kalerkantho


ছবি বানাতে চেয়েছি, অন্য কিছু নয়

১৯ মে, ২০১৭ ০০:০০



ছবি বানাতে চেয়েছি, অন্য কিছু নয়

১৯৮০ সালে ছুটির ঘণ্টা মুক্তি দেওয়া হলো। কিন্তু কোনো হলই বুকিং করতে চায় না। এমনকি ২০-২৫ হাজার টাকাও বুকিং মানি দিতে চাইছে না। টঙ্গীর এক হল মালিক দয়া করে বললেন, ‘দাদা (সত্য সাহা) কাঁদছেন, কী করব? দিয়ে যান, ২৫ হাজার টাকা দিলাম, নিয়ে যান।’ দাদা বললেন, ‘লস হয়ে যাবে।’ বললাম, সাত লাখ টাকায় লসের কী আছে? পরের সপ্তাহে সেই ছবি ওই হল মালিক দুই লাখ টাকায় বুকিং করেছেন

বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম সেরা পরিচালক তিনি। ‘ছুটির ঘণ্টা’, ‘মাটির ঘর’, ‘অশিক্ষিত’, ‘জনতা এক্সপ্রেস’সহ আরো অনেক স্মরণীয় ছবি বানিয়েছেন। কাজ করেছেন এহতেশাম-মোস্তাফিজের সঙ্গে। শাবানা-রাজ্জাকের সবচেয়ে বেশি ছবিও তাঁর। পরিচালক আজিজুর রহমান-এর সিনেমা জীবনের গল্প শুনেছেন ওমর শাহেদ। ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান

 

এহতেশামের সঙ্গে কিভাবে যোগাযোগ হয়েছিল?

১৯৫৮ সালে পত্রিকায় দেখলাম এহতেশাম ‘এ দেশ তোমার আমার’ নামে একটি ছবি তৈরি করছেন। আমি আর সুভাষ দত্ত তখন এভারগ্রিন পাবলিসিটি নামের একটি ফার্মে সিনেমার ব্যানার করি। আমি ঢাকা আর্ট ইনিস্টিটিউট থেকে কেবল ডিপ্লোমা পাস করেছি। দত্তদা বললেন, ‘চলো যাই। ’ তার আগে আমাদের শান্তাহারে তাঁদের মিনার সিনেমা হলে তিনি, তাঁর ভাই মোস্তাফিজ ও তাঁদের মা যেতেন। সেভাবেই পরিচয়। তখন বংশালে এক বন্ধুর বাসায় থাকতাম। আমরা রাজার দেউড়িতে লিও ফিল্মসের অফিসে গেলাম। দেখা হলো না। তবে শান্তাহারে তাঁর ম্যানেজার ইব্রাহিম ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হলো। তিনি বললেন, ‘এহতেশাম দোতলায় থাকেন। ৯টার দিকে নিচে নামবেন। ’ আমি অপেক্ষা করছি। ৯টায় ওস্তাদজি নামলেন। তিনি আমাকে বললেন, ‘কী ব্যাপার?’ বললাম, আপনার ছবিতে শিল্পনির্দেশনা করতে চাই। ‘শিল্পনির্দেশনা তো এফডিসি থেকে করে। তাদের নিজস্ব শিল্পনির্দেশক আছে। ’ তাহলে কমার্শিয়াল পাবলিসিটির কাজ দেন। ‘সেই কাজ সুভাষ দত্ত করবে। ’ আমরা একসঙ্গে কাজ করি, এখানেও একত্রে কাজ করব। তখন তিনি আমাকে প্রস্তাব দিলেন, ‘তুমি আমার সঙ্গে সহকারী পরিচালক হিসেবে যোগ দাও। আমি দোসানি সাহেবকে বলে দেব। সুযোগ পেলেই গুলিস্তানে গিয়ে ছবি দেখবে। নাজে গিয়ে ইংরেজি ছবি দেখবে। ’ এভাবেই আমার সিনেমা দেখা ও বানানো শেখার শুরু। সময় পেলেই ছবি দেখতাম। প্রজেকশান হলে গিয়ে অপারেটরের কাছ থেকে নিয়ে রিল নেড়েচেড়ে দেখতাম।

 

এহতেশাম কিভাবে নতুন মুখ খুঁজে পেতেন?

তাঁর আইকিউ খুবই ভালো ছিল। রত্না তখন ক্লাস থ্রি বা ফোরে পড়ে। দেখতেও অনেক ছোট ছিল। মাত্র ৯ বছর বয়স। তারা গেণ্ডারিয়া থাকত। ওর বাবা কোর্টে চাকরি করতেন। কোর্টের পেছনেই আমাদের অফিস ছিল। ‘নতুন সুর’ ছবিটিতে অভিনয়ের জন্য মেয়েকে নিয়ে বাবা আমাদের অফিসে এলেন। আমি বললাম, এমন ছোট মেয়ের কোনো চরিত্র তো নেই। তবে ছোট্ট চরিত্র আছে। সে নায়ক রহমানের ছোট বোন হতে পারে। এহতেশামরা বললেন, তাকে সেই চরিত্রই দাও। ছবিটির শুটিংও আমার মনে আছে। ঢাকার পরিবাগের পীর সাহেবের বাড়ির পেছনের বাড়িতে আমাদের শুটিং হচ্ছে। রাত ১১টা কী ১২টার দিকে রত্না বলল, ‘চাচা, আমি বাইরে যাব। ’ এতটাই ছোট্ট ছিল যে প্রাকৃতিক কাজ করতে যাবে, সেটিও বলতে পারছিল না। বললাম, ‘জঙ্গলের ধারে যাও। ’ সেই মেয়েটিই বাংলা ছবির সবচেয়ে বড় নায়িকা শাবানা।

