kalerkantho


ঐতিহ্য

পুরনো ঢাকায় পুরনো টমটম

জসীম রেজা   

২৭ জানুয়ারি, ২০১৫ ০০:০০



পুরনো ঢাকায় পুরনো টমটম

পুরান ঢাকার রাজপথে আজও সগর্বে চলছে ঘোড়ায় টানা গাড়ি টমটম। ছবি : কালের কণ্ঠ

'ইচ্ছে ছিল বিয়ের দিন ঘোড়ার গাড়িতে চেপে শ্বশুরবাড়ি যাব। সেই সাধ পূর্ণ হয়নি। কারণ আমাদের গ্রামে এখন আর সচরাচর ঘোড়ার গাড়ি দেখা যায় না। পুরান ঢাকার ঘোড়ায় টানা গাড়ি টমটমের খবর জেনেই সেই সাধ আবার জেগে ওঠে। সুযোগ বুঝে বউ ও ছেলেকে নিয়ে ঢাকায় এক আত্মীয়ের বাসায় উঠি। তার পরদিনই সদরঘাটে চলে এসেছি ঘোড়ার গাড়িতে চড়তে।' গত শনিবার দুপুরে রাজধানীর সদরঘাট এলাকায় কলেজিয়েট স্কুলের সামনে মাদারীপুর থেকে টমটমে ভ্রমণ করতে আসা সৈয়দ আবদুল হক বেশ আহ্লাদের সুরেই বললেন কথাগুলো।

সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, পুরান ঢাকার নানা ঐতিহ্যের মধ্যে ঘোড়ার গাড়ি অন্যতম। এই ঘোড়ায় টেনে নেওয়া গাড়িগুলো টমটম হিসেবে পরিচিত। একসময় টমটম ছিল রাজা-জমিদার ও বিশেষত ধনাঢ্য পরিবারের সদস্যদের অন্যতম বাহন। যান্ত্রিকতার এই সময়ে এসে ঢাকা শহরে সেই পুরনো ঐতিহ্যবাহী টমটম হারিয়ে যেতে বসেছে।

পুরান ঢাকার ঐতিহ্যের ধারক টমটমে এক জোড়া ঘোড়া ব্যবহার করা হয়ে থাকে। মাঝেমধ্যে একটি ঘোড়া দিয়েও গাড়ি টানা হয়। চার চাকাবিশিষ্ট গাড়ির সামনে, মধ্যে ও পেছনে মোট ১৪ জন যাত্রী বসতে পারে। সঙ্গে কোচোয়ান ও হেলপারের আসনও রয়েছে।

যান্ত্রিক বাহন না হলেও একটি টমটম রাস্তায় নামাতে গেলে খরচ নেহাত কম পড়ে না। গাড়িটি তৈরি করতে ব্যয় হয় ৮০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা। একটি ভালো জাতের ঘোড়া কিনতেও লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়। সব মিলিয়ে একটি ঘোড়ার গাড়ি বানাতে দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা খরচ পড়ে।

টমটম চলে পিচঢালা মসৃণ রাস্তায়। স্বভাবতই দীর্ঘদিন পাকা রাস্তায় চলতে গিয়ে ঘোড়ার পায়ের খুর ক্ষয়ে যায়। এ জন্য খুরে পরাতে হয় নাল (লোহার এক ধরনের খাপ)। আর গাড়ির গতিবেগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয় ঘোড়ার গতি সামাল দিয়ে। এ জন্য ঘোড়ার নাকে রশি পরিয়ে টানা বাঁধা হয়। কোচোয়ান (চালক) যেদিকে টান দেন ঘোড়া সেদিকেই ছুটতে থাকে।

বর্তমানে বঙ্গবাজার, ফায়ার সার্ভিস, পশু হাসপাতাল, বকশীবাজার, নারিন্দা, সিদ্দিক বাজার, কেরানীগঞ্জ এলাকায় ৩৫ থেকে ৪০টি ঘোড়ার গাড়ি চলাচল করে। টমটম টানার জন্য ঘোড়াগুলো ঢাকায় আনা হয় কুষ্টিয়া, বিক্রমপুর, মানিকগঞ্জ, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। ঘোড়ার গাড়ির চাকা ও বডি তৈরি হয় দেশের অনেক অঞ্চলেই। গুলিস্তানের পাশে বঙ্গবাজার এলাকা থেকেও রেডিমেড গাড়ি কিনতে পাওয়া যায়।

যাত্রী পরিবহন ছাড়াও টমটম ব্যবহৃত হয় বিয়ে, পূজা, বিভিন্ন দিবসের শোভাযাত্রা ও সিনেমার শুটিংয়ে। এসব কাজে টমটমকে ফুল দিয়ে সাজানো হয়। কোচোয়ান ও হেলপারের জন্যও ওই সব অনুষ্ঠানের সময় রয়েছে বিশেষ পোশাক। বর্তমানে যাত্রীরা ঘোড়ার গাড়িতে ভ্রমণ করে মূলত বিনোদনের উদ্দেশ্যে। এ ছাড়া বিয়ে, গায়েহলুদের অনুষ্ঠানগুলোতেও ঘোড়ার গাড়ির ব্যবহার দেখা যায়। পুরান ঢাকায় বিয়েতে আজও ঘোড়ার গাড়ি একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

