kalerkantho

বুধবার । ২৫ জানুয়ারি ২০১৭ । ১২ মাঘ ১৪২৩। ২৬ রবিউস সানি ১৪৩৮।


ফ্লাওয়ার ফেস্ট

ফুলের রাজ্যে স্বাগত

নওশাদ জামিল   

৩০ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ফুলের রাজ্যে স্বাগত

রাজধানীর খামারবাড়ীতে গতকাল শুরু হয়েছে ফুল উৎসব। ছবি : কালের কণ্ঠ

‘ফাগুনে বিকশিত কাঞ্চন ফুল/ডালে ডালে পুঞ্জিত আম্রমুকুল’। ভরা ফাগুনে গতকাল মঙ্গলবার দেখা মিলল শ্বেত কাঞ্চনের।

আমাদের দেশে যে কয়েক ধরনের কাঞ্চন ফুল দেখা যায়, এর মধ্যে শ্বেতকাঞ্চন বা সাদা কাঞ্চন বেশ সহজলভ্য। বসন্তের পুরো সময়ই থাকে কাঞ্চনসহ নানা বাহারি ফুলের রাজত্ব। পথের ধারে, পার্ক বা উদ্যানে ফুলের শোভা আমাদের নজর কাড়ে।

শুধু শ্বেতকাঞ্চন নয়, গতকাল মঙ্গলবার খামারবাড়ীতে দেখা মিলল হরেক রকম ফুলের সমাহার। গতকাল বিকেলে খামারবাড়ীতে পৌঁছতেই ভেসে এলো ফুলের গন্ধ। নানা ফুলের গন্ধ। এ যেন দেশি ফুলের অনন্য এক রাজ্য। দেশে উৎপাদিত ফুল নিয়ে প্রথমবারের মতো খামারবাড়ীতে শুরু হয়েছে দুই দিনব্যাপী ফ্লাওয়ার ফেস্ট ২০১৬। গতকাল বিকেল ৩টায় কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী।

কোমলতা, পবিত্রতা আর ভালোবাসার প্রতীক এই ফুল। প্রিয় মানুষকে উপহার দিতেও ফুলই সেরা। হৃদয়ের গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপনেও ফুলেল পবিত্রতা শেষ আশ্রয়। আর তাইতো ফুল নিয়ে মানুষের উচ্ছ্বাসের শেষ নেই। প্রকৃতির এ অপূর্ব উপহার নিয়ে রাজধানীর খামারবাড়ীতে শুরু এমন আয়োজনে তাই বিপুল সাড়া আমাদের দেশে নানা রকম আচার-ব্রত ও উৎসবে ফুলের ব্যবহার চলছে আদিকাল থেকে। বর্তমানে এর চাহিদা ব্যাপক। ফুলের এই চাহিদা মেটাতে ফুল চাষ হচ্ছে বাণিজ্যিকভাবে। এই প্রক্রিয়ায় কর্মসংস্থানের সঙ্গে বেড়েছে অর্থ উপার্জনব্যবস্থা। বৈচিত্র্যময় দেশি ফুলের সঙ্গে মানুষের পরিচয় বাড়ানো, ফুলের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং ফুলের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণ প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটি আয়োজন করেছে দুই দিনব্যাপী এ মেলার। এতে অংশ নিয়েছে ফুল উৎপাদনকারী ২০টি প্রতিষ্ঠান। ফুলের মেলা হলেও আছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান

আয়োজন। এ ছাড়া মেলায় ফুল উৎপাদক, ফুল ব্যবসায়ী (পাইকারি ও খুচরা), ফুল সেক্টরের সংশ্লিষ্ট সংগঠন, সাজসজ্জা বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান (ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট) অংশগ্রহণ করেছে। প্রতিটি স্টলে থরে থরে সাজানো ফুল। তাজা ফুলের গন্ধে ভরে উঠেছে গোটা মিলনায়তন। ফুলের প্রদর্শনী, ফুলের ওপর ফ্যাশন শো ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান—সব মিলিয়ে ফুল নিয়ে এ এক ফুলময় উৎসব।