আরেকজন বড় নায়িকা শবনমের আসল নাম ঝরনা বসাক। ‘এ দেশ তোমার আমার’ ছবিতে একটি দলগত নৃত্য ছিল।   ‘এলো রে এলো স্বাধীনতা এলো’—গানের সঙ্গে এই নাচের দলে সেও ছিল। তখন সে বাফাতে নাচ শেখে। মদনমোহন বসাক লেনে নানার বাসায় থাকে। বাবার নাম ননী বসাক। তিনি ফুটবলের রেফারিং ও স্কাউটিং করতেন। পরের ছবি ‘রাজধানীর বুকে’তে সে বাইজির চরিত্রে অভিনয় করল। আর পরের ছবি ‘হারানো দিন’-এ সে হয়ে গেল শবনম। ভালো নাম বন্দিতা বসাক, ডাকনাম ঝর্ণা। তিনি কিভাবে এই নতুন মুখগুলো আবিষ্কার করতেন সেটি আমরাও বুঝতে পারি না। সে জন্য অনেক সময় আমরা আড়ালে তাঁর নিন্দাও করেছি। তিনি নতুন শিল্পী নিয়ে আসতেন। ঢাকা স্টেডিয়ামে খান টেইলার্সে প্রত্যেক শিল্পীর ড্রেস তৈরি করে তাঁদের মেকআপ দেওয়া হতো। আমি তাঁদের ছবি তুলতাম। পরে সেই স্টিল ফটোগ্রাফি তাঁকে দেখাতাম। মুখস্ত করার জন্য খাতায় তাঁদের সংলাপ লিখে দিতাম। এসব আমার কাজ ছিল। তিনি ছবি দেখে শিল্পীদের নির্বাচন করতেন। তারপর রিহার্সাল দিয়ে অভিনয় শেখানো হতো। এভাবে রহমান, নাদিম, নার্গিস, সুভাষ দত্ত, শবনম, শাবানা, শাবনাজ, শাবনূরসহ আরো অনেকের জন্ম হয়েছে।

 

তাঁদের নিয়ে আর কোনো স্মৃতি?

এহতেশাম একটু কবি ধরনের, আনমাইন্ডফুল ছিলেন। ফলে তাঁর পেছনে জোঁকের মতো লেগে থেকে তাঁকে দিয়ে ছবি বানাতাম। তিনি কোনো কিছু লিখে বলতেন—‘এটি এভাবে শুট করো। ’ তিনি আমাকে দিয়ে কাজ করাতেন বলে তাড়াতাড়ি পরিচালনায় আসতে পেরেছি। তার পরও ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৭ সাল—১০ বছর তাঁদের পেছনে ছিলাম। তাঁরা আমাকে এত ভালোবাসতেন যে বাসায় ভাত পর্যন্ত ভাগাভাগি করে খেয়েছি। তাঁরা তিন তলায় থাকতেন, আমি নিচতলার অফিসে। আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পে এহতেশামের অবদান বলে শেষ করা যাবে না। এহতেশাম বাণিজ্যিক ছবি করেছেন। তাঁর সেরা ছবি ‘এ দেশ তোমার আমার’। এটিই পুরো পাকিস্তানের প্রথম দেশাত্মবোধক ছবি। এ ছাড়া ভালো ছবির মধ্যে আছে ‘পিচ ঢালা পথ’, ‘মিত্তি কী পুতলি (মাটির পুতুল)’, এটি পাকিস্তানের নিগার অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে। তাঁর আরেকটি মাস্টারপিস ‘রাজধানীর বুকে’। তাঁদের আদি বাড়ি কুমিল্লায়। তাঁর বাবা ঢাকা ইসলামিয়া কলেজের ইংরেজির অধ্যাপক ছিলেন। নানা হেকিম হাবিবুর রহমান ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহদের চিকিৎসক ছিলেন। তাঁরা উর্দুভাষী বনেদি পরিবার। এহতেশাম মানুষ হিসেবে অসাধারণ ছিলেন। যেহেতু জীবনে অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের শিকার হয়েছেন, ফলে কোনো খাবারই নষ্ট করতেন না। কেউ ফেলে দিলে খুব বকতেন। ম্যাট্রিক পাসের পর তিনি দিল্লিতে পড়তে গিয়ে ফটোগ্রাফি শেখেন। আর্মিতেও ছিলেন। তাঁর ‘চান্দা’ পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম উর্দু ছবি। পাকিস্তানিরা এখানে উর্দু ছবি বানিয়ে পয়সা নিয়ে যাচ্ছে বলে সারা পাকিস্তানে চালানোর জন্য তিনি ছবিটি করেছিলেন। ছবিটি তৈরির জন্য তিনি সাবিহা সন্তোষের সঙ্গে চুক্তি করেছিলেন। তবে তাঁরা শিডিউল দিচ্ছিলেন না, তিনি অনেক ঘুরে প্রযোজক দোসানিকে বললেন, ‘লোকাল ছেলেকে দিয়ে উর্দু ছবি বানাব। ’ কিন্তু দোসানি রাজি নন, ‘আমার পয়সা নষ্ট হবে। তারা উর্দু কী বলবে আর কী অভিনয় করবে?’ তখন এহতেশাম বললেন, ‘আমিও তো এই ছবির প্রযোজক। আমার ৫০ আর আপনার ৫০ শতাংশ টাকা লগ্নি আছে। লোকসান হলে আমারও তো হবে। আমি বানাবই। ’ অভিনয়ের জন্য সুলতানা জামান, শবনম ও রহমানকে নেওয়া হলো। সুরুর বারাবানকাভি উর্দুতে চিত্রনাট্য, সংলাপ লিখলেন। সেগুলো আমি বাংলায় লিখে দিলাম। এরপর রিহার্সাল, শুটিং শুরু হলো। এটি করাচির নিশাত হলে ১০০ সপ্তাহ চলেছে, বাংলাদেশের হলে ৫০ সপ্তাহ। ছবিটি ঢাকা থেকে করাচিতে বেশি জনপ্রিয় হয়েছিল। এরপর তাঁর একসময়ের সহকারী জহির রায়হান বানালেন ‘সঙ্গম’। এহতেশাম না থাকলে এফডিসিতে একটি ফ্লোর থেকে আটটি ফ্লোর হতো না। কারণ এহতেশাম-মুস্তাফিজ বাণিজ্যিক ছবি নির্মাণ করতেন। সেগুলো হিট হতো। তখন ভারত-পাকিস্তানের উর্দু ও কলকাতার বাংলা ছবির সঙ্গে যুদ্ধ করে আমাদের ছবি নির্মাণ করতে হতো। দর্শক আমাদের এই ছবিগুলো ভালোভাবে নিয়েছিল।