সদরঘাট এলাকার টমটমের সুপারভাইজার সালাহউদ্দিন বলেন, 'আমরা সদরঘাট থেকে গুলিস্তান পর্যন্ত ট্রিপ দিয়ে থাকি। টমটমে সর্বোচ্চ ১৪ জন যাত্রী বহন করা যায়। এই দেড় কিলোমিটার রাস্তা যাত্রায়াতের জন্য মাত্র ২০ টাকা ভাড়া নেওয়া হয়ে থাকে।'

পুরান ঢাকার বাসিন্দা গোলাম সারোয়ার বাবু বলেন, 'বিয়ে উপলক্ষে ঘোড়ার গাড়িগুলো নানা রঙে সাজানো হয়। আজও বংশপরম্পরায় অনেকেই ঘোড়ার গাড়ির কোচোয়ান হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করেন।'

সিদ্দিক বাজার এলাকার 'বাংলাদেশ আদর টমটমের' মালিক নিজাম উদ্দিন বলেন, 'আজকাল টমটমের চাহিদা বেশি থাকে বিয়ের অনুষ্ঠানে। রাজকীয় বিয়ের আবহ চায় পুরান ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকার মানুষ। জায়গা ও সময়ভেদে আমরা পাঁচ হাজার থেকে শুরু করে ৩০ হাজার টাকায় একটি টমটম ভাড়া দিয়ে থাকি।'

কামরাঙ্গীরচরের 'ইমন ও রামিয়া টমটমের' মালিক মামুন মিয়া বলেন, হরতাল ও অবরোধ না থাকলে একটি গাড়ি দিয়ে সারা দিনে দুই হাজার থেকে তিন হাজার টাকা আয় হয়। ছোলা, গম, ভুসি, বুটের দাম বেড়ে যাওয়ায় খরচ বেড়ে গেছে। ভুসি আর ঘাস দিয়ে এক জোড়া ঘোড়ার পেছনে খরচ হয় সাড়ে পাঁচ থেকে ছয় শ টাকা। তাই লাভও আগের মতো হয় না।'

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো সাইফুল ইসলাম বলেন, 'একটি ঘোড়াকে প্রতিদিন তার ওজনের ৬ থেকে ৮ শতাংশ প্রোটিন খাওয়ানো উচিত। ছোলা, ভুট্টা, গম ও যবের মধ্যে বেশি প্রোটিন থাকে। আর দিনভর পরিশ্রম করে বলে টমটমচালিত ঘোড়াগুলোর ১৫ দিন অন্তর চিকিৎসা করানো উচিত।'

ঢাকা টমটম মালিক সমিতির ক্যাশিয়ার ও সিটি টমটমের মালিক মানিক মিয়া বলেন, 'একটি গাড়ি প্রতিদিন সর্বোচ্চ ছয়বার সদরঘাট-গুলিস্তান রুটে আসা-যাওয়া করতে পারে। ১০ বছর আগেও এই রুটে ৮০ থেকে ১০০টি টমটম চলাচল করত। বর্তমানে সদরঘাট থেকে গুলিস্তান রুটে ৩৩টি টমটম চলাচল করে থাকে। কুষ্টিয়া, বিক্রমপুর, দোহার, মানিকগঞ্জের হাটে একেকটি ঘোড়ার দাম ৫০ হাজার থেকে শুরু করে কয়েক লাখ টাকা হয়ে থাকে। তবে কুষ্টিয়ার ঘোড়ার দাম সবচেয়ে বেশি।'

পেছন ফিরে দেখা : অনেক ইতিহাসবিদের ধারণা, ঢাকায় ঘোড়ার গাড়ির প্রচলন শুরু হয় ১৮৩০ সালে। তখন এ দেশে ছিল নবাবি শাসন। পুরান ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় ঘোড়ার গাড়ি চলত। সে হিসেবে পুরান ঢাকায় প্রায় পৌনে ২০০ বছরের ঐতিহ্য ধরে রেখেছে এই টমটম।

অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনের 'ঢাকা স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী-১' বই সূত্রে জানা যায়, আর্মেনীয়রা ১৮ শতকের প্রথম দিকে ঢাকায় বসবাসকারী প্রভাবশালী সম্প্রদায় ছিল। ব্যবসার উদ্দেশ্যে তারা সে সময় ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় দোকান খুলেছিল। তার মধ্যে শাঁখারীবাজারের 'সিরকো অ্যান্ড সন্স' অন্যতম। এ দোকানে বিভিন্ন ইউরোপীয় জিনিসপত্র বিক্রি হতো। 'মেসার্স আনানিয়া অ্যান্ড কোম্পানি' ছিল প্রতিষ্ঠিত মদ ব্যবসার প্রতিষ্ঠান। ১৮৫৬ সালে সিরকোই প্রথম ঢাকায় ঘোড়ার গাড়ির প্রচলন করেন, যা 'ঠিকা গাড়ি' নামে পরিচিত ছিল। তখন সিরকোর ঠিকা গাড়ির ব্যবসা বেশ জমে উঠেছিল। সময় গড়িয়ে তা হয়ে ওঠে ঢাকার প্রধান বাহন। ১৮৬৭ সালে ঠিকা গাড়ির সংখ্যা ছিল ৬০। ১৮৮৯ সালের দিকে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৬০০টি।

১৮৪৪ সালের 'ক্যালকাটা রিভিউতে' উল্লেখ রয়েছে নানা ধরনের ঘোড়ার গাড়ির কথা। তবে ঢাকায় যেসব ঘোড়ার গাড়ি চলত, সেগুলোর নাম ক্রাহাঞ্চি বা ক্রাঞ্চি গাড়ি। এগুলোকে 'কারাচি গাড়ি'ও বলা হতো।

 

 

 



মন্তব্য