চেহারা লুকিয়ে ফেলেছে। এ সময়ের স্বাভাবিক দাবদাহ নেই। ফলে ফসলের মাঠ পুড়ে যাওয়ার বদলে কৃষকের মুখে চওড়া হাসি। আবহাওয়া অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা পুরনো সব রেকর্ড ঘেঁটে বলছেন, এবার চৈত্র মাসে যে পরিমাণ বৃষ্টি হচ্ছে, এমনটা দেখা যায়নি গত ১০ বছরে। স্বাভাবিকের চেয়ে ৪৬ শতাংশ বৃষ্টিপাত বেশি হয়েছে মার্চ মাসে। আরো দুই দিন বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। শুধু তাই নয়, আগামী বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ মাসেও কমবেশি এমন বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছেন তাঁরা। ফলে চৈত্রের বৃষ্টিতে বোরোর ভালো ফলনের আশায় তৃপ্ত কৃষকদের পাকা ধান শুকাতে বেশ বেগ পাওয়ারও আশঙ্কা আছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, এবার চিরাচরিত চৈত্র মাসের চেহারায় বেশ গরমিল। এ মাসে রোদের তীব্রতা দেখতে অভ্যস্ত বাংলাদেশের মানুষ। প্রচণ্ড দাবদাহে ওষ্ঠাগত হয়ে ওঠে জনজীবন। পানির অভাবে বিপাকে পড়ে বোরোচাষি। ঘামের সঙ্গে শরীর থেকে লবণ বের হয়ে যাওয়ায় দেখা দেয় নানা ধরনের রোগ। হিট স্ট্রোকেও মারা যায় অনেকে। চেনা সেই চৈত্র এবার ফিরেছে অচেনা রূপে। গ্রাম-শহর সর্বত্রই মানুষের জীবনযাত্রায় নতুন ছন্দ।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, এ বছর পুরো মার্চ মাস সারা দেশে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, বাংলাদেশের ইতিহাসে এ ধরনের ঘটনা অত্যন্ত বিরল। অনেক বছর পর পর এ ধরনের অবস্থা দেখা দেয়। অধিদপ্তরের নথি ঘেঁটে দেখা যায়, সর্বশেষ ২০০৫ সালে স্বাভাবিকের চেয়ে ১৪৬ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়েছে মার্চে। এরপর গত ১০ বছরে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টি হয়েছে বাংলাদেশে। এক দশকের সব রেকর্ড ওলটপালট করে দিয়েছে এবারের চৈত্র। স্বাভাবিকের চেয়ে ৪৬ শতাংশ বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।

এখন জমিতে ইরি-বোরো ধান। বাকি জমিতে চলছে নানা রবিশস্য আবাদ। এই সময়ে বেশি মাত্রায় বৃষ্টি হওয়ায় চাষিরা বেশ খুশি। কারণ তাদের সেচের পেছনে খরচ করতে হবে কম। বৃষ্টির পানি দিয়েই মিটে যাবে চাহিদা।

কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আগাম বৃষ্টি হওয়ায় এ বছর বোরোর বাম্পার ফলন হবে। দীর্ঘ সময় ধরে বৃষ্টির কারণে দেশের তাপমাত্রাও স্বাভাবিক আছে। আগের বছরগুলোতে চৈত্র মাসে তাপমাত্রা যেখানে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ওঠে, এ বছর সেখানে ৩০-এর ঘরেই ঘুরপাক খাচ্ছে।

চলতি এপ্রিল মাসেও তাপমাত্রা স্বাভাবিক থাকতে পারে বলে আভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। এবার দাবদাহের কারণে ভাইরাসজনিত জ্বর, কাশি, ঠাণ্ডাসহ অন্যান্য পানিবাহিত রোগ তেমন পরিলক্ষিত হয়নি। চৈত্রের দাবদাহে হিট স্ট্রোকে বিগত বছরগুলোতে অনেক জেলায় মৃত্যুর ঘটনা ঘটলেও এ বছর এখন পর্যন্ত কোনো মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি।

এত এত সুখবরের মধ্যে কিছু দুঃসংবাদও আছে। যেসব কৃষক আলু, মরিচ, ডালসহ অন্যান্য ফসল বুনে ভালো ফলনের আশায় বুক বেঁধে আছে, তাদের বেশ ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, এখন পর্যন্ত তাঁদের কাছে যে তথ্য আছে, তাতে আগামী দুই দিন সারা দেশে আবহাওয়ার এমন গুমোট ভাব থাকবে। কমবেশি প্রায় সব জেলায় রোদ আর মেঘের লুকোচুরি খেলা চলবে। কোথাও কোথাও হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি হবে। উপকূলবর্তী এলাকার জন্য সতর্ক সংকেত দেখানো আছে। ৪ এপ্রিলের পর নতুন করে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হবে বলে জানান কর্মকর্তারা।

আবহাওয়াবিদ আবদুল মান্নান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের দেশে সাধারণত মার্চ থেকে মে সময়কে বর্ষাকাল ধরা হয়। কিন্তু মার্চে তেমন বৃষ্টি হয় না। মূলত এপ্রিল থেকেই বৃষ্টিপাত শুরু হয়। কিন্তু এ বছর আগাম বর্ষা শুরু হয়েছে। ’

তিনি বলেন, ‘আগের বছরগুলোতে এত লম্বা সময় ধরে বৃষ্টি দেখা যায়নি। কিন্তু গত মাসে বেশ লম্বা সময় ধরে বৃষ্টি হয়েছে। আবহাওয়ার এমন চিত্র স্থায়ী নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গত মাসে বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে, সেটি এখনই বলা যাবে না। তবে এটি যদি স্থায়ী হয় অর্থাৎ আগামী কয়েক বছর মার্চে বেশি বৃষ্টি হয়, তখন জলবায়ু পরিবর্তনকে এর জন্য দায়ী করা যাবে। ’ 

গত ৩৫ বছরের আবহাওয়ার গতি-প্রকৃতি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০০৫ সালে স্বাভাবিকের চেয়ে ১৩৪ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়েছে। এর আগে ২০০৩ সালে স্বাভাবিকের চেয়ে ৯৮ শতাংশ বেশি, ১৯৯৮ সালে ১২৯ শতাংশ এবং ১৯৯৪ সালে ১৩০ শতাংশ বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। কিন্তু ১০ বছর পর গত মার্চে স্বাভাবিকের চেয়ে ৪৬ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়েছে। অথচ আগের বছর এ সময়ে স্বাভাবিকের চেয়ে ৪৫ শতাংশ বৃষ্টিপাত কম হয়েছে। তার আগের বছর এ সময়ে ৬২ শতাংশ এবং ২০১৩ সালে স্বাভাবিকের চেয়ে ৮১ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছে।

লম্বা সময় ধরে হওয়া বৃষ্টিপাতের প্রভাব সম্পর্কে জানতে চাইলে কৃষি অর্থনীতিবিদ ও পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ড. শামসুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, এর ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুই দিকই রয়েছে। এ বছর সেচে কৃষকদের তেমন অর্থ খরচ করতে হবে না। বোরোর বাম্পার ফলন হবে। তবে নেতিবাচক দিক হলো ডাল, আলু, মরিচসহ অন্যান্য ফসলের ক্ষতি হবে। এ বৃষ্টি আরো কয়েক দিন থাকলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বাড়বে বলে জানান তিনি।


মন্তব্য