 

আপনার প্রথম ছবি তো সয়ফুলমুলুক বদিউজ্জামান?

তখন আমি এহতেশামের ‘চকোরি’তে প্রধান সহকারী পরিচালক। আমাদের প্রডাকশন ম্যানেজার আলী এসে একদিন বললেন, ‘এক ভদ্রলোক পেশায় ঠিকাদার, বাড়ি নোয়াখালী। তিনি একটি ছবি বানাতে চান। চলেন তাঁর তেজকুনিপাড়ার বাসায় যাই। ’ গেলাম। তিনি বললেন, ‘আমি ফোক ছবি বানাব। ’ শুনেই মনটা খারাপ হয়ে গেল। চারুকলায় পড়ে আমি ফোক ছবি বানাব? বললাম, বিকেলে আপনাকে জবাব দেব। ওস্তাদকে বলার পর তিনি বললেন, ‘আরে বেকুব, মানুষ প্রযোজক খুঁজে পায় না। ফোক হলে সমস্যা কোথায়? তুমি ভালো ছবি পরেও বানাতে পারবে। শুরু করো। ’ পরে প্রযোজককে বললাম, আমরা ছবিটি বাংলা ও উর্দু দুই ভাষায়ই বানাতে পারি। ড. আশরাফ সিদ্দিকীর কাহিনি অবলম্বনে তৈরি এ ছবিটি প্রথম দুই ভাষার ছবি। উর্দু নাম ছিল ‘মেরে আরমান মেরে স্বপ্নে’। এটি ১৯৬৭ সালে মুক্তি পেয়েছে। এহতেশাম তাঁর চকোরিতে আজিম-সুজাতাকে বাদ দিয়েছিলেন। আমি তাঁদের নায়ক-নায়িকা নিয়েছিলাম। ছবিতে অনেক ফ্যান্টাসি ছিল। ছবিটির শুটিং ঢাকায় হয়েছে। এফডিসির স্টুডিও, প্রযোজকের বাড়ির সামনে ইনডোর শুটিং করেছি। এখন যেখানে চিডিয়াখানা, সেখানে আগে টিলা, জঙ্গল ছিল। সেখানে শুটিং করেছি। ছবিতে বশির আহমেদ ও ফেরদৌসী রহমান গেয়েছেন। টপশট থেকে বাঘ, ভালুুকের ছবি নিয়ে সেগুলো এডিটিং করে ছবিতে লাগিয়েছিলাম। ছবিটি পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান দুই জায়গায়ই হিট করেছে।

 

এরপর তো মধুমালা?

মধুমালায়ও আজিম-সুজাতা ছিলেন। এটি গ্রামের ফোক ছবি। গল্পটি জমিদারি প্রথার বিরুদ্ধে কৃষকদের আন্দোলন নিয়ে। এ ছবিতে প্রথম ও শেষবারের মতো শিবলী সাদিক অভিনয় করে। সে আমার চারুকলার বন্ধু ছিল। তার বিপরীতে ছিল অঞ্জনা। পরের ছবি ‘সমাধান’। এর শুটিং ১৯৬৯ সালে শুরু হয়। কাজ শেষ হয়ে গেলেও মুক্তিযুদ্ধের জন্য এটি ১৯৭২ সালে মুক্তি পায়। এটি স্বাধীনতার পর মুক্তি পাওয়া দ্বিতীয় ছবি। গল্পটি ১৯৫৯ সালের ঘূর্ণিঝড়ের ওপর সাজিয়েছিলাম। ঘূর্ণিঝড়ের পর মাটির পাত্রে ভাসতে ভাসতে তিন ভাই-বোন পশুর নদ হয়ে খুলনা শহরে এসে আশ্রয় নেয়। খবরে পড়া এ গল্প আমি আমার মতো সাজালাম। তাদের ঢাকায় নিয়ে এসেছিলাম। ছবিটির গ্রামের দৃশ্য সাভারের স্মৃতিসৌধে করেছি। তখন ওখানে ধানক্ষেত ছিল, বন্যা হলে নদীর মতো হয়ে যেত। সেখানে রোমান্টিক দৃশ্যগুলো করেছি। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে কলেজের দৃশ্য, নায়িকার বাড়ি ছিল এহতেশামের বাড়ি। রমনা পার্কেও শুটিং করেছি। এখানে শাবানা, উজ্জ্বল, সুভাষদা, সুমিতা দেবী, আনোয়ার হোসেন, রানী সরকারসহ অনেকে অভিনয় করেছেন। এটিই বাংলাদেশের প্রথম ছবি, যেটি ২৫ সপ্তাহ চলেছে। এ ছবির মাধ্যমেই শাবানা আমার সঙ্গে প্রথম কাজ করে। সে গ্রামের কৃষকের মেয়ে ছিল।

 

তিনি আপনার কতগুলো ছবি করেছেন?