গতকাল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ মঈনউদ্দিন আবদুল্লাহ, ইউএসএআইডি বাংলাদেশ ফিড দ্য ফিউচার টিম লিডার মার্ক টেজেনফিল্ড এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কৃষিবিদ মো. হামিদুর রহমান। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন ইউএসএআইডির এভিসি প্রকল্পের চিফ অব পার্টি মাইকেল ফিল্ড।

উদ্বোধনী আনুষ্ঠানিকতা শেষে শুরু হয় ফুলবিষয়ক গোলটেবিল বৈঠক। তাতে ‘ফুল চাষের সমস্যা ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিএফএসের উপদেষ্টা ড. গয়ানাথ সরকার, সভাপতিত্ব করেন বিএফএসের সভাপতি আব্দুর রহিম।

প্রধান অতিথি মতিয়া চৌধুরী বলেন, ‘ছোটবেলায় বিশিষ্ট কোনো ব্যক্তি স্কুলে আসলেই শুধু ফুল দেখতে পেতাম, কিন্তু এখন ফুলের বহুবিধ ব্যবহার হচ্ছে। ফুলচাষিরা তাদের জীবিকা নির্বাহ করছে ফুল চাষ করে, অনেক মানুষ এই সেক্টরের সঙ্গে জড়িত। আমি মনে করি, এ নিয়ে কৃষিবিজ্ঞানীদেরও অনেক কিছু করার আছে। ’

সভাপতি বলেন, ‘আমাদের দেশি ফুলের বাজার সম্প্রসারণের অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। ঢাকায় স্থায়ী পাইকারি বাজার, ফুল নিয়ে গবেষণাগারসহ পরিকল্পিতভাবে এগোতে পারলে অর্থনীতিতে আরো বেশি অবদান রাখা সম্ভব। ’

ফুলের উৎপাদন ও ব্যবহার সম্পর্কে এ সময় অতিথিরা বলেন, একসময় শুধু শৌখিনতায় মানুষ বাড়ির আঙিনায় ফুলের গাছ রোপণ করত এবং পুজো-পার্বণেই ফুলের ব্যবহার হতো। বর্তমানে বাংলাদেশে ফুল অর্থকরী ফসল হিসেবে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন ও বিপণন হচ্ছে। ১৯৮৩ সাল থেকে ৩০ শতক জমিতে রজনীগন্ধা ফুল চাষের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে ফুল উৎপাদন শুরু হয়। বর্তমানে দেশে ২৩টি জেলায় প্রায় ১০ হাজার হেক্টর জমিতে প্রায় ১৬ হাজার কৃষক সরাসরি বিভিন্ন জাতের ফুল উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত। সব মিলিয়ে প্রায় ২০ লাখ মানুষ এই সেক্টরের সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট। হাজার হাজার শিক্ষিত বেকার ফুল চাষ ও ফুল ব্যবসা করে বেকারত্ব দূর করেছে। দেশে উৎপাদিত ফুল দেশের চাহিদা মিটিয়ে কিছু কিছু বিদেশেও যাচ্ছে। বছরে প্রায় ৮০০ কোটি টাকার ফুল আমাদের দেশে উৎপাদিত হচ্ছে।

ফুল উৎপাদন ও বিপণন কার্যক্রমে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ অব্যাহত আছে। সরকারি-বেসরকারি জাতীয় অনুষ্ঠানসহ বিয়ে, জন্মদিন ও বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে ফুলের ব্যবহার ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এখন আধুনিক পদ্ধতিতে নতুন জাতের ফুল উৎপাদন ও বাজারজাত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অনেক কম্পানির সঙ্গে পরিচিতি এবং স্থানীয় সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সম্পর্ক স্থাপিত হচ্ছে। দেশের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ফ্লোরিকালচারের ওপর একটি বিভাগ স্থাপিত হয়েছে। দেশি ফুলের বৈচিত্র্যের সঙ্গে মানুষের পরিচয় আরো বাড়ানোর উদ্দেশ্যে ও ফুলের সামগ্রিক ব্যবহার আরো বৃদ্ধি করা এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটি (বিএফএস) এই মেলার আয়োজন করছে।

মেলার আজই শেষ দিন। আজ সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে এ মনোমুগ্ধকর আয়োজন।


মন্তব্য