১৬টি ছবি করেছে। উল্লেখযোগ্য হলো—‘সমাধান’, ‘অতিথি’, ‘গরমিল’, ‘অমর প্রেম’, ‘অনুভব’, ‘অভিমান’, ‘সাম্পানওয়ালা’, ‘মাটির ঘর’ ও ‘ঘরে ঘরে যুদ্ধ’। শাবানার সেরা অভিনয় ‘মাটির ঘর’। এটি বাংলাদেশের প্রথম ট্র্যাজেডি ছবি। নায়ক-নায়িকা দুজনেই মারা যায়। গ্রামের মাতবর ও তার সহকারীরা তাকে ধর্ষণ করে, হাঁটতে পারছে না, রক্ত বেয়ে বেয়ে পড়ছে—এমন একটি দৃশ্যে সে অসাধারণ অভিনয় করেছে। ছবিটি সুপারহিট করেছিল। শাবানা হলো মাটির অভিনেত্রী। তাকে যেকোনো ফর্মে আনা যায়। তাকে আমি গ্রামের চরিত্রে অভিনয় করিয়েছি। অনেকে বলেছেন, সে মডার্ন মেয়ের চরিত্রে অভিনয় করতে পারবে না। সেই চ্যালেঞ্জ থেকেই তাকে নিয়ে ‘অনুভব’ করলাম। তাতে সে উজ্জলের বিপরীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীর চরিত্রে অভিনয় করেছে। শাবানা-রাজ্জাক আমার ৫৩টি ছবির মধ্যে ১৬টিতে অভিনয় করার কারণ হলো—তাঁরা কাজে খুব ডেডিকেটেড ছিলেন, খুব সিনসিয়ার ছিলেন। তাঁরা পরিশ্রম করতেন। যেটি আর কারো মধ্যে এত বেশি ছিল না। ববিতা, কবরী আমার মাত্র দুটি করে ছবি করেছেন। রোজিনা, সুচরিতা চার-পাঁচটি ছবিতে অভিনয় করেছে। যখনই কোনো ব্যতিক্রমী চরিত্র পেয়েছি শাবানাকে নিয়েছি। কারণ সে কষ্ট করতে পারবে, সময় দেবে। এসব কারণেই সে ১১টি জাতীয় পুরস্কার পেয়েছে। রাত ৩টার সময়ও নারায়ণগঞ্জের ইছামতী নদীর তীরে কলাকোপা-বান্দুরায় শাবানা-রাজ্জাক হাজির হয়ে গেছেন। ‘সমাধান’-এ সে ছিল বড়লোকের মেয়ে। ‘গরমিল’-এ গ্রামের মেয়ে, ‘লাল কাজল’-এ কাজের মেয়ে, ‘অমর প্রেম’-এ মেডিক্যালের নার্স। রাজ্জাককে কেউ গ্রামের চরিত্রে নিতেন না। আমিই তাঁকে প্রথম ‘মাটির ঘর’-এ গ্রামের চরিত্রে নিয়েছি, ‘অশিক্ষিত’তে তিনি গ্রামের পাহারাদার ছিলেন।

 

মাটির ঘর তো শাবানা প্রযোজিত ছবি?

এ দেশের অনেক পরিচালককে দিয়ে সে ছবি বানাতে চেষ্টা করেছে, কিন্তু পারেনি। কেউ কস্টিউম বানিয়েছেন, কারো চিত্রনাট্য লেখা হয়েছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ছবি হয়নি। আমাকে প্রস্তাব দেওয়ার পর বললাম, আমার নামে ছবি হবে—এ ঘোষণা দেওয়ার পর ছবি হতেই হবে। তখন সে বললো, আমার কাছে তো এখন অত টাকা নেই। এরপর সিদ্ধান্ত হলো, বিউটি সিনেমা হলের মালিক এস এ খালেক, হানিফ পরিবহনের জয়নুল আবেদিন ও শাবানা—প্রত্যেকে ৫০ হাজার করে টাকা দেবেন। শুধু জয়নুল সাহেব টাকা দিলেন। এই টাকায় তো ছবি হবে না। স্ত্রীর কাছ থেকে সাত হাজার টাকা নিয়ে উর্দুভাষী প্রয়াত সাংবাদিক জয়নুল আবেদিনকে সাক্ষী রেখে মহরত করলাম। নায়ক-নায়িকা রাজ্জাক-শাবানা, গ্রামের মাতবর খলিলউল্লাহ খান ও নানি ছিলেন রওশন জামিল। তুরস্কের একটি উপন্যাস অবলম্বনে এ টি এম শামসুজ্জামান দারুণ চিত্রনাট্য লিখেছিলেন। সাভার, এফডিসি ও কলাকোপা-বান্দুরায় শুটিং করে, নিজের পকেট থেকে সোয়া লাখ টাকা দিয়ে পুরো ছবি তৈরি করে শাবানাকে উপহার দিলাম। ছবির লাভ থেকে সে টাকা ফেরত দিয়েছে। গ্রামের প্রেক্ষাপটের এই ছবিটি আড়াই-তিন কোটি টাকা ব্যবসা করেছে। এ ছবির মাধ্যমে এস এস (সাদেক-শাবানা) প্রডাকশনের সৃষ্টি। আগে এর নাম ছিল এস এস (শামীম, আমার স্ত্রীর নাম, শাবানা) প্রডাকশন। ছবিটি এস এস প্রডাকশন প্রযোজিত এবং পরিবেশিত ছিল। শাবানা প্রডাকশনের লোগোও আমার ডিজাইন করা। অফিসও আমার অফিসের পাশে ছিল। এটি আমার সেরা ছবি, এ কারণেই এর আগে বাংলাদেশে নায়ক-নায়িকা মারা যান এমন কোনো ট্র্যাজেডি ছবি আর হয়নি। এটি পুরোপুরি লোকেশনভিত্তিক, গ্রামের দৃশ্য ইনডোরে শুট করেছি। কেউ ধরতে পারেননি—সেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাজ্জাক-শাবানা ইছামতী নদীর পারে চলে এসেছেন। ধীরস্থিরভাবে ক্যামেরার কাজ করতে পেরেছি। রেজা লতিফ ক্যামেরার কাজ খুব ভালো করেছেন। আমি কিন্তু খুব চঞ্চল। খুব দ্রুত কাজ করি। একটু পরপর শট নিই। একসঙ্গে তিনটি ছবিও করেছি। জীবনের প্রথম দুটি ছবির কাজই তো একত্রে করেছি। এ জন্য এফডিসিতে আমাকে একদল বলে ঠোকাই ডিরেক্টর, আরেক দল কম্পিউটার ডিরেক্টর বলে। এক জায়গায় বসে আমি ওপর-নিচ, পাশে এভাবে ১০ রকমের শট নিতে পারি। একমাত্র জহির রায়হান এভাবে কাজ করতে পারতেন।  

 

অনেক ক্যামেরাম্যানকে নিয়ে এসেছেন, জেনেছি।

সিনিয়র ক্যামেরাম্যানকে নিলে আমাকে তাঁর অধীনে কাজ করতে হবে বলে প্রতিটি ছবিতে আমি তাঁদের সহকারীদের নিয়ে এসেছি। এটি খুব চ্যালেঞ্জিং ছিল। সাইফুলমুলক-এ বদরে আলম, মধুমালায় তাঁর সহকারী অরুণ রায়, ‘আখেরি স্টেশন’-এ নাসেরকে নিয়েছি। রেজা লতিফকে ‘স্বীকৃতি’তে, গরমিল-এ তাঁর সহকারী আবু হেনা বাবলু, আলমগীর খসরু—এভাবে ১৬ জনকে আমি ক্যামেরাম্যান বানিয়েছি। সেভাবে নুরুন্নবী, বুলবুল চৌধুরী, আমজাদ হোসেনকে এডিটর বানিয়েছি। আমজাদ ‘জনতা এক্সপ্রেস’ থেকে আমার সব ছবিতে কাজ করেছেন। তিনি সেরা এডিটর ছিলেন, কাজ নিয়ে গবেষণা করতেন। রেজা লতিফের কনসেপ্টই আলাদা। তাঁকে প্রথম নেওয়ার পর ভয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘যদি ফিল্ম নষ্ট হয়?’ বলেছি, হলে আমার হবে। আবার নতুন ফিল্ম নেবেন। কারণ তখন নতুন চাইনিজ ফিল্ম এফডিসিতে আমদানী করা হয়েছিল। পরে ফলাফল ভালো হয়েছিল।

 

দিলীপ বিশ্বাসকে কিভাবে পেয়েছেন?

সে খুলনা থেকে ঢাকায় গান গাওয়ার জন্য এসেছিল। জহির রায়হান, সুমিতা দেবীর সঙ্গে ঘোরে। প্যারডি গাওয়ার জন্য সত্যদার (সাহা) পেছনে ছোটে। সত্যদার বাড়িতেই আলাপ। তার দুলাভাইয়ের অনুরোধে তাকে নিলাম। সে আমার স্বীকৃতি, সমাধান, অপরাধ ও গড়মিল-এ সহকারী পরিচালক ছিল। মতিন রহমান আমার আপন ফুফাত বোনের ছেলে। সে-ও আমার সহকারী ছিল। সুচরিতাকে ‘বাবলু’ ছবিতে শিশু অভিনেত্রী হিসেবে ছেলের চরিত্র করিয়েছি। তার ভালো নাম বেবি হেলেন। ‘স্বীকৃতি’তে সে নায়িকা হয়। সে শাবানার চেয়েও ইমোশনাল। তবে কিছুটা পাগল।

 

আরেকটি সেরা ছবি ‘অশিক্ষিত’।

শিক্ষার আলো আনাচকানাচে ছড়িয়ে পড়ুক—এ ভাবনা থেকে প্রযোজক সত্যদা গল্প লিখেছিলেন। আমি বললাম, নিরীক্ষাধর্মী ইএই ছবিটি চলবে কি না বলতে পারব না। নায়ক-নায়িকাকে ব্যালান্স করে বানাতে হবে। নায়ক গ্রামের পাহারাদার রাজ্জাক, নায়িকা অঞ্জনা। এখানে রাজ্জাক স্মরণীয় অভিনয় করেছেন। ছবির জন্য তাঁর কাছ থেকে ২০ দিনের শিডিউল নিয়ে আমি ১৭ দিনেই শুটিং শেষ করেছি। অঞ্জনা ছোট্ট রোমান্টিক চরিত্রে ছিলেন। গ্রামের মাতবর ও চোরাচালানি ছিলেন এ টি এম। পাঁচ লাখ টাকার এই ছবি অন্তত দুই-তিন কোটি টাকা ব্যবসা করেছে।

 

রাজ্জাকের অভিনয়?

রাজ্জাক অঞ্জনার সঙ্গে কাজ করেছেন, আমার পরিচয়ে কবরীর নায়ক ছিলেন। তবে জুটি হিসেবে রাজ্জাক-শাবানাই সেরা। তাঁদের চরিত্রও ভালো মিলত, তাঁরা ভালো অভিনয়ও করতেন। তাঁদের দিয়ে ‘অতিথি’, ‘ছুটির ঘন্টা’, ‘অমর প্রেম’, ‘মায়ের আঁচল’, ‘মাটির ঘর’-এর মতো ছবি করেছি। শাবানা বাদে রাজ্জাককে অন্য নায়িকার সঙ্গে দিলে কেন যেন মানাত না। তাঁদের কাজের গতি, নিয়মানুবর্তিতাও ভালো লাগত। তার পরও রাজ্জাক আমাকে মায়ের আঁচল ছবিতে খুব কষ্ট দিয়েছেন। সে ছবিতে ফারুক-সুচরিতা, রাজ্জাক-শাবানা ছিলেন। এক নায়ক এলে অন্যজন আসতেন না। শেষ দৃশ্যে তো রাজ্জাক আসেনইনি। তখন ডামি দিয়ে অভিনয় করিয়েছি। তাঁদের আলাদা শুটিং করে এডিটিংয়ে জোড়া লাগিয়েছি। রোজিনা-অঞ্জু ঘোষও একসঙ্গে অভিনয় করত না। তাদেরও এক ছবিতে অভিনয় করিয়েছি। আলমগীর-শাবানা-রাজ্জাককে নিয়েও কাজ করেছি। তখনকার সময় এটি খুব কঠিন ছিল। কখনো কখনো রাজ্জাক দেরি করে আসতেন। তিনি আমার ‘অতিথি’তে অপরাধীর চরিত্রে ক্যারেক্টার আর্টিস্ট হিসেবে কাজ করেছেন। তবে বাংলাদেশের সিনেমায় শাবানাই সবচেয়ে নিয়মনিষ্ঠ অভিনেত্রী। কেউ না এলেও সে সকাল ৯টায় এসে হাজির হতো। ভোরে ঘুম থেকে উঠে নামাজ পড়ে, রান্না করে, এফডিসিতে এসে ঘুরে বেড়াত। তখনো হয়তো ফ্লোর খোলেইনি। তাঁরা বাদে আমার প্রিয় অভিনেতা এ টি এম শামসুজ্জামান ও আনোয়ার হোসেন। আমার শুটিং কোনো দিন প্যাকআপ হয়নি। কারণ এক অভিনেতা নাই তো আরেকজন আছেন। আমার শুটিংয়ে কেউ দেরি করে আসেননি। কারণ তাঁরা জানতেন, পরিচালক আজিজুর রহমান সব শিল্পী উপস্থিত না হলেও শুটিং করতে পারেন। তাই সবাই সময় মতো আসতে চেষ্টা করতেন।

 

ছুটির ঘণ্টার পেছনের গল্প?

আমরা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে, ফতেহাবাদ গ্রামে একটি পুকুরপারে ‘অশিক্ষিত’ ছবির শুটিং করছিলাম। তখন ঢাকায় জাপান এয়ারলাইনসের একটি বিমান ছিনতাই হয়েছিল। ফলে রাজধানীর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। আমার স্ত্রী ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে নিয়ে সেন্ট্রাল রোডে থাকেন। ফলে দুশ্চিন্তায় প্রডাকশন ম্যানেজারকে বললাম, শহর থেকে কয়েকটি পত্রিকা নিয়ে এসো। দুপুরে খাওয়ার ব্রেকে সে পত্রিকা নিয়ে এলো। আমার হাতে ‘বাংলার বাণী’। পড়তে পড়তে ভেতরের পাতায় দুই কলামের খবর দেখলাম—‘একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। ’ পড়লাম—নারায়ণগঞ্জের একটি স্কুলের ছাত্র ছুটির আগে বাথরুমে আটকা পড়েছিল। মাসখানেক বেঁচে থাকার পর সে সেখানে মারা গেছে। খবরটি পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার মাথা খারাপ হয়ে গেল, আরে এ তো ভয়াবহ কষ্টের গল্প। কিভাবে সে বেঁচে ছিল সেই ঘটনাগুলোও দেয়ালে ছেলেটি লিখে গিয়েছিল। সৈয়দ হাসান ইমাম, রোজী ভাবি, এ টি এম শামসুজ্জামান এবং অশিক্ষিতের প্রযোজক সত্যদাকে বললাম, এটি নিয়ে তো একটি দারুণ ছবি করা যায়। প্রযোজক বললেন, ‘আগে অশিক্ষিত শেষ করো। পরে দেখা যাবে। ’ ‘অশিক্ষিত’ সুপারহিট হলো। আমিও এই নতুন ছবির জন্য প্রযোজক খুঁজতে লাগলাম। তবে কারোরই আগ্রহ নেই—‘একটি স্কুলছাত্র বাথরুমে মারা গেছে, সেখানে তুমি কী দেখাবে? ছবিতে তো নায়িকাও নেই। ’ অন্তত ১০ জন প্রযোজকের পেছনে ঘুরেছি। কাউকেই রাজি করাতে না পেরে শেষে সত্যদাকে ধরলাম, অশিক্ষিত ছবিতে তো তিন-চার কোটি টাকার ব্যবসা হয়েছে। প্লিজ, এই ছবির জন্য আড়াই থেকে সাত লাখ টাকা বিনিয়োগ করুন। আসুন, একটি রিস্ক নিই, আমার চিন্তাকে প্রতিফলিত করি। তিনি রাজি হলেন। চিত্রনাট্য লিখে ডামি সংলাপ দিলাম। এরপর মোহাম্মদ রফিকুজ্জামানকে দিয়ে আসল সংলাপ লেখানো হলো। প্রতিটি ছবিতেই আমি এভাবে কাজ করেছি। নিজে না লিখে দিলে তো সেটি ভিজ্যুয়ালাইজ করা খুব কঠিন। চিত্রনাট্য লেখার পর দেখা গেল নায়ক-নায়িকা নেই, গল্পও অসম্পূর্ণ। ফলে সে কিভাবে এখানে আটকে গেল, কিভাবে মারা গেল সেগুলো আমাকে তৈরি করতে হলো। স্কুলের ঘণ্টাবাদক রাজ্জাককে নায়ক হিসেবে পেলাম। সত্যদা বললেন, ‘নায়িকা ছাড়া কী ছবি বানাবে?’ এর মধ্যে একদিন সকাল ৯টায় আমার কাকরাইলের অফিসের দরজা খুলে দেখি এক মহিলা আমার টেবিলের ওপর বসে আরাম করে সিগারেট ফুঁকছে। আমাকে দেখেই সে ভয়ে লাফিয়ে নামল। বললাম, তুমি কে? ‘আমি সুইপারের বউ, ওর জ্বর হয়েছে বলে ঝাড়ু দিতে এসেছি। ’ একটু পরই সত্যদাকে ফোন করে বললাম, নায়িকা পেয়ে গেছি। আমার নায়িকা হবে স্কুলের ঝাড়ুদারনী। সেই চরিত্রে অভিনেত্রী খুঁজতে খুঁজতে মনে হলো, একটু পৃথুলা শাবানাই হলো সবচেয়ে ভালো। তাঁকে নিয়ে চরিত্র তৈরি করলাম, বুঝিয়ে দিলাম। শাবানাকে নিয়ে ধোলাইখালের সুইপার পট্টিতেও গেছি। ওকে তাদের পরিবেশ, আচার-আচরণ, পোশাক, চলাফেরা দেখালাম। তার গেটআপ ঠিক করা হলো। সত্যদাকে দেখানোর পর তিনি বললেন, ‘সব ঠিক আছে। ’ বিভিন্ন চরিত্রও তৈরি করা হলো।  

 

গল্প কিভাবে সাজালেন?

ঢাকায় আসার পর গল্পটি নিয়ে গবেষণা শুরু করলাম। এক মাসের কাহিনি ১৫ দিনে নিয়ে এলাম। পত্রিকায় তো অর্ধেক গল্প দেওয়া ছিল। কিভাবে ছেলেটি বাথরুমে ঢুকে পড়ল, কিভাবে আটকা পড়ল, সেসব নেই। সেগুলো যুক্ত করে পুরো গল্প সম্পূর্ণ করলাম। প্রথম, দ্বিতীয় এভাবে ১৫ দিনের গল্প সাজালাম। প্রথম দিন সে বাথরুমে গেল, হাত-মুখ ধুল—এভাবে আস্তে আস্তে গল্প এগিয়ে এলো। সে পোকামাকড় দেখে ভয় পেয়ে গেল, পরে ওগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্ব করল। সেখানে থাকতে চেষ্টা করল—এভাবে সাজালাম। ছেলেটি প্রতিদিন গোসল করে এসে মাকে বলত, ‘মা খাবার দাও। ’ স্কুলে গিয়ে টিফিন খেত না। ছুটির পরে গাড়িতে বসে খেত। এভাবে তার জীবনের প্রতিটি ঘটনা আগে দেখিয়েছি। পরে সেগুলো আবার দেখিয়েছি। যেমন সে যে নাশতা রেখে দিয়েছিল, সেটি বন্দিদশায় খেয়েছে। যেদিন সে মারা যাবে, তার পর দিন স্কুল খুলবে। আমার ছবিও শেষ হবে।

  

ছেলেটিকে কিভাবে পেলেন?     

এই ছবিতে সেই ছেলের চরিত্রে সুমন অভিনয় করেছে। এর আগে সে ‘অশিক্ষিত’তে অভিনয় করেছিল। যেহেতু সে অভিনেতা নয়, তাকে অভিনয় শেখাতে হলো। তাকে যেমন বলেছি, সেভাবে অভিনয় করেছে। শিল্পী হলে তার অভিনয় আরো পূর্ণাঙ্গ হতো, কিন্তু স্বাভাবিক মনে হতো না। এ কারণেই কোনো শিশুশিল্পী নিইনি। রাজ্জাক-শাবানার অভিনয় নিয়ে তো আর বলার কিছু নেই।

 

কোথায় শুটিং হয়েছিল?

আমরা এমন একটি জায়গা খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম—যেখানে এই প্রকৌশলীর ছেলেটির বাসা হবে পাহাড়ের ওপরে, নিচে থাকবে স্কুল। নানা জায়গায় খুঁজেছি। শেষ পর্যন্ত কাপ্তাইয়ে বাঁধের ওপরে খুঁজে পেলাম। ওয়াপদার অনুমতি নেওয়া হলো। আইয়ুব খানের আমলে তৈরি রেস্ট হাউসকে ছাত্রের বাড়ি বানানো হলো। রেস্ট হাউসের আউটার ভিউতে জানালা থেকে স্কুল দেখা যায়। ফলে সেখান থেকে স্কুলের ছবি নিলাম, স্কুল থেকে বাড়ির। এফডিসিতে সেট বানিয়ে ঘরের ভেতরের অংশ শুট করা হলো। ১৫ দিন আউটডোর করে বাথরুমের ভেতরের অংশ সেট বানিয়ে ১৫ দিন শুটিং করা হলো। প্রতিটি দিনের আলাদা শুটিং করেছি।

   

ছবিটি কিভাবে মুক্তি পেল?

শুটিং শেষ হওয়ার পর সেন্সরে জমা দিলাম। কিন্তু বোর্ড আটকে দিল। তারা বলল, এই ছবি দেখে ছাত্র-ছাত্রীরা ভয়ে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেবে। তখন বিভিন্ন স্কুল থেকে আমরা ছাত্র-ছাত্রী সংগ্রহ করে তাদের বোর্ডে নিয়ে এসে ছবি দেখালাম। তারা বলল, আমরা মোটেও ভয় পাইনি, বরং অনেক কিছু শিখেছি। এরপর সেন্সর ছাড়পত্র পেলাম। ১৯৮০ সালে ছুটির ঘণ্টা মুক্তি দেওয়া হলো। কিন্তু কোনো হলই বুকিং করতে চায় না। এমনকি ২০-২৫ হাজার টাকাও বুকিং মানি দিতে চাইছে না। টঙ্গীর এক হল মালিক দয়া করে বললেন, ‘দাদা (সত্য সাহা) কাঁদছেন, কী করব? দিয়ে যান, ২৫ হাজার টাকা দিলাম, নিয়ে যান। ’ দাদা বললেন, ‘লস হয়ে যাবে। ’ বললাম, সাত লাখ টাকায় লসের কী আছে? পরের সপ্তাহে সেই ছবি ওই হল মালিক দুই লাখ টাকায় বুকিং করেছেন।

 

ছুটির ঘণ্টা কেমন চলেছে? 

প্রথমে মাত্র ২০টি হলে মুক্তি দিয়েছিলাম। এরপর সারা দেশে কোথাও চার-পাঁচ সপ্তাহ, কোথাও এক-দুই থেকে পাঁচ মাসও ছবিটি চলেছে। সত্যদা, আমার স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে এক ভোরে দিনাজপুরের মডার্ন হলে ম্যাটিনি শো শেষে গিয়ে দেখি, কান্নাকাটি, হৈচৈ হচ্ছে। পরে জানলাম, এক মহিলা ছবি দেখতে দেখতে আবেগে কোলের শিশুসন্তানকেই চাপ দিয়ে মেরে ফেলেছেন। আমরা ভয়ে পালিয়ে তাড়াতাড়ি রংপুরে গেলাম। কক্সবাজারের এক অধ্যাপকের ছেলে স্কুলে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে। স্কুল ছুটি হওয়ার পরে বাবা তাকে না পেয়ে স্কুলে হাজির হন। তিনি আমার ছবিটি দেখেছিলেন। তিনি দেখলেন, তাঁর ছেলে জ্বরে বেঞ্চে কাতরাচ্ছে। পরে খবরটি প্রকাশিত হয়েছে। তিনি বলেছেন, আজিজুর রহমানের ছুটির ঘণ্টাই আমার ছেলেকে বাঁচিয়েছে। এ ছবিটি তিন থেকে চার কোটি টাকা ব্যবসা করেছে। তবে কোনটি আমার সেরা ছবি জানি না। অভিনয়ের গভীরতা, কন্টিনিউশনের দিক থেকে মাটির ঘর, অশিক্ষিতের কথা বলব। এগুলো বারবার বানানো যায়। ছুটির ঘণ্টা দুর্ঘটনার ছবি, মানুষের আবেগ ও ভিজ্যুয়াল ইমোশনের কারণে চলেছে।

 

আপনার আয় কেমন ছিল?

এহতেশামের সঙ্গে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত প্রতিদিন যাতায়াত ভাড়া হিসাবে পাঁচ টাকা এবং মাসিক ৭৫ টাকা বেতন পেতাম। প্রথম ছবিতে ৩০০ টাকা পেয়েছি। বানাতে খরচ হয়েছে তিন লাখ টাকা। অশিক্ষিত, ছুটির ঘণ্টায় ৩০ হাজার পেয়েছি। সবেচেয়ে বেশি পেয়েছি ‘শাপমুক্তি’তে। বন্ধু শাহাবুদ্দিন এ ছবিতে দুই লাখ টাকা দিয়েছিলেন। আমি তো টাকা কামাতে আসিনি। আমি ব্যবসায়ীর ছেলে, জীবনে অনেক টাকা দেখেছি। আমি একজন স্রষ্টা, সৃষ্টি করতে এসেছি। শাবানার ‘মাটির ঘর’, এ টি এম শামসুজ্জামানের ‘বাপ-ব্যাটা ৪২০’ বিনা পয়সায় করে দিয়েছি। ফোক ছবির চিত্রনাট্যকার সফদর আলী ভূঁইয়ার ‘রঙিন রূপবান’ পরিচালনার কথা ছিল। কিন্তু তিনি মারা যাওয়ার পর আমি পরিচালনা করি। সেই ছবির টাকা এবং আমার কিছু মিলিয়ে তাঁর পরিবারকে তিন লাখ টাকা দিয়েছিলাম। সত্যদা, আমি ও গাজী মাজহারুল আনোয়ার ওয়ার্কিং পার্টনার ছিলাম। গাজী গান লিখত, সত্যদা সংগীত পরিচালনা করতেন, আমি পরিচালনা। আমরা ‘সমাধান’, ‘স্বীকৃতি’, ‘অপরাধী’, ‘গড়মিল’, ‘অগ্নিশিখা’ বানিয়েছিলাম। পরে ছেড়ে দিয়েছি। কারণ আমি ছবি বানাতে চেয়েছি, অন্য কিছু নয়।

 

কোন ছবিতে সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জ নিতে হয়েছে?

‘জনতা এক্সপ্রেস’। এখানে অ্যাক্টিং প্রডিউসার ছিলেন জয়নুল আবেদিন। তিনি স্টার ফিল্মসের পরিবেশক ছিলেন। এটি ইস্টম্যান কালারে বানানো তৃতীয় ছবি। এটি ১২ লাখ টাকায় শেষ করে দিয়েছিলাম। ছবিটি তাসখন্দ ফিল্ম ফেস্টিভালে সেরা বিদেশি ছবি নির্বাচিত হয়েছিল। হাজার হাজার লোকের মধ্যে এটি শান্তাহারে শুটিং করতে হয়েছে। দুটি ট্র্যাকে শুটিং করেছি। ক্রেনে ক্যামেরা বসিয়ে হলিউডের মতো শুটিং করেছি। ট্রেনে আসা-যাওয়ার মধ্যে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শুটিং করতে হয়েছে। ফ্রেমের মধ্যে বারবার লোকজন চলে আসছিল বলে আমি দুঃখে কেঁদেও দিয়েছি।

 

শ্রুতলিখন : রাজু আহমেদ

(২৬ জানুয়ারি, ২০১৭, গ্রিন রোড, ঢাকা)     


মন্তব্য